Site icon CPI(M)

Freedom Struggle And The Communists: Part VI

6

সুজন চক্রবর্তী

২০০৪ সালে, চতুর্দ্দশ লোকসভা নির্বাচনে বামপন্থী ৬১ জন সাংসদ নির্বাচিত হলেন, এটাই সংসদে বামপন্থীদের সর্বোচ্চ শক্তি। ৬১ জনের মধ্যে ৫৭ জন সরাসরি কংগ্রেসকে পরাজিত করে জিতেছেন। এতদসত্তেও সরকার গঠনে বামপন্থীরা সরাসরি কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ-১ সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন করল। নীতিগত এই সমর্থন। দেশের ক্ষমতায় বিজেপিকে ঠেকাতে হবে। দেশের সর্বনাশ রুখতে এটা জরুরী। দেশের স্বাধীনতা, সংবিধানের মর্মবস্তুকে মানে না বিজেপি। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার মূল মন্ত্রকে অস্বীকার করে। দেশকে রক্ষা করতে হবে। অতএব বিজেপিকে ঠেকাতে ইউপিএ-১।

চাপ ছিল প্রচুর, কিন্তু বামপন্থীরা সরকারে অংশ নেয়নি। সমর্থন করেছে বাইরে থেকে। ক্ষমতার চাইতে মানুষের প্রতি দায়িত্ব বেশি জরুরী। গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি দায়বদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ। বামপন্থীরা স্বভাবতই বেশী আগ্রহী কিভাবে, কোন নীতিতে সরকার পরিচালিত হবে সেই নীতিগত অবস্থানে। অতএব তৈরী হলো ‘Common Minimum Programme’। ন্যূনতম সাধারণ কর্মসূচী। বস্তুতপক্ষ্যে এর সুদূর প্রসারি প্রভাব আজও স্পষ্ট। বামপন্থীরা ৬১জন ছিল বলেই, সেদিন কেন্দ্রীয় সরকার বিদেশের চাপ সত্ত্বেও ব্যাংক-বীমার মত ক্ষেত্রগুলিকে বেসরকারীকরণ করতে পারেনি। খুশি মত বিদেশী বিনিয়োগের নামে দেশের শিল্প সংস্থাগুলোকে জলাঞ্জলি দিতে পারেনি। রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রগুলো জলের দরে বেচে দিতে পারেনি। সাম্রাজ্যবাদী-আন্তর্জাতিক পুঁজির চক্ষুশূল হয়েছে বামপন্থীরা বটেই, কিন্তু তাতে লাভ হয়েছে দেশের। রক্ষা পেয়েছে দেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ নানান ক্ষেত্র।

দেশের এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রকল্পগুলি প্রকৃতপক্ষে, এই সময়েই প্রতিষ্ঠিত হয়। একশদিনের কাজের প্রকল্প বা মনরেগা নামক দেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রকল্প এই সময়েরই। এই সময়তেই মিড ডে মিল, ন্যাশনাল রূরাল হেলথ মিশন অথবা জাতীয় স্বাস্থ্য প্রকল্প। মূলত জঙ্গল এলাকায় আদিবাসী মানুষের স্বার্থ রক্ষার নয়া আইন। দেশের নানান ক্ষেত্রের স্বচ্ছতা রক্ষার বিবেচনায় ‘রাইট টু ইনফরমেশন অ্যাক্ট’ তথ্য জানার অধিকার। এ ধরনের নানাবিধ প্রকল্প। বামপন্থীদের শক্তি হ্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে এবং বিশেষত বিজেপি সরকারের আমলে প্রকল্পগুলি অনেকাংশে দূর্বল করে দেওয়া হয়েছে। বামপন্থীদের পরামর্শেই  বরং আরও বহু প্রকল্পের প্রস্তাবনা ছিল। যেমন ‘ফুড এন্ড নিউট্রিশন সিকিউরিটির’ প্রস্তাব। ইউপিএ-১ আমলে প্রস্তবিত, মানুষের খাদ্যের অধিকারের জন্য জরুরী এই খাদ্য নিরাপত্তা আইনের সুদূর প্রসারি ফল আজ আরও পরিস্কারভাবে প্রতিভাত হচ্ছে। কোভিড পরিস্থিতিতে লকডাউনের এই সময়ে তা আরও স্পষ্ট হচ্ছে এসবের উপযোগিতা।

