Lenin Legacy Souvik ghosh

Lenin: A Legacy

“অদ্ভুত একজন নেতা – যিনি নেতৃত্ব করছেন একান্তই তাঁর মেধার জোরে; বেরঙীন, বেরসিক, অটল, অনাশক্ত, এমনকি চমকপ্রদ কোন পাগালামিও যার কিছু নেই, কিন্তু আছে গভীরতর ভাবনাকে সহজে ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা, নির্দিষ্ট পরিস্থিতির নিখুঁত বিশ্লেষণের শক্তি। বিচক্ষণতার সঙ্গে মিলনে যা এক মেধাশক্তির মহত্তম স্পর্ধা।”

কথাগুলো লিখেছিলেন জন রিড – দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন বইতে। লিখেছিলেন লেনিনকে ব্যাখ্যায়। লেনিন – ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লব সফল হবার পরেই সেদিনের বুর্জোয়া সংবাদপত্র থেকে শুরু করে লিবারাল ডেমোক্র্যাসির ভাড়াটে মেধা যাকে চিত্রিত করতে চেয়েছিল রক্তখেকো শয়তান হিসাবে তাদেরই বিপ্রতীপে আমেরিকান সাংবাদিক রিড লিখতে বসে ভরসা করেছিলেন নিজের চোখকে, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে।

কেমন হন একজন কমিউনিস্ট বিপ্লবী? 

আধুনিক ভোগবাদ যখন প্রেক্ষাগৃহ থেকে মোবাইলের স্ক্রিন অবধি সবকিছুই বিকিয়ে যায় দেখিয়ে আসলে বিক্রয়যোগ্য মূল্যবোধের এক “গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ” নির্মাণ করছে ঠিক তখনই ৫৮ শতাংশ নিউ ইয়র্কবাসীর সমর্থনে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের ১৬ ফুট উচ্চতার মূর্তি বসছে ম্যানহাটনে – ইউনিয়ন স্ক্যয়ারে।

ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন এমন ব্যাক্তিত্বদের জনমানসে বরাবরই অতিমানব হিসাবে তুলে ধরতে চেয়েছে পুঁজিবাদ। বেঁচে থাকতে বিপ্লবীদের নিপীড়ন, অত্যাচার এমনকি খুনের উদ্দেশ্যে ঘৃণ্যতম চক্রান্ত করতে একমুহূর্ত বসে থাকেনি যারা তারাই একটা সময় বিপ্লবীদের মহামানব প্রমাণ করতে নামেন – তাদের এহেন আচরণ অবশ্যই রাজনৈতিক। বিপ্লবী চেতনা, বিপ্লবী মতাদর্শ এবং সংশ্লিষ্ট চর্চা থেকে জনগণকে বিচ্ছিন্ন করার রাজনীতি। মার্কস শ্রমিকশ্রেণীর সাথে উৎপাদিত পণ্যের ব্যাবধান বোঝাতে অ্যালিনিয়েশনের উল্লেখ করেছিলেন, সচেতনভাবেই পুঁজিবাদ মেহনতি জনগণকে বিপ্লবী মতাদর্শ এবং তার মূর্ত রুপের থেকে অ্যালিনিয়েট করে। লেনিন সেই অ্যালিনিয়েশনের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিলেন। গড়ে তুলেছিলেন কৃষক – শ্রমিকদের জোট, চুরমার হয়ে গেছিল সাম্রাজ্যবাদের দুর্বলতম গ্রন্থি।

ঠিক এখানেই লেনিনের অনন্যতা বিপ্লবের ইতিহাসে নজীরবিহীন। জনমানসে বিপ্লব, বিপ্লবের স্লোগান এবং বিপ্লবী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রাথমিক স্তরে বহু ধোঁয়াশা থাকে, লেনিন এই সত্য জানতেন। সমাজতন্ত্রের স্লোগান দেওয়া ব্ল্যাঙ্কিপন্থী সংগঠন, পরবর্তীতে রাশিয়ায় নারোদনায়া ভালিয়া ইত্যাদি সংগঠনের কর্মকাণ্ডে জনসাধারণ বিপ্লবী মানেই প্রাণের মায়া ত্যাগ করা ভয়ানক মেধা এবং সাহস সমৃদ্ধ ব্যাক্তি মনে করত। গুপ্ত বিপ্লবীসংগঠনের সদস্য দাদা আলেকজান্দারের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হবার পরেই উপলব্ধি করেছিলেন “মুক্তির লক্ষ্যে ঐ রাস্তা আমাদের পথ হতে পারে না”। গোড়া থেকে সমাজ বদলের লড়াইতে নিপীড়িত জনগণের সংগঠিত আন্দোলনই শেষ কথা – এই কথাই ইতিহাসের সার, কিন্তু তাকে প্রয়োগ করে দেখিয়ে দেওয়ার কাজটা লেনিনের আগে কেউ কার্যকর করতে পারেনি। প্যারি কমিউনের শিক্ষা লিখে গেছিলেন মার্কস – এঙ্গেলস দুজনে, লেনিন সেটি আত্মস্থ করেন। এছাড়াও ১৯০৫ সালের বিপ্লবের অভিজ্ঞতা রাশিয়ার কমিউনিস্টদের লোহা থেকে ইস্পাতে পরিণত করেছিল।

