জনগণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের প্রতি আমরা একনিষ্ঠ

প্রকাশ কারাত

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র ২৪ তম পার্টি কংগ্রেসের প্রারম্ভিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলকে আমি উষ্ণ অভিনন্দন জানাই।

কমিউনিস্ট পার্টির জন্য তার কংগ্রেসই হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বোচ্চ মঞ্চ। ২৪ তম পার্টি কংগ্রেসের আয়োজন করার জন্য মাদুরাই শহরকে বেছে নেওয়া হয়। সুপ্রাচীন তামিল সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে সুবাসিত এ শহর নিজের অতীত ঐতিহ্যের সাথে আট দশকের শ্রমিক শ্রেণী ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসকেও নিজের সাথে জড়িয়ে রেখেছে।

এই সম্মেলনের মঞ্চ থেকে কমরেড পি রামমূর্তি, কে টি কে থাঙ্গামণি, এন শংকরাইয়া এবং কমরেড কে পি জানকী আম্মাল’র ন্যায় অসাধারণ নেতৃত্বদের স্মরণ করছি। তামিলনাড়ু সহ মাদুরাই’তে কমিউনিস্ট পার্টির সাংগঠনিক উন্নতিসাধনে এরা প্রত্যেকেই বিশেষ অবদান রেখেছেন।

মাদুরাই থেকে একাধিক বিশিষ্ট কমিউনিস্ট দেশের সাংসদ ও বিধায়ক হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন। এখনও পর্যন্ত ছজন কমিউনিস্ট সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন, কে টি কে থাঙ্গামণি (১৯৫৭), পি রামামূর্তি (১৯৫৭), পি মোহন (১৯৯৯ ও ২০০৪) এবং বর্তমানে সি ভেঙ্কটেশান (২০১৯ ও ২০২৪)। ১৯৪০ সালে মাদুরাইতে প্রথম কমিউনিস্ট ইউনিট প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই থেকে পার্টি ও গন-আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য একের পর এক প্রজন্মের কমিউনিস্টরা শ্রমিক, কৃষক ও খেত মজুরদের সংগঠিত করার কাজ করেছেন। সেই সমস্ত পুরুষ এবং মহিলা কমিউনিস্টদের যাবতীয় অবদানকে আমরা স্মরণ করছি। এই উপলক্ষে আমরা এ শহরে পার্টির পৌর প্রতিনিধি কমরেড লীলা ডি’র স্মৃতির প্রতিও শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। ১৯৯৭ সালে জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষার লড়াইতে কমরেড লীলা স্থানীয় অপরাধী গোষ্ঠীর আক্রমণে নিহত হন।

এবারের পার্টি কংগ্রেস আমাদের জন্য এক আবেগঘন মুহূর্তে আয়োজিত হচ্ছে। পার্টির সাধারণ সম্পাদক, কমরেড সীতারাম ইয়েচুরি, যাঁর নেতৃত্বেই এবারের পার্টি কংগ্রেসের প্রস্তুতি শুরু হয়, তিনি আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। এমন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে পার্টির পলিটব্যুরো ও কেন্দ্রীয় কমিটি ঐক্যবদ্ধ হয়েই ২৪ তম কংগ্রেস আয়োজনের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করেছে। মার্কসবাদী তত্ত্ব ও তার অনুশীলন প্রসঙ্গে কমরেড সীতারাম ইয়েচুরির বিশেষ অবদানকে আমরা স্মরণ করছি ও মর্যাদা জানাচ্ছি।

কমরেডস ও বন্ধুগণ,

পার্টি কংগ্রেসের প্রধান কর্তব্য পার্টির রাজনৈতিক-রণকৌশলগত লাইন নির্ধারণ, যা আগামীদিনে পার্টির রাজনৈতিক কর্মসূচির দিশাকে সুনিশ্চিত করবে। এ কাজে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির মর্মবস্তুকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে হয়। দেশের সরকার ও শাসক দলের শ্রেণীচরিত্র এবং আজকের পরিস্থিতিতে বিদ্যমান শ্রেণী শক্তির ভারসাম্যকে যথাযথরূপে চিনতে হয়। এই বিশ্লেষণ কখনো কখনো জটিল চেহারা নিতে পারে। কিন্তু আজকের পরিস্থিতিতে সে কাজ সম্পন্ন করা তুলনামূলকভাবে সহজ বলা চলে।

তিনটি প্রশ্নেই আজকের পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে-

১) কে বা কারা নিজেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বন্ধু হিসাবে দাবী করছে?

