Environment 2024 (2)

Nature and the Discontents: A Note (Part II)

প্রাককথন

গত পর্বের আলোচনায় মূল বিষয় ছিল বিশ্বজোড়া নগরায়নের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষিত। এহেন ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই সামাজিক কাঠামোয় উৎপাদিকা শক্তি ও তার অনুসারী উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তনগুলি এগিয়ে চলে। সেই গতির সমানুপাতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের যাবতীয় কিছুকেই সামাজিক জীবনযাপনের সাথে সম্পৃক্ত করে নেওয়া চলতে থাকে। প্রকৃতির রহস্যকে ক্রমাগত উন্মোচিত করে চলার পাশাপাশি জেনে এবং কিছুটা না জেনে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্টের প্রক্রিয়াটিও শুরু হয়ে যায়। বানর থেকে মানুষের রুপান্তরে শ্রমের বিশেষ ভূমিকায় ফ্রেডরিক এঙ্গেলস স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন-

‘প্রকৃতির উপরে নিজেদের ইচ্ছাকে সফলভাবে চাপিয়ে দিতে পেরে আমরা যেন বিজয়োল্লাসে আত্মহারা না হয়ে পড়ি। এমন প্রত্যেকটি জয়ের পরেই প্রকৃতি আমাদের উপরে প্রতিশোধ নেয়। যে সমস্ত ফলাফলের উপরে ভিত্তি করে আমরা জিতে গেছি বলে মনে হয় সেইসব আসলে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া, পরবর্তী প্রতিক্রিয়াগুলিতে একেবারেই বিপরীত অবস্থার সৃষ্টি হয়, এমনকি তখন প্রাথমিক পর্বের ফলাফলগুলি কার্যত অকেজো বলে প্রতিভাত হয়।…. প্রকৃতি সর্বদা স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমরা আদৌ তার উপরে বিজয় অর্জন করতে পারিনি, বড়জোর তাঁর নিয়মগুলিকে আবিষ্কার করেছি মাত্র। আমরা কোনোদিনই প্রকৃতিকে শাসন করতে পারি না, আমাদের মস্তিস্ক, গায়ের হাড়, চামড়া থেকে শুরু করে মাংস অবধি শরীরের সবটাই সেই প্রকৃতিরই অংশবিশেষ ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্যান্য প্রাণীদের তুলনায় আমাদের বাড়তি দক্ষতা এই যে প্রকৃতির নিয়মগুলি উপলব্ধি করে তাকে নিজেদের কাজে যথাসাধ্য প্রয়োগটুকু আমরা করতে পারি। এটুকুই আমাদের বিশেষ বৈশিষ্ট।’

এখানেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার রাজনীতি ও তার ফলাফল প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।    

আজ প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্ব।

পর্ব ২

শ্যামাশীষ ঘোষ

নগর অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতার একটি বড় উৎস ছিল যুদ্ধের সংগঠিত হিংসা। যুদ্ধ, প্রকৃত অর্থে, সভ্যতার আর একটি ফসল। যুদ্ধের জন্য শাসক গোষ্ঠীর সবসময়েই একটা শক্তিশালী অর্থনৈতিক স্বার্থ ছিল। শক্তিশালী রাজ্যগুলি সভ্যতার কেন্দ্রগুলিকে ঘিরে থাকা বর্বর উপজাতিদের একটিকে অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করত, অভিযান চালিয়ে তাদের দাস বানাতো। সভ্য দেশে, উন্নত কৃষি সরঞ্জামের কারণে, ক্রীতদাসের ব্যবহার আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। নবগঠিত শ্রেণিসমাজে শিক্ষা ও বিজ্ঞান যুক্ত হয়ে গিয়েছিল উচ্চশ্রেণির সাথে। প্রাচীন গ্রীসে এই ব্যবস্থা একটা বিশেষ উচ্চতায় পৌঁছেছিল। দাসব্যবস্থা ভিত্তিক এই সভ্যতা কালক্রমে ভেঙে পড়ে এবং সামন্ত সমাজব্যবস্থার উদ্ভব হয়।

