ভারতের জাতীয় আন্দোলন ও আর এস এস – (পর্ব - ১১)

ধারাবাহিক রচনায়ঃ গৌতম রায়

হেডগেওয়ারের  জীবনের প্রথম পর্বের যে পর্যায়ে কে কেন্দ্র করে আরএসএস তাদের প্রতিষ্ঠাতাদের জীবনের সঙ্গে জাতীয় আন্দোলনের সংযোগ তৈরি করার চেষ্টা করে, সেই পর্যায়ে জাতীয় আন্দোলনের প্রেক্ষাপটের  সঙ্গে সেইসব ব্যক্তিত্বদের সংযোগের বিন্দুমাত্র প্রমাণ ইতিহাসের কাছে নেই। জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্যায়ের নেতৃত্বেরা  প্রশাসনিক পুনর্গঠনের প্রশ্নে প্রথম থেকে সোচ্চার ছিলেন ।কিন্তু সেই প্রশাসনিক পুনর্গঠন কে তাঁরা কোনোরকম সংস্কার হিসেবে দেখেন নি ।তাঁরা সেটি দেখেছিলেন, দেশীয় সরকারি চাকরি গুলিতে ভারতবর্ষের মানুষদের নিয়োগের  প্রেক্ষিতে ।
              

জাতীয় আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের নেতাদের যুক্তি ছিল ;ভারতবর্ষের সিভিল সার্ভিসের পদ গুলিকে ভারতীয়করণ যদি করা হয় ,তাহলে ভারতবর্ষের মানুষদের দরকারে যেসব আধিকারিক কর্মরত রয়েছেন ,তাঁদের কার্যক্রমের ধারাবিবরণী অনেক বেশি শক্তিশালী হবে এবং সেটি ভারতবর্ষের মানুষের উপকারে আসবে। সেই সময়কালে ইউরোপের আধিকারিকদের অবসরকালীন ভাতা ইত্যাদি দেওয়ার ক্ষেত্রে ,ভারতবর্ষের একটা বড় অংশের টাকা ইংল্যান্ডে চলে যাচ্ছিল। দাদাভাই নওরোজি যে 'ড্রেন অফ ওয়েলথ'  এর বিষয়টি অবতারণা করেছিলেন, শিল্প-বাণিজ্যের ভেতর দিয়ে  ভারতবর্ষ থেকে অর্থ সংগ্রহের সাথে সাথে,  অবসরকালীন ব্রিটিশ আধিকারিকদের, বেতন -ভাতা -পেনশন ইত্যাদির জন্য যে টাকার প্রয়োজন ,সেই টাকাটিও ব্রিটিশ  ভারত বর্ষ থেকে সংগ্রহ করে, তাদের নিজেদের দেশে নিয়ে যাচ্ছে --সেই বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল ।
                   

জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্যায়ের নেতারা দেশীয় সরকারি চাকরির গুলিতে ভারতবর্ষের মানুষদের নিয়োগের পেছনে একটা বড় যুক্তি হিসেবে  উপস্থাপিত করেছিলেন যে ,এই কাজটি যদি কার্যকরী করা যায় ,তাহলে অবসরকালীন আধিকারিকদের জন্য যে বিপুল পরিমাণ টাকা ভারতবর্ষ থেকে চালান যাচ্ছে ইংল্যান্ডে, সেই প্রক্রিয়াটিকে বন্ধ করে ভারতবর্ষের টাকা ভারতবর্ষে তেই রাখা যাবে।
                  

এটা কিন্তু যেন আমাদের মনে না হয় যে ,একটা জাতি বৈরিতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্যায়ের নেতারা ভারতবর্ষের সরকারি চাকরি গুলিতে ভারতীয় দের নিয়োগের প্রসঙ্গটিকে এইভাবে তুলে ধরেছিলেন। ব্রিটিশ এই পর্যায়ক্রম টিকে জাতি বৈরিতার পরিচায়ক হিসেবে দেখাবার চেষ্টা করলেও ,আমাদের জাতীয় আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের নেতাদের, ভারতীয় আধিকারিক পদে ,ভারতীয় দের নিয়োগের দাবি প্রসঙ্গটির  ভেতরে প্রধান ছিল ,ভারতবর্ষের টাকা ভারতবর্ষেই রেখে দেওয়ার প্রসঙ্গটি ।
                 

