Party Congress History Part XI Cover

পার্টি কংগ্রেস – ইতিহাস থেকে আগামী (১১শ পর্ব)

পারমিতা ঘোষ চৌধুরী

ত্রয়োদশ পার্টি কংগ্রেস

২৭ ডিসেম্বর ১৯৮৮ থেকে ১ জানুয়ারি ১৯৮৯ (ত্রিবান্দ্রম)

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি

আমাদের কলকাতা পার্টি কংগ্রেসের পর গত তিন বছরে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে কতকগুলি অনুকূল পরিবর্তন দেখা গেছে- স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, শান্তি ও সমাজতন্ত্রের অনুকূলে পরিবর্তন। শান্তির জন্য যে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম সোভিয়েত ইউনিয়ন চালিয়েছে এবং অন্যান্য সমাজতন্ত্রী ও জোটনিরপেক্ষ দেশগুলি যা সমর্থন করেছে তা শান্তির পক্ষে আরও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে এবং সাম্রাজ্যবাদী দূরভিসন্ধিগুলির প্রতি বিরোধিতা বাড়িয়ে তুলেছে। এই সময়ে বেশ কয়েকটি দেশে গণ-সংগ্রামগুলি, আত্মত্যাগ, এই সমস্তই জনগণের অনুকূলে বিশ্বশক্তিসমূহের ভারসাম্যটিকে সরিয়ে আনতে সাহায্য করেছে। আধুনিকীকরণ ও অর্থনীতির অগ্রগতির জন্য সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলি, অব্যাহত বিপর্যয় ও সংকটগ্রস্ত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উপর সমাজতন্ত্রী ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।

পুঁজিবাদী অর্থনীতি

পুঁজিবাদী অর্থনীতি এখনও পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। সংকট থেকে পুনরুদ্ধারের যে প্রক্রিয়া ১৯৮৩ সালে শুরু হয়েছিল তা অনুমিত সময়ের চাইতে সেটা আরও দীর্ঘকালব্যাপী বলে প্রমাণিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভাণ্ডারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মি: ক্যামডেসাস-এর মতে: "গত অক্টোবরের বিপর্যয় সত্ত্বেও, শেয়ার বাজার স্বল্প হারে প্রসারিত হচ্ছে শিল্পোন্নত দেশগুলিতে এখন ঊর্ধ্বগতির ষষ্ঠ বছর চলেছে। এই সব দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার এই দশকের গোড়ার দুই অঙ্কের হার থেকে তিন শতাংশ নামিয়ে আনা হয়েছে। বিকাশমান দুনিয়ায়, মাথাপিছু প্রকৃত মোট অভ্যন্তরীণ উৎপন্ন, ১৯৮১-৮৩ সালে পিছিয়ে পড়ার পর বাড়তে শুরু করেছে। অনেক বছরের মধ্যে গত বছরই সর্বপ্রথম এইসব দেশে মোট রপ্তানি আয়, ঋণের তুলনায় দ্রুততর হারে বেড়েছিল।”

সমাজতন্ত্রী অর্থনীতি

পুঁজিবাদী বর্ধিত বেকারী সঙ্গে নিয়ে যেখানে হামাগুড়ি দিয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে চলেছে, সমাজতন্ত্রী দেশগুলিতে সেখানে কাজের অধিকারে গ্যারান্টি রয়েছে এবং বেকার সমস্যা নেই, আগামী বছরগুলিতে দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতির দিকে তারা তাকিয়ে রয়েছে। ১৯৮৬-৯০ সালের জাতীয় আয় বৃদ্ধির পরিকল্পনার গড়পড়তা উন্নয়ন হার থেকে পুঁজিবাদী ও সমাজতন্ত্রী দেশগুলির মধ্যে পার্থক্যটা দেখতে পাওয়া যায়।

তীক্ষ্ণতর দ্বন্দ্বসমূহ

কেন্দ্রীয় কমিটি ইতিমধ্যেই ১৯৮৮ সালের মে মাসের মতাদর্শগত দলিলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির বিশদ বিশ্লেষণ করেছে। সে দলিল পার্টিকে পথ প্রদর্শন করছে। আমাদের বিগত পার্টি কংগ্রেসের পরবর্তী বছরগুলিতেত বর্তমান কালের দ্বন্দ্বগুলি তীক্ষ্ণতর হতে দেখা যাচ্ছে। সে দ্বন্দ্বগুলি নিজেদের অনুকূলে সমাধানের জন্য সাম্রাজ্যবাদীদের চেষ্টাগুলি প্রায়ই জনগণের প্রতিরোধে ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতন্ত্রী দেশগুলির নীতির দরুন ব্যর্থ হচ্ছে। বিশ্বশক্তিসমূহের ভারসাম্যে একটা তাৎপর্যমূলক পরিবর্তন ঘটেছে। শান্তি, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের শক্তিগুলি এগিয়ে চলেছে ও শান্তির প্রতি চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলিতে শান্তির জন্য গণ-আন্দোলন এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে বিরামহীন সংগ্রাম এমন শক্তিগুলির জন্ম দিয়েছে যাকে সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস বা নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম। বিশ্বের সংগ্রামী মানুষ এখন সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় আরও বেশি সক্ষম। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও গণচীন, দুই বৃহত্তম সমাজতন্ত্রী দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান পারস্পরিক বোঝাপড়া শ্রমিকশ্রেণী ও প্রগতিশীল শক্তিগুলির আরও শক্তি বৃদ্ধি করেছে।

পুঁজিপতি ও শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে দ্বন্দ্ব

উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলিতে শ্রমিকশ্রেণী ও পুঁজিপতিশ্রেণীর মধ্যে দ্বন্দ্বটা তীব্রতর হচ্ছে, যদিও কিছু রাজনৈতিক দলের দ্বারা বিপথচালিত শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলন প্রায়শই ব্যাপক বিস্তারী ধর্মঘটের ধর্মঘটের রূপ নিলেও তা অর্থনৈতিক সংগ্রামের বাইরে যাচ্ছে না। প্রথমত, মন্দা এবং চড়তির সময় বেকারী বেড়েই চলেছে। শ্রমিকদের দম ফেলার কোনো অবকাশ নেই। উন্নত দেশগুলিতে তাদের ব্যবস্থার 'স্থিতিশীলতা ও ন্যায়বিচারের' কথা ঘোষণা করতে গিয়ে বেকারের সংখ্যা দাঁড়ায় কম করেও ৩ কোটি। বিপুল, সামরিক ব্যয়, সামরিক-শিল্পপতি জোটের প্রয়োজনের পদানত অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের উপর একচেটিয়া পুঁজির আধিপত্য ও দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনগুলির দ্বারা পুঁজিবাদের তীব্রতর সাধারণ সংকট এইসব দেশের শ্রমিকশ্রেণীর পক্ষে এক অভিশাপ হয়ে উঠেছে।

ব্রিটেনের থ্যাচার সরকার শ্রমিকদের অধিকার ও সুবিধাগুলির উপর একের পর এক আক্রমণ শুরু করেছে। রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীকে খর্ব করা হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারগুলি আক্রান্ত হচ্ছে, সংহতিমূলক ধর্মঘট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যে ট্রেড ইউনিয়নগুলি ওই বিধিনিষেধের গণ্ডী লঙ্ঘন করেছে তাদের উপর আর্থিক শাস্তির খঙ্গ ঝুলছে এবং শ্রমিকশ্রেণীর ধর্মঘট ও আন্দোলনে বলপ্রয়োগ ও হিংসার ব্যবহার বাড়ছে। শ্রমিকদের শায়েস্তা করার জন্য লক-আউট ও ক্লোজার ব্যবহার করা হচ্ছে। আর বেকারী বেড়ে চলেছে।

জাতীয় পরিস্থিতি

স্বাধীনতা লাভের পর প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা আমাদের বিগত পার্টি কংগ্রেসের পরবর্তী বছরগুলিতে দেখা গেছে। সে অস্থিরতা মেহনতী মানুষের সমস্ত অংশের উপর এক বিপুল দুঃখ-দুর্দশা চাপিয়ে দিয়েছে ও সারা দেশে স্বতঃস্ফূর্ত গণ-বিক্ষোভ ছড়িয়ে দিয়েছে। সে বিক্ষোভ প্রায়শ ভুল খাতে প্রবাহিত হলেও তার বাস্তব কারণগুলি সর্বত্র একই। বুর্জোয়া-ভূস্বামী সরকার ও বুর্জোয়া-ভূস্বামী ব্যবস্থার সঙ্গে একযোগে গ্রামীণ ও শহরের জনগণের সংঘাত সৃষ্টিকারী, একই সমে কৃষি ও শিল্প সংকটের এমন উদ্ভব ইতিপূর্বে আর কখনও দেখা যায়নি।

