All India Strike Against Central Budgetary Plan of Financial Sector Privatization- Pradip Biswas*

কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী গত ১লা মার্চ সংসদে বাজেট পেশ করতে গিয়ে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক এবং বিমা ক্ষেত্র নিয়ে যে প্রস্তাব করেছেন তা হল :

১) দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণ করা হবে।
২) একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বিমা কোম্পানি বেসরকারিকরণ করা হবে।
৩) রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বিমার শেয়ার বাজারে বিক্রী করা হবে, ১০০% সরকারি মালিকানা রাখা হবে না।
৪) বিমা ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ ৪৯% থেকে বাড়িয়ে ৭৪% করা হবে।

ব্যাঙ্ক ও বিমা শিল্পের কর্মী ও আধিকারিকরা এই বাজেট প্রস্তাবগুলোর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই দেশব্যাপী প্রতিবাদ বিক্ষোভ ও ধর্ণা ইত্যাদি সংগঠিত করেছেন।

গত ৯ই মার্চ হায়দ্রাবাদে অনুষ্টিত সভা থেকে ব্যাঙ্কশিল্পের ৯টি সর্বভারতীয় ইউনিয়নের যুক্ত মঞ্চ ইউনাইটেড ফোরাম অফ ব্যাঙ্ক ইউনিয়নস (ইউ.এফ.বি.ইউ) আগামী ১৫ই এবং ১৬ই মার্চ টানা দুই দিন ব্যাঙ্কশিল্পে দেশব্যাপী প্রতিবাদ ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। সাধারণ বিমা এবং জীবন বিমা শিল্পে যথাক্রমে ১৭ই মার্চ এবং ১৮ই মার্চ বিমা কর্মচারী এবং আধিকারিকরা দেশব্যাপী ধর্মঘটে সামিল হবে।

Source: Google Images

নয়া উদারবাদী আর্থিক নীতির ফল

নয়া উদারবাদী আর্থিক নীতির প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির জনবিরোধী সংস্কার। এই লক্ষ্যেই ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে ১৯৯১ সালে নরসিমহম কমিটি এবং বিমা শিল্পের ক্ষেত্রে ১৯৯৩ সালে মালহোত্রা কমিটি গঠিত হয়েছিল। শ্রী এম নরসিমহম এবং শ্রী আর এন মালহোত্রা উভয়েই ছিলেন রিজার্ভব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর।

নরসিমহম কমিটির প্রধান সুপারিশগুলির মধ্যে ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে সরকারি অংশীদারিত্ব ১০০% থেকে ৩৩% -এ নামিয়ে আনা, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সংখ্যা কমিয়ে আনা, অগ্রাধিকার ক্ষেত্রে ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের ৪০% এর নীচে নামিয়ে আনা। মালহোত্রা কমিটির সুপারিশ ছিল বিমা কোম্পানিগুলিতে সরকারি অংশীদারিত্ব ১০০% থেকে ৫০% -এ নামিয়ে আনা। বিমা ক্ষেত্রে দেশি ও বিদেশি কোম্পানিগুলিকে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়া। জীবন বিমা তহবিলের ৭৫% বাধ্যতামূলক সরকারি বন্ডে বিনিয়োগের নির্দেশিকা পরিবর্তন করে ৫০% -এ নামিয়ে আনা, ইত্যাদি। দুটো কমিটিরই প্রধান লক্ষ্য ছিল ব্যাঙ্ক এবং বিমা ক্ষেত্রের বেসরকারিকরণ।

