গণতন্ত্র , সংবিধান এবং মিথ্যাচার - সুব্রত দাশগুপ্ত


২০ আগস্ট ২০২৩ রবিবার

      ন’বছরের প্রাধানমন্ত্রীত্বে একবারের জন্যও তিনি দেশের সাংবাদিকদের মুখোমুখি হননি, কোন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সাহস করেননি। একতরফা প্রচারের সুযোগ নিয়ে বলে গিয়েছেন নিজের ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’মন কি বাত’, জানতে চাননি দেশের মানুষের মনের কথা। সেই তিনি সম্প্রতি আমেরিকা সফরে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে চূড়ান্ত নাটকীয়তার সাথে ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’গণতন্ত্র’-র জয়গান গাইলেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী জানালেন – ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’‌‌‌‌‌‌ভারতের ধমনীতে প্রবাহিত হচ্ছে গণতন্ত্র। ভারত বাঁচে গণতন্ত্রে। পূর্বসূরীরা গণতন্ত্রের বয়ানেই লিখেছিলেন সংবিধান। মোদী সরকারও গণতন্ত্রেরই উপাসক। জাতি, ধর্মের কোনও বৈষম্য সেখানে নেই। আমাদের সরকারে বৈষম্যের কোন স্থান নেই। কোনও ভেদাভেদ নেই। ধর্ম, জাতি, ভৌগোলিক ভিত্তিতে কোন বৈষম্য করা হয়না। আমাদের এবং আমেরিকার রক্তেই বয়েছে গণতন্ত্র এবং আমার সরকার গণতন্ত্র মেনে চলে।‘’ এ’ছাড়াও মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনেও গণতন্ত্রের মাহাত্ম্য এবং বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য নিয়ে তিনি বিস্তর কথা বলেছেন। ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍'অন্নদামঙ্গল কাব্য'-র স্রষ্টা ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর তাঁর ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’বিদ্যাসুন্দর’ পদে লিখেছিলেন - ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’সে কহে বিস্তর মিছা যে কহে বিস্তর’। আমেরিকায় মোদীজির গণতন্ত্র বন্দনার প্রসঙ্গে এই বাক্যবন্ধটি যেন খাপে খাপে এটেঁ যায়। তাঁর বক্তব্য মার্কিন সেনেটর, প্রতিনিধিসভার সদস্য বা সাংবাদিকদের কতটা আশ্বস্ত করেছে তা এই মুহূর্তে বলা যাবেনা, কিন্তু তাঁর নিজের দেশের কোটি কোটি মানুষ যে এই বক্তব্য শুনে বিষম খেয়েছেন সেটা অক্লেশেই নিশ্চিত বলা যায়।
প্রধানমন্ত্রীর কথায় ঘুরে ফিরে এসেছে ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’গণতন্ত্র’, ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’সংবিধান’, ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নিরপেক্ষতা’-র মতো অসীম গুরুত্বপূর্ণ শব্দবন্ধগুলি, যা নিয়ে একবিংশ শতাব্দির ভারত তথা সমগ্র পৃথিবীতে বহুল চর্চা চলছে। ভারতের সংবিধান তার প্রস্তাবনা-য় বলেছে – ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’আমরা ভারতের জনগণ সত্যনিষ্ঠার সঙ্গে সংকল্প করে ভারতকে একটি সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র রূপে গড়ে তুলতে এবং সমস্ত নাগরিকদের জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ন্যায়বিচার; চিন্তা, মতপ্রকাশ, বিশ্বাস, ধর্ম ও উপাসনার  স্বাধীনতা; মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধার সমতাকে নিশ্চিত করতে এবং তাদের সকলের মধ্যে ব্যক্তির মর্যাদা ও জাতীয় ঐক্য ও সংহতির নিশ্চয়তা প্রদান করে ভ্রাতৃত্ববোধের প্রসার ঘটানোর লক্ষ্যে আজ ২৬ নভেম্বর, ১৯৪৯ আমাদের গণপরিষদে এই সংবিধান গ্রহণ ও বিধিবদ্ধ করছি এবং নিজেদের অর্পন করছি।