ভারতবর্ষের মানুষের কষ্টার্জিত টাকা, ভারতবর্ষের ধন-সম্পদ যাতে ব্রিটিশের মনোরঞ্জনের জন্য ইংল্যান্ডে চালান না হয় --সেই দিকটা র প্রতি দৃষ্টি রেখেই ,জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্যায়ের নেতারা ,এই প্রসঙ্গটিকে প্রথম তুলে ধরেছিলেন ।জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্যায়ের নেতা, যাঁদের  নরমপন্থী নেতা বলা হয় ,তাঁরা দাবি করতেন; সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা টি একসাথে ভারত বর্ষ এবং লন্ডনে অনুষ্ঠিত করতে  হবে এবং এই পরীক্ষায় বসার বয়স তখন ১৯ ছিল ।সেটাকে বাড়িয়ে ২৩  করতে হবে ।
          

ভারতীয় নেতৃত্বের দাবি কিন্তু বোর্ড অফ কন্ট্রোল সভাপতি চার্লস উড অত্যন্ত রুঢ়  ভাবে বিরোধিতা করেন। চার্লস উডের দাবি ছিল; সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় যে ধরনের প্রশিক্ষণ দিতে হয়, সেই ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়ার মত উন্নত পরিকাঠামো ভারতবর্ষের নেই ।সেই কারণে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায়, পরীক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের লক্ষ্যেই ,এই পরীক্ষাটি ইংল্যান্ডের মাটিতে নেওয়া প্রয়োজন বলেও খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে ছিলেন  ।
                 

চার্লস অচিসনের নেতৃত্বে পাবলিক সার্ভিস কমিশন কিন্তু প্রথম সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বয়সের সীমা রেখা কে বৃদ্ধি করার পক্ষে  অভিমত প্রকাশ করে। কিন্তু কোন অবস্থাতেই লন্ডন আর ভারতবর্ষে একই সাথে এই সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা নেওয়ার পক্ষে অচিসনের  নেতৃত্বাধীন পাবলিক সার্ভিস কমিশন কোনরকম অভিমত ব্যক্ত করেনি।
               

১৮৯২-৯৩  সালে গ্ল্যাডস্টোনের  প্রচেষ্টায় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা ভারত ও লন্ডনে একসাথে নেওয়ার ব্যাপারে হাউস অব কমন্সে একটি প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছিল ।হাউস অব কমন্সে  এ সম্পর্কে প্রস্তাব অনুমোদিত হওয়া সত্ত্বেও সেক্রেটারি অফ স্টেট কিন্তু এই গোটা ঘটনার তীব্র বিরোধিতা করেন। ভারতবর্ষের নাগরিকদের এই পরীক্ষায় বসার ক্ষেত্রে বয়সের সীমারেখা যে একটা বড় রকমের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে-- সেই বিষয়টি নিয়ে সেই সময় জাতীয় কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতাদের যে সোচ্চার হয়ে ওঠা ,তাকে কিন্তু ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ কোনো অবস্থাতেই কোনরকম গুরুত্ব দিতে রাজি ছিল না ।
                 

গ্লাডস্টোন এই প্রস্তাব হাউস অব কমন্স থেকে অনুমোদন করাধোর ফলে  ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ গ্ল্যাডস্টোনের  উপরে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ  হয়ে ওঠে এবং তাঁকে  কে এই ঘটনার অল্প কিছুদিন পরেই পদচ্যুত করা হয়। গ্ল্যাডস্টোনের  জায়গায় সলসবৃরিকে  সেই পদে নিয়ে আসা হয়। সলসবেরি গোটা বিষয়টিকে কার্যত ঠান্ডা ঘরে পাঠিয়ে দেন ।
               