বিগত তিন দশকে দিল্লিতে যত সরকার ক্ষমতাসীন হয়েছে তাদের মধ্যে আর্থিক নীতির ক্ষেত্রে মৌলিক কোনো ফারাক ছিল না। একদিকে ব্যাঙ্ক এবং বিমা শিল্পের কর্মচারীদের ধারাবাহিক আন্দোলন এবং ২০১৪ সালের আগে পর্যন্ত দিল্লিতে ক্ষমতায় আসীন সরকারগুলিতে কোনো দলের একক নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় বা জোট সরকার হওয়ার বাধ্যবাধকতার কারণে এই সরকারগুলি নয়া উদারবাদী আর্থিক নীতির প্রয়োগ ব্যাঙ্ক ও বিমা ক্ষেত্রে বল্গাহীনভাবে করতে পারে নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ব্যাঙ্ক শিল্পে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বিরুদ্ধে ১৯৯১ থেকে আজ পর্যন্ত, সাধারণ ধর্মঘট সহ, মোট ৬৫ দিন কর্মচারী ও আধিকারিকরা ধর্মঘটে সামিল হয়েছেন।

Source: Google Images

ফিরে দেখা

১৯৬৯ সালের ২৯শে জুলাই প্রথমে ১৪টি বেসরকারি ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ করা হয়। পরে ১৯৮০ সালের ১৫ই মার্চ আরও ৬টি বেসরকারি ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় দেশের ব্যাঙ্ক ব্যবস্থার ৯০% রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে পরিণত হয়। অবশ্যই এরমধ্যে আছে ১৯৭৫ সালে ২রা অক্টোবর সম্পূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে গ্রামীণ ব্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠা ও ১৯৮২ সালের ১২ই জুলাই ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক ফর এগ্রিকালচার এন্ড রুরাল ডেভলপমেন্ট (নাবার্ড) এর প্রতিষ্ঠা। ১৯৯৩ সালে ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ আইন (১৯৭০ এবং ১৯৮০) সংশোধন করে সরকারি অংশীদারিত্ব ১০০% থেকে কমিয়ে ৫১% পর্যন্ত নামিয়ে আনা যাবে এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০১২ সালে বেসরকারি অংশীদারদের ভোটাধিকার ১% থেকে বাড়িয়ে ১০% করা হয়েছে।কর্মচারী আন্দোলনের চাপে বেসরকারি অংশীদারদের আনুপাতিক ভোটাধিকারের দাবী কার্যকারী করতে এখনো পর্যন্ত সরকার সফল হয়নি ।

১৯৫৬ সালে ১৯শে জুন সংসদে জীবন বিমা আইন পাশ হয় এবং ২৪৫টি দেশি এবং বিদেশি বিমা কোম্পানীগুলিকে জাতীয়করণ করে লাইফ ইন্সিওরেন্স কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া ‘র (এল.আই.সি) প্রতিষ্ঠা হয় ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৫৬ তে মাত্র ৫ কোটি টাকার সরকারি মূলধন নিয়ে। এখন এল.আই.সির মোট সম্পদের পরিমাণ ৩১১,১৮৪,২২৭ লক্ষ টাকা (২০১৯)।

১৯৭২ সালে ১০৭টি সাধারণ বিমা কোম্পানিকে জাতীয়করণ করে রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বিমা কর্পোরেশনের (জি.আই.সি)প্রতিষ্ঠা হয়। এই কর্পোরেশনের অধীনস্ত ৪টি সাধারণ বিমা কোম্পানি হল (১)নিউ ইন্ডিয়া অ্যাসিওরেন্স কোম্পানি (২)ইউনাইটেড ইন্ডিয়া ইনসিওরেন্স কোম্পানি (৩)ওরিয়েন্টাল ইনসিওরেন্স কোম্পানি (৪)ন্যাশনাল ইনসিওরেন্স কোম্পানি। ২০০০ সালের নভেম্বর মাস থেকে জি.আই.সি.-র নিয়ন্ত্রণ উপরিউক্ত চারটি অধীনস্ত সাধারণ বিমা কোম্পানিগুলি্র উপর থেকে তুলে নেওয়া হয় এবং এই কোম্পানিগুলি এখন স্বাধীনভাবে সাধারণ বিমার ব্যবসা পরিচালনা করে এবং কোম্পানিগুলি লাভজনক।