বিগত পার্টি কংগ্রেসের পরবর্তী পরিবর্তনসমূহ

পরিস্থিতির নতুন পরিবর্তনগুলি হলো এই : কলকাতা কংগ্রেসের সময়কার পরিস্থিতির তুলনায় শাসক দল এখন জনগণের কাছ থেকে আরও অনেক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে; লোকসভার সাম্প্রতিক উপ-নির্বাচনগুলিতে এবং ইতিপূর্বের বিধানসভার নির্বাচনগুলিতে ও ত্রিপুরায় নির্বাচনের মিথ্যাচার থেকে তা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। কুখ্যাত মানহানি বিলের বিরুদ্ধে গোটা সংবাদপত্র জগৎ ও সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলির ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের মধ্যে শাসকদলের সে বিচ্ছিন্নতার আরেক পরিমাপ মিলেছে। শাসকদল পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছে।

রাজীব সরকারের অনুসৃত নীতিগুলি স্বতঃস্ফূর্ত গণ-বিক্ষোভের বিস্ফোরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সে বিক্ষোভ অবশ্য এখনও ধর্মনিরপেক্ষ সর্বভারতীয় বিরোধী দলগুলির চারিদিকে সমবেত হবার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। যেখানে যেখানে সি পি আই (এম) ও বামপন্থী শক্তিগুলি উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানেই তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন ও প্রতিবাদ জানাতে বিরাট বিরাট শক্তিগুলিকে সমাবেশ করতে পেরেছে।

দেশের বাকি অংশে অধিকাংশস্থলেই এই বিক্ষোভ নেতৃত্বহীন এবং প্রায়শই প্রতিক্রিয়াশীলদের দ্বারা তা বিপথে চালিত হচ্ছে। কেরল হরিয়ানায় ও দক্ষিণের মাত্র তিনটি রাজ্যে- অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাডু ও কর্ণাটকে বিরোধী দলগুলিকে কেন্দ্র করে এই বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছে। কিন্তু ভারতের বেশিরভাগ অংশেই, সাম্প্রতিক উপ-নির্বাচনের ফলাফলগুলি সত্ত্বেও মানুষের এই অসন্তোষ এখনও বিরোধী দলগুলি কিংবা বামপন্থী দলগুলির চারিপাশে স্থিতিলাভ করেনি।

আরেকটি যে পরিবর্তন ঘটেছে, তা হলো সি পি আই (এম) এবং বামপন্থী শক্তিগুলির বর্ধিত শক্তি। এই বর্ধিত শক্তিই সি পি আই (এম) এবং অন্যান্য বামপন্থী শক্তিগুলিকে কতকটা পরিমাণে জাতীয় রাজনৈতিক ঘটনাবলীকে প্রভাবিত করতে, বিভেদপন্থী, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং সেই সঙ্গে কংগ্রেস (আই)-কে বিচ্ছিন্ন ও উৎখাত করার জন্য বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলির সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বোঝাপড়ার সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম করছ।

জনগণ ও শাসক দলের মধ্যে তীব্রতর দ্বন্ধ

অর্থনীতির সংকট

গত তিন বছর ধরে বহুজাতিক সংস্থাগুলিসহ বিদেশী সহযোগিতার চুক্তির সংখ্যা, বেসরকারী বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির কাছ থেকে একে ঋণ এবং বর্ধিত বিদেশী ঋণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে, আর তার ফলে ভারতীয় অর্থনীতি ক্রমেই আরো বেশি করে সাম্রাজ্যবাদী চাপের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

ভারতীয় অর্থনীতির পুঁজিবাদী পথের সংকটটা ভারতের জনগণের উপর অসহনীয় দুঃখ-দুর্দশা চাপিয়ে দিয়েছে। সে দুর্দশাটা হলো পুঁজিবাদী দেশগুলিতে ধনতন্ত্রে রূপান্তরণের ও পুঁজির প্রাথমিক পুঞ্জিকরণের কালের দুঃখ-দুর্দশার চাইতে আরো অনেক বেশি। সর্বশেষতম ঘটনাবলী বর্তমান ধাবমান অগ্রগতি যদি রুদ্ধ অথবা নিয়ন্ত্রিত না হয় তাহলে যে বিদেশী ঋণের ফাঁদের সম্ভাবনা প্রায় একরূপ সুনিশ্চিত করে তুলছে। ভারতের বিদেশী দেনা অভূতপূর্ব হারে বেড়ে চলছে।

সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলির গুরুতর বিপদ

হিন্দু হিন্দু ও মুসলমান, উভয় গোঁড়ামির শক্তিগুলির সঙ্গে আপসরফায় কংগ্রেস (আই)-র সুবিধাবাদ সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলির অভিসন্ধিকে এবং জনগণের উপর কুসংস্কারবাদের আধিপত্যকেই উৎসাহ দেয়। সতী-র প্রশ্নে রাজীব গান্ধীর সরকার একটা দুদিক রক্ষার অবস্থান নিয়েছে। এবং পুরীর শঙ্করাচার্যের মতো যারা সতী ও অস্পৃশ্যতা সমর্থন করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে অস্বীকার করছে। রাজস্থানের রাজ্য সরকার হরিজনদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করতে অস্বীকার করছে এবং হিন্দু গোঁড়ামির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আর মুসলিম নারীদের কুসংস্কারবাদী ধর্মীয় গোঁড়ামির দয়ার উপর ছেড়ে দিয়ে, শাহ্বানু মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় বাতিল করতে কেন্দ্রীয় সরকার মুসলমান গোঁড়ামির কাছে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করছে।

এরা এখন তাদের সুযোগ বিস্তৃত করার ও বামপন্থী শক্তিগুলিকে সরাসরি আঘাত করার চেষ্টা করছে। যে পশ্চিমবঙ্গে সি পি আই (এম) ও বামপন্থী শক্তিগুলি সাম্প্রদায়িক ঐক্য রক্ষায় ও সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াচ্ছে বাধা দেবার ক্ষেত্রে সফল হয়েছে, সেখানে তারা গোলযোগ সৃষ্টির জন্য প্রবল চেষ্টা করছে। মুসলিম লীগ বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও অন্যান্য হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি এখন পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক মনোভাব জাগিয়ে তুলতে অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠছে।

বাম ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের জন্য সংগ্রাম

স্বৈরতন্ত্রী সরকারকে পরাস্ত করতে, সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের বিচ্ছিন্ন করতে এবং অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য সাম্রাজ্যবাদীদের দুরভিসন্ধিমূলক কার্যকলাপ থেকে জাতীয় ঐক্য রক্ষা করতে সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল শক্তিগুলিকে সমবেত করার মহান প্রচেষ্টা হলো বাম ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গড়ে তোলার জন্য পার্টির সংগ্রামের এক অখণ্ড অংশ। আশু সংগ্রামে একটা মিলিত সাধারণ ফ্রন্ট গড়ে তোলার জন্য পার্টির ব্যাপকতর প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই পার্টি ও বামপন্থী শক্তিগুলি শক্তিসমূহের বর্তমান পারস্পরিক সম্পর্কটাকে বদলাতে পারবে, এবং বিকাশমান অসন্তোষের নেতৃত্বের স্থানে ক্রমশ নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। দেশের রাজনৈতিক শক্তিসমূহের সাতিশয় পুনর্বিন্যাস সাধনকেই, যে পুনর্বিন্যাসের ফলে বুর্জোয়া-ভূস্বামী জোটগুলি একমাত্র বিকল্প রূপে বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির একটা দেশব্যাপী ফ্রন্ট গড়ে উঠবে, জলন্ধর কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রস্তাবে পার্টির সর্বপ্রধান কর্তব্য বলে নির্দেশ করা হয়েছিল।

বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির আশু কাজের জন্য একটি যথোপযুক্ত কর্মসূচি রচনা করা প্রয়োজন। মূল দাবিগুলি প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে সে কর্মসূচিতে আশু আন্দোলন ও কাজের জন্যও কয়েকটি দাবি থাকা উচিত। এই উদ্দেশ্যে একটি কার্যকর কর্মসূচি অবশ্যই হবে নিম্নরূপ:

(১) স্বৈরতন্ত্রী প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে লড়াই গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি ও সেগুলির সম্প্রসারণ রক্ষা করা নিপীড়নমূলক আইনগুলির প্রত্যাহার।

(২) বামপন্থী সরকারগুলি রক্ষা কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের, পুনর্বিন্যাস- রাজ্যের হাতে অধিকতর ক্ষমতা।

(৩) রাজীব সরকারের অর্থনৈতিক নীতির বিরোধিতা, অর্থনীতির স্বাধীনতার জন্য লড়াই প্রযুক্তির উন্নতি সাধনের নামে চাকুরি নিধনের বিরুদ্ধে লড়াই।

(৪) অবিলম্বে চটকল ও বস্ত্রকল শিল্পের জাতীয়করণ, বন্ধ কলকারখানাগুলির অধিগ্রহণ ও জাতীয়করণ।

(৫) চড়া মূল্যস্তর, চড়া করের বোঝার বিরুদ্ধে এবং খাদ্যশস্যের রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের জন্য লড়াই।