এই সামন্তসমাজে উৎপাদন ব্যবস্থা ছিল কৃষি ও কিছু পরিমাণে হস্তশিল্পের উপর নির্ভরশীল। একটি ধীর কিন্তু ক্রমবর্ধমান হারে কৌশলগত এবং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি ঘটছিল। এই অগ্রগতি নিজে এবং এর অর্থনৈতিক পরিণাম পুঁজিবাদের পরবর্তী সামাজিক চেহারার জন্ম দেবে। কৃষি এবং ব্যবহারিক শিল্পে উন্নতিগুলি মানুষের কাজকে যান্ত্রিকভাবে প্রতিস্থাপিত করার দিকে যাচ্ছিল – লোহা, উন্নততর লাঙ্গল, লাগাম, তাঁত এবং চাকির মত শ্রমলাঘবকারী সরঞ্জামের ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে। কৃষি এবং হস্তশিল্পের বিকাশের সাথে সাথে বিনিময়ের প্রয়োজনে সৃষ্ট হয়েছিল বণিক সমাজের। নগরগুলি কারিগরদের গিল্ডের তৈরি নতুন পণ্য বিনিময় করত সামন্ত অর্থনীতির উদ্বৃত্তের মাধ্যমে। নগরের প্রতিষ্ঠানগুলি থেকেই এসেছিল বার্জেস বা বুর্জোয়া শ্রেণি। সামন্ত উৎপাদনের শর্তগুলি ব্যবহারিক বিজ্ঞানের চাহিদা কমিয়ে দেয়। বৌদ্ধিক প্রচেষ্টা প্রবাহিত হয় সংগঠিত ধর্মীয় বিশ্বাসের দিকে। সামন্ত ব্যবস্থা প্রযুক্তিগত এবং সামাজিক দিক থেকে ধ্রুপদী ধনিকতন্ত্রের তুলনায় বেশি উন্নত ছিল। কিন্তু সামন্ত অর্থনীতি বিকশিত হতে পারত কেবলমাত্র জমিচাষের বৃদ্ধির মাধ্যমেই। ত্রয়োদশ শতকের শেষের দিকে এই প্রসারণ তার সীমা অতিক্রম করে গিয়েছিল, যা এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটের জন্ম দেয়, যা থেকে সামন্তবাদ আর কখনোই বেরিয়ে আসতে পারেনি। ইতিমধ্যেই সামন্ত ব্যবস্থার মধ্যেই অন্য অর্থনৈতিক রূপ জন্ম নিচ্ছিল – বাণিজ্য এবং শহরের উৎপাদনের অর্থনীতি। বণিকরা বাণিজ্যের কারণে অনেক বেশি বিত্তশালী ও ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছিল। সামন্তপ্রভুরা কৃষকদের শোষণের মাধ্যমে বিত্তশালী হলেও, এই বিত্ত প্রধানত তাদের সুখস্বাচ্ছন্দ্য ও বিলাসব্যসনে ব্যয় হত। বিপরীতে এই নব্য-উত্থিত বনিকসমাজ তাদের বিত্তকে ক্রমাগত মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে পুঁজির চেহারা দিতে সক্ষম হয়। সূচনা হয় প্রাথমিক ধরণের পুঁজিবাদী সমাজের – এই বণিকেরা বুর্জোয়ার ভূমিকা গ্রহণ করে। চতুর্দশ শতকের শেষে সামন্ত ব্যবস্থার ভেঙে পড়া কিন্তু কোনো সামাজিক অবক্ষয়ের সাক্ষ্য ছিল না, কারণ অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগতভাবে অনেক জায়গাতেই স্পষ্ট অগ্রগতির লক্ষণ ছিল।  