‘’ এই প্রস্তাবনা শুধু ভারতের সংবিধানের মুখবন্ধই নয়, প্রকৃত প্রস্তাবে এটি সংবিধানের মূল ভাবধারাকেই প্রতিফলিত করে। একথা ঠিক যে সংবিধান প্রবর্তিত হওয়ার সময় (২৬ জানুয়ারি, ১৯৫০), প্রস্তাবনা’র মধ্যে ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’সমাজতান্ত্রিক’, ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’ধর্মনিরপেক্ষ’ এবং ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’সংহতি’ শব্দত্রয় সংযুক্ত ছিলনা, ১৯৭৬ সালে ৪২তম ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’সংবিধান সংশোধনে’র সময় এই তিনটি শব্দ ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’প্রস্তাবনা’য় যুক্ত করা হয় এবং ১০৩ বার সংবিধান সংশোধন করা হলেও ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’প্রস্তাবনা’ অংশটি, যা সংবিধানেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ, এই একবারই মাত্র সংশোধিত হয়েছিল। কিন্তু ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’প্রস্তাবনা’ সংশোধনের আগে বা পরে সবসময়ই ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’সার্বভৌম গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র’-র ধারণাকে সংবিধানের মূল কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
গণপরিষদে প্রদত্ত ভাষণে সংবিধানের খসড়া কমিটির সভাপতি বাবাসাহেব ড. ভীমরাও আম্বেদকর বললেন – ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’ভারতীয় সংবিধানের উৎস জনগণ এবং এর কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমিকতা জনগণের হাতেই ন্যস্ত আছে।‘ যদিও একথা ঠিক যে অনেক সংবিধান-বিশেষজ্ঞ আমাদের সংবিধানের সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোকপাত করেছেন। একটি অংশের মতে – গণপরিষদের একটি অংশ রক্ষণশীল সামন্ততন্ত্র এবং সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকারের মুখপত্র হিসেবে থাকায় গণপরিষদ গণচরিত্র লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আবার কারও মতে – যে গণপরিষদ সংবিধান রচনা করেছিলেন তাঁরা ভারতের সংখ্যাগরিষ্ট অংশের প্রতিনিধি ছিলেন না। এইসব সমালোচনা সত্বেও ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’প্রস্তাবনা’র ব্যাপকতা ও গুরুত্বকে কোন ভাবেই অস্বীকার করা যায়না। দেশের জনগণ নিজেরাই নিজেদেরকে এই সংবিধান অর্পন করছে – এই ভাবধারা সত্যই অতুলন। কিন্তু মোদীজি কি জানাবেন গত ন’বছরে শাসন পরিচালনা করতে গিয়ে সংবিধানের এই প্রস্তাবনার কোন অংশকে তাঁর সরকার মান্যতা দিয়েছে?

সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্বে মোদিজী শুনিয়েছেন – জাত, ধর্মের বৈষম্যহীনতার কথা এবং তার প্রতি তাঁর সরকারের দায়বদ্ধতার অমৃতবচন। বলেছেন, তাঁর সরকার নাকি সংবিধান মেনে চলে !

  অন্যতর প্রসঙ্গের কথা না হয় উত্থাপন করলাম না, কিন্তু একটি অতি সাম্প্রতিক ঘটনার উল্লেখ তো করাই যায়। দেশের জনগণের হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে যে প্রাসাদোপম বিলাসবহুল নব সংসদভবন তৈরী করা হল তার উদ্বোধনে ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’সাংবিধানিক প্রধান’ রাষ্ট্রপতিকে ব্রাত্য রাখা হল কেন? এটা কি শুধুমাত্র এই কারণে যে, মোদিবাহিনী একনায়কতান্ত্রিক দেশ গঠনের ভাবনা থেকে রাষ্ট্রপরিচালনার সব ক্ষমতা ওই একটি ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’পদ’-এই কেন্দ্রীভূত করতে চায়, যেখানে আজ ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’নরেন্দ্র মোদী’ আছে কাল আবার অন্য কাউকে বসানো