(৬) ভূমিসংস্কারের রূপায়ণ এবং জমি বণ্টন মজুরি, জীবনধারণের অবস্থা ও সামাজিক কল্যাণ সম্পর্কে খেতমজুরদের অধিকারগুলি রক্ষার জন্য সামগ্রিক কেন্দ্রীয় আইন প্রণয়ন।

(৭) কর্মসংস্থানের সুযোগ, বেকারদের জন্য বেকার কল্যাণ প্রবর্তনের জরুরি ব্যবস্থা।

(৮) বিভেদপন্থী, পৃথকতাবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলির বিরুদ্ধে লড়াই।

(৯) নারীর বিরুদ্ধে বর্বর অত্যাচার ও অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই নারীর সমানাধিকার ও নারীর আইনগত ও সাংবিধানিক অধিকারগুলি বলবৎ করার জন্য লড়াই।

(১০) মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা এবং নয়া-শিক্ষানীতির ক্ষতিকর দিকগুলির বিরুদ্ধে লড়াই।

(১১) নির্বাচনী সংস্কার আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ১৮ বছরের ঊর্ধ্ব বয়স্কদের জন্য ভোটের অধিকার।

(১২) জোটনিরপেক্ষতা রক্ষা, বিশ্বশান্তি, গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য প্রতিবেশী দেশগুলির জনসাধারণের সংগ্রামে সমর্থন।

পার্টি কংগ্রেসে প্রতিনিধি হয়েছিলেন ৬৯১ জন।

৭০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয় কেন্দ্রীয় কমিটি, ১২ জনের পলিট ব্যুরো।

ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ পুনরায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

পলিটব্যুরো সদস্যরা হলেন : ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ, এম বাসবপুন্নাইয়া, নৃপেন চক্রবর্তী, জ্যোতি বসু, সরোজ মুখার্জী,  হরকিষান সিং সুরজিৎ, বি টি রণদিভে, সমর মুখার্জী, ই বালা নন্দন, ভি এস অচ্যুতানন্দন, এ নাল্লা শিবম, এল বি গঙ্গাধর রাও।

H K S Surjit & EMS Namboodiripad at the Party Congress Chennai in 1992

চতুর্দশ পার্টি কংগ্রেস

৩ - ৯ জানুয়ারি ১৯৯২ (মাদ্রাজ)

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি

ত্রয়োদশ কংগ্রেসের পরবর্তী সময়ে সমাজতন্ত্র, জাতীয় মক্তি ও শ্রমিক আন্দোলনের শক্তিগুলি এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সুকঠিন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে এবং তারও আগে পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ে আন্তর্জাতিক ভারসাম্য এখনকার মত সাম্রাজ্যবাদীদের দিকে ঝুঁকেছে। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে পুঁজিবাদের পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র উৎখাত অভিযান এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদীদের নয়া আক্রমণ। সমাজতান্ত্রিক দেশ ও কমিউনিস্ট পার্টি, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম এবং শান্তি ও গণতন্ত্রের শক্তিগুলির ক্ষেত্রে এর প্রতিক্রিয়া হবে খুবই গুরুতর। এরকমই একটা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে বিপ্লবী ও প্রগতিশীল শক্তিগুলিকে বর্তমান অসুবিধাগুলি অতিক্রম করার লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

ত্রয়োদশ কংগ্রেসের আগেই সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতে এবং অনেক কমিউনিস্ট পার্টিতে গুরুতর পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। কিন্তু তখন আমরা সেগুলির গভীর তাৎপর্য ঠিকমত বুঝে উঠতে পারিনি। ফলে, পরবর্তীকালের ঘটনাবলী আমাদের কাছে ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত।

ত্রয়োদশ কংগ্রেসের একবছরের মধ্যেই তৎকালীন সমাজতন্ত্র-ব্যবস্থায় গুরুতর বিপর্যয় ঘটে যায়। পূর্ব ইউরোপের একের পর এক দেশে- হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, চেকোস্লোভাকিয়া, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, আলবেনিয়া এবং গণতান্ত্রিক জার্মানিতে তুমুল ওলটপালটের পরিণতিতে দেখা দেয় পুঁজিবাদের পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়া। গণতান্ত্রিক জার্মানির ক্ষেত্রে এর ফলশ্রুতি ঘটে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনে দুই জার্মানির মিলন।

সোভিয়েত ইউনিয়নে পেরেস্ত্রৈকা ও গ্লাসনস্তের ছটি বছরে সমাজতন্ত্রের নবীকরণ ও শক্তি বৃদ্ধির নামে যেসব সংস্কার শুরু হয় সেগুলি সমাজতন্ত্রের ধ্বংসের পথই সুগম করে দেয়। ঐসব সংস্কার মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক দিক থেকে এমনভাবে পরিচালিত হয় যার ফলে মাথাচাড়া দেয় সমাজতন্ত্র-বিরোধী শক্তি। এটা পুঁজিবাদের প্রবক্তাদের পথ নিষ্কণ্টক করে এবং তাদের সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে দিতে সাম্রাজ্যবাদীদের সুবিধা করে দেয়।

১৯৯১ সালের আগস্ট মাসের ঘটনাবলী ছিল ঘনায়মান সমাজতন্ত্র-বিরোধিতার চূড়ান্ত পরিণতি। আগস্টের ঘটনাবলীর পর সমাজতন্ত্র-বিরোধী শক্তিগুলি প্রতিবিপ্লবী আক্রমণ শুরু করে। সি পি আই (এম) সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্র ব্যবস্থার এবং অক্টোবর বিপ্লবের ফসল সোভিয়েত সাধারণতন্ত্রগুলির ঐক্যের সমর্থনে নীতিনিষ্ঠ অবস্থান গ্রহণ করে।

কমিউনিস্ট পার্টিকে ভেঙে দেওয়া এবং অঙ্গ সাধারণতন্ত্রগুলির বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে যে বিরাট বিপর্যয় নেমে এসেছে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার গুরুতর এবং প্রতিকূল প্রভাব পড়বে। এতদিন জাতীয় মুক্তি আন্দোলনগুলি এবং প্রগতিশীল পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে তৃতীয় বিশ্বের এমন দেশগুলি সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে পারতো। আজকে আর সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে পাল্লা দেবার শক্তিগুলি আগেকার সেই অবস্থায় নেই।

গত চার বছর সোভিয়েত বিদেশনীতিতে 'নতুন ভাবনা' প্রকাশ পেয়েছে। এ যুগের দ্বন্দ্বগুলির সংশোধন এবং সাম্রাজ্যবাদ আর নেই এই বিশ্লেষণের ওপর প্রতিষ্ঠিত ঐ 'নতুন ভাবনা' বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনে। এর ফলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ দুনিয়াব্যাপী তাদের হুকুম চাপিয়ে দিতে নির্লজ্জ হস্তক্ষেপে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ইরাকের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলির যুদ্ধ ঘোষণা সাম্রাজ্যবাদীদের এই নবলব্ধ আক্রমণমুখী এবং উদ্ধত মনোভাবের নিদর্শন। মোজাম্বিক ও ইথিওপিয়াতে প্রতিক্রিয়াশীল পরিবর্তনের ধারা উল্টোমুখী হওয়া, প্রগতিশীল ও সাম্রাজ্যবাদমুখী শক্তিগুলির সঙ্গে আপসে যেতে অ্যাঙ্গোলাকে বাধ্য করা এবং আরব দেশগুলির মধ্যে অনৈক্য এসবই সোভিয়েত ইউনিয়নের এযাবৎকালের ভূমিকা পরিত্যাগের ফল। মৌলবাদী শক্তিগুলির অগ্রগতিতে আলজেরিয়ার বিপ্লব বিপন্ন। আরব শিবিরে অনৈক্য এবং উপসাগরীয় যুদ্ধে কয়েকটি প্রধান প্রধান আরব দেশের মার্কিন পক্ষে যোগদান প্যালেস্তাইনের মুক্তি আন্দোলনকে পিছনে ঠেলতে চাইছে। মার্কিন নেতৃত্বে প্যালেস্তিনীয় জনগণের একমাত্র প্রতিনিধি পি এল ও-কে পাশ কাটিয়েই আন্তর্জাতিক শান্তি আলোচনার মাধ্যমে প্যালেস্তাইন প্রশ্নের সমাধানের চেষ্টা চলছে। অধিকৃত আরবভূমি থেকে সরে যেতে অস্বীকার করে এবং ঐসব এলাকায় ইহুদি পুনর্বাসন দেবার মাধ্যমে ইজরায়েল এখনও আন্তর্জাতিক জনমতকে অগ্রাহ্য করে চলেছে। যুগোস্লাভিয়ার গৃহযুদ্ধে জার্মানি ও অস্ট্রিয়া স্লোভেনিয়া এবং ক্রোয়েশিয়ার বিচ্ছিন্ন হবার দাবিকে মদত দিচ্ছে।