লেনিন চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট বুঝতে আজকের প্রজন্মের পছন্দসই ওয়ানলাইনার কেমন হবে?

“নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ

“Concrete Analysis of the Concrete Condition”

মার্কসীয় বিশ্ববিক্ষা সম্পর্কে লেনিনের এই নোটই তাকে সঠিকভাবে বুঝতে সাহায্য করে। ব্রিটানিকার অনলাইন ভার্সনে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে লেনিনের ছোটবেলায় এমন একটিও উল্লেখযোগ্য ঘটনা (ওদের ভাষায় পার্টিকুলার ইভেন্ট) নেই যা থেকে এমন সিদ্ধান্ত টানা চলে যে সেই শিশুই বড় হয়ে সমাজ বদলের লড়াইতে ইতিহাস সৃষ্টি করবে। আসলে বাজার নিয়ন্ত্রিত ব্যাবস্থা এমনই চায় – সবকিছুই তাদের গাণিতিক হিসাবে প্রেডিক্টেবল – সম্ভাব্য করে তুলতে। নাহলে যে তার বিশ্বব্যাপি মুনাফা লুটের ব্যবস্থার বুনিয়াদটাই ভঙ্গুর প্রমানিত হয়! লেনিন সেটাই প্রমান করেছিলেন।

১৮৭০ সালের ৭ই এপ্রিল তারিখটা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী লেনিনের জন্মদিবস। ১৯১৭ সালে রুশবিপ্লবের আগে রাশিয়াতে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার চালু ছিল। বাবা ছিলেন শিক্ষক, মা উদারচেতা চরিত্রের। কাজান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় দাদা আলেকজান্দারের ড্রয়ার থেকে খুঁজে পান কার্ল মার্কসের “দ্য ক্যাপিটাল”। সমাজতন্ত্রের অধ্যয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরতদের গোপন সংগঠনে সক্রিয়তা শুরু হয়। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন এভাবেই। প্রথম থেকেই রাশিয়ায় বিপ্লবী আন্দোলনের দুটি ধারা একদিকে ব্যক্তিহত্যার রাজনীতি আরেকদিকে মুখে বাম কাজে ডান সংশোধনবাদী সমাজতন্ত্রী – উভয়ের বিরুদ্ধেই কলম ধরেন। আবার আরেকদিকে সময়োপযোগী বিপ্লবী সংগঠনের চেহারা কেমন হতে হবে সেই সম্পর্কে ধারণা বুনতে থাকেন। প্রকাশিত হয় তার লেখা লিফলেট “কোথা থেকে শুরু করতে হবে” – সেই লিফলেটই “কি করতে হবে” গ্রন্থের ভ্রুন। কিভাবে লিখতে হয়, কিভাবে বাস্তবোচিত তথ্য সংগ্রহ এবং সঠিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিপ্লবী তত্বের রচনায় তাকে ব্যবহার করতে হয় সেই কাজ শিখতে গেলে তার লেখা “রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ” পড়তেই হবে। এই লেখার মধ্যে দিয়েই লেনিন অর্থনীতিবাদ (Economism) এবং সন্ত্রাসবাদী নারদোনিকদের রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া প্রমান করে দেন। এই কাজই পূর্ণতা পায় পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাকে পার্টি পরিচালনার মূলনীতি হিসাবে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে, পার্টিতে কারা সদস্য হবেন সেই সংজ্ঞা নির্ধারিত করার সময়। বুলি কপচানো, আত্মমগ্ন বাবুগণের চার দেওয়ালের রাজনীতির বাইরে টেনে আনেন বিপ্লবী সংগঠনের পরিসর। সেই সংগঠন ছড়িয়ে পড়ে মস্কো শহরের কল কারখানার গেট থেকে সাইবেরিয়ায় খনি অবধি। যুগ যুগ ধরে যারা পথের ধুলোয় মলিন হয়ে থাকাকেই নিজেদের কপালের ফের বলে মেনে নিতে অভ্যস্ত ছিল তারাই স্বপ্ন দেখতে শুরু করে শ্রমিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার।