দেশের সংবিধানের নির্দেশক নীতি, চতুর্থ পরিচ্ছদের Directive Principles of State Policy, অথবা অন্য বিভিন্ন অংশে মানুষের জন্য নানাবিধ রক্ষাকবচের কথা বলা আছে। জীবনের অধিকার, খাদ্য-পুষ্টি-শিক্ষার অধিকার, কাজের অধিকার—নানাবিধ। রাষ্ট্র পরিচালনায় কখনোই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বামপন্থীদের ৬১জন সাংসদ থাকার কারণে এবং সরকারকে তার উপর নির্ভর করতে হয়েছে বলে ইউ.পি.এ ১ এর সময় নতুন নতুন প্রকল্প, পরিকল্পনা করতেই হয়েছে সরকারকে। খাদ্য, মজুরি, কাজ সহ জীবনের জন্য জরুরী বিষয়গুলিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করতে পারে নি সরকার। বামশক্তি বৃদ্ধি মানুষের জন্যই জরুরী না, সংবিধানের মূল মর্মবস্তুকে রক্ষার জন্য জরুরী তা পরিষ্কার হয়ে যায়। কিংবা বামপন্থীদের আগ্রহেই ইউপিএ-১ এর সময়ে দেশের স্বার্থে আয়ত্ত বেশ কতগুলি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। কতগুলি কমিশন যা দেশের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রগুলির আর্থ সামাজিক অবস্থান এবং সেক্ষেত্রে সমাজ অথবা সরকারের দায়িত্বকে চোখে আঙুল দিয়ে নির্দিষ্ট করে। যেমন – অসংগঠিত শ্রমিকদের আর্থ সামাজিক বাস্তব অবস্থা নিরূপনে অর্জুন সেনগুপ্ত কমিশন। কৃষিক্ষেত্র বিষয়ে স্বামীনাথন কমিশন। সংখ্যালঘু মানুষের অবস্থান এবং করণীয় বিষয়ে সাচার কমিশন ইত্যাদি। দেশের রাজনীতিতে এই অংশগুলির গুরুত্ব স্পষ্টত, এই প্রথম কেন্দ্রীয়ভাবে নজরে আনা গেল। এই কমিশনগুলি বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা-গবেষনা করে তাঁদের রিপোর্ট পেশ করেছে। এই রিপোর্টের মধ্য দিয়ে দেশের অসংগঠিত অংশের শ্রমিক, কৃষক-কৃষি উৎপাদন এবং সংখ্যালঘু অংশের সমস্যা, সংকট এবং সমাধানের কিছু কিছু প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবেই সরকার এবং সংসদের কাছে পেশ হয়েছে। অত্যন্ত জরুরী এই ক্ষেত্রগুলি ভারতীয় রাজনীতিতে তার প্রাসঙ্গিকতা এবং গুরুত্ব অর্জন করতে পেরেছে। পিছিয়ে থাকা এই অংশগুলির অগ্রাদিকারে এবং গুরুত্বকে অস্বীকার করে জাতীয় রাজনীতি এগোতে পারবে না, বামপন্থীরা এটাকে স্পষ্ট করে দিতে পেরেছে।

গোটা ভারতবর্ষ পরিচালনার ক্ষেত্রে জনমুখীনতা এবং ইউ.পি.এ ১ সরকারের অগ্রাধিকার স্থির করার ক্ষেত্রে বামপন্থীরা সদর্থকভাবেই ভূমিকা নিয়েছে। মানুষের জীবন জীবিকা এবং ভবিষ্যতকে সুরুক্ষিত রাখার লড়াইতে, মানুষের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যেই যে কমিউনিস্টদের দায়বদ্ধতা—তা ক্রমশই স্পষ্ট হয়। বামপন্থীরাই মানুষের বিবেক। বামপন্থীদের দূর্বলতা মানুষকেই বিপন্ন করে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ এমনকি সংবিধানের মর্মবস্তু পর্যন্ত বিপন্ন হয়ে পড়ে—বিজেপি শাসনে তার বিষময় ফল ফলছে। বোঝাই যাচ্ছে যে বামপন্থীরা শক্তিশালী না থাকলে তার পরিনাম কত ভয়ঙ্কর হতে পারে। আমরা কাজের মধ্যে থেকে অনেকবার স্পষ্ট করতে পেরেছি যে বামপন্থীরা শক্তিশালী থাকলে, বামপন্থীদের শক্তিবৃদ্ধি পারতপক্ষে দেশ এবং দেশের মানুষের স্বার্থকেই সুরক্ষিত করে।