১৯৮২ সালের পর প্রতিবছর সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ায় মোট প্রকৃত জাতীয় উৎপাদন (জি এন পি) বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু কখনোই তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী প্রথম পঁচিশ বছরে অর্জিত উচ্চহারকে স্পর্শ করতে পারে নি। বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংক্রান্ত রাষ্ট্রসঙ্ঘ কমিটির (অঙ্কটাড) ১৯৯১ সালের বার্ষিক রিপোর্টে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে বর্তমান বছর সহ এই নিয়ে তৃতীয় বছর বাণিজ্য বৃদ্ধির হার কমে যেতে পারে। সংক্ষেপে বলতে গেলে বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উন্নয়নের গতিবেগ ধারাবাহিকভাবেই শ্লথ থাকছে এবং পর্যায়ক্রমিক ওঠানামা করছে। এই সঙ্কটের মূল আঘাতটা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিকে বহন করতে হলেও উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলিও ব্যবস্থার সঙ্কটের ক্ষতি এড়াতে পারছে না।

সামাজিক দ্বন্দ্বগুলির প্রাসঙ্গিকতা

বিশ্ব পরিস্থিতিতে বড় বড় পরিবর্তন ঘটলেও আজকের যুগের দ্বন্দ্বগুলির প্রাসঙ্গিকতা লোপ পায়নি। সাম্রাজ্যবাদ বনাম সমাজতন্ত্রের কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্বটি বরং আগের তুলনায় আরও তীব্র হয়েছে। সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান আক্রমণের মধ্যেই তার প্রকাশ ঘটছে। সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইতে সাম্রাজ্যবাদ সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের পথে না গিয়ে বরং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলির সুযোগ নিতে অন্তর্ঘাতের পথে মনোনিবেশ করছে। বর্তমানে বেশ কয়েকটি সমাজতান্ত্রিক দেশ নিজেদের 'শান্তিপূর্ণ' রূপান্তর ঘটিয়ে পুনরায় বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে মিশে যাবার প্রয়াস চালাবার পরিপ্রেক্ষিতে সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষে সুবিধাজনক পরিস্থিতির উদ্ভবের মধ্যেও ঐ দ্বন্দ্বটি প্রতিফলিত হচ্ছে।

সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণের মুখে আমাদেরকে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির সঙ্গে, নিজেদের স্বাধীনতা ও সামাজিক রূপান্তর প্রক্রিয়া রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তৃতীয় বিশ্বের এমন দেশগুলির সঙ্গে, জাতীয় মুক্তি সংগ্রামগুলির সঙ্গে, পুঁজিবাদী দেশগুলিতে শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রামের সঙ্গে এবং বিশ্বশান্তির সমর্থক শক্তিগুলির সঙ্গে সংহতিকে আরও উন্নত করতে হবে। সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামে ভারতে সমস্ত অংশের মানুষকে সমবেত করার মধ্য দিয়ে সি পি আই (এম) তার আন্তর্জাতিক দায়িত্ব সম্পাদনে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে।

জাতীয় পরিস্থিতি

ত্রয়োদশ পার্টি কংগ্রেস লক্ষ্য করেছিল, 'স্বাধীনোত্তর অর্থনৈতিক' ব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা। এটা সমস্ত অংশের শ্রমজীবী মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে অপার দুর্দশা। সঞ্চার করেছে সারা দেশ জুড়ে স্বতঃস্ফূর্ত গণবিক্ষোভ। এই বিক্ষোভগুলি প্রায়শই ভ্রান্ত পথে প্রবাহিত হয়, যদিও তার পিছনের বাস্তব কারণগুলি সর্বত্রই এক।” ত্রয়োদশ কংগ্রেসের পরবর্তী' সময়টা প্রমাণ করেছে যে এই মূল্যায়ন সঠিক ছিল। বুর্জোয়া-জমিদার ব্যবস্থার সঙ্কটের কারণে রাজনৈতিক ব্যবস্থাতেও অস্থিতিশীলতা পরিব্যাপ্ত হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে বুর্জোয়া-জমিদার ব্যবস্থা আগে আর কখনও এত চাপের মুখে পড়েনি।)

বিগত কংগ্রেসের পরবর্তী তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন

স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পর পর দুটি সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশ প্রবেশ করেছে এক অস্থিতিশীল সময়ে। এটা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সর্বক্ষেত্রে বুর্জোয়া-জমিদার ব্যবস্থার সঙ্কটের তীব্রতা বৃদ্ধির প্রতিফলন। ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস (আই) ক্ষমতাচ্যুত হয়। বাইরে থেকে বামপন্থী দল ও বি জে পি-র সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল রাষ্ট্রীয় মোর্চা সরকার মাত্র এগারো মাস স্থায়ী হয়। এরপর ক্ষমতাসীন হয় কংগ্রেস (আই)-র মদতপুষ্ট দলত্যাগীদের সংখ্যালঘু সরকার যার আয়ু ছিল মাত্র ছয় মাস। ১৯৯১ সালের নির্বাচনেও কংগ্রেস (আই) সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। এটা কংগ্রেস (আই)-র সমর্থনৈর ভিত আরও ক্ষয়ে যাওয়ার প্রমাণ। পর পর দুটো নির্বাচন থেকেই এমন পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ একদলীয় সরকার সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন যাবৎ যে একদলীয় প্রাধান্য চলে আসছিল এটা তার থেকে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন সূচিত করল।

বিপজ্জনক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি

রাজীব গান্ধীর নির্বিচার উদারীকরণ নীতির কুফল ফলতে শুরু করেছে। দেশের বর্তমান অভূতপূর্ব বাণিজ্য ঘাটতির কারণ হল আমদানি উদার করা, বিদেশি পুঁজিতে ছাড় দেওয়া এবং বিশ্বব্যাঙ্ক-আই এম এফ-এর ফতোয়ার কাছে নতিস্বীকার। এগুলি এবং সার্বিক সঙ্কট অর্থনীতির বেসরকারিকরণ, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রকে তুলে দেওয়া, নির্বিচারে বিদেশি পুঁজির জন্য দ্বার খুলে দেওযা এবং একচেটিয়া মালিকানা বন্ধি নিয়ন্ত্রণের বিধিনিষেধগুলি বাতিল করার জন্য অধিকতর চাপ ডেকে আনছে।

ক্ষমতায় আসার চার সপ্তাহের মধ্যে নরসিমা রাও সরকারের গৃহীত অর্থনৈতিক নীতিগুলির ফলে দক্ষিণপন্থী ঝোঁক আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। টাকার ২০ শতাংশ মূল্য হ্রাস, নতুন বাণিজ্যনীতি, সোনা বন্ধক রাখা, কেন্দ্রীয় বাজেটের প্রস্তাবগুলি এবং নতুন শিল্পনীতি সব মিলিয়ে পঞ্চাশের দশকে প্রবর্তিত সীমিত স্বনির্ভরতার নীতি ও শিল্পনীতিকে বিপরীতমুখী করেছে। নয়া অর্থনৈতিক নীতির মধ্যে বেসরকারিকরণ, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র বিলোপ এবং "বিশ্ব অর্থনীতির অঙ্গীভূত'' হবার মত সাম্রাজ্যবাদ প্রবর্তিত প্রবলতর ঝোঁকগুলির প্রতিফলন ঘটছে। বুর্জোয়া, বুদ্ধিজীবী ও প্রচার মাধ্যমগুলির একাংশ এইসব দক্ষিণপন্থী নীতিগুলিকে সমর্থন করছে। রাষ্ট্রীয় মোর্চা সরকারের অর্থনৈতিক নীতিগুলি পূর্ববর্তী কংগ্রেস (আই) সরকারের নীতিগুলি থেকে ভিন্ন কিছু ছিল না। তাদের প্রস্তাবিত কিছু পদক্ষেপ ছিল অর্থনৈতিক উদারীকরণেরই ধারাবাহিক অনুসরণ। চন্দ্রশেখরের দলছুট সরকার আই এম এফ-এর ফতোয়া মেনে নিয়ে আরও একধাপ অগ্রসর হয়। আই এম এফ-এর শর্তগুলির কাছে নতিস্বীকারের নীতি নিয়ে পুরোদমে অগ্রসর হবার মধ্য দিয়ে কংগ্রেস (আই) ঐ প্রবণতাকেই নির্লজ্জভাবে আরও এগিয়ে নিয়ে গেছে।

বৈদেশিক নীতি

এ যাবত, বিগত বছরগুলিতে, সমস্ত সরকারই জোটনিরপেক্ষতার একটা মৌলিক নীতি অনুসরণ করে এসেছে এবং জাতীয় মুক্তি আন্দোলন ও বিশ্বশান্তির প্রশ্নে মূলত সঠিক অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ সঙ্কট মোকাবিলায় অনুসৃত অর্থনৈতিক নীতিগুলি বৈদেশিক নীতির মৌল ভাবনাগুলিকে বিপন্ন করছে। রাজীব শাসনে মার্কিন সহযোগিতায় প্রতিরক্ষা সামগ্রী উৎপাদনের কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলিকে ভারতীয় বিমানবন্দরে তেল ভরে নেবার অনুমতি দিয়ে চন্দ্রশেখরের সংখ্যালঘু সরকারের দুর্ভাগ্যজনক সিদ্ধান্ত বিদেশনীতির ক্ষেত্রে একটা গুরুতর পরিবর্তন সূচনা করে। এটাই ছিল প্রথম গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত যা জোটনিরপেক্ষ বৈদেশিক নীতিকে গুরুতরভাবে লঙ্ঘন করল।