যাবে? নাকি এরই সঙ্গে কাজ করছে বিজেপি-র ভাবাদর্শগত পরিচালক আর এস এস-র তুমুল জাতবিদ্বেষী ও নারীবিদ্বেষী মনোভাব, যে আর এস এস চূড়ান্তভাবে মনুবাদী দর্শনকে আশ্রয় ও উপাসনা করে চলে? রাষ্ট্রপতির ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’দলিত’ ও ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’নারী’ পরিচয়-ই কি তাকেঁ ব্রাত্য রেখেছিলো তাঁর ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’ধর্মনিরপেক্ষ’ দেশের নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধনে মনুবাদী অর্ধোলঙ্গ সাধুদের জগঝম্পময় যজ্ঞোৎসব থেকে? রাষ্ট্রপতি এবং দুই কক্ষ, রাজ্যসভা ও লোকসভা, নিয়ে যে দেশের সংসদ গঠিত, যে দেশের সংবিধান অনুসারে প্রধানমন্ত্রী লোকসভা বা রাজ্যসভার নেতামাত্র, সমগ্র সংসদের নন, সেই দেশের নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধনে খোদ রাষ্ট্রপতিকে কেন ব্রাত্য রাখা হলো – এই প্রশ্ন কি কোন সাংবাদিক আমেরিকা সফররত প্রধানমন্ত্রীর কাছে রেখেছিলেন? না, রাখেননি। অথবা এই প্রশ্ন তালিকায় থেকে থাকলেও তা আগে থেকেই ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’সেন্সর’ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ ১৩০ কোটি মানুষের এতবড় এক বাজারের ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’মালিক’-কে বিব্রত করা কখনোই একটি সাম্র্রাজ্যবাদী দেশের প্রশাসনের কাজ হতে পারেনা। 
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন – ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’মোদী সরকারও গণতন্ত্রেরই উপাসক’। এ এক নির্জলা অসত্যবচন। গণতন্ত্রে তো বিরোধী কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব ও মর্যাদা উভয়ই প্রদান করা হয়। বলা হয় যে যুক্তিপূর্ণ বিরোধীতা গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই শক্তিশালী করে। কিন্তু মোদীর ভারতে কি দেখছি আমরা? হিন্দুধর্মের সঙ্গে সম্পর্কহীন, আর এস এস-এর রাজনৈতিক কর্মসূচী ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’হিন্দুত্ববাদ’-এর আগ্রাসী রূপের বিরোধীতা করতে গেলেই বিজেপি ও আর এস এস-এর নানা নামধারী সংগঠনের কোপে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সমাজের বিশিষ্ট জনদেরও। এবং এক্ষত্রে রাষ্ট্রশক্তিও তার প্রশাসনিক যন্ত্রকে ব্যবহার করছে সমগ্র উগ্রতা নিয়েই। সমাজকর্মী সুধা ভরদ্বাজ, গৌতম নওলখা বা ফাদার ষ্ট্যান স্বামীকে কয়েদ করা কিংবা গোবিন্দ পানসারে, অধ্যাপক এম এম কালবুর্গী, সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশকে হত্যা করা – এসব গণতন্ত্রের ঠিক কি ধরণের ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’উপাসনা’ – সে সম্পর্কে কি শ্রীযুক্ত নরেন্দ্র মোদী মুখ খুলবেন? তিনি কি অনুগ্রহ করে জানাবেন যে গণতন্দ্র্রের কোন ধরনের উপাসনায় তাঁর দলের শাসনে থাকা রাজ্যসমুহে একের পর এক সাজানো এনকাউন্টারের নামে কিংবা ধর্মীয় বা সম্প্রদায়গত পরিচয়ের কারণে মানুষকে নৃশংসভাবে খুন করা  হচ্ছে? যে সংবিধান ভারতের জনগণকেই ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’চরম সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী’ বলে বর্ণনা করেছে, সেই সংবিধানের বর্তমান ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’রক্ষাকর্তারা’ যখন দেশের নাগরিকদের রাষ্ট্রশক্তির বিরোধীতা করার অধিকারটুকুও কেড়ে নেন তখন কি মোদিজীর গণতন্ত্রবন্দনা শুনে চিন্তাশীল মানুষের হাসির উদ্রেক হয়না?