২) গৌতম আদানি ও মুকেশ আম্বানির ঘনিষ্ঠ মিত্র কে বা কারা?

৩) আর এস এস’র প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শনে কার বা কাদের নাম সবার আগে বিবেচিত হয়?

উপরের তিনটি প্রশ্নেরই উত্তর এক, নরেন্দ্র মোদী এবং বিজেপি।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তার সরকার হিন্দুত্ব-কর্পোরেট আঁতাতেরই প্রতিনিধি। এই বন্দোবস্ত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে। এটিই বিজেপি-আরএসএস’র সঙ্গে হিন্দুত্ব-কর্পোরেট আঁতাতের যোগসূত্র। এহেন আঁতাতের বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে হবে, একে পরাস্থ করা একান্ত প্রয়োজন। আগামী রাজনৈতিক কর্তব্য হিসাবে এমন এক সহজ উপসংহারে পৌঁছানোর পরে আরও একটি জটিল প্রশ্ন সামনে আসে। বিজেপি-আরএসএস জোটের বিরুদ্ধে কার্যকরী লড়াই চালিয়ে জনসাধারণের থেকে তাদের পৃথক করা যায় কিভাবে? ক্রমবর্ধমান দক্ষিণপন্থী ঝোঁক থেকে দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যকে কিভাবে বদলে দেওয়া যায়? মার্কসবাদী হিসাবে আমরা জানি আজকের ভারতে হিন্দুত্বের বাহিনীর যে রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম হয়েছে তা কেবলমাত্র নির্বাচনী কৌশলে অর্জিত হয়নি। হিন্দুত্বের বাহিনী এমন এক আধিপত্য কায়েম করেছে যা মতাদর্শগত, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রগুলি তাদের প্রভাবকে বাড়িয়েছে। এ এমন এক আধিপত্য যাকে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সংবিধানের উপর স্বৈরতান্ত্রিক আক্রমণ মারফৎ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই কংগ্রেসে রাজনৈতিক-রণকৌশলগত দিশা নির্ধারণ করার সময় বিজেপি-আরএসএস এবং হিন্দুত্বের বাহিনীর বিরুদ্ধে এক বহুমুখী সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তাকে মাথায় রাখা উচিত। জনসাধারণের রুটি-রুজি রক্ষার লড়াইয়ের পাশাপাশি নয়া-উদারনীতি নির্দেশিত আক্রমণসমূহের বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টি ও বামপন্থীরা বহুবিধ সংগ্রাম করে চলেছেন। এসকল সংগ্রামে যারা অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীল এবং বিভাজন সৃষ্টিকারী হিন্দুত্ব সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রচার চালানো হলে তবেই তারা রাজনৈতিক ভাবে সচেতন হবেন। এই উদ্দেশ্য সাধনে হিন্দুত্বের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও নয়া উদারনীতিসমূহের বিরুদ্ধে যাবতীয় সংগ্রামকে একত্রিত করতে হবে। এই মুহূর্তে, আমরা যখন বিজেপি’র বিরুদ্ধে যাবতীয় ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির বৃহত্তম ঐক্য গড়ে তোলার জন্য লড়াই করছি, তখন মনে রাখতে হবে যে বামপন্থীই একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি, যারা হিন্দুত্ব ও সংখ্যাগরিষ্ঠ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় এবং আপসহীন সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম। কারণ ঐ কাজ করার পাশাপাশি একমাত্র আমরাই নয়া-উদারনীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নিয়ে চলেছি।

