Kazi Nazrul Cover

The Way Dukhu Became Najrul: A Retrospect

সৌম্যজিৎ রজক

“ “মারো শালা যবনদের!” “মারো শালা কাফেরদের!” — আবার হিন্দু মুসলমানী কাণ্ড বাঁধিয়া গিয়াছে। প্রথমে কথা-কাটাকাটি, তারপর মাথা-ফাটাফাটি আরম্ভ হইয়া গেল। আল্লার এবং মা কালীর ‘প্রেস্টিজ’ রক্ষার জন্য যাহারা এতক্ষণ মাতাল হইয়া চিৎকার করিতেছিল তাহারাই যখন মার খাইয়া পড়িয়া যাইতে লাগিল, দেখিলাম— তখন আর তাহারা আল্লা মিয়া বা কালী ঠাকুরানীর নাম লইতেছে না। হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি পড়িয়া থাকিয়া এক ভাষায় আর্তনাদ করিতেছে,— “বাবা গো, মা গো!” — মাতৃ পরিত্যক্ত দুটি বিভিন্ন ধর্মের শিশু যেমন করিয়া এক স্বরে কাঁদিয়া তাহাদের মাকে ডাকে।

দেখিলাম, হত-আহতদের ক্রন্দনে মসজিদ টলিল না, মন্দিরের পাষাণ দেবতা সাড়া দিল না। শুধু নির্বোধ মানুষের রক্তে তাহাদের বেদী চিরকলঙ্কিত হইয়া রহিল।…

জানি, স্রষ্টার আপনি-মোড়ল ‘প্রাইভেট সেক্রেটারি’রা হ্যাট খুলিয়া, টুপি খুলিয়া, টিকি নাচাইয়া আমায় তাড়না করিবে, তবু ইহাদের পতন হইবে। ইহারা ধর্ম-মাতাল। ইহারা সত্যের আলো পান করে নাই, শাস্ত্রের এলকোহল পান করিয়াছে।…”

সাধু ভাষা দেখে, বোধহয় পাঠক, ঠাহর করতে পেরেছেন যে এ লেখা অনেক দিন আগের। নাহলে এতই জ্যান্ত, এতই ক্ষুরধার— যেন মনে হয়, একেবারে সাম্প্রতিক। তাছাড়া আজকের বাংলায় আকছারই তো ঘটছে এ’সব। যাকে এক কথায় ‘সাম্প্রদায়িক হানাহানি’ বা ‘দাঙ্গা’ বলা হয়। কখনো বাদুড়িয়ায়, বসিরহাটে, কখনো ধুলাগড়ে, পুরুলিয়ায়, কখনো আমতায়, এখানে, ওখানে, সর্বত্র। এরকমই সাম্প্রতিক কোনও ঘটনার প্রেক্ষিতেও কী ভীষণ প্রাসঙ্গিক এই রিপোর্টাজ! যা লিখেছিলেন নজরুল ইসলাম। আজ থেকে ৯৭ বছর আগে।

১৯২৬ সালের ২৬শে আগস্ট তারিখে তাঁর এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল। ‘মন্দির ও মসজিদ’ শিরোনামে। সাপ্তাহিক ‘গণবাণী’ পত্রিকায়।

প্রসঙ্গত বাংলার ‘গণবাণী’ একদিনে গজিয়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক-সাংগঠনিক বিকাশের ধারাতেই তার আত্মপ্রকাশ। ঠিক যেভাবে চুরুলিয়ার দুখু মিঞাও হঠাৎ একদিনে এমন প্রখর রাজনৈতিক গদ্যের রচয়িতা হয়ে ওঠেননি। এক লম্বা যাত্রাপথ ছিল তাঁরও, যে পথে হাঁটতে হাঁটতে একজন শিশুশ্রমিক হয়ে উঠেছিলেন বাংলার মুক্তিকামী জনতার মুখপাত্র। বাঙালির প্রাণের কবিটি।