বেসরকারিকরণের লক্ষ্যে সংযুক্তিকরণের

২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরে শ্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে যখন দিল্লিতে সরকার গঠিত হয় তখন আমাদের দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সংখ্যা ছিল ২৬টি। সংযুক্তিকরণের মধ্য দিয়ে ব্যাঙ্কের সংখ্যা কমিয়ে করা হয়েছে ১২টি। ২০১৭ সালের ১লা এপ্রিল ৫টি অ্যাসোসিয়েট ব্যাঙ্ক (ষ্টেট ব্যাঙ্ক অফ বিকানীর অ্যান্ড জয়পুর, ষ্টেট ব্যাঙ্ক অফ পাতিয়ালা, ষ্টেট ব্যাঙ্ক অফ হায়দ্রাবাদ, ষ্টেট ব্যাঙ্ক অফ ত্রাভাঙ্কুর ও ষ্টেট ব্যাঙ্ক অফ মাইসোর) ও রাষ্ট্রায়ত্ত মহিলা ব্যাঙ্ককে ষ্টেট ব্যাঙ্কের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। দ্বিতীয় পর্বে ক্ষমতায় এসে মোদি সরকার সংযুক্তিকরণের প্রক্রিয়াকে আরো দ্রুত প্রসারিত করে। ২০১৯ সালের ১লা এপ্রিল দেনা ব্যাঙ্ক এবং বিজয়া ব্যাঙ্ককে ব্যাঙ্ক অফ বরোদা র সাথে সংযুক্তিকরণ করা হয়। ২০২০ সালের ১লা এপ্রিল একটি বৃহদায়তন সংযুক্তিকরণ (Mega Merger) কার্যকারী করে। এক দিনেই ১০টি ব্যাঙ্ককে ৪টি ব্যাঙ্কে পরিণত করা হয়। (১)ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক এবং ওরিয়েন্টাল ব্যাঙ্ক অফ কমার্সকে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক এর সঙ্গে (২) এলাহাবাদ ব্যাঙ্ক কে ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্ক এর সঙ্গে (৩)সিন্ডিকেট ব্যাঙ্ক কে কানাড়া ব্যাঙ্ক এর সঙ্গে (৪)কর্পোরেশন ব্যাঙ্ক এবং অন্ধ্র ব্যাঙ্ক কে ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক এর সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হল।

পূর্বতন ২৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের মধ্যে ২টি ব্যাঙ্ক যথা ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া ও এলাহাবাদ ব্যাঙ্ক এর সদর দপ্তর ছিল কলকাতায়। শাখার সংখ্যার নিরিখে ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক ছিল এই রাজ্যের বৃহত্তম ব্যাঙ্ক এবং এটি পশ্চিমবঙ্গের ব্যাঙ্ক হিসেবে রাজ্যবাসীর কাছে পরিচিত। এলাহাবাদ ব্যাঙ্ক দেশের প্রাচীনতম ব্যাঙ্ক। আমাদের রাজ্যে সদর দপ্তর থাকার ফলে এই রাজ্যে ঋণ দানের ক্ষেত্রে যে ভূমিকা এই ব্যাঙ্কগুলো নিতে পারতো সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হল আমাদের রাজ্য। একটি সদর দপ্তর চলে গেল দিল্লিতে, আর একটি চলে গেল চেন্নাইতে। কোন প্রাদেশিক মনোভাব থেকে নয়, জাতীয় ক্ষেত্রে আমানত এবং ঋণের অনুপাতে কেন্দ্রীয় নীতির কারণে আমাদের রাজ্য ঐতিহাসিকভাবে অবহেলিত। সেই বঞ্চনা আরও বাড়বে। পরিতাপের বিষয়, আসন্ন নির্বচনের মুখে দাঁড়িয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যে বিষোদ্গার কেন্দ্রের বিরুদ্ধে করছেন,এই রাজ্য থেকে দুটি ব্যাঙ্কের সদর দপ্তর তুলে নেওয়ার বিরুদ্ধে তিনি কোন ভূমিকা পালন করেন নি। হয়তো এখানে কোন সেটিং কাজ করেছে।

