সর্বগ্রাসী ক্ষমতার লালসায় সিক্কার এপিঠ ওপিঠ ...জয়দীপ মুখার্জী

চুতর্থ পর্ব



তিন বছর আগে ২০১৮ -তে ত্রিপুরার নির্বাচনেও ডাবল ইঞ্জিনের কথা বলেছিল বিজেপি। ডাবল ইঞ্জিন মানে, কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার। তাহলেই নাকি উন্নয়নের রেলগাড়ি বিদ্যুৎ বেগে ছুটবে। আরএসএস-বিজেপি’র আইটি-সেল সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের তুফান তুলেছিল ডাবল ইঞ্জিনের।

ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে সমর্থন আদায়ে সেই প্রচার ভালোরকম ফল দিয়েছিল বিজেপি’কে। দ্বিতীয় দফা টানা আড়াই দশকের বামফ্রন্ট সরকার পরিবর্তনের তিন বছর কেটে গেছে কিন্তু ডাবল ইঞ্জিনের সেই রেলগাড়িটিকে এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। আড়াই দশক ধরে বামফ্রন্টের সরকার পরিচালনায় ত্রিপুরাতে উন্নয়নের যে প্রবহমান গতি তৈরি হয়েছিল সেটাই আচমকা স্তব্ধ হয়ে গেছে। উন্নয়ন মানে, খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের জীবন জীবিকার মানের উন্নয়ন। রাজ্যের কৃষি, শিল্প, পুলিশ-প্রশাসন, আইন-কানুন, অভ্যন্তরীন পরিকাঠামোর সার্বিক বিকাশ। গতিশীল কোনো বস্তু আকস্মিক স্তব্ধ হয়ে গেলে যেমন হয়, বিজেপি’র শাসনে ত্রিপুরায় ডাবল ইঞ্জিন উন্নয়নের রেলগাড়ির তেমনই বেলাইন দশা।
ভোটের আগে বিজেপি’র নেতারা সব মিলিয়ে ২৯৯ টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। যার গালভরা নাম ছিল, ‘ভিশন ডকুমেন্ট ফর ত্রিপুরা ২০১৮’। বামফ্রন্ট সরকার পরিবর্তনের ডাক দেওয়া শব্দবন্ধ, ‘চলো পাল্টাই’। সেই জুমলা প্রচারের কেন্দ্রে ছিল প্রত্যেক পরিবার পিছু অন্তত একজনের চাকরি। রাজ্যের প্রায় ৬০ হাজার শুন্যপদে একবছরের মধ্যে ৫০ হাজার কর্মী নিয়োগ। প্রথম তিন বছরের মধ্যে ৭ লক্ষ বেকারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। আর পাঁচ বছরে সাড়ে ১২ লক্ষ চাকরি। সেও নাকি হবে মোবাইল ফোনের মিস্‌ড কল -এ। বাজারে ভাসিয়েও দেওয়া হয়েছিল একটি নম্বর, ‘৮৮৮২২৭১৯৫৫’। ফেকু প্রতিশ্রুতি আরও ছিল। রাজ্য সরকারি ক্ষেত্রে সমস্ত অনিয়মিত ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীকে নিয়মিত করে দেওয়া হবে। এমজিএনরেগা’র কাজ বাড়িয়ে বছরে ২০০ দিন এবং ৩৪০ টাকা দৈনিক মজুরি। মন্ত্রিসভার প্রথম ক্যাবিনেট থেকেই সরকারি কর্মচারিদের জন্য সপ্তম বেতন কমিশন মঞ্জুর করা হবে। কর্মচারিদের বকেয়া মহার্ঘ্যভাতা মিটিয়ে দেওয়া হবে। এ রকম অজস্র প্রতিশ্রুতির বন্যা। এবার দেখে নেওয়া যাক ফলাফল। বিজেপি-আইপিএফটি সরকারের তিন বছরে ত্রিপুরার মানুষের প্রাপ্তি ক্রমবর্ধমান দারিদ্র, ক্ষুধা, বেকারি, সরকারি ক্ষেত্রে কর্মী সঙ্কোচন, ছাঁটাই, এমজিএনরেগায় কর্মদিবস হ্রাস, শাসক দলের স্থানীয় মাতব্বরদের কমিশন, জুলুমবাজি, চুরি, ডাকাতি, নারী নির্যাতনের ঘটনা, আত্মহত্যা এবং সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরলে সংবাদ মাধ্যমের কর্মীদের চোখ রাঙ্গানি ও নিপীড়ন। বিজেপি শাসিত দেশের অন্য রাজ্যগুলির একেবারে অভ্রান্ত অনুকরন। পদে পদে মিল এরাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের সঙ্গেও।

