Where there is struggle, there is Lenin – Samik Lahiri


নভেম্বর বিপ্লব – প্রথম সর্বহারার রাষ্ট্র। প্রথম, পুঁজিবাদের একটি সুনির্দিষ্ট বিকল্প হিসাবে বিশ্ব ইতিহাসের অগ্রগতির আলোচনায় উঠে এল সমাজতন্ত্র। তারপর, এই বসুন্ধরার মানচিত্রের গায়ে কৃষ্ণচূড়ার মতো একে একে নানা দেশে ফুটে উঠছে লেনিনের স্বপ্ন। উত্তর থেকে দক্ষিণ মেরুর লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদস্পন্দনে লেনিন।
নভেম্বর বিপ্লব – মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক যুগান্তর। সামান্য’র হাতে বহু’র শোষণ ভিত্তিক সমাজের অবসান। পুঁজি ও ব্যক্তি মুনাফার স্বার্থে নয়, শোষিত জনগণের স্বার্থে রাষ্ট্র — সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে তার প্রথম বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছিল।
তাই নভেম্বর বিপ্লব এক নতুন বিশ্বের অগ্রদূত। একটি নতুন যুগের সূচনা।

Lenin-Engels-Marx


কিন্তু কেন?
এর আগে আঠারো বা উনিশ শতকে অনেক বিপ্লব হয়েছে। কিন্তু তা হয়েছে সামন্ত রাজাদের উৎখাতের লক্ষ্যে। বুর্জোয়া বিপ্লব। যেমন ছিল ফরাসী বিপ্লব। একটি ধ্রুপদী বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব। তারপরে বিশ শতকে নভেম্বর বিপ্লব। তার আগে প্যারি কমিউন। সর্বহারাদের প্রথম ক্ষমতা দখল ও একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের প্রচেষ্টা। যদিও তা ছিল স্বল্পায়ু – মাত্র ৭২দিন, তবে সেটাই ছিল নভেম্বর বিপ্লবের অঙ্কুরোদ্গম্‌।
নভেম্বর বিপ্লবই নতুন বিশ্বের অগ্রদূত কারণ, নভেম্বর বিপ্লব পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম মাইলফলক। এই প্রথম একটি বিপ্লব করল শ্রমিক শ্রেনি। এই প্রথম একটি বিপ্লব হলো, যার নেতৃত্ব শ্রমিক শ্রেনি।
কেবল জারের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছিল না এই বিপ্লব। এই বিপ্লব ছিল একটি নতুন ধরনের বিপ্লবের আগমন বার্তা সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী, পুঁজিবাদ-বিরোধী এবং চরিত্রের দিক থেকে সমাজতান্ত্রিক। যার ছিল বিশ্বজোড়া তাৎপর্য। লেনিন এবং বলশেভিকরা রাশিয়ার বিপ্লবকে বিশুদ্ধ ‘জাতীয়’ পরিসরে দেখেননি। দেখেছিলেন বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পূর্বসূরী হিসাবে।
সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপার সম্ভাবনাকে দেখাল এই বিপ্লব। এই বিপ্লব দেখাল তার অভাবনীয় সাফল্যকে।
এই প্রথম, সমস্ত মানুষের জন্য জন্ম থেকে মৃত্যু— খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কাজ, বস্ত্র, বাসস্থানের নিশ্চয়তা। ভুখাপেট-নিরক্ষর-কাজহীন মানুষের জন্য কেবলমাত্র ভোট দেওয়ার অধিকার নামক একটা স্বান্তনা পুরষ্কার নয়, মানুষের মতো বাঁচার অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল সমাজতন্ত্র। শিল্প ও কৃষিতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি।
বিপ্লবের সময় কতটা পিছিয়ে ছিল রাশিয়া, আজ কল্পনা করাও কঠিন। ৮০ শতাংশ রুশই ছিলেন নিরক্ষর। উচ্চশিক্ষার জন্য সাকুল্যে ৯০টি প্রতিষ্ঠান। টেনেটুনে ১,১২,০০০ ছাত্র। মাত্র দু’দশকের মধ্যে নিরক্ষরতার অবসান। ১৯৪১, উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে ৮০০। ছাত্র সংখ্যা ৬,৬৭,০০০। বেকারির অবসান। ঘরের টুকিটাকি কাজের বন্দি জীবন থেকে মহিলাদের মুক্তি। প্রতিটি ক্ষেত্রে মহিলাদের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা। রান্নাঘরের সামোভার থেকে মহাকাশে – প্রথম মহিলা, ভ্যালেন্তিনা তেরেস্কোভা।
গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে গ্রামে গ্রামে বিদ্যুতের আলো। এইচ জি ওয়েলসের মতো মানুষও ভ্লাদিমির লেনিনের ‘পাগলামি’ দেখে ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ‘ক্রেমলিনের স্বপ্নদর্শী’ (Book: Russia in the shadows)। দশ বছর পর সেই ওয়েলসই নিজে দেখেছেন গোটা সোভিয়েত ইউনিয়ন উজ্জ্বল আলোয় হাসছে। সাত পুরুষের অন্ধকার তাড়িয়ে ঝলমল করছে বিদ্যুতের আলো। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তাক লাগিয়ে দেওয়া অগ্রগতি। মহাকাশে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ – স্পুটনিক। মহাকাশে প্রথম মানুষ – যৌথ খামারের এক ছুতোরকর্মীর সন্তান – ইউরি গ্যাগারিন।