পার্টিতে কাজের নতুন এক ধারা প্রতিষ্ঠা করেন। পেশাদার বিপ্লবী (Professional Revolutionary) – আজ যাদের আমরা হোলটাইমার বলে চিনি। বিপ্লবী সর্বহারা শ্রেনিচেতনার সবথেকে এগিয়ে থাকা অংশ যারা বিপ্লবের লক্ষ্যে বিপ্লবী পার্টির স্বার্থে নিবেদিত প্রাণ – তারাই হবেন পেশাদার বিপ্লবী – এই ছিল তার ব্যাখ্যা। সেই সময় পার্টিতে এলিট হিসাবে পরিচিত মার্তফ, আক্সেলরদ, ট্রটস্কি সকলেই লেনিনের বিরোধিতা করেছিলেন – এমনকি রাশিয়ায় মার্কসবাদের শিক্ষক গেওর্গি প্লেখানভ অবধি লেনিনের যুক্তি উপলব্ধি করতে ব্যার্থ হয়েছিলেন। এদের সবার সাথে সংগ্রাম করতে হয়েছিল লেনিনকে, সেই পার্টি কংগ্রেসে অনেক কাছে থাকা কমরেডই তাকে অনৈতিক আক্রমন করেছিলেন। লেনিন সমস্ত আক্রমনের মোকাবিলা করেছিলেন মার্কসীয় ডায়ালেক্টিক্স, ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারণা এবং নিজের দেশে প্রলেতারিয়েতদের জীবন সংগ্রাম সম্পর্কে যথাযথ উপলব্ধি সম্বল করে। সেই সমস্ত আক্রমণ এবং তার জবাব প্রকাশিত হয় “এক পা আগে, দুই পা পিছে” গ্রন্থে। অনেকক্ষেত্রেই বইয়ের নামটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ব্যাখা হাজির হয়, জেনে রাখা দরকার লেনিন ঐ বইতে পার্টি কংগ্রেসের মিনিটস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যা প্রকাশ করেছিলেন, মধ্যপন্থী, সুবিধাবাদী, নিজেদের এলিট ভাবা মানুষজন আসলে কেমন রাজনৈতিক চরিত্রের হন সেটা সবার সামনে স্পষ্ট করে দেওয়াই ছিল সেই সময় কর্তব্য। সুবিধাবাদী নিষ্কর্মাদের সম্পর্কেই লেনিন “এক পা আগে, দুই পা পিছে” কথাটা ব্যবহার করেছিলেন। কেতাবি বুলি আউড়ে যাওয়া কিংবা নিরর্থক অক্লান্ত বিতর্কে সময় ব্যয় করা বুদ্ধিজীবীদের লেনিন “মার্শ” এবং “ফেরজুম্ফ” বলে উল্লেখ করেছেন, দুটো জার্মান শব্দেরই অর্থ প্রায় একই – বদ্ধ জলাশয়।

পার্টি সংগঠনের চেহারা থেকে শুরু করে বিপ্লবের কাজে শ্রমিক – কৃষকের জোটবদ্ধতার কর্মসূচি রুপায়ন, পার্টির মধ্যে ভ্রান্ত সমস্ত পথের (সংশোধনবাদী এবং সংকীর্ণতাবাদী উভয়ই) বিরুদ্ধে সংগ্রাম থেকে শুরু করে ক্যাডার নির্বাচন এবং কাজ ভাগ করার নীতি, শ্রমিক রাষ্ট্রের বাস্তবিক কাঠামো সম্পর্কে সঠিক ব্যখ্যা থেকে শুরু করে বিজ্ঞানের নব নব আবিস্কারের সাথে মার্কসীয় প্রজ্ঞার সম্মিলন – সবেতেই লেনিন শুধু অসাধারণ মুন্সিয়ানার পরিচয় দেন নি, সমস্ত ক্ষেত্রেই প্রায়োগিক মার্কসবাদের সারাংশ হিসাবে “নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ (Concrete Analysis of the Concrete Condition)” –কে সাফল্যের সাথে প্রয়োগ করেছেন। লেনিন বুঝতে গেলে, কেন সাম্রাজ্যবাদের যুগে মার্কসবাদ কথাটির সাথে কমরেড স্তালিন লেনিনবাদ কথাটি জূড়ে দিয়েছিলেন তা আত্মস্থ করতে হলেও “নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ (Concrete Analysis of the Concrete Condition)” করতে হয়।

