CPIMCC

কেন্দ্রীয় কমিটির বিবৃতি

আগস্ট ১, সোমবার, ২০২২

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি(মার্কসবাদী)-এর কেন্দ্রীয় কমিটি ৩০ এবং ৩১জুলাই, ২০২২তারিখে নয়াদিল্লিতে বৈঠক করে নিম্নলিখিত বিবৃতি জারি করেছে:

সিপিআই(এম)-এর ২৩তম পার্টি কংগ্রেসের সমাপ্তির পর থেকে গত চার মাসে ফ্যাসিস্ট আরএসএস-এর হিন্দুত্ব এজেন্ডাকে নব্য-উদারবাদী সংস্কার, ধান্দার পুঁজিবাদকে শক্তিশালী করা এবং সাম্প্রদায়িকতাকে শক্তিশালী করার সাথে মিলিতভাবে ও আক্রমণাত্মকভাবে এগিয়ে নেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট প্রয়াস দেখা গেছে। সাম্প্রদায়িক- কর্পোরেট আঁতাত ভারতের অর্থনীতিকে আঘাত করছে এবং জনগণের উপর অভূতপূর্ব বোঝা চাপিয়েছে।

লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি

WPI এবং CPI উভয়েরই রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানো, অভূতপূর্ব মূল্যবৃদ্ধি, জনগণের জীবন ও জীবিকাকে ধ্বংস করছে, তাদের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস করছে, যার ফলে অর্থনীতিতে চাহিদার মাত্রা আরও কমছে।অভ্যন্তরীণ চাহিদার সংকোচন উৎপাদন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে যার ফলে অর্থনীতি আরও মন্থর হয়ে যাচ্ছে এবং কর্মসংস্থানের ক্ষতি হচ্ছে।খাদ্য ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি সকল নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির সাথে এই মুদ্রাস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করছে। GST বৃদ্ধির সর্বশেষ কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত দৈনন্দিন ব্যবহারের সমস্ত প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়িয়েছে।

সিপিআই(এম) এর কেন্দ্রীয় কমিটি জিএসটি বৃদ্ধি এবং পেট্রোপণ্যের উপর সেস/সারচার্জ প্রত্যাহার করার দাবি জানায়।

জনগণের উপর বোঝা চাপানোর পরিবর্তে মোদি সরকারকে রাজস্ব বাড়াতে অতি-ধনীদের উপর অতিরিক্ত কর চাপাতে হবে।

রেকর্ড বেকারত্ব

২০-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের যে হার রয়েছে তা ভয়াবহ, ৪২ শতাংশ। উপরন্তু, আমাদের ৯০কোটি কর্মক্ষম জনসংখ্যার (২০২০) ৬১.২ শতাংশ  কাজের সন্ধান বন্ধ করে দিয়েছে।শ্রম অংশগ্রহণের হার রেকর্ড পরিমানে কম – ৩৮.৮ শতাংশ - মহিলারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ।মোদি সরকার সংসদে স্বীকার করেছে যে গত আট বছরে ০.৩৩ শতাংশ আবেদনকারীকে সরকারি চাকরি দিয়েছে যেখানে দশ লাখের বেশি সরকারি শূন্যপদ রয়েছে।

মোদি সরকারকে অবিলম্বে সমস্ত শূন্যপদ পূরণ করতে হবে এবং MGNREGS-এর জন্য বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে হবে এবং আমাদের যুব ও জনসংখ্যাগত সম্পদ নষ্ট করা বন্ধ করতে হবে।

আদিবাসী অধিকারের উপর আক্রমণ

কেন্দ্রীয় কমিটি বন সংরক্ষণ আইনের অধীনে সংশোধিত নিয়মগুলি অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি করে যা গ্রাম সভা, উপজাতি সম্প্রদায় এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী বনবাসীদের বাধ্যতামূলক পূর্ব সম্মতির অধিকার থেকে বঞ্চিত করে যাতে বেসরকারি কর্পোরেটদের লাভের সর্বাধিক সুবিধার জন্য বনভূমির চরিত্র বদল করা যায়। এইভাবে বন ধ্বংস জলবায়ু পরিবর্তনের বিপর্যয়কর প্রভাবকে বাড়িয়ে তুলছে।