স্বাধীনতার আগে কিংবা পরে, বরাবরই দেশরক্ষার এবং দেশগঠনে, মানুষের স্বার্থরক্ষায়, দেশের ঐক্য-সম্প্রীতি-সংহতির প্রশ্নে গৌরবজনক ভূমিকা পালন করে এসেছে এদেশের কমিউনিস্টরা। স্বাধীনতার শপথ কিংবা সংবিধানের মর্মবস্তুকে যখনই শাসকশ্রেণী দূর্বল করতে চেয়েছে, আপোষহীনভাবেই রুখে দাঁড়িয়েছে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে। শ্রেণী স্বার্থেই শাসকেরা নানাবিধভাবে দেশকে দুর্বল করেছে। নেহেরুর আমলের মিশ্র অর্থনীতির মডেলের উপর, উদারনীতির নামে চেপে বসছে একচেটিয়া এবং বিদেশী পুঁজির দাপট। জোটনিরপেক্ষতার নীতি লঙ্ঘন করে দেশ এখন, এককথায়, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দুনিয়ার পার্টনারের পথে। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিকে দূর্বল করে স্বৈরাচারী এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির রমরমা। বিভেদ-বিভাজন, অধিকারহীনতা ক্রমশই বাড়ছে। পুঁজির কেন্দ্রীভবন ভয়ঙ্করভাবে বাড়ছে। মানুষের মধ্যে অসাম্য রেকর্ড পরিমান। দারিদ্র-বেকারী বাড়ছে। বিক্ষোভ মানুষের মধ্যে বাড়বেই। গায়ের জোরে তাকে ঠেকিয়ে রাখা যায় না। আম্বেদকর সতর্ক করেছিলেন— ‘Those who suffer from this inequality, will break the structure of this political democracy that this Assembly (Constituency Assembly) has so Laboriously built’.

দেশ পরিচালনার ভার আজ তাঁদের হাতে যাঁদের দেশে স্বাধীনতা সংগ্রামে কোন ভূমিকা ছিল না। বৃটিশের সাথে আপোষ আর দালালিই ছিল তাঁদের একমাত্র কাজ। তাঁদের হাতে দেশ কি নিরাপদ থাকতে পারে? গত কয়েকটি বছরে, অতীতের চাইতে, অনেক দ্রূতগতিতে দেশের অধোগমন ঘটছে। দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, মর্যাদা প্রতিটি ক্ষেত্রেই। দেশের মানুষের জীবনের মান, গণতন্ত্রের অধিকার, ব্যক্তির স্বাধীনতা—সবমিলিয়েই।  শিক্ষা-বিজ্ঞান-চেতনাকে দূর্বল করা হচ্ছে। বিভাজন-অবিশ্বাস-স্বৈরাচারের প্রবনতা বাড়ছে। ডিমনিটাইজেশন থেকে মনিটাইজেশন পাইপ লাইন। বোধহীন দেশবিরোধী একটা মনোভাব ক্রমশই পুষ্ট করা হচ্ছে সরাসরি রাষ্ট্রের শাসন কর্তাদের দিক থেকে। ঠেকাতেই হবে। যে কোনো মূল্যেই। স্বাধীনতার লড়াই যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সংবিধানের মর্মবস্তুকে রক্ষার লড়াই তেমন গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ সমস্ত মানুষকে সাথে নিয়ে সে লড়াই এর দায়িত্ব বামপন্থীদেরই।

শেয়ার করুন