২০১৭ সালে ষ্টেট ব্যাঙ্কের সাথে অ্যাসোসিয়েট ব্যাঙ্কের সংযুক্তির সময়ে ইউএফবিইউ -এর অভ্যন্তরে সহমতের অভাবের জন্য কোন ঐক্যবদ্ধ কার্যক্রম গ্রহণ করা যায় নি। ২০১৯ ও ২০২০ সালের সংযুক্তিকরণকে কেন্দ্র করে ইউএফবিইউ ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করতে সক্ষম হয় এবং উভয়ক্ষেত্রেই এই সংযুক্তিকরণের বিরুদ্ধে ব্যাঙ্ক শিল্পে দেশব্যাপী ধর্মঘট সফলভাবে পালিত হয়।

ব্যাঙ্ক কর্মচারী আন্দোলন মনে করে সংযুক্তিকরণ বেসরকারিকরণের লক্ষ্যে একটি অন্যতম পদক্ষেপ। দেশের কর্পোরেট সংস্থাগুলোর লোলুপ নজর ব্যাঙ্কে গচ্ছিত সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের প্রতি যার পরিমাণ ১৪৭.২৬ লক্ষ কোটি টাকা (জানুয়ারী ২০২১)।

Source: Google Images

রাষ্ট্রায়ত্ত বিমাই মানুষের পছন্দ

আমাদের দেশে জীবন বিমার ক্ষেত্রে বেসরকারি বিমা কোম্পানির প্রবেশ ঘটে ২০০০ সালে। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বিমা সহ ২৪টি জীবন বিমা কোম্পানি আছে। কিন্তু ব্যবসা প্রসারের ক্ষেত্রে কোন বেসরকারি কোম্পানি এল আই সি ‘র ধারেকাছে নেই। জীবন বিমার বাজারে এলআইসি ‘র অংশ ৭১.৪৯%। গড়ে প্রায় ১০০% বিমাকারীদের পাওনা এলআইসি মিটিয়ে দেয় যা পৃথিবীতে অনন্য। উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলিতে খুব ভাল রেকর্ড যে কোম্পানির তারাও ৬০% থেকে ৬৫% এর বেশী বিমাকারীর পাওনা মেটায় না।

সাধারণ বিমার ক্ষেত্রেও চিত্রটা ভিন্ন নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ৪টি সাধারণ বিমা কোম্পানি সহ দেশে ৩৪টি সাধারণ বিমা কোম্পানি আছে। ব্যবসার নিরিখে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ৩০টি বেসরকারি কোম্পানি থেকে এগিয়ে। রাষ্ট্রায়ত্ত নিউ ইন্ডিয়া ইনসিওরেন্স কোম্পানি ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে ২৬,৮১৩ কোটি টাকা প্রিমিয়াম বাবদ সংগ্রহ করেছে যা ৩৪টি সাধারণ বিমা কোম্পানিগুলির মধ্যে সর্বোচ্চ। এটা আরও ভাল হতে পারতো যদি কেন্দ্রীয় সরকার বিমা কর্মচারী ইউনিয়নগুলির দাবী মেনে ৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলিকে একত্রিত করে একটি কোম্পানি বানাত। কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বিচারিতার প্রতিফলন এখানে স্পষ্ট। ব্যাঙ্ক শিল্পের ক্ষেত্রে ইউএফবিইউ -র বিরোধিতা সত্ত্বেও সংযুক্তিকরণ হচ্ছে আর সাধারণ বিমার ক্ষেত্রে বেসরকারি বিমা কোম্পানিকে বেশী বেশী বাজার দখলের সুযোগ দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বিমা কোম্পানিকে দুর্বল করে রাখা হচ্ছে। এই দ্বিচারিতার উৎস কিন্তু এক এবং তা হচ্ছে কর্পোরেট তোষণ নীতির কারণে।