জাতীয় ঐক্য গুরুতরভাবে বিপন্ন

কেন্দ্রের বুর্জোয়া-জমিদার সরকারগুলির নীতি সাম্রাজ্যবাদীদের মদতপুষ্ট এবং সীমান্তের ওপার থেকে সক্রিয় বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলির কাছ থেকে আসা জাতীয় ঐক্যের সামনে বিপদকে প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিচ্ছিন্নতার শিকড় সন্ধান এবং জনগণের মধ্যে দেশপ্রেমিক মনোভাব জাগিয়ে তোলার ও তাদের ন্যায়সঙ্গত দাবিগুলির মীমাংসা করার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় সরকার গত একদশক যাবৎ সমস্যাটাকে নিছক আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন হিসেবেই দেখে আসছে। এইভাবে আর চলতে দিলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাবে। সোভিয়েত ইউনিয়নে বিচ্ছিন্নতার প্রবণতা এবং সাবেক আকারে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তি ভারতের জাতি সমস্যার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে বাধ্য। সি পি আই (এম) বরাবরই জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে একটা ঐকমত্যের পক্ষে কেননা ঐ প্রশ্নটি ভারতের ভবিষ্যতের পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জাতীয় ঐক্য রক্ষায় সিপিআই(এম)

সি পি আই (এম)-ই এখন জাতীয় ঐক্যের সব থেকে ধারাবাহিক সমর্থক ও প্রবক্তা। আশির দশকের খতিয়ানই এটা প্রমাণ করছে। পাঞ্জাব, ত্রিপুরা, আসাম, দার্জিলিঙ ও কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও বিভেদকামী শক্তিগুলির বিরুদ্ধে সংগ্রামে আমাদের পার্টির ইউনিট ও কর্মীরা একেবারে সামনের সারিতে রয়েছেন। আমাদের শত শত কমরেড জাতীয় ঐক্যের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। পাঞ্জাবে আমাদের কমরেডদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের বীরগাথা অব্যাহত। খালিস্তানী সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অনেক মূল্যবান কমরেড আত্মবিসর্জন দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের পরিবারের লোকজনও শহীদের মৃত্যুবরণ করেছেন। গর্বের কথা একজন কমরেডও তাঁর দায়িত্ব ছেড়ে পালিয়ে যান নি। ত্রিপুরায় আধা-ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসের গুরুতর পরিস্থিতির মধ্যেও আমাদের পার্টি উপজাতি ও বাঙালিদের ঐক্যরক্ষার সংগ্রাম সাহসের সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছে। দার্জিলিঙে আমাদের কমরেডরা শান্তি বিঘ্নিত করার অপচেষ্টা ব্যর্থ করতে এবং বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত দার্জিলিঙ গোর্খা পার্বত্য পরিষদকে বজায় রাখতে সদা সতর্ক। পার্টির ক্ষুদ্র কাশ্মীর ইউনিটও বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলির হুমকির কাছে মাথা নত করতে অস্বীকার করেছে। তামিলনাডুতে আমাদের পার্টি ধারাবাহিকভাবে এল টি টি ই-র হিংসাত্মক ও বিভেদপন্থী কার্যকলাপের নিন্দা করে যাচ্ছে। জাতীয় ঐক্য রক্ষায় এই সাহসী এবং ধারাবাহিক অবস্থানের উৎস হল একটি শ্রমিকশ্রেণীর পার্টির জনগণের ও শ্রেণীগত ঐক্য এবং সেই কারণে দেশের ঐক্যরক্ষার প্রশ্নে আপসহীন মানসিকতা। জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে পার্টির লাইন জনগণের মধ্যে তার মর্যাদা ও প্রভাব বৃদ্ধি করেছে। বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির সঙ্গে মিলে জাতীয় ঐক্য রক্ষার এই সংগ্রামকে আরও বলিষ্ঠভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

সাম্প্রদায়িকতার শক্তিবৃদ্ধিজনিত বিপদ

সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তিগুলির ক্রমবর্ধমান শক্তি সম্পর্কে ত্রয়োদশ কংগ্রেসের হুঁশিয়ারি সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। ঐ কংগ্রেসের পরবর্তী তিনটি বছরে এই বিপদ গুরুতরভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাধীনতার পর আর কখনও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ এত তীক্ষ্ণ হয় নি এবং ধর্মনিরপেক্ষতা এত গভীর বিপদের মুখে পড়ে নি। রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ বিরোধকে কেন্দ্র করে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, আর এস এস এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ও বিষাক্ত প্রচার শুরু করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় 'মেকি ধর্মনিরপেক্ষতা'র বিরুদ্ধে বি জে পি-র প্রচার যেটা আসলে আমাদের দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তির বিরুদ্ধেই আক্রমণ। ১৯৮৯ সালে অযোধ্যায় বিতর্কিত স্থানে শিলান্যাস করতে গিয়ে কংগ্রেস (আই) সরকার ধর্মান্ধতার সঙ্গে আপস করে।

গণতন্ত্রের বিপদ

সাম্প্রতিককালে বুর্জোয়া-জমিদার পার্টিগুলির মদতে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী কার্যকলাপে ক্রমবর্ধমান দুর্বৃত্তায়ন ঘটছে। নির্বাচনে রিগিং, ভীতি প্রদর্শনের জন্য সমাজবিরোধীদের নিয়োগ, নির্বাচনী কারচুপিতে আমলাতন্ত্রের একটা অংশের যোগসাজশ এবং কালো টাকার ব্যাপক ব্যবহার নির্বাচনী ব্যবস্থার মর্মবস্তুকে ধ্বংস করছে। দশম সাধারণ নির্বাচনে ত্রিপুরা এবং অন্যান্য স্থানে মুখ্য নির্বাচনী কমিশনারের নির্লজ্জ পক্ষপাতপুষ্ট আচরণ দেখিয়ে দিচ্ছে সংসদীয় গণতন্ত্র রক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলি কতটা গভীরভাবে আক্রান্ত। এইসব অপরাধমূলক কাজকর্মের দ্বারা অনেক এলাকায় ভোটদানের প্রাথমিক অধিকারটুকুও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। জাতপাত ও সাম্প্রদায়িক আবেদনের ব্যবহার পরিবেশকে আরও বিষাক্ত করছে। বেসরকারিকরণ ও উদারকরণের নতুন অর্থনৈতিক নীতিগুলির মধ্যে দিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারগুলির ওপর আক্রমণ বেড়ে চলেছে।

সংসদীয় গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে সমস্ত বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে আন্তরিকভাবে এইসব বিপদের মোকাবিলা করতে হবে। এই প্রসঙ্গে নির্বাচনী সংস্কারের প্রশ্নটাই হল সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তালিকা ব্যবস্থার মাধ্যমে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব এমন একটি বড় ধরনের সংস্কার হতে পারে যার সাহায্যে জনগণের রায়কে বিকৃত করার অনেক ব্যবস্থাই দূর করা যাবে। এছাড়া, এ বিষয়ে কোন আইন প্রণয়নের সময় রাষ্ট্রীয় মোর্চা সরকার নিয়োজিত এবং সমস্ত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত নির্বাচনী সংস্কার কমিটির সুপারিশগুলিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

আক্রমণের লক্ষ্য বামপন্থীরা

সি পি আই (এম) এবং বামপন্থীরা কংগ্রেস (আই)-র বুর্জোয়া-জমিদার নীতিগুলি বিরোধিতায় ধারাবাহিক ভূমিকা পালন করেছে। পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী পরিচালিত সরকার এবং ১৯৯১ সাল পর্যন্ত কেরালার বামগণতান্ত্রিক সরকার বিকল্প নীতি রূপায়ণের সংগ্রামে সর্বদাই সম্মুখ সারিতে থেকেছে। গোটা দেশজুড়ে বামপন্থীরাই হল জনগণের স্বার্থের এবং সংগ্রামের সব থেকে বড় প্রবক্তা ও সংগঠক। এই খতিয়ানই বামপন্থীদেরকে শাসকদলের শ্রেণী-আক্রোশের লক্ষ্য করে তুলেছে। এমনকি ১৯৮৯-৯০ সালে যখন কংগ্রেস (আই) কেন্দ্রে ক্ষমতায় ছিল না তখনও যে সব রাজ্যে তারা শক্তিশালী সেখানে বামপন্থীদের ওপর নিরবচ্ছিন্ন আক্রমণ চালিয়ে গেছে।