তৃতীয় বার নির্বাচিত হয়ে আসা মোদী সরকার আরএসএস-চালিত হিন্দুত্বের কর্মসূচির সাথে নয়া উদারনৈতিক নীতিসমূহ ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনকে আক্রমণাত্মক কায়দায় এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায়, তাদের আচরণে নয়া-ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পাচ্ছে। আরএসএস’র ফ্যাসিবাদী কর্মসূচিকে বাস্তবায়িত করার জন্যই মুসলমান সংখ্যালঘু জনসাধারণকে সর্বদা আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হিসাবে সামনে রাখতে হয়। হিন্দুত্বের সংগঠনসমূহের মাধ্যমে পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়ানোর মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের নিপীড়ন করা হচ্ছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় সেই ঘটনা কার্যকর হচ্ছে। মুসলমান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অবিরাম হিংসা ও ভীতিপ্রদর্শন করার বন্দোবস্তটি একদিকে জনসাধারণের মধ্যে এক স্থায়ী সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে কায়েম করার কৌশল এবং আরেকদিকে হিন্দুত্বের সার্বিক পরিচিতিকে সংহত করার পরিকল্পনা।

মোদী সরকার এখন লুটেরা পুঁজিবাদ (ক্রোনি ক্যাপিটালিজম)-র প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছে। জাতীয় অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রগুলিকে বেসরকারিকরণের লক্ষ্যে এগোনোর পাশাপাশি বৃহৎ একচেটিয়া সংস্থাগুলিকে সর্বোচ্চ মুনাফার লুটের সুযোগ করে দিতে তারা নিত্যনতুন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রও সাজিয়ে দিতে চায়। এর ফলস্বরূপ আমরা দেশের জনজীবনে এক নজিরবিহীন আর্থিক অসাম্য দেখতে পাচ্ছি। এ এক এমন পরিস্থিতি যেখানে দেশের ৪০ শতাংশ সম্পদ দখলে রেখেছে মোট জনসংখ্যার শীর্ষ এক শতাংশ ধনীগোষ্ঠী। যুবসমাজে বেকারির হার বেশ চড়া; চুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে শ্রমিকের উপরে শোষণ বেড়েছে এবং শিল্পখাতে উৎপাদনের সময় মোট যুক্তমূল্য (নেট ভ্যালু অ্যাডেড)-র পরিমাণে মজুরির অংশ অনেকটাই কমে গেছে। কৃষক ও খেত মজুরদের অবস্থা আগের চাইতে আরও খারাপ হয়েছে, কৃষিক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান সঙ্কটের কারণেই এমনটা ঘটেছে।

এমন পরিস্থিতির কারনে আগামীদিনে দেশজুড়ে শ্রেণীসংগ্রাম এবং গণআন্দোলন তীব্রতর হবে। এ সকল আন্দোলন-সংগ্রামকে সঠিক রাজনৈতিক দিশা দেওয়ার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।

দেশের সরকার নয়া চার শ্রম-কোড বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে, এতে শ্রমিকদের অধিকার আরও বেশি সংকুচিত হবে। শ্রমিক স্বার্থবিরোধী যাবতীয় আইনসমূহের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। আগামী মে মাসের ২০ তারিখে কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নসমূহের পক্ষে এক দিনের ধর্মঘটের আহ্বান জানানো হয়েছে। নয়া চার শ্রমকোড প্রত্যাহারের দাবিই এ লড়াইয়ের মূল কথা। বামপন্থী দলসমূহ, শ্রেণী ও গণসংগঠনগুলি এই ধর্মঘটকে সফল করতে সক্রিয় হবে।

লোকসভায় বিজেপি নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে, সংসদের দুটি কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাও তাদের নেই। তা স্বত্বেও ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং সংবিধানকে বদলে দিতে মোদী সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক প্রচেষ্টা থামেনি। লোকসভা ও বিধানসভার নির্বাচন একসাথে করার জন্য সংবিধান সংশোধনী বিল আসলে ভারতের সাধারণতান্ত্রিক কাঠামো ও রাজ্যসমূহের অধিকারগুলির উপর সরাসরি আক্রমণ। সংসদের এক্তিয়ারকে সংকুচিত করা, উচ্চ আদালতকে দুর্বল করা এবং নির্বাচন কমিশনের স্বশাসিত অবস্থানকে ক্ষুণ্ণ করার মতো পদক্ষেপ এখনও অব্যাহত রয়েছে।

বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বকে দমন করতে এখনও ইউএপিএ এবং পিএমএলএ'র মতো দানবীয় আইনসমূহ ব্যবহৃত হচ্ছে। স্বাধীন ভারতে এই প্রথম দুজন নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীকে দুর্নীতির কাল্পনিক অভিযোগের ভিত্তিতে জেলে পাঠানো হয়েছে। একদিকে স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব আরেকদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীভূত প্রচেষ্টা এদুয়ের সাহায্যে দেশের সাধারণতান্ত্রিক কাঠামো ও রাজ্যগুলির অধিকারকে সরাসরি পিষে দেওয়া চলছে। বিজেপি বিরোধী দল যে রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে সেখানেই রাজ্য সরকারের প্রাপ্য আর্থিক তহবিল বরাদ্দে সরাসরি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে।

ভারতীয় সমাজের মূল কাঠামো হিসাবে বিজেপি-আরএসএস জাতিভিত্তিক বিভাজনকেই তুলে ধরতে চায়। ঐ বিভাজনকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যেই তারা বিভিন্ন উপজাতি ভিত্তিক পরিচিতিকে কৌশল হিসাবে ব্যবহার করে। জনসাধারণের মধ্যে কার্যকর বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নিঃশব্দে মনুবাদী মূল্যবোধের প্রচার করা হচ্ছে। মনুবাদ এমনই এক পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা যাতে মহিলা, দলিত ও অধিবাসীদের অধিকার সরাসরি আক্রান্ত হয়। মনুবাদ বিরোধী লড়াই হিন্দুত্বের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কিভাবে সিপিআই(এম)-র স্বাধীন শক্তি বৃদ্ধি করা যাবে এটিই পার্টি কংগ্রেসের মূল আলোচ্য বিষয়। সারা দেশেই বিভিন্ন এলাকায় শ্রেণীসংগ্রাম ও গণআন্দোলনের নিরিখে স্থানীয় স্তরে লড়াই-আন্দোলন শুরু করতে হবে, এ কাজে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। একেবারে বুনিয়াদী স্তর থেকে পার্টিকে গড়ে তোলার সঙ্গেই পার্টি সংগঠনের কার্যক্রমকে সার্বিক অর্থে সক্রিয় করে তুলতে হবে।

কেন্দ্রীয় সরকারের জনগণবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে কেরালাযর এলডিএফ সরকার সর্বাগ্রে অবস্থান নিয়েছে। এলডিএফ সরকার বিকল্প নীতিসমূহের বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছে বলেই তারা কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে বৈরিতা এবং বৈষম্যের শিকার। সাধারণতান্ত্রিক ও রাজ্যের অধিকার সুরক্ষিত রাখতে এলডিএফ সরকার সহ কেরালার জনসাধারণের সংগ্রাম সারা দেশের সাধারণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে মূল লড়াইয়েরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কমরেডস ও বন্ধুগণ,

আমেরিকার রাষ্ট্রপতি পদে দ্বিতীয়বার ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দেয়। এক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী বিস্তার আরও বেশি নগ্ন রূপে নিজেকে তুলে ধরছে। বিভিন্ন অঞ্চলকে দখল করা এমনকি ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সম্পদ অবধি শোষণ করাই আজকের পরিস্থিতিতে দস্তুর হয়ে উঠেছে। গাজা থেকে প্যালেস্তিনিয়দের নিশ্চিহ্ন করার জন্য ট্রাম্প নেতানিয়াহুর পরিকল্পনাকে সমর্থন জানাচ্ছেন। গ্লোবাল সাউথের একাধিক দেশের বিরুদ্ধেো তিনি আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এসব সত্ত্বেও, প্রধানমন্ত্রী মোদী এখনও একান্ত বাধ্য হিসাবেই ট্রাম্পের প্রতি তার নিজের আনুগত্য ঘোষণা করছেন।

আমাদের দেশের উপরে এমন রাজনীতির গভীর প্রভাব পড়বে। ইতিমধ্যে শুল্কের উপর নির্ধারিত সুদ, শক্তি সরবরাহ সংক্রান্ত ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভারত নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়েছে। এই পরিস্থতিতে মোদী সরকার এবং আমেরিকার সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতার বিরুদ্ধে লড়াইতে একটি নতুন ফ্রন্ট গড়ে উঠছে। ভারতের সার্বভৌম স্বার্থের যেকোনও ক্ষতি হওয়ার বিরুদ্ধে সিপিআই(এম) সহ বামপন্থীরা সকলের সামনে এসে দাঁড়াবে। এ লড়াইতে যেমন আমাদের এগোতে হবে, সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ও বিজেপি শাসকদের দাসত্বমূলক মনোভাবের বিরুদ্ধে দেশের জনসাধারণকেও ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।