যে বার্তা রটি গেল দেশে দেশে

১০ নভেম্বর, ১৯১৭। কলকাতা থেকে প্রকাশিত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মুখপত্র দ্য স্টেটসম্যান লিখল: ‘৮ নভেম্বর লন্ডন থেকে বেতার যোগে খবর পাওয়া গিয়েছে যে পেট্রোগ্রাডের শ্রমিকরা ও সৈন্যদল কেরেনস্কি সরকারের পতন ঘটিয়েছে।’ ব্যাস, ছোট্ট দু’ লাইনের খবর। কোনও মন্তব্য নেই। পরদিন বেরল আরেকটু খবর। সঙ্গে সম্পাদকীয়।
অক্টোবর বিপ্লবের বজ্রনির্ঘোষ। প্রথম ঢেউ ওঠে ইউরোপে। বিপ্লবের পরের বছরই গ্রিসে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা। জমি, রুটি আর শান্তি – যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইউরোপের অধিকাংশ দেশের শ্রমিক শ্রেনির কাছে ছিল তূর্যনিনাদ।
১৯১৯, লেনিনের নেতৃত্বে তৃতীয় আন্তর্জাতিক – দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা। ওই বছরই মেক্সিকোতে গড়ে উঠেছিল মেক্সিকান কমিউনিস্ট পার্টি – অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এম.এন. রায়। অন্যদিকে ফ্রান্সে ফ্রেঞ্চ কমিউনিস্ট পার্টি – ১৯২০। সেই বছরেই তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। তার পরের বছর ১৯২১ সালে চীনে তৈরি হ’লো কমিউনিস্ট পার্টি অফ চায়না। ঐ বছরই ইতালিতে, পার্তিদো কমিউনিস্তা ইতালিয়ানো ও দক্ষিণ আফ্রিকার কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হ’লো কেপটাউনে। ওই বছরই ভারতে, জাতীয় কংগ্রেসের আমেদাবাদ অধিবেশন। কমিউনিস্টরাই প্রথম তুললেন পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি (মৌলানা হসরৎ মোহানি ও স্বামী কুমারনন্দ)। ১৯২২ সালে পার্তিদো কমিউনিস্তা দু ব্রাজিল। তিন বছর বাদে ১৯২৫ সালে কিউবায় পার্তিদো সোশ্যালিস্তা পপুলার তৈরি হ’লো, ফিদেলের জন্মের আগে। ১৯৩০ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারী তৈরি হ’লো ভিয়েতনামে। ওই বছরই কলম্বিয়াতে, পার্তিদো কমুনিস্তা কলম্বিয়ানো।