এখন যেটা পশ্চিম বর্ধমান, সেই জেলাতেই— আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়ায় জন্ম নজরুলের।  ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জৈষ্ঠ্য সেটি; খ্রিস্টীয় ১৮৯৯ সাল। যখন তার সবে নয় বছর বয়েস, প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় মারা যান বাবা। মাকে নিয়ে তিন ভাই, দুই বোনের সংসার। বড় টানাটানি। নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। লেখাপড়া তো বন্ধ হয়ই।

বছর দশেকের ছেলে কখনো মাজার শরীফের খামেদগিরি বা মসজিদের এমামতি ক’রে সামান্য পয়সা রোজগার করে। এসময় বাড়িতেই চাচার কাছে ফারসীর পাঠও নেয় সে। পাশের গ্রামের ‘লেটো গান’-এর দলের জন্য কখনো পালাগান লিখেও কিছু টাকা রোজগার করেছে বালকটি! এমনই গান বাঁধত, গাইতও, বাজনাও বাজাত যে আশেপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে নাকি বিভিন্ন দল আসত তার কাছে পালাগান, যাত্রা লেখাতে। ঐটুকুন একটা ছেলের কাছে! দুখু মিঞা নামে তো ডাকতই তাকে সকলে, এখন থেকে ‘ছোট উস্তাদ’ নামেও ডাকা শুরু। পড়শিরা কেউবা ডাকে ‘খ্যাপা’।

ফের লেখাপড়ায় ফিরেছিল অবশ্য সে। প্রথমে রানীগঞ্জের একটি স্কুলে, তারপর বর্ধমান নবীনচন্দ্র ইন্সটিটিউটে। যদিও অভাবের জন্য আবার ড্রপ আউট। আবারও লেটোর দলে গান লেখা। কখনো বাবুর্চির কাজ, আসানসোলের রুটির দোকানে ময়দা-মাখার কাজ মাসিক এক-টাকা বেতনের। এভাবে শ্রমের নিদারুন যন্ত্রণায়, অভাবে, কষ্টে কাটছিল নজরুলের কৈশোর।

সহসা আসানসোলের এক দারোগা রুটির দোকানের কাজ ছাড়িয়ে ‘গৃহ পরিচারক’ হিসেবে নজরুলকে নিয়ে যান নিজের বাড়ি। ময়নমনসিংহ জেলার সিমলা গ্রামে। তিনিই দরিরামপুর হাইস্কুলে ভর্তি করে দেন তাঁকে। সেটা ১৯১৪ সাল। ওদিকে শুরু হচ্ছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।

সেই স্কুলে ক্লাস এইটে উঠতে না উঠতেই নজরুল ফিরে আসেন রাণীগঞ্জে। পুরনো স্কুলেই ভর্তি হন ফের। বাইরেই তখন শুধু যুদ্ধ চলছে না, দেশের ভেতরেও প্রতিদিন আরও গরম হচ্ছে হাওয়া। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র ক’রে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই ঘনীভূত হয়েছে এতদিনে। বিপ্লববাদী আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে বাংলার সমস্ত ছাত্র-যুবর মননে। সশস্ত্র বিপ্লববাদী নিবারণচন্দ্র ঘটক ছিলেন নজরুলের স্কুল-শিক্ষক। বিপুলভাবেই তাঁর দ্বারা প্রভাবিত ছিল ক্লাস এইট-নাইনের নজরুল।

অভাব তো ছিলই দুখুর, তার সাথে ছিল এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ানো, হাজার রকম মানুষের সাথে আলাপ, ফার্সি কবিতার পাঠ, পালাগান যাত্রার সূত্রে মঙ্গলকাব্য-পুরাণ-রামায়ণ-মহাভারত-পল্লীগানের সমৃদ্ধি। এসবের সাথেই যুক্ত হচ্ছিল ঝোড়ো রাজনৈতিক সংগ্রামের অভিঘাত, বিপ্লববাদের রোমান্টিক হাতছানি, দেশের জন্য সব সঁপে দেওয়ার মহতি অনুপ্রেরণা। বড় হচ্ছিল নজরুল।