সম্পূর্ণ কর্তৃত্ববাদ কায়েমের চেষ্টা

ইডি এবং সিবিআই গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাজ্য সরকারগুলিকে অস্থিতিশীল করতে এবং বিরোধী নেতাদের টার্গেট করার জন্য মোদি সরকারের রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ক্রমবর্ধমানভাবে কাজ করছে।সদ্য অবসর নেওয়া একজন বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চের সাম্প্রতিক রায়, পিএমএলএ (Prevention of Money Laundering Act)-তে ২০১৯ সালের সমস্ত সংশোধনী বহাল রেখেছে যা ইডিকে আরও ভযানক ক্ষমতাশালী করে তুলেছে। এটা গণতন্ত্রের ওপর মারাত্মক আঘাত।

সংসদের ওপর আঘাত

মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব ইত্যাদির মতো জনগণের জ্বালাময়ী ইস্যুতে কোনো উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করে মোদি সরকার সংসদে নজিরবিহীন আক্রমণ চালাচ্ছে। এই অধিবেশনের জন্য সংসদের ২৭ জন সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। স্বাধীন ভারতে এটা নজিরবিহীন।

মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার প্রখ্যাত আন্দোলনকারী এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সাহসী যোদ্ধা তিস্তা শীতলাবাদকে যেভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে তার নিন্দা করছে কেন্দ্রীয় কমিটি। এটি সেই পূর্বোল্লেখিত বিচারকের নেতৃত্বেই সুপ্রীম কোর্টের একটি বেঞ্চের রায়ের ফলে সহজতর হয়েছিল।

যে বিশেষ পরিস্থিতিতে জুবের আহমেদকে যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তা নিশ্চিত করে যে এই মোদি সরকারের অধীনে যারা হিংসা ঘটায়, ঘৃণামূলক বক্তৃতা প্রচার করে এবং প্রকাশ করে তারা রাষ্ট্রের দ্বারা সুরক্ষিত থাকে, অন্যদিকে যারা এই ধরনের বক্তৃতার পেছনে থাকা ঘৃণার রাজনীতিকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে এবং সত্যকে জনগণের সামনে তুলে ধরে তাদের গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়।

ভীমা কোরেগাঁও বন্দিরা তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে বন্দী রয়েছেন। সাংবাদিক এবং শিক্ষার্থী সহ আরও বেশ কয়েকজন কঠোর নিবর্তনমূলক আটক আইনের অধীনে হেফাজতে রয়েছেন।

কেন্দ্রীয় কমিটি অবিলম্বে তিস্তা শীতলাবাদ, আর বি শ্রীকুমার সহ ভীমা কোরেগাঁও বন্দীদের এবং অন্যান্যদের মুক্তি দাবি করে৷

সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের ভয়ঙ্কর তীব্রতা

কেন্দ্রীয় কমিটি শাসক দলের পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির দ্বারা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের ঘটনার ভয়ঙ্কর বৃদ্ধির নিন্দা করে, এর ফলে বেশ কয়েকটি রাজ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে হিংসার ঘটনা ঘটেছে । দিল্লি এবং অন্যান্য বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বড় আকারে বুলডোজার রাজনীতির ব্যবহার সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে আরও তীক্ষ্ণ করেছে। আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে হিন্দুত্ব রাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জনের জন্য জনগণের মধ্যে হিন্দুত্ব চেতনাকে সুসংহত করার জন্য আরএসএস/বিজেপি দ্বারা ঘৃণা ও সন্ত্রাসের বিষাক্ত প্রচারের প্রসার ঘটানো হয়েছে।

নতুন সংসদ ভবনের উপরে জাতীয় প্রতীক উন্মোচন করার সময় প্রধানমন্ত্রীকে হিন্দু ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান করে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের চরিত্রের উপর আবারও আক্রমণ  করতে দেখা গেছে। এটি স্পষ্টতই ভারতীয় রাষ্ট্র ও সরকারের পরিচয় হিন্দুত্বের সাথে তুলনীয় করে, ভারতের সংবিধানের সাথে নয়।

কেন্দ্রীয় কমিটি ভারতীয় সংবিধান, ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র এবং আমাদের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা রক্ষায় সকল ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ এবং শক্তিকে একত্রে সমবেত হওয়ার জন্য আবেদন করে।