এই পর্যায়ক্রমে পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও সামরিক খাতে ব্রিটিশ ভারত যেভাবে ভারতবর্ষের মানুষদের অর্থনৈতিক শোষণ করছিল ,সেই প্রসঙ্গটিকে ঘিরে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্যায়ের নেতারা সোচ্চার হয়ে ওঠেন । ভারতবর্ষের তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষিতে যে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব তখন ঘটতে শুরু করেছে, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সেই অংশের মানুষদের কাছে, ব্রিটিশ তার সম্রাজ্য রক্ষার স্বার্থে, ভারতবর্ষের মানুষদের টাকা কিভাবে সামরিক খাতে খরচ করছে-- এ সম্পর্কে একটা সচেতনতা তৈরি র পরিবেশ সৃষ্টি করে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্যায়ের নেতারা।
                

ব্রিটিশের প্রতি এইসব নেতৃত্বের  একটা ইতিবাচক মানসিকতা থাকা সত্ত্বেও, সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা এবং ব্রিটিশ ভারতের সামরিক খাতে ভারতবর্ষের মানুষদের অর্থনৈতিক শোষণ ঘিরে  গোটা পর্যায়টি র পরিচালনা র  বিষয়টিকে নিয়ে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্যায়ের নেতাদের সম্পর্কে ধীরে ধীরে ব্রিটিশের  ভেতরে একটা নেতিবাচক মানসিকতা খুব সামান্য হলেও তৈরি হতে শুরু হয় ।ভারতবর্ষের মানুষদের অর্থনৈতিক শোষণ ক'রে সেই টাকা, ব্রিটিশ সামরিক খাতে খরচ করে।সেই টাকা র দ্বারা ব্রিটিশ  আফ্রিকা এবং এশিয়াতে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীকে যেভাবে যুদ্ধবিগ্রহের লিপ্ত করে দিয়েছিল, এই বিষয়টি জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্যায়ের নেতারা কোন অবস্থাতেই ভালোভাবে মেনে নেননি।
                     

ব্রিটিশের এই সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা এবং এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে আর আফ্রিকায় ব্রিটিশের স্বার্থবাহী যুদ্ধে ভারতবর্ষের মানুষদের অর্থ বিনিয়োগের বিষয়টিকে ঘিরে ,হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে  মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত শ্রেণীর ভেতরে সচেতনতা তৈরীর লক্ষ্যে ,নানা সীমাবদ্ধতার ভেতরে ও , জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্যায়ের নরমপন্থী নেতারা যে ভূমিকা নিতে শুরু করেন, সেই ভূমিকাটি ব্রিটিশের স্বার্থকে শেষপর্যন্ত ক্ষুন্ন করছিল।
                  

সেই কারণে এই দিকে লক্ষ্য রেখে ব্রিটিশ কিন্তু ধীরে ধীরে জাতীয় কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতৃত্বের প্রতি রুষ্ট হতে শুরু করে। এইসব যুদ্ধবিগ্রহের কারণে উনিশ শতকের নয়ের দশক থেকে  ভারতবর্ষের অর্থনীতির উপরে একটা ভয়াবহ চাপ এসে পড়ে ।এই চাপটি ভারতবর্ষের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উপলব্ধি করতে পারে জাতীয় কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতাদের মাধ্যমে।ফলে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্যায়ের নেতাদের প্রতি ব্রিটিশ তাদের ইতিবাচক ধারণা সম্পর্কে ধীরে ধীরে সরে আসতে থাকে।
                     

জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্যায়ের নেতারা সেভাবে তাঁদের আন্দোলনকে সমাজের ভূমি স্তরে পৌঁছে  দিতে না পারলেও ,শিক্ষিত  মধ্যবিত্তের ভেতরে, তাঁদের চিন্তা-চেতনার যে প্রসার ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন ,যার দ্বারা উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্তের ভেতরে ধীরে ধীরে একটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মানসিকতা জন্ম লাভ করতে শুরু করেছিল --এই গোটা পর্যায়ক্রমে সঙ্গে কিন্তু একটি বারের জন্যেও আমরা হেডগেওয়ার বা বি এস  মুঞ্জে সহ আরএসএস এর প্রথম যুগের একজন নেতৃত্বের ও  কোন অবস্থাতে বিন্দুমাত্র সংযোগের কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাইনা।
                 