মালহোত্রা কমিটির সুপারিশ ছিল বেসরকারি কোম্পানিগুলিকে বিমা ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রবেশ করতে দেওয়া এবং তাদের খোলা বাজারে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির সাথে প্রতিযোগিতা করতে দেওয়া। গত দুই দশকের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে যে ১৯৫৬ সাল থেকে এবং ১৯৭২ সাল থেকে যথাক্রমে রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বিমা এবং সাধারণ বিমা পরিষেবার মধ্য দিয়ে গ্রাহকদের যে আস্থা অর্জন করেছে আই আর ডি এ আইনে বেসরকারি বিমা কোম্পানিগুলোকে খোলা বাজারে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ দেওয়া সত্ত্বেও, কি জীবন বিমা কি সাধারণ বিমা, কোনও ক্ষেত্রেই বেসরকারী কোম্পানিগুলি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলির সাথে পেরে উঠছে না। তাই কর্পোরেট বন্ধু মোদি সরকারের প্রস্তাব জীবন বিমার শেয়ার বিক্রি করে সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমাও এবং একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বিমা কোম্পানি বেসরকারি করে দাও। আসলে ব্যাঙ্ক ও বিমা ক্ষেত্রকে সরকার পরিষেবা ক্ষেত্র মনে করে না, তারা মনে করে এগুলো শুধু ব্যবসার ক্ষেত্র এবং ব্যবসা করা সরকারের কাজ নয় তাই বেচে দাও।

Source: Google Images

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি লাভ করে’ও লোকসানে

ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের পর ৫১ বছর অতিক্রান্ত। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৬৯ সালের প্রথম পর্বের জাতীয়করণের আগের ২২ বছরে ৬৫০টি বেসরকারি ব্যাঙ্ক ‘ফেল’ করে অর্থাৎ বন্ধ হয়ে যায়। এইসময়ে আমাণতকারীরা হয়েছেন সর্বস্বান্ত, কর্মচারীরা হয়েছেন চাকুরিচ্যুত। ১৯৬৯ সালের জুলাই মাসের পর থেকে আমাদের দেশে আর এই ধরণের ঘটনা ঘটেনি। কোন বেসরকারি ব্যাঙ্ক সঙ্কটে পরলে আমানতকারীদের সঞ্চয় এবং কর্মীদের চাকুরীর নিরাপত্তা দিয়ে চলেছে কোন না কোন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক। সর্বশেষ নজির ইয়েস ব্যাঙ্ক। যেখানে ব্যাঙ্কটিকে বাঁচাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ষ্টেট ব্যাঙ্ককে ভূমিকা নিতে হয়েছে। আরও অনেক নজির আছে,তালিকা দিয়ে পরিসর বাড়ানোর প্রয়োজন নেই।

বিগত ৫১ বছর ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি ধারাবাহিকভাবে ব্যবসায়িক লাভ (operating profit) করে চলেছে। ২০১৪ সালে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর, ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে পুণেতে অনুষ্ঠিত হয় ব্যাঙ্কারস মিট, যার নাম দেওয়া হয় ‘জ্ঞানসঙ্গম’,ব্যাঙ্ক শিল্পের রোডম্যাপ স্থির করতে গিয়ে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তার রূপরেখা ঐ বছরই ১৪ই আগষ্ট ‘ইন্দ্রধনুশ’ নামক দলিলে প্রকাশিত হয়। ঐ দলিলে অন্যান্য সুপারিশগুলির মধ্যে ছিল অনাদায়ী ঋণ খাতে আরও বেশী করে প্রতি বছর বরাদ্দ করতে হবে অর্জিত ব্যবসায়িক লাভ থেকে। যার পরিণতিতে গত ৫ বছর ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি আজ নীট লোকসানের কোঠায় চলে গেছে। ২০১৯-২০ এর অর্থবর্ষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির মোট ব্যবসায়িক লাভ হয়েছে ১,৭৪,৩৩৬ কোটি টাকা,কিন্তু ইন্দ্রধনুশ দলিলের নির্দেশিকা অনুযায়ী অনাদায়ী ঋণ খাতে বরাদ্দ করতে হয়েছে ২,০০,৩৫৩ কোটি টাকা, ফলে গত অর্থবর্ষে (৩১-৩-২০২০) রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির মোট নীট লোকসান দাঁড়ায় ২৬,০১৬ কোটি টাকা।