এল ১৯১৭ সাল। দশম শ্রেণিতে প্রিটেস্ট শুরু হয়েছে সবে, লেখাপড়া সব ছেড়ে সৈন্যবাহিনিতে নাম লেখানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল সে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য অনেক সৈন্য দরকার তখন, চলছে দেদার নিয়োগ। যুদ্ধে যোগ দেওয়াটাকে দেশপ্রেমিক কর্তব্য বোধ ক’রে নজরুল যোগ দিলেন ৪৯ নং বেংগলি রেজিমেন্টে। চলে গেলেন করাচি।

সে বছরেরই শেষের দিকে দুনিয়াকে তাজ্জব বানিয়ে দেওয়া ঘটনা ঘটল রুশ দেশে। শ্রমিকশ্রেণি ছিনিয়ে নিল রাষ্ট্রক্ষমতা।

শ্রমিক-কৃষকের সেই বিপ্লবের কথা রটে গেল সারা পৃথিবীতে। আমাদের দেশেও এল সে বার্তা, তবে খানিকটা পরে। নজরুল কিন্তু, সেই ১৯১৭ সালেই, প্রায় সাথে সাথে রুশ বিপ্লবের খবর পেয়ে গেছিলেন করাচির সেনা পল্টনে থাকার সুবাদে। রুশ বিপ্লব সংক্রান্ত নানান সংবাদ, পত্রিকা— কীকরে কে জানে— জোগাড় করেছিলেন নজরুল। ব্রিটিশ সেনা ছাউনিতেই। আলোড়িত হয়েছিল তাঁর মনপ্রাণ, নাড়া খেয়েছিলেন ভীষণ। ভীষণই উল্লসিত হয়েছিলেন, উত্তেজিতও।

১৯১৯ সালের জুনে ‘সওগত’ পত্রিকায় হাবিলদার নজরুল ইসলামের লেখা গল্প প্রকাশিত হয়। সেনা ছাউনিতে বসেই লিখেছেন, করাচি থেকে পাঠিয়েছেন কলকাতায়। প্রথম প্রকাশিত লেখা এটি তাঁর। এর পরপরই ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র মুখপত্র ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় কবিতা বেরোয়। কবি নজরুলের প্রথম প্রকাশিত কবিতা। প্রসঙ্গত মুজফফর আহমদ তখন সে পত্রিকার সহসম্পাদক। এই কবিতাটির সূত্রেই নজরুলের সাথে তাঁর যোগাযোগ স্থাপিত হয়। দু’জনই তখন রুশ বিপ্লবে অনুপ্রাণিত।

এই পত্রিকারই পরের দু’টো সংখ্যায় নজরুলের দু’টো গল্প প্রকাশিত হয়। যার একটা ছিল ‘ব্যথার দান’। এই গল্পের নায়কের ‘লাল ফৌজে’ যোগ দেওয়ার কথা লিখেছিলেন নজরুল। একদিকে রুশ বিপ্লবের বিশ্বব্যাপী প্রভাব, আরেকদিকে ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী গণআন্দোলনের জোয়ার সেসময়। এই পরিস্স্থিতিতে একজন ভারতীয় সৈনিকের গল্পের নায়ক ‘লাল ফৌজে’ যোগ দিচ্ছে, এটা ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের কুনজরে পড়তই এমন বিবেচনায়  বিচক্ষণ মুজফফর আহমদ গল্পটি ছাপার সময় ‘লাল ফৌজ’ কথাটি বদলে ‘মুক্তিসেবক সৈন্যের দল’ করে দেন। তাড়াহুড়োর কারণে লেখকের আগাম অনুমতি ব্যাতিরেকেই।