ট্রাম্পের অধীনে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক যুদ্ধ, রাজনৈতিক ও সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নতুন আক্রমণ শুরু করতে চলেছে। সিপিআই(এম) এবং বামপন্থীদের জন্য এ এক গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সক্রিয় সংগ্রাম গড়ে তোলার সঙ্গে মোদী সরকারের সাম্রাজ্যবাদ-পন্থী নীতিসমূহের মুখোশও খুলে দিতে হবে।

ইজরায়েলের বর্বর জায়নবাদী শাসক গত ১৭ মাস যাবত গাজায় যেভাবে গণহত্যা চালিয়েছে তার বিরুদ্ধে আমরা পার্টি কংগ্রেসের এই মঞ্চ থেকে প্যালেস্তাইনের জনগণের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ও সার্বিক সংহতি প্রকাশ করছি। প্যালেস্তিনীয় জনসাধারণের সংগ্রামের প্রতি লজ্জাজনক বিশ্বাসঘাতকতা এবং ইজরায়েলের প্রতি মোদী সরকারের অন্ধ সমর্থনকে আমরা তীব্র নিন্দা করছি।

কিউবার বীর জনসাধারণ ও কিউবার সরকারের প্রতিও আমরা শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করছি। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তরফে চাপিয়ে দেওয়া অমানবিক অর্থনৈতিক অবরোধের বিরুদ্ধে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তারা সাহসিকতার সাথে লড়াই করছেন। সমাজতান্ত্রিক কিউবার প্রতি আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।

কমরেডস ও বন্ধুগণ,

বামপন্থীদের ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করা ও বাম রাজনীতির আরও প্রভাব বৃদ্ধির জন্য এটাই সঠিক সময়। নয়া-উদারনৈতিক পুঁজিবাদের বিরোধীতায় ও শ্রমিক জনগণের স্বার্থ দৃঢ়ভাবে রক্ষা করার পথে বামপন্থীরাই একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি যারা নিরবিচ্ছিন্নরূপে সক্রিয় রয়েছে। হিন্দুত্ববাদী নয়া-ফ্যাসিবাদকে মোকাবিলা ও প্রতিহত করতে জরুরী মতাদর্শগত সামর্থ্য ও দায়বদ্ধতা রয়েছে বামপন্থীদেরই। বামপন্থীরাই একমাত্র শক্তি যারা আমাদের দেশে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে পারে।

সমস্ত বামপন্থী শক্তিকে সাথে নিয়ে একটি বাম ও গণতান্ত্রিক বিকল্প গড়ে তোলার দিকে সিপিআই(এম) এগিয়ে যাবে।

সমস্ত গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলির হাতে হাত রেখে বিজেপি-আরএসএসের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে সফলভাবে পরিচালিত করতে এক সর্ববৃহৎ ঐক্য নির্মাণে সিপিআই(এম) নিজেদের দায়বদ্ধতাকে নতুন করে তুলে ধরবে।

মাদুরাই’তে আয়োজিত ২৪ তম পার্টি কংগ্রেসের মঞ্চ থেকে সুস্পষ্ট ও জোরালো আবেদন ব্যক্ত হোক- প্রতিক্রিয়াশীল অন্ধকার শক্তিকে পিছনে ঠেলে দিতে সমস্ত বাম, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি একত্রিত হোক! ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক এবং প্রগতিশীল মূল্যবোধে সম্পৃক্ত এক ‘নতুন ভারত’ গড়ে তোলার জন্য আসুন, আমরা সকলে একসাথে সক্রিয় হই।

জনগণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের দিকে আমাদের এগিয়ে যাওয়া অব্যাহত থাকুক।

২রা এপ্রিল, ২০২৫

সিপিআই(এম)-র ২৪ তম পার্টি কংগ্রেসের মঞ্চে উদ্বোধনী ভাষণ

ভাষান্তর- সৌভিক ঘোষ


শেয়ার করুন

উত্তর দিন