হেয়ার কাট

দেশের ব্যাঙ্কগুলির একটি গুরুতর সমস্যা হচ্ছে পুঞ্জিভূত অনাদায়ী (N.P.A) ঋণ যার পরিমাণ ৬.৮ লক্ষ কোটি টাকা (মার্চ ২০২০)। এর সিংহ ভাগই বকেয়া পরে আছে দেশের রাঘব বোয়াল ব্যবসায়ীদের কাছে। কেন্দ্রীয় সরকার এদের বন্ধু, তাই এদের বিরুদ্ধে ফৌজদারী ব্যবস্থা নিতে অনিচ্ছুক। ২০১৬ সালের ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাঙ্করাপ্টসি আইন প্রয়োগ করে ঢালাওভাবে ছেঁটে ফেলা (Write Off) হচ্ছে বকেয়া ঋণের পরিমাণ। বিগত ৮ বছরে ১২টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ৬.৩২ লক্ষ কোটি টাকা ছাড় দিয়ে আদায় করেছে মাত্র ১৯,২০৭ কোটি টাকা। গত ১৮ই ফেব্রুয়ারী রিজার্ভ ব্যাঙ্ক একটি ঋণ সমঝোতা অনুমোদন করে যেখানে দিওয়ান হাঊসিং ফিনান্স কর্পোরেশন নামে একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির কাছে বিভিন্ন ব্যাঙ্কের বকেয়া পাওনার মোট পরিমাণ ছিল ৯০,০০০ কোটি টাকা। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অনুমোদিত সমঝোতা অনুযায়ী পিরামল গ্রুপ নামে আর একটা রিয়েল এস্টেট কোম্পানিকে ৬০% এর ওপরে ছাড় দিয়ে সামান্য টাকার বিনিময়ে ব্যাঙ্কের খাতায় অনাদায়ী ঋণের তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হবে। এই ছাড়ের গাল ভরা নাম দেওয়া হয়েছে ‘হেয়ার কাট’। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিকে বেচে দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য এই প্রক্রিয়ায় ব্যাঙ্কগুলির ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করার চেষ্টা চলছে। এমনও কথা শোনা যায় যে সরকার একটি খারাপ ব্যাঙ্ক (Bad Bank) তৈরী করার কথা ভাবছে যেখানে সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের অনাদায়ী ঋণের খাতাগুলো স্থানান্তরিত করা হবে যাতে সমস্ত ব্যাঙ্কের ব্যালেন্স শিট ঝকঝকে দেখায় আর রাঘব বোয়াল বকেয়া ঋণ গ্রহীতাদের টাকা ফেরত দিতে না হয়। যে তুঘলকী পথে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি চালানোর চেষ্টা চলেছে তাতে যে কোন ধ্বংসাত্মক কাজ করা এই সরকারের পক্ষে অসম্ভব নয়।

চাই বেসরকারিকরণ বিরোধী জনরোষ

বর্তমান পর্যায়ে ব্যাঙ্কশিল্পে দুই দিন,সাধারণ বিমা এবং জীবন বিমা শিল্পে একদিন করে ধর্মঘটের কর্মসূচী আগামী দিনে আরও কঠিন এবং দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের প্রস্তুতিতে একটি পদক্ষেপ।