ব্যাংক পুঁজি এবং শিল্প পূঁজি একীভূত হয়ে কিভাবে লগ্নী পূঁজির জন্ম দেয় এবং মুনাফার লোভে দুনিয়াজূড়ে ছুটে চলা সেই লগ্নী পূঁজিই যে সাম্রাজ্যবাদের বীজ এই উপলব্ধিকেই তথ্য এবং বিশ্লেষণী তত্ত্বের সাহায্যে ব্যাখ্যা করেছেন লেনিন। সেই কথা লেখা আছে “সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়” বইতে। সেই যুক্তিবোধ রহিত হলে উপ্লব্ধি করা সম্ভব না কেন বুখারিন, ক্রপ্টকিন এদের চরম বিরোধিতা স্বত্বেও বিপ্লবের পরে দেশ গঠনে নয়া অর্থনৈতিক পরিকল্পনা (NEP) গৃহীত হয়েছিল। গোটা পশ্চিম ইউরোপ আজও যার কথায় সমাজতন্ত্রের মহান বার্তা খুঁজে পায় সেই ট্রটস্কি বিপ্লবোত্তর রাশিয়ায় শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন বন্ধ করার সুপারিশ করেছিলেন, লেনিন সেই প্রস্তাব খারিজ করে দেন। আজকের প্রজন্মের জন্য এই সমস্ত চরিত্রের স্বরুপ আরও একবার স্পষ্ট হওয়া উচিত, তাতে একই ভুল দ্বিতীয়বার না হবার সম্ভাবনা বাড়ে।

লেনিন এক বিরাট অধ্যায়, একটি গোটা ঐতিহাসিক নির্মাণপর্বে নিজেই একটি ইতিহাসে পরিণত হওয়া ব্যক্তিত্ব – একটি প্রবন্ধের পরিসরে তাকে ধরা যায় না। তারই সম্পাদনায় প্রকাশিত পার্টির মুখপত্রের নাম ছিল ইস্ক্রা (স্ফুলিঙ্গ) – সেই ধারা মেনেই আরও একবার তাকে স্মরণ করা মানে আসলে একটা উত্তরাধিকারকে স্বীকার করে নেওয়া এই অনুভবটুকু আমাদের চেতনায় রাখতে হয়। সেই উত্তরাধিকার আসলে কেমন তা বুঝতে তিনটি প্রসঙ্গই সম্ভবত যথেষ্ট হবেঃ

১) ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লব (যাকে আমরা নভেম্বর বিপ্লব বলি) সফল হবার পরে লেনিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত সরকার প্রথম যে আইনগুলি প্রণয়ন করে সেগুলি এরকম ছিল – ক) জমি সংক্রান্ত আইন (Decree Of Land) যাতে জমিহীনদের মধ্যে জমি বিলি করার বন্দোবস্ত, আইনী সীমার উর্ধে থাকা ব্যাক্তি এবং সংগঠনের মালিকানাধিন জমি কেড়ে নেবার নিদান এবং যৌথ কৃষি খামার ব্যবস্থার পরিকল্পনা ছিল। খ) রাশিয়ার জনগণের অধিকার আইন (Declaration of the Rights of the Peoples of Russia) যাতে রাশিয়ানরা ছাড়াও অন্যান্য যে জাতিগোষ্ঠীগুলি সেই দেশের নাগরিক ছিল তারা নিজেদের ইচ্ছায় নিজস্ব জাতি রাষ্ট্র গঠনের অধিকার পায়, এরই ফলে জন্ম হয় স্বাধীন ফিনল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, লাতভিয়া, ইউক্রেন, ট্রান্স ককেসিয়া এবং পোল্যান্ডের। গ) আইনানুগ বিচার ব্যাবস্থার ক্ষেত্রে জোর দেওয়া হয় ন্যায় সম্পর্কিত সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি (Socialist Sense of justice)-র উপরে। অর্থাৎ কেউ চুরি করলে তার বিচার করার ক্ষেত্রে কোন বাধ্যবাধকতায় সে চুরি করেছে তাও বিচার করার দায় স্বীকার করা হয়, বুর্জোয়া আইনের মতো চুরি মানেই শাস্তিযোগ্য জঘন্য অপরাধ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয় না। ঘ) সর্বজনীন শিক্ষাকে জনপ্রিয়করণ কর্মসূচী (Decree on Popular Education) – এরই ফলে রাশিয়ায় নিরক্ষর মানুষজন উপযুক্ত শিক্ষার সুযোগ পান। ঙ) লিঙ্গভেদ দূরীকরণের কর্মসূচী – মহিলাদের সমানাধিকার আইনি স্বীকৃতি পায়, তাদের উন্নত জীবনমানের লক্ষ্যে অনুপযুক্ত বিবাহ বন্ধন থেকে আইনানুগ বিচ্ছেদের ব্যাবস্থা করা হয়। সারা পৃথিবীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের মহিলারাই সর্বপ্রথম অবাঞ্ছিত গর্ভধারণের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির আইনি অধিকার পেয়েছিলেন। এবং সবশেষে চ) শ্রমিক অধিকার আইন (Decree on Workers) যার ফলে দেশের সম্পদ রক্ষিত হয়, শ্রমিকেরা বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক পরিবেশে কাজের সুযোগ লাভ করেন, শিল্পসংস্থাসমূহের নিয়ামক গোষ্ঠীতে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনের আইনি সুযোগ পান – মে দিবসের দাবিসমুহের সফল রুপায়ন করে সোভিয়েত সরকার।