বিজেপি জোট সরকারের আমলে ত্রিপুরায় বেকারত্বের হার তো কমেইনি বরং জাতীয় হারের প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এনএসও -এর পিরিয়োডিক লেবার ফোর্স সার্ভে রিপোর্ট,২০১৯ জানাচ্ছে, ত্রিপুরায় বেকারত্বের হার ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি’র রিপোর্ট লকডাউনের পর বেকারত্বের হার ১৮.১ শতাংশে পৌছে গেছে। তিন বছর আগে বামফ্রন্টের সময়ে যা ছিল ৬.৮ শতাংশের কাছে। বছরে ৫০ হাজার সরকারি কর্ম সংস্থান হয়নি। বরং, চাকরিচ্যুত হয়েছেন ১০,৩২৩ জন শিক্ষক। বামফ্রন্ট আমলে সৃষ্ট ১৩,০০০ অশিক্ষক পদ পুরোপুরি বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। জাইকা প্রকল্পের ৬০০ কর্মীসহ বিভিন্ন সমবায়ে কর্মরত কয়েক হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করে দেওয়া হয়েছে। রাজস্ব দপ্তরের ৫৩১ টি পদসহ রাজ্য সরকারের ৩,৬৩৪ টি পদের অবলুপ্তি ঘটানো হয়েছে। আটটি জেলার ব্লক ও মহকুমা স্তরে ৬১ টি সরকারি তথ্য কেন্দ্র পাকাপাকি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানকার কর্মীদেরও চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসৃত করা হয়েছে।


বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ৯৬১ টি সরকারি স্কুল। ৮৪০ টি সরকারি স্কুলকে বেসরকারি মালিকানায় তুলে দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। যার প্রায় সিংহ ভাগই আরএসএস চালিত এনজিও’গুলির পরিচালন বোর্ডের হাতে যাওয়ার প্রস্তুতি পাকা। গত তিন বছরে সরকারি নিয়োগ সাকুল্যে ৪-৫ হাজার। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ বন্ধ। মিস্‌ড কলের নম্বরে ফোন করলে খালি বিজ্ঞাপন শোনা যায়। পিএসসি -এর ৮-৯ টি নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। ‘প্রতি ঘরে রোজগার, ঘরে ঘরে মোদী সরকার’ ছিল ভোটের আগে বিপ্লব দেবের শ্লোগান। মুখ্যমন্ত্রীর কুরসিতে বসে বেমালুম অন্য কথা তাঁর মুখে। এখন তিনি বেকার যুবকদের পান-বিড়ির দোকান, গরু প্রতিপালনের উপদেশ দিচ্ছেন। উত্তরপ্রদেশে বিজেপি’র আদিত্যনাথ যোগী অথবা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী যেমনটা হামেশাই বলে থাকেন। বামফ্রন্ট আমলে অনিয়মিত সরকারি কর্মীদের পাঁচবছর পর থেকে নিয়মিত কর্মীদের সমহারে বেতনক্রম চালু করা হতো। ডাবল ইঞ্জিনের সরকার বেতন তো বাড়ায়নি বরং, মিডডে মিল, অঙ্গনওয়াড়ি, বনবিভাগ, কৃষি দপ্তরের অনিয়মিত কর্মীদের ছাঁটাই শুরু করে দিয়েছে। এমজিএনরেগায় বামফ্রন্টের সময় ত্রিপুরা ছিল দেশের মধ্যে প্রথম স্থানে। গড়ে ৯৩-৯৪ দিন কাজ পেতেন সেরাজ্যের মানুষ। মজুরির টাকা পেতে কাউকে এক পয়সা কমিশন দিতে হয়নি। গত তিন বছরে গড় কাজের দিন কমে ৩০-৩৫ দিনে নেমে গেছে। মজুরির টাকা পেতে কমিশন দিতে হয় শাসক দলের স্থানীয় মাতব্বরদের