পরে এই পরিবর্তনে খুশি হয়ে নজরুল চিঠি দিয়ে ধন্যবাদ জানান মুজফফর আহমদকে। দু’জনের আলাপ জমেছে চিঠিপত্রেই সেসময়।

যুদ্ধ শেষ হলে ৪৯ নং বেংগলি রেজিমেন্ট ভেঙে দেয় ইংরেজরা। বাংলায় ফিরে আসেন নজরুল। প্রথমে অল্প কিছুদিনের জন্য দু’টি বাসায় থাকেন। তারপর ওঠেন ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র দপ্তরে। ৩২ নং কলেজস্ট্রীটের ঠিকানায়, মুজফফর আহমদের সাথে এক ঘরে।

দেশ তখন উত্তাল। অসহযোগ-খিলাফত আন্দোলনে। মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্বে দেশব্যাপী ব্রিটিশ বিরোধী প্রথম গণআন্দোলন। এমনই সময় তাঁর সাংবাদিকতার শুরু। ১৯২০ সালের ১২ই জুলাই ৬ নং টার্ণার স্ট্রীট (এখন আব্দুর রহমান স্ট্রীট) থেকে প্রকাশিত হয় সান্ধ্য দৈনিক ‘নবযুগ’। তৎকালীন বাংলার অন্যতম জননেতা ফজলুল হকের মালিকানায়। নজরুল ইসলাম ও মুজফফর আহমদের যুগ্ম সম্পাদনায়।

না, মুজফর আহমদ তখনও কমিউনিস্ট হননি। নজরুল তো নয়ই। দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার তেমন কোনও উদ্যোগও নেওয়া হয়নি তখনও। কার্যত এই সময়ই, মস্কোতে তৃতীয় আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেস হয়, যেখানে মেক্সিকোর কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন এম এন রায়। যাইহোক, কমিউনিস্ট না হলেও কিষাণ-মজুরের লড়াই, রুশ বিপ্লবের পথ এসব তখন ওঁদের দু’জনের চেতনাকেই নির্মাণ করছে একভাবে। এমন দিনকালে ওঁদের যুগ্ম সম্পাদনায় যে ‘নবযুগ’ প্রকাশিত হচ্ছে, তা ঠিক কেমন ছিল?

“ ‘নবযুগ’ ছিল বাংলা ভাষায় শ্রমিক-কৃষকদের সমস্যা সম্পর্কিত রচনায় সমৃদ্ধ প্রথম পত্রিকা।” কমরেড সরোজ মুখার্জি জানাচ্ছেন ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ও আমরা’ বইতে।

যদিও শেষঅব্দি ফজলুল হকের সাথে মতপার্থক্য শুরু হয় এবং সেই পার্থক্য বাড়তে থাকে দুজনের। ডিসেম্বর নাগাদ নজরুল ‘নবযুগ’ ছেড়ে, কলকাতা ছেড়ে চলে যান দেওঘরে। পরের মাসে বন্ধ হয়ে যায় ‘নবযুগ’। মুজফফর আহমদ গিয়ে ওঠেন ১৪/২ চেতলা হাট রোডের নতুন বাসায়। তারও পরের মাসে, অর্থাৎ ১৯২১-এর ফেব্রুয়ারি নাগাদ দেওঘরে যান নজরুলকে ফেরত আনতে। এবং ফেরত নিয়ে আসেন কলকাতায়; নিজের ঘরে।

১৯২১-এর নভেম্বর থেকে ৩/৪ সি তালতলা লেনের বাড়িতে থাকতে শুরু করেন মুজফফর আহমদ ও নজরুল ইসলাম। এই সময়ই রাতের পর রাত আলোচনা; সাথে গান, আড্ডা আর বিপজ্জনক সব পরিকল্পনা দুই স্বপ্নালু যুবার। এই সময়ই কলেজস্ট্রীটের চ্যাটার্জি এণ্ড কোং বইয়ের দোকান থেকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের একাধিক বই প্রথম কেনেন মুজফফর আহমদ। নিশ্চিতভাবেই সেসব বই পড়েন নজরুলও।