কেরালার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি

কেন্দ্রীয় কমিটি কেরালার এলডিএফ সরকারকে অস্থিতিশীল করতে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির ক্রমবর্ধমান অপব্যবহারের প্রবল প্রচেষ্টার তীব্র নিন্দা করেছে।রাজ্যে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ,এলডিএফ সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে একাধিক আন্দোলন শুরু করেছে। এই জোট এলডিএফ সরকারের বিরুদ্ধে বিজেপির সঙ্গে মিলেমিশেই কাজ করছে।

কেন্দ্রীয় রাজস্ব থেকে প্রাপ্য কেরালার বৈধ অংশ অস্বীকার করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক নিয়োজিত বৈষম্যমূলক নীতি এবং কৌশলকে কেন্দ্রীয় কমিটি দৃঢ়ভাবে নিন্দা করে, এর ফলে কেরালায় গুরুতর সম্পদ সংকট দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটি কেরালার এলডিএফ সরকার এবং এর জনগণের পক্ষে বিকল্প নীতির রক্ষায় দেশব্যাপী প্রচার চালানোর এবং এলডিএফ সরকারকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ ও বৈষম্যের নিন্দা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ত্রিপুরার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি

কেন্দ্রীয় কমিটি সাধারণভাবে জনগণের বিরুদ্ধে এবং বিশেষ করে ত্রিপুরায় সিপিআই(এম) এবং পার্টি কর্মীদের বিরুদ্ধে  রাজ্য সরকারকে ব্যবহার করে বিজেপির দ্বারা পরিচালিত ফ্যাসিবাদী আক্রমণের নিন্দা করেছে।কয়েক মাসের মধ্যে রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন হবে, বিজেপি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে পরিবর্তন করেছে এবং জনগণকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে বাধা দিয়ে সন্ত্রাস ও ভয়ের পরিবেশকে তীব্র করেছে।সিপিআই(এম) বিজেপি সরকার এবং এর সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতির বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির বৃহত্তম সংহতি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বাংলার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি

শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারিতে টিএমসির ক্ষমতাশালী নেতা এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের গ্রেপ্তার সন্ত্রাস ও হিংসার রাজনীতির সাথে তৃণমূল সরকারের অবিচ্ছেদ্য যোগ থাকা,এবং এই দলের দুর্নীতির বিষয়ে সিপিআই(এম) এর অবস্থানকে শক্তিশালীভাবে প্রমাণ করে।

গ্রেপ্তারের প্রেক্ষিতে এই মন্ত্রীকে বরখাস্ত করতে হয়েছে তা আবারও প্রমাণ করে যে তৃণমূল সরকার জনবিরোধী ও অগণতান্ত্রিক।নারদ, সারদা এবং পূর্বের  চিট ফান্ড কেলেঙ্কারিগুলিতে বিজেপি সরকারের অধীনে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির দ্বারা কোন অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি।

রাজ্যে সিপিআই(এম) এবং বামফ্রন্ট, সরকারের বিরুদ্ধে বৃহৎ আকারের প্রতিবাদ কর্মসূচী সংগঠিত করেছে যা অনেক জনগণের সমর্থন পাচ্ছে।

কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বান

১. আগস্ট ১-১৫, ভারতের স্বাধীনতার ৭৫ তম বার্ষিকী পালন, সমস্ত পার্টি অফিসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং সংবিধানের প্রস্তাবনার শপথ গ্রহণের মাধ্যমে এই কর্মসূচির সমাপ্তি।স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্টদের গৌরবময় ভূমিকা, গণতন্ত্র রক্ষা, গণতান্ত্রিক অধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা এবং ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সাংবিধানিক মূল্যবোধকে তুলে ধরে প্রচারাভিযান।

২. ১৪ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, জনগণের জীবন জীবিকার উপর বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকারের ক্রমবর্ধমান আক্রমণের বিরুদ্ধে লাগাতার প্রচার চালাতে হবে।প্রতিটি রাজ্যে কাজের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রাজ্য কমিটি দ্বারা পরিকল্পনা করা হবে। এই প্রচারাভিযান রাজ্যের রাজধানীগুলিতে একটি কেন্দ্রীয় জনসভার মধ্য দিয়ে শেষ হবে।

৩. সারা দেশে কেরালার এলডিএফ সরকারকে অস্থিতিশীল করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রচার চালানো হবে। প্রচারাভিযানটি এলডিএফ সরকার দ্বারা অনুসৃত জনকল্যাণমূলক বিকল্প নীতিগুলিও তুলে ধরবে।


শেয়ার করুন

উত্তর দিন