কমিউনিস্টরা কেমন সমাজ গড়তে চায়, শ্রমিক রাষ্ট্রের বাস্তব চেহারাটা ঠিক একমন হয় সেই সম্পর্কে যাবতীয় ধোঁয়াশা কাটিয়ে দিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেই কাজের নেতা ছিলেন লেনিন।

২) ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লব সংগঠিত হবার আগে পার্টির মধ্যে বিপ্লবী পরিকল্পনা চুড়ান্ত করতে সভা হয়, লেনিন সেই সভায় প্রতিক্রিয়াশীল কেরেনস্কি সরকারকে উচ্ছেদ এবং বিপ্লবী সক্রার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব রাখেন। লেনিনের মতের পক্ষে ভোট পড়ে দশটি, বিরুদ্ধে ভোট দেন লেনিনের দীর্ঘদিনের সাথী জিনোভিয়েভ (Grigory Yevseyevich Zinoviev) এবং কামেনেভ (Lev Borisovich Kamenev)। বিপ্লবের সাফল্য সম্পর্কে তাদের সংশয় ক্রমশ তাদের পার্টি বিরোধী করে তোলে, তারা বাজারি সংবাদ পত্রে বিপ্লবের পরিকল্পনা ফাঁস করে দেন। যদিও তাদের সংশয়কে আদ্যন্ত ভুল প্রমান করেই রুশ বিপ্লব সফল হয়েছিল। কিন্তু বিপ্লব সফল হবার পরে লেনিন জিনোভিয়েভ এবং কামেনেভের জন্য শাস্তির বিধান দেন নি, সোজাসুজি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। নিজে খাঁটি বিপ্লবী ছিলেন বলেই বুঝতেন বিপ্লবী সংগঠন মানুষ নিয়ে গড়ে ওঠে – আনন্দ, দুঃখ, ভয়ভীতি রহিত যন্ত্র দিয়ে নয়। মানুষের ভুল হয়, সেই ভুল শুধরেই মানুষের জয়যাত্রা শুরু হয়। জিনভিয়েভ এবং কামেনেভ দুজনেই সোভিয়েত সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপালন করেন।