এই গ্রহের যেখানে সূর্যের আলো, সেখানেই লাল পতাকা; আর সেখানেই লেনিন। খেতে কারখানায় হাটে বন্দরে বস্তিতে — যেখানে মানুষ, সেখানেই লাল পতাকা। সেখানেই লেনিন। যেখানে মুক্তির যুদ্ধ সেখানেই কমরেড লেনিন। এমনকি হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পর্যন্ত উড়েছে লাল পতাকা – ইতিহাস জানে, আর জানেন জুলিয়াস ফুচিক। যিনি ফ্যাসিস্ত কারাগারে মে’দিবস পালনের সেই বিবরণ লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন (বইঃ ফাঁসির মঞ্চ থেকে)।
নভেম্বর বিপ্লবের প্রেরণা ছড়িয়ে পড়ল ভিয়েতনামেও, পাশে সোভিয়েত। লেনিনের ‘থিসিস অন দি ন্যাশনাল অ্যান্ড কলোনিয়াল কোশ্চেন’ – অন্যান্যদের মতো উদ্বুদ্ধ করেছিল হো চি মিন্‌’কেও। গোটা বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে জোরালো লড়াই। দেশে-দেশে মুক্তি আন্দোলন। বিপ্লবের পাঁচ দশকের মধ্যে গোটা দুনিয়ার মানচিত্রটাই বদলে গিয়েছিল। ভারতবর্ষ সহ দেশে দেশে স্বাধীনতা অর্জন। সরাসরি সাম্রাজ্যবাদের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি।
ভোলগার ঢেউ গঙ্গায়। অক্টোবর বিপ্লবের আলোড়ন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে। ফাঁসির আগের দিনগুলিতে ক্লারা জেটকিনের লেখা ‘লেনিনের স্মৃতিচারণ’ বইতেই ডুবে ছিলেন ভগৎ সিং (মার্চ ২৩, ১৯৩১০)। ২১ জানুয়ারি, ১৯৩০ – লেনিনের মৃত্যু বার্ষিকীতে লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত ভগৎ সিং ও তাঁর কমরেডরা আদালতে ঢুকলেন রক্তলাল স্কার্ফ পরে। ‘বন্দে মাতরম’ থেকে সরে এসে স্লোগান ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক’। তারপর খোলা আদালতে ভগৎ সিং সোচ্চারে শোনালেন তৃতীয় আন্তর্জাতিকের কাছে পাঠানো টেলিগ্রাম: ‘আজ লেনিন দিনে আমরা আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি তাঁদেরকে, যাঁরা মহান লেনিনের মতাদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কিছু না কিছু করছেন। রাশিয়া যে মহান পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে তার সাফল্য কামনা করি আমরা। আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করছি আমাদের কন্ঠস্বর। সর্বহারার জয় নিশ্চিত। পরাস্ত হবে পুঁজিবাদ। মৃত্যু ঘটবে সাম্রাজ্যবাদের।’
ভগৎ সিং থেকে মুজফফ্‌র আহমেদ; রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল – কে প্রভাবিত হয়নি এই বিপ্লবে।