সমাজ পরিবর্তনের উপর এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে যা বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে তা হল, মানুষ তার শ্রমের মাধ্যমে প্রকৃতি পরিবেশের পরিবর্তন করেছে সকল সময়েই। কিন্তু এগুলির চরিত্র সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে যেমন বদলেছে, তেমনই বদলেছে মানুষের উপর প্রকৃতি-পরিবেশের প্রভাবের ধরণ। আদিম সমাজে প্রকৃতির সাথে মানুষের কাজের সুফল এবং কুফল দুইই বর্তেছিল পুরো সমাজের উপর, এবং প্রভাবিত হয়েছিল পুরো সমাজ। কৃষি এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার আরো বিকাশ সমাজে শ্রেণি বিভাগের সৃষ্টি করেছিল। উৎপাদনের উপকরণের মালিক সমাজের সংখ্যালঘু অংশ ক্রমশ সরাসরি শ্রম থেকে, প্রকৃতির থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছিল। অন্যদিকে সমাজের শ্রমজীবী গরিষ্ঠ অংশের মানুষ অনেক বেশি যুক্ত ছিল প্রকৃতি পরিবেশের সঙ্গে এবং অনুমান করা যায় তারাই প্রকৃতির প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে বেশি পরিমাণে।

পরিবেশের উপর প্রভাব

পশুপ্রাণীরাও, মানুষের মত এতটা না হলেও, পরিবেশকে তাদের ক্রিয়াকলাপের দ্বারা একইভাবে পরিবর্তন করে এবং এই পরিবর্তনগুলি, আবার পরিবর্তনকারীদের উপরেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং তাদেরও পরিবর্তিত করে। প্রকৃতিতে কোনো কিছুই বিচ্ছিন্নভাবে ঘটে না। সবকিছুই অন্য সব কিছুকে প্রভাবিত করে এবং তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। সর্বতোমুখী এই গতি এবং পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বুঝতে না-পারলে প্রকৃতিবিজ্ঞানীরা সহজতম জিনিষগুলি পর্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখতে অক্ষম হন। দেখা গিয়েছিল কীভাবে ছাগল গ্রিসে নতুন অরণ্য সৃষ্টিতে বাধা দিয়েছে; সেন্ট হেলেনা দ্বীপে, প্রথম নাবিকদের দ্বারা আনা ছাগল এবং শূকরগুলি তার পুরানো গাছপালা প্রায় সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করে দিয়েছিল এবং তাই পরবর্তী নাবিক এবং উপনিবেশবাদীদের দ্বারা আনা গাছপালা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য জমি প্রস্তুত হয়েছিল। কিন্তু পশুপ্রাণীরা তাদের পরিবেশের উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে অনিচ্ছাকৃতভাবে এবং প্রাণীদের দিক থেকে দেখলে, দুর্ঘটনাক্রমে। বিকাশের সাথে সাথে প্রকৃতির উপর মানুষের প্রভাব সেখানে অনেক বেশি পূর্বপরিকল্পিত, সুনির্দিষ্ট পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত হওয়ার চরিত্র গ্রহণ করে। পশুপ্রাণী কী করছে তা না বুঝেই কোনও অঞ্চলের গাছপালা ধ্বংস করে। মানুষ মাটিতে ক্ষেতের ফসল বপন করার জন্য বা গাছ বা লতা রোপণ করার জন্য এটি ধ্বংস করে যেহেতু তারা জানত যে রোপণ করা পরিমাণের বহুগুণ ফলন দেবে এগুলি। তারা দরকারী উদ্ভিদ এবং গৃহপালিত প্রাণীদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তর করে এবং এভাবে পুরো মহাদেশের উদ্ভিদ এবং প্রাণীজগতকে পরিবর্তন করে। এর চেয়েও বেশি – কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয়ই মানুষের হাতে এমনভাবে পরিবর্তিত হয় যে, তাদের চেনাই যায় না। কিন্তু, সমস্ত পশুপ্রাণীর সমস্ত পরিকল্পিত কর্ম পৃথিবীতে তাদের ইচ্ছার ছাপ ফেলতে সফল হয়নি। সেটি ছিল মানুষের জন্য নির্দিষ্ট। মানুষ এই পরিবর্তনের দ্বারা প্রকৃতিতে তার উদ্দেশ্য সাধন করে, প্রকৃতির উপর প্রভুত্ব করে। এটাই হচ্ছে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে চূড়ান্ত, অপরিহার্য পার্থক্য, এবং আবারও শ্রমই এই পার্থক্য নিয়ে আসে।