৩) রাশিয়ায় কমিউনিস্ট পার্টির ত্রয়োদশ কংগ্রেসে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনের পূর্বে ট্রটস্কি লেনিনের লেখা একটি চিঠির খন্ডাংশ পড়ে শোনান। উদ্দেশ্য লেনিন পরবর্তী সময়ে স্তালিন যেন কিছুতেই পার্টির সাধারণ সম্পাদকের পদে নির্বাচিত না হন। ট্রটস্কির সেই পরিকল্পনা যদিও ভেস্তে যায়। স্তালিনকেই পার্টি কংগ্রেস থেকে পুনঃনির্বাচিত করা হয়, ট্রটস্কি নিজেও ভোট দেন। আজও পৃথিবীতে ট্রটকাইস্ট নামে পরিচিত বিচিত্রস্বভাব সমাজতন্ত্রীরা সেই চিঠিকে লেনিনের উইল (Testament) বলে প্রচার করে চলেছেন। এই প্রবন্ধের প্রসঙ্গ স্তালিন নন। কিন্তু প্রসঙ্গ হল কমিউনিস্ট পার্টি তো আর পাঁচটা বুর্জোয়া সুবিধাবাদী রাজনৈতিক দলের মতো না যেখানে একজন কারোর কথায় সবকিছু চলবে, লেনিন নিজেই সারাজীবন সেই নীতি মেনে চলেছেন। তবে এমন একটি চিঠি তিনি লিখেছিলেন কেন? ট্রটস্কিকে সাধারণ সম্পাদক হিসাবে সুপারিশ করতে? নাকি স্তালিনের স্বরুপ প্রকাশ করে দিতে? এইসব কথাই কোটি কোটি টাকা খরচ করে বই লিখে প্রচার করা হয়েছিল, আজও হয়। উদ্দেশ্য একটাই, যাতে পার্টি কর্মী, সমর্থক এবং নতুন প্রজন্মকে গুলিয়ে দেওয়া যায়। আসলে লেনিন নিজস্ব দায়বদ্ধতা থেকেই এমন কাজ করেছিলেন। বুলেটের আঘাতে দীর্ঘ অসুস্থ শরীর, ঠিকমতো লিখতেও পারছেন না, বুঝতে পেরেছিলেন তার সময় ফুরিয়ে আসছে। পার্টি কংগ্রেসে উপস্থিত হতে পারলে পার্টি, পার্টি সংগঠন এবং ভবিষ্যতে পার্টির কেন্দ্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাজের মুল্যায়ন সম্পর্কে যা কিছু বলতেন সেই কথাগুলিকেই লিখে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কেবলমাত্র কেন্দ্রীয় কমিটির পরিসরে আলোচনার জন্য। এই লেখা কখনোই উইল নয়, লেনিনের উত্তরাধিকার অর্জন করতে হয় সংগ্রামের আগুনে পুড়ে – আইনের পাতায় তার হিসাব বুঝে নেওয়া যায় না। ট্রটস্কি নিজের বহুবিধ যোগ্যতা সত্বেও সেই ভুল করেছিলেন, আমাদের সেই একই ভুল যেন দ্বিতীয়বার না হয়।

১৫২ তম জন্মদিবসে লেনিন স্মরণ পৃথিবীতে আরেক ঐতিহাসিক পর্যায়। ভোগবাদে আচ্ছন্ন বেনিয়া সভ্যতার আক্রমনে শুধু মানুষের জীবন না, ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ – জীবজগত। এরই ফলে মারণ ভাইরাস প্রানীদেহ থেকে বিপরীতমুখী হয়ে মানুষকে সংক্রামিত করছে। এই সংকট শুধুই জনস্বাস্থ্যের নয়। কাজ হারিয়ে মানুষ না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছেন, কখনো বিনা চিকিৎসায় রাস্তায় পড়ে থাকছে সারি সারি নিথর দেহ। ইতিমধ্যেই সংক্রমনের চিকিৎসায় অতি প্রয়োজনীয় ঔষধের কালোবাজারি শুরু হয়ে গেছে, আরও দগদগে চেহারায় স্পষ্ট হচ্ছে পুঁজিবাদের অসারতা, অক্ষমতা। আর এরই বিপরীতে গোটা পৃথিবী দেখছে আরেক দৃশ্য। সেই ছবি লড়াইয়ের, সংগ্রামের, জীবনের। একজোট হওয়া মানুষ অন্যদের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে হাত। সেই হাতে কখনো ধরা থাকছে মাস্ক, স্যানিটাইজার, কখনো দুবেলার খাবার কিংবা প্রয়োজনীয় অন্যান্য সামগ্রী – সবটাই নিজেদের জোরে। এই হল সেই জোর যা সমাজ বদলের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছে। রেলস্টেশনে নিথর মায়ের দেহ আঁকড়ে কাঁদতে থাকা শিশুর দু চোখে জল দেখেও চোয়াল শক্ত করে মানুষ আজও মানুষের উপরেই ভরসা রাখছেন।

এই ভরসারই মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন লেনিন।  আজকের পৃথিবীতে নিপীড়িত, শোষিত জনসাধারনের সেই ভরসাকে আরও একবার মর্যাদা দেওয়ার কাজকে যারা নিজেদের একান্ত কর্তব্য বলে মনে করবেন কমরেড লেনিনের উত্তরাধিকার তাদের জন্যই।

ওয়েবডেস্কের পক্ষেঃ সৌভিক ঘোষ

Spread the word

Leave a Reply