গণতন্ত্রের স্বরূপ নির্ধারণে বহু সমাজবিজ্ঞানীর বিভিন্ন মত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে অনেকেই উল্লেখ করেন প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের সেই ভুবনখ্যাত উক্তিটি ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍‘Democracy is a rule of the people, for the people by the people’ (গণতন্ত্র হল জনগণের জন্য জনগণের দ্বারা জনগণের শাসন)। অর্থাৎ এই উক্তিতেও গণতন্ত্রে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতারই নির্দেশনা রয়েছে। এক্ষেত্রে ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍'জনগণের দ্বারা' বলতে বোঝানো হয়েছে ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍'জনতার প্রতিনিধিদের দ্বারা’ অর্থাৎ জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা। আমাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রতিনিধি নির্বাচনে যে সবসময় মানুষের প্রকৃত ইচ্ছারই প্রতিফলন হয়, এমন কথা বলা যায়না। আরোপিত পরিস্থিতি অনেকসময় মানুষকে বাধ্য করে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে। ভারতের সংসদে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত বহু সদস্যের ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍ ’প্রোফাইল’ দেখলেই বোঝা যায় যে তারা ঠিক কোন ধরণের ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’জনতা’র প্রতিনিধিত্ব করছেন। তথাপি, আমাদের গণতন্ত্রে এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গুরুত্বকে কোনভাবেই লঘু করে দেখা যায়না। 
নিজের সরকারের গণতন্ত্রের প্রতি অপার শ্রদ্ধার ছবি তুলে ধরার পাশাপাশি শ্রী নরেন্দ্র মোদী আমেরিকার গণতন্ত্রের প্রশংসায়ও পঞ্চমুখ হয়েছেন। তাঁর এবং তাঁদের ধারণায় আমেরিকাই গণতন্ত্রের উদ্গাতা, যার কাছে আমাদের সংবিধান রচয়িতারা ঋণী। অবশ্য ইতিহাস বলছে যে আমেরিকার বহুপূর্বে, খ্রীষ্টপূর্ব ৫ম শতকে (আনুমানিক ৫০৬ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে ) গ্রীসের এথেন্সেই গণতন্ত্রের বিকাশ হয়েছিল। কিন্তু আমাদের কাছে ইতিহাসের আরও চমকপ্রদ তথ্য হল এই যে এথেন্সেরও পূর্বে, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল আমাদের দেশেরই একটি প্রান্তে এবং তাও খ্রীষ্টের জন্মের ছয়শত বছর পূর্বে অর্থাৎ এথেন্সের প্রায় একশ’ বছর আগে। একথা ঠিক যে সেই সময় সর্বজনীন ভোটাধিকারের মধ্য দিয়ে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকাশ হয়নি তথাপি প্রাথমিক গণতন্ত্রের ধারনা গড়ে উঠেছিল এখানেই, যা সময়ান্তরে বিকশিত হতে হতে আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। ইতিহাসের একজন মনোযোগী পাঠক হলে শ্রী মোদী নিশ্চয়ই জানতেন যে গৌতম বুদ্ধের সময় ভারতে যে ষোড়শমহাজনপদের উত্থান হয়েছিল, তার অন্যতম ছিল বৈশালী এবং এই বৈশালীতেই খ্রীষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে পৃথিবীর প্রথম প্রজাতান্ত্রিক গণরাজ্য গড়ে ওঠে। বৈশালীর সঙ্গে গৌতম বুদ্ধ ও মহাবীরের নাম ওতপ্রোতভাবে যুক্ত কিন্তু বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের অভ্যুদয়ের পূর্বেই বৈশালী তার নিজস্ব পরিচয় গড়ে তুলেছিল। হিমালয়ের কোলে বসবাসকারী লিচ্ছবি উপজাতির মানুষরা, যাঁরা চিন্তা-চেতনা-সংস্কৃতিতে সময়ের তুলনায় অনেকটাই অগ্রসর ছিল তাঁরাই এই গণরাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। এখানে রাজ্যশাসনের নিয়মবিধি তৈরী করার দায়িত্ব অর্পিত ছিল ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’গণ’ বা ছোট ছোট সমিতিগুলির হাতে। যারা ছিলো সেখানকার জনগণের প্রতিনিধিমণ্ডলী। আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে এই সমিতিগুলি নিজেদের গণরাজ্যের ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’গণনায়ক’ নির্বাচিত করতো। অর্থাৎ শাসক নির্বাচিত হতো জনগণের প্রতিনিধিদের দ্বারা। এই প্রতিনিধিরাই রাজ্যের সমস্ত কাজকর্ম দেখভাল করতো এবং সময়োপযোগী করে প্রচলিত নিয়মবিধির পরিমার্জন-পরিবর্দ্ধন-পরিবর্তন করতো। 