সপ্তম বেতন কমিশন নিয়ে সরকারি কর্মচারিদের বিরাট ভাঁওতা দিয়েছে বিজেপি। সপ্তম বেতন কমিশনের দেওয়া ফিক্সেশনের (২.৫৭), সিংহ ভাগ (২.২৫) বাম আমলেই পেয়েছিলেন সরকারি কর্মচারিরা। বামফ্রন্টের ঘোষনা ছিল নতুন সরকার হলে ফিক্সেশনের বাকিটুকু এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সপ্তম পে কমিশনের সমস্ত সুযোগ সুবিধাও চালু করে দেওয়া হবে। ২০১৬ কে ভিত্তি ধরে এরিয়ারের টাকাও মিটিয়ে দেওয়া হবে। বিজেপি সরকার শুধুমাত্র ফিক্সেশনের বকেয়া অংশটুকু (০.৩২) দিয়েই হাত গুটিয়ে নিয়েছে। এরিয়ার, কেন্দ্রের পে কমিশনে উল্লখিত অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পুরোটাই বাতিলের খাতায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ত্রিপুরায় রাজ্য সরকারি কর্মচারিদের অবসরের বয়স সীমা ৬০ বছর হলেও, ৫০ -এর পর থেকে ফি-বছর সুস্থতার (মেডিক্যাল) সার্টিফিকেট জমা করার নিয়ম চালু হয়েছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই চালু করে দিয়েছে জাতীয় পেনশন প্রকল্প, অর্থাৎ কন্ট্রিবিউটারি পেনশন স্কিম। অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের জীবন এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

আইন শৃঙ্খলার অবনতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, নারী নির্যাতন এ ধরনের অপরাধ একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল বামফ্রন্টের সময়ে। গত তিন বছরে এ সব লাগামছাড়া বেড়েছে। উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলোর মধ্যে আত্মহত্যা, নারী নির্যাতনের ঘটনায় ত্রিপুরা প্রথমসারিতে পৌঁছে গেছে।

শুধু সরকারি পরিষেবাকে লাটে তুলে দিয়ে বেসরকারি ক্ষেত্রের অবাধ লুটের বন্দোবস্ত করাই নয়, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরএসএস-বিজেপি’র চরম দক্ষিণপন্থী স্বৈরাচারি চেহারাটাও ক্রমশ পরিস্কার হয়ে উঠেছে। ফ্যাসিস্ত রাষ্ট্র ব্যবস্থার অনুসারি আরএসএস-বিজেপি’র অভিধানে গণতান্ত্রিক অধিকার বোধের কোনো ঠাঁই নেই। অতএব, সরকারের নীতির কোনরকম বিরোধিতা বরদাস্ত নয়, বিরোধী দলের রাজনৈতিক মিছিল-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা, রাজ্য জুড়ে একটা দমবন্ধকর অঘোষিত জরুরি অবস্থা। ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের উপনির্বাচনে ৯৬ শতাংশ আসনেই বিরোধীদের মনোনয়ন পেশ করতে দেওয়া হয়নি। এখানেও পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জী সরকারের সঙ্গে হুবহু মিল। গায়ের জোরে ভোট লুঠ করে একের পর এক পঞ্চায়েতে ক্ষমতা দখল।