“১৯২১ সালের নভেম্বর মাসে নজরুল আর আমি ঠিক করি যে আমরা কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজে এগিয়ে যাব।” — কমরেড মুজফফর আহমদ লিখেছেন ‘স্মৃতিকথা’য়।

Smritikotha

ডিসেম্বরে নলিনী গুপ্তের সাথে সাক্ষাৎ করেন দু’জন। যদিও মুজফফর আহমদের লেখা থেকে জানি, সে সাক্ষাৎ বড় সন্তোষজনক লাগেনি তাঁদের। তবু এই নলিনী গুপ্তের মাধ্যমেই এম এন রায়ের সাথে পত্রালাপ শুরু। ১৯২২-র গোড়ার দিক থেকে চিঠি মারফত রায়ের সাথে যোগাযোগ স্থাপিত হয় মুজফফর আহমদের। এই যোগাযোগ থেকে ক্রমে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে কমিউনিজমের প্রতি আগ্রহী ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ স্থাপিত হতে থাকবে তাঁর। ওদিকে ১৯২১-এর ডিসেম্বরেই জাতীয় কংগ্রেসের আমেদাবাদ অধিবেশনে কমিউনিস্টদের পক্ষ থেকে প্রথম ইস্তাহার বিলির চেষ্টা করেন এম এন রায়। মৌলানা হজরত মৌহানি তোলেন পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব।

এদিকে আমরা তালতলার এই বাড়িতেই ফিরে আসি।

১৯২১-এর সেই ডিসেম্বরে, এই বাড়িতেই নজরুল ইসলাম লিখে ফেলেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি। যা দাবানলের মতন ছড়িয়ে পড়ল প্রকাশের সাথে সাথেই। মৌন মলিন মুখে ভাষা ফোটায় যে কবিতা।

‘দুখু’ থেকে ‘বিদ্রোহী’তে উত্তরণের এই পথ বড় মোলায়েম ছিল না তো; তা থাকেও না কখনো। দুখ বহুলোকেরই থাকে, দ্রোহে তাকে উত্তরিত করা সম্ভব হয় কারো কারো পক্ষে। এ উত্তরণ নজরুলের জীবন দেখেছে।

১৯২২-এর গোড়াতেই তালগোল পাকিয়ে গেল অনেক কিছুরই। চৌরিচৌরার ঘটনাকে কেন্দ্র ক’রে মহাত্মা গান্ধি একক সিদ্ধান্তে প্রত্যাহার করে নিলেন অসহযোগ আন্দোলন। ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ। সারা দেশের বিপুল যে জনতা তাঁর আহ্বানে উদ্বেল হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সর্বস্ব ত্যাগ ক’রে, দিশেহারা হয়ে পড়লেন সকলে। ঘিরে ধরল ব্যাপক হতাশা, বিভ্রান্তিও।

আগস্টে একক সম্পাদনায় নজরুল বের করলেন নতুন কাগজ। ‘ধূমকেতু’। আর প্রথম সংখ্যাতেই (১১ই আগস্ট) সমস্ত বিভ্রান্তি থেকে বহুদূরে দাঁড়িয়ে জানালেন নিজের স্পষ্ট বক্তব্যঃ

“স্পষ্ট কথা বলায় একটা অবিনয় নিশ্চয় থাকে, কিন্তু তাতে কষ্ট পাওয়াটা দুর্বলতা। নিজেকে চিনলে, নিজের সত্যকেই নিজের কর্ণধার মনে জানলে নিজের শক্তির উপর অটুট বিশ্বাস আসে। এই স্বাবলম্বন, এই নিজের ওপর অটুট বিশ্বাস করতেই শেখাচ্ছিলেন মহাত্মা গান্ধীজী। কিন্তু আমরা তাঁর কথা বুঝলাম না, ‘আমি আছি’ এই কথা না বলে সবাই বলতে লাগলাম, ‘গান্ধীজী আছেন’। এই পরাবলম্বনই আমাদের নিষ্ক্রিয় করে ফেললে। একেই বলে সবচেয়ে বড় দাসত্ব। অন্তরে যাদের এত গোলামির ভার, তারা বাইরের গোলামি থেকে রেহাই পাবে কীকরে?… নিজে নিষ্ক্রিয় থেকে অন্য একজন মহাপুরুষকে প্রাণপণে ভক্তি করলেই যদি দেশ উদ্ধার হয়ে যেত, তাহলে এই তেত্রিশ কোটি দেবতার দেশ এতদিন পরাধীন থাকত না।”