বাম ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের জন্য সংগ্রাম

কংগ্রেস (আই) এবং বিজেপি-কে পরাস্ত করা এবং জাতীয় ঐক্য ও অখন্ডতা বজায় রাখা, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তকে পর্যুদস্ত করা এবং জনগণের অপরিহার্য স্বার্থগুলি রক্ষা করার জন্য সমস্ত বাম, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলিকে সামিল করার এই বিপুল প্রয়াস জলন্ধর কংগ্রেস থেকে পরবর্তী পার্টি কংগ্রেসগুলিতে রাজনৈতিক প্রস্তাবে উল্লেখিত বাম ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের জন্য সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এইভাবে আশু সংগ্রামগুলিতে ব্যাপক ঐক্য গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই অমাদের পার্টি ও বামপন্থী শক্তিগুলি ক্রমে ক্রমে শক্তিবিন্যাসের পরিবর্তন ঘটাতে পারবে এবং দেশের ঘটনাবলীর ওপর নির্ণায়ক প্রভাব ফেলার মত অবস্থানে যেতে সক্ষম হবে। এই সংগ্রামে সাফল্য বাম ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের উদ্ভবের উজ্জ্বল সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে। এই ধরনের একটি ফ্রন্টই কেবল বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা সার্বিক সঙ্কটের কবল থেকে দেশকে উদ্ধার করতে পারে।

পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত ক্রমবর্ধমান গণসংগ্রামগুলি, গণসংগঠনগুলির বিকাশ, বামফ্রন্ট সরকারের সাফল্য, বামপন্থী দলগুলির ক্রমবর্ধমান ঐক্যবদ্ধ কার্যকলাপ এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক দলগুলির অনুগামী জনসাধারণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতর যোগাযোগ সব মিলে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতির উপযোগী পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটাতে পারে যেখানে বামপন্থীরা একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।

সি পি আই (এম) শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে একটি জনগণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গড়ে তোলার মৌলিক লক্ষ্য অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ। এই ধরনের একটা মোর্চাই কেবল জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের সাফল্য সুনিশ্চিত করতে পারে। বাম ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের কর্মসূচী ও কার্যকলাপগুলিকে জনগণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠনের একটি প্রয়োজনীয় স্তর হিসেবেই দেখতে হবে।

পার্টি কংগ্রেসে ৯৬৭ জন প্রতিনিধি যোগ দেন।

৬৩ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয় কেন্দ্রীয় কমিটি, ১৭ জন সদস্য দিয়ে গঠিত হয় পলিট ব্যুরো।

হরকিষাণ সিং সুরজিত সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

পলিট ব্যুরোর সদস্য হলেন : হরকিষাণ সিং সুরজিত, ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ, এম বাসবপুন্নাইয়া, নৃপেন চক্রবর্তী, জ্যোতি বসু, ভি এস অচ্যুতানন্দন, এ নাল্লা শিবম, এল বি গঙ্গাধর রাও, ই. কে নায়ার, সীতারাম ইয়েচুরি, এস আর পিল্লাই, বিনয় চৌধুরী, প্রকাশ কারাত, এম হনুমন্ত রাও, সুনীল মৈত্র, পি রাম চন্দ্রন, শৈলেন দাশগুপ্ত।

পঞ্চদশ পার্টি কংগ্রেস

১৯৯৫ সালের ৩-৮ এপ্রিল (চণ্ডিগড়)

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি

চতুর্দশ পার্টি কংগ্রেসের পরবর্তী দিনগুলিতে বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গিয়েছে। সাভিয়েত ইউনিয়নসহ পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয় এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের ঠিক পরপরই অনুষ্ঠিত চতুর্দশ কংগ্রেস মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিপ্লবী পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিল এবং পার্টিকে রাজনৈতিক মতাদর্শগত প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ করেছিল।

কংগ্রেস অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে নিম্নলিখিত সিদ্ধান্তসমূহে উপনীত হয়েছিল যা মধ্যবর্তী সময়ের ঘটনাবলীর ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিপর্যয় ঘটেছে সমাজতন্ত্র নির্মাণের প্রক্রিয়ায় কয়েকটি গুরুতর ত্রুটি, সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রে বিকৃতি এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিজ্ঞানকে সৃজনশীলভাবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিচ্যুতির দরুন। তাই এ সমস্ত পরিবর্তন কোনক্রমেই মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে অথবা সমাজতান্ত্রিক আদর্শ অনুসরণকে নস্যাৎ করে দেয় না।

এ সবের ফলশ্রুতিতে ঐতিহাসিক পটভূমিকায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে হলেও শ্রেণীশক্তিসমূহের ভারসাম্য সাম্রাজ্যবাদের অনুকূলে চলে গেছে।

এতদসত্ত্বেও এসমস্ত পরিবর্তন ও সাম্রাজ্যবাদের আপেক্ষিক সুবিধাজনক পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও পুঁজিবাদ মানবজাতির সবচেয়ে গুরুতর সমস্যাগুলির কোনও সমাধান করতে পারে না। বিপরীতে তা লক্ষ লক্ষ মানুষকে দারিদ্র্য, বুভুক্ষা, নিঃসহায় দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় ফেলে রেখেছে।

তাছাড়া পুঁজিবাদী ব্যবস্থা 'ব্যবস্থা হিসেবেই' সংকটমুক্ত নয় এবং কোনদিন তা হবেও না। শ্রেণীশক্তিসমহের নির্দিষ্ট পারস্পরিক ভারসাম্যের দরুন সে তার নিজের সমস্যাকে সামলে নিচ্ছে বৈজ্ঞানিক- প্রাযুক্তিক অগ্রগতিকে কাজে লাগিয়ে, বিশ্ব বাজারের প্রসার ঘটিয়ে এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ হল দেশীয় ও অন্তর্জাতিক স্তরে শোষণের মাত্রাকে তীব্র করে।

দ্বন্দ্বের তীব্রতা বৃদ্ধি

ভারসাম্য রক্ষাকারী সমাজতান্ত্রিক শক্তির অবলুপ্তির দরুন বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ এক সুদূরপ্রসারী "নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার" নামে নিজেদের প্রতিপত্তি কায়েম করার জন্য মরিয়া প্রয়াস চালাচ্ছে। তাই চতুর্দশ কংগ্রেসের পরবর্তী পর্যায় হচ্ছে চারটি মৌলিক দ্বন্দ্বের তীব্রতা বৃদ্ধির পর্যায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দুনিয়ায় সাম্রাজ্যবাদের ক্রমআগ্রাসনের মধ্য দিয়ে চিহ্নিত হচ্ছে এই পর্যায়।

সমাজতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব

এই বছরগুলি জুড়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ অবশিষ্ট সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করেছে যা এই যুগের কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্বকেই তীব্র করেছে।

উৎসাহব্যঞ্জক দিক হচ্ছে দৃঢ়তার সঙ্গে এই দেশগুলি সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণকে প্রতিহত করেছে।

শ্রম ও পুঁজির দ্বন্দ্ব

উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশগুলিতে মন্থর গতির পরিত্রাণ যার কথা একটু আগে বলা হয়েছে ধনতান্ত্রিক দেশগুলিতে শ্রমজীবী মানুষ ও পুঁজির মধ্যেকার দ্বন্দ্বকে তীব্র করে তুলেছে। বেকারী, দারিদ্র্য এবং গৃহহীনদের সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্য দিয়েই তা সূচিত হচ্ছে। ব্রিটিশ শিল্প ফেডারেশনের হিসেব মাফিক ব্রিটেনের কলকারখানায় সর্বমোট কর্মসংস্থান ১৯৭৯ থেকে ৯৩ সালের মধ্যে দারুণভাবে ৪০ শতাংশ কমেছে। জার্মানিতে '৯১ সালে ৮.৫ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছিলেন এবং ৯৪ সালে আরও ৫ লাখ মানুষ কর্মচ্যুত হতে পারেন। ৭২.৫ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করতে বাধ্য হচ্ছেন এবং ৮ লক্ষ মানুষ গৃহহারা হয়ে পড়েছেন। জার্মানিতে বেকারীর হার যেখানে ৮.৯ শতাংশ, পূর্ব অংশে এই হার ১৭.১৩ শতাংশ, জাপানে ২.৭শতাংশ হারে বেকারীর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ লক্ষ যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী ইতিহাসে সব থেকে বেশি।

আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব

বিগত তিন বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি আর জাপান-এই তিনটি পুঁজিবাদী কেন্দ্রের নিজের নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়ে আঞ্চলিক সংঘবদ্ধতার প্রক্রিয়া আরো বেশি করে মূর্ত হয়ে উঠেছে।