থেমে গেল হিটলারের রথ
ঐ সময়েই বিশ্বজুড়ে মহামন্দা, কিন্তু তা ছুঁতে পারেনি রাশিয়াকে। এটা কাকতালীয় কোনও ঘটনা নয়, এটা একটা পরিকল্পিত অর্থনীতির ফসল; পুঁজিবাদ বনাম সমাজতন্ত্র – দুই ব্যবস্থার ভিন্নতার অনিবার্য প্রকাশ।
১৯৩০-এর দশক। গোটা দুনিয়াতে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগোচ্ছে হিটলার। প্রবল পরাক্রান্ত শক্তি। আটকে দেওয়ার ক্ষমতা কার আছে? কে কোথায় ছিল সেদিন? একা স্তালিন। একা সোভিয়েত। স্তালিনগ্রাদের শেষ লড়াই। হিটলারের ‘অপারেশন বারবারোসা’র মাধ্যমে সোভিয়েত জয়ের স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ। ২২শে জুন ১৯৪১ থেকে ৭ই জানুয়ারী, ১৯৪২ – ৬মাস,২ সপ্তাহ, ২ দিন। আড়াই কোটি রুশ জনগণ, আর লাল ফৌজের জীবনদান – ইতিহাসের এক মহাকাব্য। অবশেষে মার্শাল ঝুকভের নেতৃত্বে বার্লিনে প্রবেশ করলো লাল ফৌজ। ১৯৪৫ সাল, ১৬ই এপ্রিল থেকে ২রা মে – ১৬ দিনেই নাৎসিদের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছিল লাল ফৌজ। তার আগেই পৃথিবীর ত্রাস হিটলার ৩০শে এপ্রিল আত্মহত্যার রাস্তাকেই বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন; সাথে দীর্ঘদিনের বান্ধবী কিন্তু ১দিনের স্ত্রী ইভা ব্রাউন।
স্ট্যালিনগ্রাদের জন্য ভালোবাসার প্রেমগাথা রচিত হয়েছিল পাবলো নেরুদা’র কলমে। সলিল চৌধুরীর কলম স্তালিনগ্রাদের লড়াইয়ের ছবি এঁকেছিল কাকদ্বীপের নোনা মাটিতে।
আমার বুকের দুর্গে করে আক্রমণ
ফ্যাসিস্ত দস্যুর মতো যক্ষ্মাবীজ এসে
তবু আমি প্রাণপণে টেনে যাই শ্বাস
আমার বিশ্বাস জানি রক্তকণিকারা
লাল ফৌজের মতো দুর্জয় সুনিশ্চিত
আবার দখল নিয়ে দেবে প্রত্যাঘাত
অমর স্তালিনগ্রাদ
আবার আমারই বুকে
ফিরে পাব আমি।


সমাজতন্ত্র – এক দেশ থেকে দুনিয়া
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে ছিল শুধু একটিই সমাজতান্ত্রিক দেশ। শুধু সোভিয়েত ইউনিয়ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বদলে গেল চেহারা। পূর্ব ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ বেছে নিয়েছিল সমাজতন্ত্রের পথ। তার রেশ ধরে উত্তর ভিয়েতনাম, গণতান্ত্রিক কোরিয়া, শেষে চীনের আকাশে লাল তারা। সবশেষে ১৯৫৯, কিউবার বিপ্লব। গোটাটা মিলিয়ে সমাজতান্ত্রিক শিবির। ১৯৭৫ সালে দক্ষিণ ভিয়ে্নামও মুক্ত হয়ে উত্তরের সাথে মিলে তৈরি হ’লো ভিয়েতনাম।
একটি সমাজতান্ত্রিক দেশ থেকে সমাজতান্ত্রিক দুনিয়া।
পৃথিবীর জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ সমাজতন্ত্রের পথ গ্রহণ করে গড়ে তুলেছিল নতুন এক জীবন, এক নতুন সভ্যতার আলো পৌঁছে দিয়েছিল মুক্তির বার্তা।