কৌশলের বিকাশ এবং ব্যবহার, মানুষকে সক্ষম করেছিল পরিবেশকে পরিবর্তন করতে। প্রতিটি কৌশল ব্যবহার বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য পরিবেশের ক্ষেত্রকে বড় করেছে। এঙ্গেলস মানুষের এই বিজয়ের জয়গান করেছেন আবার সতর্কও করেছেন, প্রকৃতির উপর এরকম প্রতিটি বিজয়ের জন্য প্রকৃতি আমাদের উপর প্রতিশোধ নেয়। প্রতিটি বিজয়, এটি সত্য যে, প্রথমে আমাদের আশানুরূপ ফলাফল নিয়ে আসে, কিন্তু পরে এটি বেশ অপ্রত্যাশিত প্রভাব ফেলে যা প্রায়শই প্রথম জয়ের সাফল্যকে ম্লান করে দেয়। মেসোপটেমিয়া, গ্রিস, এশিয়া মাইনর এবং অন্যত্র যে লোকেরা চাষযোগ্য জমি পাওয়ার জন্য বন ধ্বংস করেছিল, তারা কখনও স্বপ্নেও ভাবেনি যে বনের সাথে জলীয় বাষ্প সংগ্রহের কেন্দ্র এবং আধারগুলি নির্মূল করে তারা সেই দেশগুলির বর্তমান দুর্বিষহ অবস্থার ভিত্তি স্থাপন করছে। আল্পসের ইতালীয়রা যখন দক্ষিণ ঢালে পাইন বন ব্যবহার করে ফেলেছিল, যাকে উত্তরের ঢালে এত যত্ন সহকারে লালন করা হয়েছিল, তখন তাদের কোনও ধারণা ছিল না যে এটি করে তারা তাদের অঞ্চলে পশুপালন ও দুগ্ধ শিল্পের শিকড় কাটছে; এভাবে তারা যে বছরের বেশির ভাগ সময় তাদের পাহাড়ি ঝর্ণাগুলোকে জল থেকে বঞ্চিত করে রাখছে এবং বর্ষাকালের ঝড়বৃষ্টিতে  সমভূমিতে আরও প্রচণ্ড জলপ্লাবন সম্ভব করে তুলছে, সে সম্পর্কেও তাদের ধারণা ছিল না। ইউরোপে যারা আলুর চাষ করতেন তারা জানতেন না যে এই শ্বেতসারপূর্ণ কন্দ দিয়ে তারা একই সাথে গ্রন্থিস্ফীতি রোগ ছড়াচ্ছেন। এভাবে প্রতিটি পদক্ষেপে প্রকৃতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমরা কোনওভাবেই প্রকৃতির উপর সেই অর্থে শাসন করি না যে অর্থে বিজিত জাতির উপর বিজয়ী করে। আমরা প্রকৃতির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ নয়, আমাদের পুরো অস্তিত্ব এই প্রকৃতিরই অন্তর্গত এবং তার মাঝখানে বিদ্যমান, এবং এ বিষয়ে আমাদের সমস্ত প্রভুত্ব এই বাস্তবতার মধ্যে নিহিত যে আমরা অন্য সমস্ত প্রাণীর থেকে অনেক বেশি প্রকৃতির নিয়মগুলি শিখতে এবং সেগুলি সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে সক্ষম হওয়ার সুবিধা পেয়েছি।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতির সাথে সাথে, আমরা আগের চেয়ে অধিকতর বেশি মাত্রায় প্রকৃতির উপরে হস্তক্ষেপের ফলাফল উপলব্ধি করার এবং সেইজন্য নিয়ন্ত্রণ করার অবস্থানে রয়েছি, আমাদের দৈনন্দিন উৎপাদন কার্যক্রমের অধিকতর দূরবর্তী প্রাকৃতিক পরিণতিগুলিও। এঙ্গেলস আশা রেখেছিলেন, এটি যত বাড়বে মানুষ ততই প্রকৃতির সাথে একাত্মতা শুধু অনুভব করবে না, উপলব্ধিও করবে।

উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমাদের ক্রিয়াকলাপের আরও দূরবর্তী প্রাকৃতিক প্রভাবগুলি কীভাবে পরিমাপ করা যায় তা বুঝতে আমাদের হাজার হাজার বছরের শ্রমের প্রয়োজন হয়েছিল, তবে এই ক্রিয়াকলাপগুলির আরও দূরবর্তী সামাজিক প্রভাবগুলি বোঝার ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি কঠিন। আমরা আলু এবং ফলস্বরূপ গ্রন্থিস্ফীতি রোগের প্রাদুর্ভাবের কথা উল্লেখ করেছি। কিন্তু শ্রমিকদের কেবলমাত্র আলু খেয়ে বেঁচে থাকার ফলে সমগ্র দেশের জনসাধারণের জীবনযাত্রার অবস্থার উপর যে প্রভাব পড়েছিল, বা ১৮৪৭ সালে আলুর মড়কের ফলে আয়ারল্যান্ডের দুর্ভিক্ষের, যা কেবল বা প্রধানত আলু খেয়ে থাকা এক মিলিয়ন আইরিশকে কবরে পাঠিয়েছিল এবং আরও দুই মিলিয়নকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল, তার তুলনায় গ্রন্থিস্ফীতি রোগ কিছুই নয়। কিউবায় স্প্যানিশ প্ল্যান্টাররা যখন পাহাড়ের ঢালের বন পুড়িয়ে দিয়েছিল এবং তার ছাই থেকে অত্যন্ত লাভজনক কফি গাছের এক প্রজন্মের জন্য পর্যাপ্ত সার পেয়েছিল, তখন তাদের এই ব্যাপারে কিই বা জ্ঞান ছিল যে এর ফলে ভারী গ্রীষ্মমন্ডলীয় বৃষ্টিপাত পরে মাটির অরক্ষিত উপরের স্তরকে ধুয়ে ফেলবে, কেবল খালি পাথর রেখে যাবে! আরবরা যখন অ্যালকোহলের পাতন করতে শিখল, তখন তারা একবারের জন্য ও ভাবেনি যে, এর মাধ্যমে তারা তখনকার অনাবিষ্কৃত আমেরিকা মহাদেশের আদিবাসীদের নিশ্চিহ্ন করার অন্যতম প্রধান অস্ত্র তৈরি করছে। এবং পরে যখন কলম্বাস এই আমেরিকা আবিষ্কার করলেন, তখন তিনি জানতেন না যে এটি করে তিনি ইউরোপে ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া দাসপ্রথাকে নতুন জীবন দিচ্ছেন, এবং নিগ্রো দাস ব্যবসায়ের ভিত্তি স্থাপন করছেন। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে যেসব মানুষ বাষ্পীয় ইঞ্জিন তৈরির জন্য শ্রম দিয়েছিলেন, তাদের কোনো ধারণাই ছিল না যে তারা এমন একটি যন্ত্র প্রস্তুত করছেন যা অন্য যে কোনও যন্ত্রের চেয়ে বেশি সারা বিশ্বের সামাজিক সম্পর্কের বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটাবে। বিশেষত ইউরোপে অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত করে এবং বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠকে অধিকারচ্যুত করে, এই হাতিয়ার প্রথমে বুর্জোয়াদের হাতে সামাজিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য তুলে দিয়েছিল, এবং পরে বুর্জোয়া ও সর্বহারা শ্রেণীর মধ্যে শ্রেণি সংগ্রামের জন্ম দিয়েছিল যার পরিসমাপ্তি হতে পারে কেবল বুর্জোয়াদের উচ্ছেদ এবং সমস্ত শ্রেণিবিরোধের উচ্ছেদের মাধ্যমে। এই নিয়ন্ত্রণের জন্য অবশ্য নিছক জ্ঞানের চেয়ে আরও বেশি কিছু প্রয়োজন। এর জন্য প্রয়োজন আমাদের এ যাবৎকালের বিদ্যমান উৎপাদন পদ্ধতিতে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন, এবং একই সঙ্গে আমাদের সমগ্র সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থায় একটা বিপ্লব।

ওয়েবডেস্কের পক্ষে প্রাককথন ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের লেখা অংশটির ভাষান্তর- সৌভিক ঘোষ

Spread the word

Leave a Reply