ঐতিহাসিক বিবরণ থেকেই জানা যায় যে বৈশালীতে রাজনৈতিক বিষয়সমুহ নিয়ে নিয়মিত চর্চারও একটি বিশেষ স্থান ছিল। আজকের মতো ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’সংবিধান’ না থাকলেও, তাঁদেরও ছিল বিচার পরিচালনার জন্য ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’প্রবেণিপুস্তক’। এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার কারণেই বৈশালী একদিন প্রাচুর্য ও প্রভাবের দিক দিয়ে মগধের মতো শক্তিশালী রাজ্যের সমকক্ষ হতে পেরেছিল। স্বয়ং বুদ্ধ তাঁর ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’সংঘ’ গঠনে বৈশালী গণতন্ত্রের দৃঢ়তা ও স্বাধীনতাপ্রিয়তা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি নিজে যেমন তাঁর শাক্যগণতন্ত্রে অংশগ্রহণ করতেন, তেমনি বৈশালী গণতন্ত্রের ধাঁচে সংঘবদ্ধ কাজ, সংঘবদ্ধ সাধ্যায়, সংঘবদ্ধভাবে বিবাদ-মিমাংসার পদ্ধতিকে সংঘ পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। যেমন বৈশালী গণরাজ্যে তেমনি বৌদ্ধ সংঘের ভিক্ষুদেরও বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য নিয়মিত মিলিত হতে হতো সভায়। মাসে দু’বার, অমাবস্যা-পূর্ণিমাতে আয়োজিত ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’সঙ্ঘসন্নিপাত’ (সম্মেলন)-এ অংশগ্রহণ করা ছিল সমস্ত ভিক্ষুর পক্ষে বাধ্যতামূলক। এই সম্মেলনে আলাপ-তর্ক-বিতর্ক হতো কিন্তু শেষপর্যন্ত গরিষ্ঠের মতকেই ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’সিদ্ধান্ত’ হিসেবে মান্যতা পেতো। বহু সীমাবদ্ধতা স্বত্বেও বৈশালী গণরাজ্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার যে প্রথম প্রকাশ দেখা গিয়েছিল, বিশ্ব তাকে অস্বীকার করতে পারেনি। এই ঘটনা ভারতবর্ষের গৌরবের মুকুটে একটি উজ্জ্বল পালক।
কিন্তু এ নিয়েও মোদী বাহিনীকে প্রশ্ন করা যায়। এই বাহিনী, আর.এস.এসের ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’হিন্দুত্ববাদী ভারত’-এর রাজনৈতিক আকাঙ্খাপূরণের জন্য যে ভাবাদর্শনগত প্রচার চালায় তাতে মাঝেমধ্যেই পুরাণ ও উপকথার কাল্পনিক, মনগড়া ঘটনাগুলিকে সামনে নিয়ে আসে। আকাশে উড়তে থাকা ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’পুষ্পক রথ’, অগ্নিবর্ষী ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’ব্রহ্মাস্ত্র, ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’মেঘের আড়ালে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ’, ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’লাফিয়ে সমুদ্র পার’-এর মতো ঘটনাগুলি নাকি প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞান ও কারিগরীর চূড়ান্ত উন্নতির অসামান্য নিদর্শন। গুরুদের এই যুক্তিহীন প্রচারের যোগ্য সঙ্গত করতেই চ্যালাদের মুখ থেকে নিঃসৃত হয় ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’গোরুর দুধে সোনা’, ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’গোরুর নিঃশ্বাসে অক্সিজেন সরবরাহ’, গোমুত্রের ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’সর্বরোগহরা’ ক্ষমতার মতো যত্তোসব চূড়ান্ত অবৈজ্ঞানিক, অসত্য ধারনা। ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’টোটাল সায়েন্স’ নিয়ে  পড়াশোনা করা প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর দল ও সরকারের কেষ্টবিষ্টুদের একবারের জন্যও প্রাচীন ভারতের কথা প্রসঙ্গে বলতে শুনেছেন যে এই মহান ভারতই ছিল গণতন্ত্রের সূতিকাগার? একবারও তারা উল্লেখ করেন, আজ থেকে আড়াই হাজার বছরেরও আগের সেই মহাজনপদের কথা? ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’হিন্দুত্ববাদী’ প্রচারকরা কি একবারের জন্যও উল্লেখ করে, উদ্ভবের প্রথম যুগে প্রগতিশীল বৌদ্ধধর্মের সঙ্ঘ পরিচালনায় অনুসৃত গণতান্ত্রিক পদ্ধতির কথা – যা ভারতের ইতিহাসকে সত্যই মহিমান্বিত করে? না, তারা তা করেনা, কারণ এই সত্য ঘটনাগুলি তাদের মিথ্যা প্রচারকে নস্যাৎ করে দিতে পারে। 