আফ্রিকা ,এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর খরচ একক ভাবে ভারতীয়দের উপর না  চাপিয়ে, এই খরচ সমানভাবে ভারত সরকার এবং বিদেশের ব্রিটিশ সরকার বহন করুক--। এই দাবি প্রথম তুলেছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্যায়ের নেতারা তার পাশাপাশি তাঁরা দাবি তোলেন; স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে ভারতবর্ষের নাগরিকদের সেনাবাহিনীতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি ।তার পাশাপাশি ভারতীয়দের সামরিক বাহিনীতে উচ্চতর পদে নিয়োগের বিষয়টিকে তাঁরা অত্যন্ত জোরৃর  সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন।
                   

বলাবাহুল্য জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্যায়ের নেতাদের এই সমস্ত দাবি গুলিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এক কথায় নাকচ করে দেয় ।কেবল নাচক ই নয় ,সেই সময়ের  ব্রিটিশ সেনাপ্রধান রবার্টসন, জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতৃত্বের  ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর উচ্চ পদে ভারতীয়দের নিয়োগের প্রসঙ্গটিকে ঘিরে যে ধরনের ঘৃণা পূর্ণ মানসিকতা প্রকাশ্যে রেখেছিলেন, তা সার্বিকভাবে জাতি বৈরিতাকে উসকে দেওয়ার সমতুল্য ছিল।
                     

রবার্টসনের ধারণা ছিল বাঙালি এবং মারাঠি  ভেতরে নব উত্থিত জাতীয়তাবাদের এবং ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত ছাত্র-যুবসমাজের একটি সংযোগ রয়েছে। সেই কারণেই বাঙালি- মারাঠি যুবকদের কোনো অবস্থাতেই বিশ্বাস করে ,তাদেরকে সেনাবাহিনীতে সংযুক্ত করা যায় না --এই কথা প্রকাশ্যে বলে, ব্রিটিশ সেনা প্রধান রবার্টসন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিভাজন প্রক্রিয়ার প্রাথমিক স্তরের নগ্ন রূপটিকে খুব পরিস্কার করে দিয়েছিলেন।
                   

রবার্টসন প্রকাশ্যেই বলেছিলেন; বাঙালি ও মারাঠি, যারা নানাভাবে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র উপায় সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টায় রত রয়েছে, সেই অংশের ভেতর থেকে যদি যুবকদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ,তাহলে সেই সব যুবকরা, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ঐক্যকে, ব্রিটিশের স্বার্থকে, সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ,ভারতবর্ষে ব্রিটিশের  সমস্ত সম্ভাবনাকে রুদ্ধ করে দেবে। সেনাবাহিনীর কমিশন্ড পদে সেই সময়  ভারতবর্ষের মানুষদের নিয়োগ করার দাবি জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছিলেন ।
                   

সেই দাবিটিও কিন্তু সেনাপ্রধান রবার্টসন এক কথাতে  নাকচ করে দিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল; কোনো ইউরোপীয় আধিকারিক, একজন ভারতীয় প্রধানের আদেশ মেনে চলার কথা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারে না। জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্যায়ের নেতারা, ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর খরচ, ব্রিটিশ-ভারতীয় সরকারের পাশাপাশি সরাসরি ব্রিটিশ শাসকদের বহন করার যে দাবি তুলেছিলেন, সেই দাবিকে ঘিরে ,সাধারণ মানুষের ভেতর তখন যে ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে শুরু করেছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে   ব্রিটেনের সরকার ,তাঁদের সামরিক বাহিনীর খুব সামান্য খরচ নিজেরা বহন করবেন এমনটা জানাতে বাধ্য হন।
                    

সেই খরচের পরিমাণ ছিল অত্যন্ত কম ।মাত্র এক মিলিয়ন পাউন্ড-- এই রকম তাঁরা খরচ বহন করতে রাজি হয়েছিলেন ।এই সময়কালে ইংল্যান্ড ও ভারতবর্ষের ভেতরে মুদ্রা বিনিময় মূল্যের হার টি  যথেষ্ট বেশি ছিল। সেই কারণে ব্রিটিশ সরকার যেভাবে সরাসরি জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্যায়ের নেতৃত্বদের দাবিকে মর্যাদা  দিতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাতেও কিন্তু তাদের এই ভারতীয় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর খরচ বহনের পরিমাণের অংকটি এত নিম্ন মুখী হওয়ার প্রসঙ্গটি উঠে এসেছিল।
               