সাম্রাজ্যবাদ এবং তৃতীয় বিশ্বের দ্বন্দ্ব

আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বগুলির অস্তিত্ব সত্ত্বেও, তৃতীয় বিশ্বের শোষণের প্রশ্নে সাম্রাজ্যবাদ বেশ কিছুটা ঐক্য দেখিয়েছে। জি-৭ দেশগুলি নিয়মিত বৈঠক করে গেছে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্যই নয়, রাজনৈতিক এবং বৈদেশিক নীতিগত একটি সঙ্ঘবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করবার উদ্দেশ্যেও বটে। এই সময়কালে এই দ্বন্দ্ব আরো তীব্র হওয়ার মধ্যে দিয়েই এই বিষয়টি প্রতিভাত হয়েছে। এখন যে ধরনের সুবিধাজনক অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে সাম্রাজ্যবাদ বিরাজ করছে, তাতে তৃতীয় বিশ্বের উপর চাপের মাত্রা বেড়েই চলেছে।

কয়েকটি সমাজতান্ত্রিক দেশের কিছু ঘটনাবলী

চীনে ১৯৯২-এর অক্টোবরে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চতুর্দশ কংগ্রেসে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে 'সমাজতান্ত্রিক বাজার' অর্থনীতি রূপায়নের প্রক্রিয়াকে বাস্তবায়িত করবার সিদ্ধান্ত করা হয়। ১৯৯৩-৯৪ সালে চীনের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (GDP) পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় পরিকল্পিত ৮ শতাংশ বৃদ্ধির জায়গায় ১৩.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। বৈদেশিক বাণিজ্য ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে ১৯৯২-এর তুলনায় আমদানি, রপ্তানির মোট মূল্যের ১৮.২ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটেছে। আজ চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথেও এক বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত অর্জন করতে পেরেছে।

চীনের কমিউনিস্ট পার্টি আগাগোড়া জোরের সঙ্গে বলে এসেছে যে, এই সমস্ত সংস্কার কর্মসূচি চারটি প্রধান নীতিকে কঠোরভাবে অনুসরণ করে রূপায়িত হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক পথের প্রতি আস্থা, মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাও জে দঙ চিন্তাধারা, জনগণতান্ত্রিক একনায়কত্ব এবং কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে।

ভিয়েতনামে জানুয়ারি ১৯৯৪-তে অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যবর্তী জাতীয় সম্মেলনে আগামী দিনগুলির কার্যসূচির রূপরেখা প্রস্তুত করা হয়েছে। সম্মেলনের দলিল অনুযায়ী ভিয়েতনাম বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও ইঙ্গিতবাহী সাফল্য অর্জন করেছে। ১৯৯১ সালের ৬৭ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতির হারকে ১৯৯৩ সালে ৫.২ শতাংশে নামিয়ে আনা গেছে। প্রাথমিক গড় হিসেব অনুযায়ী মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (GDP) পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ৫.৫-৬ শতাংশ ছাড়িয়ে ৭.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি এবং শিল্প উৎপাদন, দুই-ই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে এগিয়ে গেছে।

কিউবায় অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও ১৯৯২-এর চতুর্থ পার্টি কংগ্রেস দেখিয়েছে যে, সমাজতান্ত্রিক নীতি আদর্শকে তুলে ধরতে আর সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে পার্টি এবং জনসাধারণ কতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। চূড়ান্ত উসকানি এবং অর্থনৈতিক অবরোধের মতন অপরাধ সত্ত্বেও কিউবা সমাজতন্ত্রকে অবিচলভাবে আঁকড়ে ধরে আছে।

গণসাধারণতন্ত্রী কোরিয়া সার্বভৌম এবং স্বনির্ভর উন্নয়ন নীতি অনুসরণ করে খাদ্য, বস্ত্র, এবং আশ্রয়ের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। পারমাণবিক জেনারেটর স্থাপনের বিষয় নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত সমস্যাগুলিকে অতিক্রম করেই তাদের অগ্রগতি ঘটছে। একইভাবে, লাওস প্রচেষ্টা চালাচ্ছে সংস্কারের মাধ্যমে  তাদের প্রকট অনগ্রসরতার সমস্যাকে সমাধান করতে।

জাতীয় পরিস্থিতি

চতুর্দশ কংগ্রেস লক্ষ্য করেছিল যে এক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মে আমাদের দেশ চলছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশকে দু'দুটো সাধারণ নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হয়েছে কিন্তু কোন দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।

এমনকি ১৯৯১ সালের নির্বাচনেও কংগ্রেস (আই) সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। পরবর্তীকালে তারা অন্য দল ভাঙিয়ে দলছুটদের নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও কংগ্রেসের প্রতি মানুষের সমর্থন হ্রাসকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। একথা পরিষ্কার যে, কংগ্রেস (আই) তার একচেটিয়া ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। পার্টি কংগ্রেস লক্ষ্য করেছিল যে "দীর্ঘকালব্যাপী একদলীয় আধিপত্যের এ এক তাৎপর্যপূর্ণ ভাঙন। " অন্ধ্রপ্রদেশ এবং কর্ণাটকে কংগ্রেস (আই)-এর বিপর্যয় এবং পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনগুলিতে এই ঝোঁককে সুনিশ্চিত করেছে যে কংগ্রেস (আই) জনসাধারণের কাছ থেকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

চতুর্দশ কংগ্রেস এই সিদ্ধান্ত করেছিল: "আগামী দিনগুলিতে নয়া অর্থনৈতিক নীতিসমূহ শ্রমজীবী মানুষের সকল অংশের অবস্থার আরও অবনতি ঘটাবে। শাসক দল ও জনগণের মধ্যেকার দ্বন্দ্বকে তা আরও তীব্র করবে। বি জে পি ও অন্যান্য সংহতিনাশক শক্তিগুলি জনসাধারণের বর্ধমান অসন্তোষকে বিভেদপন্থী খাতে বইয়ে দিতে চেষ্টা করবে। শ্রমিকশ্রেণী ও শ্রমজীবী জনগণের স্বার্থরক্ষায় নিরবচ্ছিন্ন লড়াই ও শক্তির সমাবেশ ঘটিয়ে এই অসন্তোষকে গণতান্ত্রিক খাতে প্রবাহিত করাই সি পি আই (এম) এবং অন্যান্য বাম ও গণতান্ত্রিক দলগুলির মুখ্য প্রচেষ্টা থাকবে।” চতুদর্শ কংগ্রেস যে বিশ্লেষণ ও দিকনির্দেশ করেছিল তা সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। কংগ্রেস (আই) ও বি জে পি-কে পরাস্ত করে বাম গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিসমূহকে আরও মজবুত করার আহ্বান জানিয়েছিল চতুর্দশ কংগ্রেস।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি

নরসিমা রাও সরকারের অনুসৃত অর্থনৈতিক নীতি নগ্নভাবে ধনিকশ্রেণীর স্বার্থবাহী ও বৃহৎ ব্যবসায়ী ও বিদেশি পুঁজির পক্ষে সহায়ক। এই নীতিগুলি ভারতবর্ষের স্বনির্ভরতার পথে উন্নয়নের নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। ফান্ড-ব্যাঙ্ক নির্দেশিত কাঠামোগত বিন্যাস কর্মসূচি গ্রহণের মাধমে রাও সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির ব্যাপক বেসরকারিকরণ এবং বিলোপসাধন করে চলেছে। অর্থনীতিকে সকল নিয়ন্ত্রণহীন করেছে এবং একচেটিয়া কারবারগুলির উপর থেকে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়েছে। অর্থনীতির ক্ষেত্র বিদেশি পুঁজির জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে এবং ফান্ড-ব্যাঙ্কের নির্দেশে সরকারি লগ্নী ও সরকারি ব্যয় ব্যাপকভাবে হ্রাস করেছে।

এই উদারনীতিকরণ ভারতীয় বৃহৎ ব্যবসায়ী ও বিদেশি পুঁজিকে এক বিরাট সুযোগ করে দিয়েছে। উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করার নামে কর্পোরেট সেক্টরকে ব্যাপক কর ছাড় দেওয়া হয়েছে এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানিগুলিকে দেশীয় কোম্পানিদের তুলনায় বেশি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এই ব্যবস্থাগুলি অর্থনীতির পক্ষে সহায়ক ভূমিকা নেয়নি, যার ফলে মন্দা, উদ্বৃত্ত মূল্যের হারের (সারপ্লাস ভ্যালু) ব্যাপক বৃদ্ধি এবং উৎপাদনমুখী লগ্নীর হ্রাস দেখা গেছে যা ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, ১৯৮১-৯১ সালে যার বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার ছিল ৫.৩ শতাংশ গত তিন বছরে কমে দাঁড়িয়েছে গড়ে ৩ শতাংশ। কৃষিতে বার্ষিক বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ১ শতাংশের কাছাকাছি এবং শিল্পের ক্ষেত্রে এই একই সময়ে তা ছিল ২ শতাংশ। এই যৎসামান্য ফলের জন্যেও কিন্তু মূল্য দিতে হয়েছে নেক। ১৯৯৩-এর শেষে মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২,৮৩,০০০ কোটি টাকায়। অভ্যন্তরীণ ঋণ ৪,৮৩,৫৪৫ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কে পৌঁছেছে।