প্রসঙ্গক্রমে বলা যায় যে ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’গণতন্ত্র’ নিয়ে শ্রী নরেন্দ্র মোদীর আহ্লাদিত ভাষণে মার্কিন মুলুকে বসবাসকারী মানুষজন সকলেই একেবারে খুশীতে বিহ্বল হয়ে পড়েছেন এমনটা নয়। তাঁর আমেরিকা সফরকালে, হোয়াইট হাউসের বাইরে ভারতের গণতন্ত্র হত্যার জন্য নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে অনাবাসী ভারতীয়দের বিক্ষোভ প্রদর্শনের ঘটনাও কিন্তু আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। সেখানে কিন্তু সাংবাদিকদের উপর ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’আক্রমণ, বিচারপতি হত্যা, নরেন্দ্র মোদীর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর না দেওয়া, গুজরাটের দাঙ্গার মদত দেওয়া, মণিপুরের সাম্প্রতিক ঘটনায় তাঁর নীরবতা নিয়ে প্রবল সমালোচনা হয়েছে। এমনকি সেখানে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’স্বৈরশাসক’ হিসেবে পর্যন্ত চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তিনি ও তাঁর সরকার যে বহুভাষাধর্মবর্ণসম্প্রদায় সমন্বিত এই ভারতবর্ষের বিভিন্নতাকে সম্মান করেন না, সেই অভিযোগও তোলা হয়েছে। এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায় যে তাঁর অভিনীত নাটক সর্বত্র সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না। বিশ্বের সব মানুষই তো আর ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’গোমাতার সন্তান’ নন !

    সংবিধানের প্রসঙ্গ দিয়েই আলোচনা শেষ করা যাক। ভারতের সংবিধান তার জনগণের হাতে নিশ্চিতভাবেই প্রভুত ক্ষমতা প্রদান করেছে। জনতা চাইলে সেই ক্ষমতার পূর্ণ অনুশীলন করতে পারে, জনগণবিরোধী রাষ্ট্রশাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে, নতুন ক্ষমতাবিন্যাস তৈরী করতে পারে। কিন্তু তার জন্য তাদেঁর ঐক্যবদ্ধতা এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আঘাত হানার শক্তি সঞ্চয় করা প্রয়োজন। এ কথা সত্য যে, মোদী শাসনের পূর্বেও ভারতবর্ষে গণতন্ত্র আক্রান্ত হয়েছে। দেশের মানুষই তখন সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতাবলে তার মোকাবিলা করেছে। আজ এ’দেশের বুকে ঘোষিত ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’জরুরী অবস্থা’ নেই ঠিকই কিন্তু এক ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’অঘোষিত জরুরী অবস্থা’ যে প্রতিদিন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে খাঁচায় বন্দী করছে একথা কে অস্বীকার করবে। এই অবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করতে পারে কেবলমাত্র জনগণের জাগরিত শক্তি। ক্ষুদ্র বীজের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মহীরুহের প্রাণ, উপযুক্ত পরিবেশ পেলে তবেই সে প্রকাশিত হয়, বিকশিত হয়। মানুষের মধ্যেই নিহিত রয়েছে অমিত ক্ষমতা, যার প্রকাশ ও অনুশীলনে বারবার পরিবর্তিত হয়েছে পৃথিবীর ইতিহাস। এ’দেশের জনগণও নানাবিধ উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে চলে, সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতার অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেদের, প্রকৃত অর্থেই, ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍’ভারতভাগ্যবিধাতা’ রূপে প্রমান করতে পারবেন।

ছবি ; সোশ্যাল মিডিয়া থেকে প্রাপ্ত


শেয়ার করুন

উত্তর দিন