এইরকম একটি পরিস্থিতিতে ভারতীয় অর্থনীতির উপরে যে চাপ টিকে গিরে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম পর্যায়ের নেতারা অত্যন্ত সোচ্চার ছিলেন। সেই চাপটি কিন্তু ভারতীয়দের ওপরে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ভারতবর্ষের মানুষদের নানা সামাজিক আন্দোলনের সত্বেও বলবৎ  রাখে।
                          

অবিভক্ত পাঞ্জাবের  বিভিন্ন সামাজিক পর্যায়ে ,রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার যে সংঘবদ্ধতা সৃষ্টির সংকল্প উনিশ শতকের শেষ প্রান্ত থেকে ক্রমশ শক্তিশালী হতে শুরু করেছিল ,যে স্রোতধারা পরবর্তী সময়ে হিন্দু মহাসভা বা আরএসএসের  রাজনৈতিক পর্যায়ক্রম কে  ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে ,যেসব সামাজিক কর্মকাণ্ড গুলি অনুষ্ঠিত হতো ,তাকে শক্তিশালী  করেছিল ,সেইসব পর্যায়ক্রমে একটি অংশের সঙ্গে কিন্তু জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম স্তরের নেতৃত্ব, যাঁদের মধ্যে হয়তো খানিকটা ধর্মীয় বোধ  , এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুনরুত্থানবাদী  চিন্তা চেতনা কার্যকরী ছিল ।
                 

তবে তাঁদের যে ধর্ম নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি এবং জাতি বৈরিতা বিরোধী চেতনা, যার দ্বারা তাঁরা ব্রিটিশের  অর্থনৈতিক শোষণ কে ভারতবর্ষের মানুষের মধ্যে প্রথম স্পষ্ট করে তুলে ধরে,  ভারতবর্ষের মানুষদের, ব্রিটিশবিরোধী মানসিকতা তৈরীর ক্ষেত্রে ভগীরথের  ভূমিকা পালন করেছিলেন ,সেই অংশের সাথে কিন্তু পাঞ্জাব, উত্তর ভারতের রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক নেতৃত্ব, লালা হরদয়াল থেকে শুরু করে যেসব রাজনৈতিক হিন্দু ব্যক্তিত্ব , জাতীয় আন্দোলনের ভিতর সাম্প্রদায়িক উপাদান সংমিশ্রণে তৎপর ছিলেন , তাদের তুলনা চলে না।
              

জাতীয় আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের নেতারা জাতীয় চেতনার উন্মেষে ব্রিটিশের অর্থনৈতিক শোষণ নিয়ে সোচ্চার হয়েছিলেন, সেই পর্যায়ক্রমের সঙ্গে ধর্মের রাজনৈতিক কারবারে র ষড়যন্ত্রে লিপ্ত এইসব মানুষেরা সংযুক্ত হন নি।

ধারাবাহিক লেখাগুলি পড়তে ক্লিক করুনঃ www.cpimwb.org.in

ভারতের জাতীয় আন্দোলন ও আর এস এস – (পর্ব - ১০)

ভারতের জাতীয় আন্দোলন ও আর এস এস – (পর্ব- ৯)

ভারতের জাতীয় আন্দোলন ও আর এস এস – (অষ্টম পর্ব)

ভারতের জাতীয় আন্দোলন ও আর এস এস – (সপ্তম পর্ব)

ভারতের জাতীয় আন্দোলন ও আর এস এস – (ষষ্ঠ পর্ব)

ভারতের জাতীয় আন্দোলন ও আর এস এস – (পঞ্চম পর্ব)

ভারতের জাতীয় আন্দোলন ও আর এস এস – (চতুর্থ পর্ব)

ভারতের জাতীয় আন্দোলন ও আর এস এস – (তৃতীয় পর্ব)

ভারতের জাতীয় আন্দোলন ও আর এস এস – (দ্বিতীয় পর্ব)

ভারতের জাতীয় আন্দোলন ও আর এস এস - (প্রথম পর্ব)


শেয়ার করুন

উত্তর দিন