এরসঙ্গে সরকারের ছত্রছায়ায় সিপিআই(এম) তথা বামফ্রন্টের নেতাকর্মীদের ওপর বিজেপি কর্মীদের হিংসাত্মক আক্রমণ। তিন বছরে ফিরে এসেছে সন্ত্রাসের পরিবেশ, শহীদ হয়েছেন ২০ জন সিপিআই(এম) -এর নেতা ও কর্মী। ভয়ঙ্কর আক্রমণ প্রত্যক্ষ করতে গিয়ে হৃদরোগের কবলে প্রাণ হারিয়েছেন পার্টি পরিবারের আরও ১৫ জন সদস্য। বেপরোয়া আক্রমণে মারাত্মক জখম আড়াই হাজারেরও বেশি বামপন্থী কর্মী। এরমধ্যে অনেকে সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছেন। আক্রান্ত বামপন্থী পরিবারগুলির ২০৩ জন মহিলা সদস্য ভয়ানক শারীরিক নির্যাতন ও সম্মানহানির শিকার হয়েছেন। সাড়ে পাঁচশো পার্টি অফিস ও কার্যালয় ভাঙচুরের পর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সহস্রাধিক বামপন্থী পরিবারের বাড়ি ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আর্থিক ভাবে যাতে কোনোভাবে তাঁরা দাড়াতে না পারেন তারজন্য তাঁদের রুজির উৎস্যগুলি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ৪২৫ টি দোকান, ৫৪ টি পোলট্রি, ১৪ টি মাছ চাষের জলাশয়, ৫৬ টি রবার চাষের বাগান ছারখার করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে রাখ করে দেওয়া হয়েছে।

গণতান্ত্রিক পথে সরকারি কাজের প্রতিবাদ জানাতে গেলে জুটেছে তীব্র পুলিশী নির্যাতন। ১০ হাজারেরও বেশি চাকরিচ্যুত শিক্ষক প্রতিবাদ দেখাতে গিয়ে পুলিশের লাঠি, জলকামান, কাঁদানে গ্যাসের শিকার হয়েছেন। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বামপন্থী ছাত্র-যুব কর্মীরা আগরতলায় কেন্দ্রীয় সমাবেশ করতে চাইলে সরকার অনুমতি দেয়নি। প্রায় ২০ হাজার ছাত্র-যুব সেদিন শহরের বুকে মিছিল করেছেন। বিজেপি-আইপিএফটি সরকারের আক্রমণ যত বাড়ছে প্রতিবাদের মাত্রাও ততো জোরালো হচ্ছে। শুধু বামপন্থীরা নয়, কম শক্তি নিয়ে অন্যান্য গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি যেমন, কংগ্রেসও রাজ্য সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে সরব। একমাত্র নিরব তৃণমূল কংগ্রেস দল। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ২০১৮ -এর নির্বাচনের আগে ত্রিপুরা রাজ্য তৃণমুল কংগ্রেসের আস্ত দলটিই জার্সি পালটে বিজেপি দলটিকে তৈরি করতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু ত্রিপুরায় তৃণমূল কংগ্রেস দলের অফিস, কার্য্যালয়, কার্যনির্বাহীরা তো আছেন। এতদিনে আরএসএস-বিজেপি’র স্বৈরাচারি আক্রমণের বিরুদ্ধে সামান্য বিবৃতিটুকুও তারা দেননি।

এরপরও অনেকের ঐ দুই রাজনৈতিক শক্তির বোঝাপড়া বুঝতে অসুবিধা হয়। পশ্চিমবঙ্গের ভোটের আগে তাঁরাই ‘লেসার এভিল’ মানে, কম বিপজ্জনক শক্তিকে বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন।




শেয়ার করুন

উত্তর দিন