বিকল্প নীতি

নয়া আর্থিক নীতি রূপায়ণের এই সময়কালে সরকার এই ধারণাই প্রচার করতে চেয়েছে যে তথাকথিত 'আন্তর্জাতিকীকরণ' নীতির কোনও বিকল্প নেই। ১৯৯১ সাল থেকে সি পি আই (এম) এবং বামপন্থী শক্তিগুলি উন্নয়নের এক বিকল্প পথের রূপরেখা দিয়ে আসছে, যা জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে এবং একই সঙ্গে সর্বাঙ্গীণ আর্থিক উন্নয়নের দ্বার খুলে দেয়। এই বিকল্প নীতি কর্পোরেট কর, আয়কর, সম্পদকর এবং দানকর সহ প্রত্যক্ষ কর বাড়িয়ে ও অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের কথা বলে যা কিনা সরকারি লগ্নী ও ব্যয় বাড়াবে। কর সংক্রান্ত আইনের ভুলত্রুটিগুলি শুধরে নেওয়া উচিত এবং কর ফাঁকি দেওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা পুনরুদ্ধার করতে হবে। শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে কালো টাকার পরিমাণ হ্রাস করা উচিত। একচেটিয়া গোষ্ঠীগুলি ও জমিদার শ্রেণী যারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে তাদের সম্পদ কর দিতে হবে। এই ব্যবস্থাগুলি রাজস্ব এবং আর্থিক ঘাটতি কমাবে এবং পরোক্ষ কর ও প্রশাসনিক মূল্যবৃদ্ধির উপর নির্ভরশীল হওয়ার প্রবণতা পালটে দেবে। শিল্পনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রকে এমনভাবে সুবিন্যস্ত করা যাতে তা প্রযুক্তি নীতি গ্রহণে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে এমনভাবে যা অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিকে উৎসাহ যোগায় এবং কেবলমাত্র জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তির প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলির জন্য উন্নত প্রযুক্তি আমদানি করে।

সাম্প্রদায়িকতার বিপদ

চতুর্দশ কংগ্রেস ধর্মনিরপেক্ষতার উপর বি জে পি-আর এস এস ও ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ জোটের ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক আক্রমণ ও আঘাত সম্পর্কে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কারণে দেশকে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। উত্তরপ্রদেশের

বি জে পি সরকার এই নৃশংস কাজ সংগঠিত করার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র কে সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করেছিল। প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও এক্ষেত্রে কারও চেয়ে কম অপরাধী নন। কারণ সংবিধান রক্ষার জন্য সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর সর্বসম্মত সমর্থন পাওয়া সত্ত্বেও কোন সদর্থক ভূমিকা পালনে তিনি অস্বীকার করেছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষ কর্তব্য পালনে রাষ্ট্রের বিশ্বাসঘাতকতা বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে এনেছিল। ফলে, সারা দেশ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঢেউয়ের কবলে পড়েছিল। দেশভাগের পর এত বড় দাঙ্গা আর কখনও দেখা যায়নি। শুধুমাত্র, বোম্বাই-এ সহস্রাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। দুইমাসব্যাপী ভয়াবহ দাঙ্গা উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ও হায়দ্রাবাদের মহানগর ও শহরগুলিতে ছড়িয়ে পড়েছিল। সুরাটে উন্মত্ত সাম্প্রদায়িক বর্বরতার নৃশংসতম প্রকাশ ঘটে। মুসলিম সংখ্যালঘুরাই এর প্রধান শিকার এবং তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বেশ কতকগুলি রাজ্যে পলিস এবং অসামরিক প্রশাসনের পক্ষপাতী আচরণের ফলে তাদের দুর্দশা আরও বেড়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরার বামফ্রন্ট সরকারের প্রভাব

পার্টি এবং গণসংগঠনগুলির বিকাশে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকারের অবদান রয়েছে। এটা দেখিয়ে দিয়েছে যে, বর্তমান কাঠামোর চৌহদ্দির মধ্যে বামপন্থীরা কিছু বিকল্প নীতি রূপায়ণ করতে সক্ষম। সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করেও জনগণ বিশেষ করে শ্রমিকশ্রেণী, মেহনতী কৃষক এবং মধ্যবিত্ত কর্মচারিদের স্বার্থে এই সরকার যথেষ্ট অবদান রেখেছে। বামফ্রন্ট সরকার দ্বিধাহীনভাবে শ্রমজীবী মানুষের পাশে থেকেছে এবং শ্রেণীভিত্তিক সংগ্রামে হস্তক্ষেপ করা থেকে পুলিসকে নিবৃত্ত রেখেছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার দ্বারা গৃহীত ভূমিসংস্কার ব্যবস্থাসমূহ শুধুমাত্র ক্ষেতমজুর ও কৃষকদের মধ্যে গণভিত্তি প্রসারিত করতে সাহায্যই করেনি, তা দারিদ্র্য মোকাবিলায় এবং শিল্পের জন্য অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণেও সহায়ক হয়েছে। এই সমস্ত সংস্কার কর্মসূচির ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে ধান উৎপাদনে বর্তমানে সর্বাগ্রগণ্য। শিল্পায়নকে জোরদার করার জন্য রাজ্য সরকার একটি শিল্পনীতি গ্রহণ করেছে যাতে রাজ্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রের গুরুত্ব হ্রাস না করেও অধিকতর বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যায়। পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রবর্তিত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ বিশেষত পঞ্চায়েতীরাজ ব্যবস্থা, দেশের বাকি অংশের কাছে আদর্শস্বরূপ। রাজ্য সরকার ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে দৃঢ়ভাবে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে এবং রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক বাতাবরণ বিরাজ করছে।

পার্টির ভূমিকা

একটি মজবুত কমিউনিস্ট পার্টি এবং শক্তিশালী বাম আন্দোলনই পারে সামাজিক ও শ্রেণী শোষণমুক্ত ভারতের জন্য সংগ্রামে এগিয়ে নিতে যেতে ও সফল করতে। পার্টিকে আদর্শগত ও রাজনীতিগতভাবে সমস্ত প্রগতিশীল এবং গণতান্ত্রিক শক্তির কাছে পথনির্দেশক হতে হবে। মতাদর্শের ক্ষেত্রে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পটভূমিতে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সৃজনশীল প্রয়োগকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে পার্টির চতুর্দশ কংগ্রেসে গৃহীত প্রস্তাবের ভিত্তিতে পার্টি তার কর্মীবাহিনীকে আদর্শগতভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। রাজনীতির ক্ষেত্রে পার্টি বাম ঐক্যকে শক্তিশালী করা এবং মেহনতী জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েছে। শাসকশ্রেণীর নীতিগুলির মোকাবিলা এবং বুর্জোয়া ও সামন্তবাদী ভাবধারাগুলিকে প্রতিহত করতে পার্টির স্বাধীন হস্তক্ষেপ অবশ্যই বাড়াতে হবে। এর জন্যে পার্টিকে সাংগঠনিকভাবে একটি সুসংহত শক্তি হিসাবে প্রসারিত করতে এবং বাড়াতে হবে। সালকিয়া প্লেনামে চিহ্নিত দুর্বলতাগুলি এবং চতুর্দশ কংগ্রেসের সাংগঠনিক প্রতিবেদনে নির্দেশিত আশু কাজগুলোর প্রতি আন্তরিকভাবে নজর দিতে হবে।

বিগত তিন বছরে পার্টি যোগ্যতার সঙ্গে কমিউনিস্টবিরোধী আদর্শগত আক্রমণ প্রতিহত করেছে এবং রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করেছে। অবশ্য এখনও অনেক কিছু করার বাকি। দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কংগ্রেস (আই) সরকার এবং তাদের অর্থনৈতিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে জারি সংগ্রামকে আরো দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয় সংহতি রক্ষার জন্য বি জে পি এবং অন্যান্য সাম্প্রদায়িক ও বিভেদকামী শক্তিগুলির বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। সংকট জর্জরিত বুর্জোয়া-জমিদার ব্যবস্থার বহুমুখী আক্রমণ পর্যুদস্ত করতে জনগণকে অবশ্যই সংগঠিত করতে হবে এবং সংগ্রাম করতে হবে। জনগণ ও দেশের প্রতি তার কর্তব্য পালন করতে পার্টি নিজেকে এইসব কাজে নিয়োজিত করছে।

৭১২ জন প্রতিনিধি যোগ দেন পার্টি কংগ্রেসে।

পার্টি কংগ্রেস থেকে ৭১ জন সদস্য নিয়ে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি, ১৬ জনের পলিট ব্যুরো গঠিত হয়। হরকিষাণ সিং সুরজিত পুনরায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

আগের পর্ব

তথ্যসুত্রঃ

১) Documents of The Communist Movement in India,

National Book Agency, Volume I- XXVII

২) আমার জীবন ও কমিউনিস্ট পার্টি,

মুজফফর আহমদ, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি

৩) Galvanising Impact of the October Revolution on India’s National-Liberation Movement

Gangadhar Adhikary, Soviet Land, August 1977


শেয়ার করুন

উত্তর দিন