দেশের অর্থব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল ব্যাঙ্ক এবং বিমা শিল্পের জাতীয়করণের মধ্য দিয়ে। দেশকে খাদ্যে স্বয়ম্ভর করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি। জাতীয়করণের পর ব্যাঙ্ক এবং বিমা শিল্পে বিপুল কর্মসংস্থান হয়েছে। অগ্রাধিকার ক্ষেত্রে স্বল্প সুদে ঋণ প্রকল্প চালু হয় ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের পর। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক এবং বিমা প্রতিষ্ঠানের গৃহঋণ প্রকল্পে উপকৃত হয়েছে দেশের অসংখ্য মানুষ। ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে এলআইসি -র নুতন পলিসি হোল্ডার হয়েছেন ২.১৮ কোটি মানুষ। জানুয়ারি ২০২১ এর তথ্য অনুযায়ী জনধন যোজনায় ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ৪১.৭৫ কোটি। এর মধ্যে ৪০.৪৮ কোটি অ্যাকাউন্ট খুলেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক এবং গ্রামীণ ব্যাঙ্কগুলি। ২০১৭-২২ এর পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা খাতে এলআইসি কেন্দ্রীয় সরকারকে যোগান দিয়েছে ২৮,০১,৪৮৩ কোটি টাকা। রাষ্ট্রয়ত্ত্ব ব্যাঙ্ক, বিমা শিল্পের এই গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকাকে নস্যাৎ করতে চায় এই সরকার।

Source: Google Images

২০০৮ এর দুনিয়া ব্যাপী আর্থিক ধসের ধাক্কা আমাদের দেশে অনুভুত হয়নি বললেই চলে। যখন পৃথিবীর বিশালায়তন বেসরকারি ব্যাঙ্ক এবং বিমা কোম্পানিগুলি তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়েছে এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থের যোগান দিয়ে (Bail Out) সংকটের মোকাবিলা করতে হয়েছিল, তখন আমাদের দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক এবং বিমা প্রতিষ্ঠানগুলি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল এবং আজও আছে – এর পেছনে আছে দেশের ব্যাঙ্ক, বিমা কর্মচারী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উজ্জ্বল ভূমিকা। কেন্দ্রীয় সরকার এই অভিজ্ঞতা থেকে কোনো শিক্ষা নিতে রাজি নয়।

ব্যাঙ্ক , বিমা বেসরকারিকরণ হলে ক্ষতি আমজনতার। কৃষক, বেকার যুবক, ছাত্র, ক্ষুদ্র শিল্প ঋণ পাবে না, সঞ্চয়ের নিরাপত্তা থাকবেনা, সঞ্চয়ের উপর সুদের হার কমবে, মোদি সরকার আসার পর ইতিমধ্যেই আমানতের উপর প্রায় ৩% সুদ কমান হয়েছে, ব্যাপক সংখ্যায় শাখা বন্ধ হবে ফলে গ্রাহক পরিষেবা সংকুচিত হবে; জীবন বিমার মেয়াদ শেষে ১০০% টাকা পাওয়া যাবে না; সাধারণ বিমায় বিমাকারীর দাবির মীমাংসা করতে হয়রানি বাড়বে।

কর্পোরেট বন্ধু কেন্দ্রীয় সরকার বেছে নিয়েছে এক সর্বনাশা পথ যা দেশের অর্থ ব্যবস্থাকে চরম বিশৃঙ্খলতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কোন আর্থিক পাওনা গন্ডার দাবী নিয়ে আসন্ন ধর্মঘটগুলি নয়। ধর্মঘটের দাবীঃ- ব্যাঙ্ক, বিমা বেসরকারিকরণ করা চলবে না, জনবিরোধি আর্থিক সংস্কার বন্ধ করতে হবে। যে দাবী ব্যাঙ্ক এবং বিমা কর্মচারীরা উত্থাপন করেছে তা দেশের অর্থ ব্যবস্থার বুনিয়াদ মজবুত রাখার স্বার্থে,আপামর জনসাধারণের স্বার্থে।

শুধু ব্যাঙ্ক ও বিমা কর্মচারিরা লড়াই করে এই আগ্রাসী নীতিকে পরাস্ত করতে পারবে না। বেসরকারিকরণ বিরোধী এবং জনবিরোধী আর্থিক সংস্কারের কর্মসূচী বাতিল করার এই দাবীকে গণদাবীতে পরিণত করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে জনরোষ।

*লেখক বি ই এফ আই এর বর্তমান সহ সভাপতি, প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক।

Spread the word

Leave a Reply