বিচ্যুতি’র ১০দিন
একথা ঠিক, সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র নির্মাণের শেষদিকে ফুটে উঠেছিল বেশ কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি, দুর্বলতা। আবার এও ঠিক, একদিনে ভেঙে পড়েনি মস্কো।
গত শতকের বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে রয়েছে দু’টি ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’ – একটি ১৯১৭ সালের ৭-১৭, নভেম্বরের দিনগুলি, যার বর্ণনা রয়েছে ওই শিরোনামে লেখা জন রীডের বইয়ে। আরেকটি সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির বিংশতিতম কংগ্রেসের গৃহীত দলিলে (১৪-২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৬)। দু’টি ঘটনাই অপরিবর্তনীয়ভাবে বিভাজন রেখা টেনে দিয়েছিল ‘আগে’ এবং ‘পরের’ মধ্যে। সহজ করে বললে, অক্টোবর বিপ্লব তৈরি করেছিল একটি বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলন, যাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল বিংশতিতম কংগ্রেস – বলেছেন এরিক হবস্‌বম্‌। কী আশ্চর্য, নভেম্বর বিপ্লবের বছরেই এই মার্কসবাদী ইতিহাসবিদের জন্ম!


বেআব্রু পুঁজিবাদ
এই সেদিন ১৯৯২ সালে, ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা ঘোষণা করেছিলেন: ‘ইতিহাসের অবসান।’ জিতেছে পশ্চিমের পুঁজিবাদ। ধনতন্ত্রই সার-সত্য, শাশ্বত। এর কোনও বিকল্প নেই। সমাজতন্ত্রের অবসান মানে দ্বন্দ্বের অবসান। সব সংকটের স্থায়ী সমাধান। ধনতন্ত্রই নাকি সমাজ বিকাশের শেষ স্তর।
দু’দশক যেতে না যেতেই খসে পড়েছিল ‘অ-বিকল্প’ বিশ্ব পুঁজিবাদের বাহারি পলেস্তারা। শতাব্দী প্রাচীন সংস্থা লেম্যান ব্রাদার’স বোল্ড। ওয়ালস্ট্রিটে বেআব্রু পুঁজিবাদ। সংকটের শুরু। লেম্যান পতনের পর কেটে গেছে দেড় দশক। এখনও সে ধাক্কা চলছে।
অন্যদিকে, মার্কস ২০৬; এঙ্গেলস ২০৪, এখনও ক্রিজে, এখনও নটআউট এবং ফুল ফর্মে।


