চৌকিদার থেকে বাস্তুঘুঘু -চন্দন দাস...

১৪ অক্টোবর ২০২২, শুক্রবার

দ্বিতীয় পর্ব

‘চোর’ অথবা ‘বাস্তুঘুঘু’, দুটি অংশই পঞ্চায়েত দখলে রাখার পক্ষপাতি। পুলিশ, প্রশাসন, দুষ্কৃতীদের সাহায্যে তারা পঞ্চায়েত দখল করতে চায়।

কারন দুটি। প্রথমত, পঞ্চায়েত দখলে থাকলে গ্রামে, মহকুমায়, জেলায় এবং রাজ্যে দাপট বজায় রাখা যাবে। মানুষকে দাবিয়ে রাখা যাবে। দ্বিতীয়ত, পঞ্চায়েত দখল মানে অবাধ লুটের সুযোগ।

‘চোর’ কারা — আমরা অনেকটাই চিনি জানি। তাদের রাজনৈতিক মদতের কথাই জানি। কিন্তু সমাজের নির্দিষ্ট শ্রেণীর স্বার্থ ‘চোর’দের পঞ্চায়েত দখলের কারন। তাই ‘বাস্তুঘুঘু’ কারা ছিল, তা একবার দেখে নেওয়া যাক।

১৮৭০ থেকে রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে স্বশাসিত সংস্থা আছে। অর্থাৎ ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম, সিপাহী বিদ্রোহের ১৩বছর পর শুরু হয় গ্রামে এমন সংস্থা তৈরি। তা ছিল ‘চৌকিদারী পঞ্চায়েত।’ তাদের মূলত কাজ ছিল গ্রামের আইন শৃঙ্খলার উপর নজর রাখা। ১৮৮৫-তে কংগ্রেসের জন্ম। সেই বছরই লর্ড রিপন গ্রামে এবং শহরে দুই পর্যায়ের স্বশাসিত সংস্থা তৈরি করেন। একটি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড। অপরটি ইউনিয়ন কমিটি।  ১৯১৯-এ সেই বড়সর সংশোধনী হয় সেই ব্যবস্থায়। তা চলে ১৯৫০ পর্যন্ত। কিন্তু যাই হোক না কেন, এই ব্যবস্থাগুলিতে বেশিরভাগ আসন পরোক্ষে নির্বাচনে ভর্তি করা হত। আর এদের উদ্দেশ্য ছিল কর সংগ্রহ এবং শাসকদের শাসন কায়েম রাখা।

অর্থাৎ ‘চৌকিদারী পঞ্চায়েত’ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত বজায় থাকা পঞ্চায়েতের মূল কাজ ছিল দেশের শাসকদের কর্তৃত্বের দেখভাল করা। তা সে সাম্রাজ্যবাদী শাসন হোক কিংবা জমিদার-বুর্জোয়া শাসন। প্রকৃতপক্ষে ১৯৭৮-র আগে ভারতে ‘জনগনের পঞ্চায়েত’ কখনও গড়েই ওঠেনি।

পঞ্চায়েত ছিল শ্রেণী শোষণের হাতিয়ার। ১৯৭৮-র পর পঞ্চায়েত হয়েছে শ্রেণী ভারসাম্য পরিবর্তনের হাতিয়ার।

কেমন?

সূর্য মিশ্রর একটি প্রবন্ধের কথা উল্লেখ করা যাক। ২০০২-এ ‘দ্য মার্কসিস্ট’-র এপ্রিল-জুন সংখ্যায় রাজ্যের তৎকালীন পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী, বর্তমানে সিপিআই(এম)-র পলিটব্যুরোর সদস্য সূর্য মিশ্র জানান যে, ১৮৯১-’৯২-এ অবিভক্ত বাংলায় ৩৮টি জেলা ছিল। তাতে ৭৯০জন ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড মেম্বার ছিলেন। তাদের মধ্যে ১৬৮জন ছিল এক্স অফিসিও সদস্য। ৩১৩জন সরকার দ্বারা মনোনীত। এবং মাত্র ৩০৯জন নির্বাচিত। সেই নির্বাচন ছিল গায়ের জোরে জোতদার, জমিদারদের ‘জয়’।

এই ৭৯০জন সদস্যর ৩০% ছিলেন জমিদার। ৩১% ছিলেন সরকারের আধিকারিক। ২৭% ছিলেন আইনজীবী।

লোকাল বোর্ডে হাল কেমন ছিল? সেখানে ১২৪৮জন সদস্য ছিলেন। তাদের মধ্যে সরকার মনোনীত ছিলেন ৭৩০জন। ৪০জন এক্স অফিসিও। এবং ৪৬৯জন ছিলেন নির্বাচিত — ওই একই ভাবে। এই ১২৪৮ জনের মধ্যে ৪৮% ছিলেন জমিদার কিংবা তাদের কর্মচারী, ১২% ছিলেন সরকারি অফিসার এবং ২৪% ছিলেন আইনপেশায় যুক্ত।

ব্রিটিশ আমলের পঞ্চায়েত কাদের স্বার্থে কাজ করত, কাদের দখলে ছিল এই তথ্যে স্পষ্ট।

স্বাধীনতার পরে অবস্থা বিশেষ বদলায়নি। ১৯৭৮-এই যোজনা কমিশন একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে — ফিফ্‌থ ইভ্যালুয়েশন রিপোর্ট। সেই রিপোর্টে দেশের পঞ্চায়েত ব্যবস্থার একটি সমীক্ষা প্রকাশ করা হয়। ১৪টি রাজ্যের ২৫টি ব্লকে এই সমীক্ষা করা হয়েছিল। দেখা যায়, পঞ্চায়েতের ৮৮.১% সদস্য এবং পঞ্চায়েতের ৯৫.৭% প্রেসিডেন্ট জমিদার পরিবারভুক্ত।

অর্থাৎ, গ্রামের ধনী, জোতদারদের কবলে ছিল পঞ্চায়েত।

এরাই পশ্চিমবঙ্গে ‘বাস্তুঘুঘু’। ১৯৭৮-এ মানুষ সরাসরি, নিশ্চিন্তে ভোট দিতে পেরেছিলেন। ‘বাস্তুঘুঘু’রা পরাজিত হয়েছিল। সেই নির্বাচনের আগেও পঞ্চায়েত নির্বাচন আটকাতে মামলা হয়েছিল হাইকোর্টে। কিন্তু হাইকোর্ট নির্বাচন আটকানোর আপিল খারিজ করে দিয়েছিল।

গ্রামবাসীদের মনোভাব কী ছিল?

হায়দরাবাদের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব রুরাল ডেভেলপমেন্টের একটি সমীক্ষক দল ১৯৭৮-র পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে একটি সমীক্ষা করে। তারা যাঁদের সঙ্গে রাজ্যে কথা বলেন ঘুরে ঘুরে, সেই মানুষের ৫৮% ১৯৭৭-র বিধানসভা নির্বাচনের থেকেও ১৯৭৮-র পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে বেশি উৎসাহী ছিলেন।

পঞ্চায়েতে কী বদল এসেছিল?  

ক্রমশ...............

পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ব্যবস্থার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক চন্দন দাসের এই প্রবন্ধটি ১২ টি পর্বে প্রকাশিত হবে।


শেয়ার করুন

উত্তর দিন