বিকল্প কি?
ফুকুয়ামা এখন বলছেন বরং সমাজতন্ত্রের কিছু বিষয় ফিরে আসা খুব জরুরি (Interview: The New Stateman, USA, 17th October, 2018)। স্বাভাবিক। বিশ্ব পুঁজিবাদের মুখপত্র ইকনমিস্ট পত্রিকার ৩রা মে, ২০১৮ সংখ্যার শিরোনাম ছিল – ‘বিশ্বের শাসকরা: কার্ল মার্কস পড়ুন!’ ২০১৫, মেরিয়াম ওয়েবস্টার অনলাইন অভিধানে সবচেয়ে সন্ধানী শব্দ ‘সমাজতন্ত্র’ (The Guardian, 3rd December, 2015)।
২৪শে মার্চ, ২০২০। দ্য মস্কো টাইমস পত্রিকা একটা সমীক্ষার খবর ছেপেছিল। স্বাধীন লেভাদা সেন্টার পোলস্টার দ্বারা প্রকাশিত একটি সমীক্ষা অনুসারে, চারজনের মধ্যে তিনজন রাশিয়ান মনে করেন যে সোভিয়েত যুগ ছিল তাদের দেশের ইতিহাসের সেরা সময়। রুশ জনগণের বড় অংশ এখন ফিরতে চায় সোভিয়েত ইউনিয়নে, সমাজতন্ত্রে। রাশিয়ানরা সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান ইতিবাচক মতামত প্রকাশ করেছে। ইউ.এস.এস.আর-এর প্রতি নস্টালজিয়া এবং স্ট্যালিনের সমর্থন গত এক বছরে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পরে অনেকেই মনে করেছিলেন এবারে কমিউনিস্ট পার্টি চলে যাবে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। কিন্তু, তা হয়নি। এই মুহূর্তে রাশিয়ায় প্রধান বিরোধী দল রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি (সি পি আর এফ)। সদস্য সংখ্যা ১,৬২,১৭৩। রয়েছে ৮১টি প্রাদেশিক কমিটি। কমিউনিস্ট পার্টি মনে করে যুবকদের সংগঠিত করা দরকার শুধু নির্বাচনের জন্য নয়, তাঁরাই দেশের ভবিষ্যৎ, কারন ১৯১৭ সালে বলশেভিক পার্টির সদস্যদের অর্ধেকের বেশি বয়স ছিল ৩৫ বছরের কম।
বিপ্লবের ১০০ বছরে মস্কোর রাজপথে দুনিয়ার ৮৮টি দেশের কমিউনিস্ট-সোশ্যালিস্ট-ওয়াকার্স পার্টির প্রতিনিধিরা মিলিত হয়েছিল।
এখনও বিপ্লবের দিনে আমাজন থেকে আন্দামান সাজে লাল ঝান্ডায়। সাক্ষী এভারেস্ট – কাঠমান্ডুতে কমিউনিস্ট প্রধানমন্ত্রী। এখনও শ্রমিক আছড়ে পড়ে ফ্রান্সের রাস্তায় হাতে লাল ঝান্ডা।
জুন, ২০১৭। রাশিয়ায় ‘বিশ্বের সর্বকালীন সেরা ব্যক্তিত্ব’ বাছাইয়ে একনম্বরে স্তালিন। লেভেদা সেন্টারের জনমত সমীক্ষার রায়। চার নম্বরে লেনিন। ছ’নম্বরে ইউরি গ্যাগরিন। সাতে তলস্তয়। ইয়েলেৎসিন জামানার দুঃস্বপ্ন ভুলে যেতে চায় এখনকার রাশিয়ান প্রজন্ম।
তার আগে এপ্রিল। বিপ্লবের ১০০ বছর উপলক্ষে এক জনমত সমীক্ষায় অর্ধেকের বেশি, ৫৬ শতাংশ রুশ নাগরিকের স্পষ্ট অভিমত: ইতিহাসে লেনিন পালন করেছেন ‘ইতিবাচক ভূমিকা’। ২০০৬ সালে এই হার ছিল ৪০ শতাংশ।
এখনও মস্কোর অদূরে লেনিনের নাম ‘যৌথ খামার’। সেই কোথায় ইকুয়েদর। এখনও প্রতি ২০,০০০ জনের মধ্যে একজনের নাম লেনিন।
বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন। এই একটি বাক্য শুধু একটি প্রজন্মের নয়, বা কিছু সময়ের কথা নয়।
পুঁজিবাদের বিকৃত জান্তব উল্লাসে আজও আক্রান্ত লেনিন। দুনিয়ার সব প্রান্তে কমিউনিস্ট বিদ্বেষীদের নিশানা লেনিন। ওরা ভয় পায় লেনিনকে, ওদের লক্ষ্য তাঁর মতাদর্শ। মূর্তি ভাঙা য়ায়, বিকট উল্লাসে তা গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু হাজারো চেষ্টা করেও গুড়িয়ে দেওয়া যায়নি সমাজতন্ত্রের মহান মতাদর্শকে। এখানেই নভেম্বর বিপ্লবের প্রাসঙ্গিকতা।
আজও দুনিয়ার ‘গ্রামে ও নগরে হাজার লেনিন যুদ্ধ করে।
বিদ্যুৎ-ইশারা চোখে, আজকেও অযুত লেনিন
ক্রমশ সংক্ষিপ্ত করে বিশ্বব্যাপী প্রতীক্ষিত দিন।’ –
এই শপথে : একদিন ‘প্রতি মাস হবে নভেম্বর, প্রতিদিন প্রত্যেকে লেনিন।’

Spread the word

Leave a Reply