চলিত বাংলায় প্রথম সংবাদপত্র ‘ধূমকেতু’ই, নজরুল ইসলামই এ প্রশ্নে প্রথম পুরুষ। ‘ধূমকেতু’তে নজরুলের গদ্য ছিল মারকাটারি। ‘বিদ্রোহী কবি’র মেজাজেই স্পষ্টাস্পষ্টি নিজের বক্তব্যকে হাজির করতেন জনসমক্ষে। ১৩-ই সেপ্টেম্বর সংখ্যায় লিখছেনঃ

“সর্বপ্রথম ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়।

স্বরাজ-টরাজ বুঝি না কেননা ও কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন।…” 

রাজনৈতিক ভাষ্য নির্মাণের প্রশ্নে তো বটেই, বাংলা ভাষায় রাজনৈতিক গদ্যেরও নতুন স্টাইল তৈরি করে দিয়েছেন নজরুল ইসলাম। প্রখর, সাহসী এবং স্মার্ট। আজ থেকে প্রায় শত বছর আগে।

ধূমকেতুর আয়ু বড় দীর্ঘ হয় না। প্রসঙ্গত, এক্ষেত্রেও হয়নি। ২৬শে সেপ্টেম্বর তারিখের সংখ্যায় বেরোয় লীলা মিত্রের ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ’ এবং নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি। এই দুটি লেখার জন্য বাজেয়াপ্ত হয় সংখ্যাটি। নজরুল ফেরার হন। ২৩শে নভেম্বর তারিখে কুমিল্লা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ পুলিশ। ‘রাজদ্রোহ’-এর অপরাধে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। প্রথমে আলিপুর সেন্ট্রাল জেল, পরে কোমরে দড়ি পরিয়ে কবিকে নিয়ে যাওয়া হয় হুগলী জেলে।

হুগলি জেলে দীর্ঘ অনশন করছেন যখন নজরুল, তখন বাইরে গড়ে ওঠে আন্দোলনও। নেতৃত্বে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। পরে নজরুলকে স্থানান্তরিত করা হয় বহরমপুর জেলে। এবং ১৯২৪-এর ডিসেম্বরে সেখান থেকেই ছাড়া পান তিনি। এরই মধ্যে, কিন্তু, ১৯২৩-এর ১৭-ই মে কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে গেছেন মুজফফর আহমদ।

কারামুক্তির পরও নজরুল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকেন। চিত্তরঞ্জন দাশের সাহচর্যে এসময়। ১৯২৫-এর জুনে চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর কয়েক মাস পর নভেম্বরের ১ তারিখ নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক ইস্তাহার মারফত বাংলায় ‘লেবার স্বরাজ পার্টি অব দ্য ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস’ গঠনের ঘোষণা করা হয়। কংগ্রেসের মধ্যেই বাম ধারার একটি সংগঠন হিসেবে এটিকে গড়ে তোলা হয়, যার মুখপত্র হয় ‘লাঙল’।

‘লাঙল’-এর সত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম। সম্পাদক হিসেবে মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের নাম থাকলেও, সম্পাদক কার্যত নজরুলই ছিলেন।

‘লাঙল’ ছিল কৃষকের প্রতীক। ‘ধূমকেতু’র পর ‘লাঙল’-এ শ্রেণি অভিমুখ খানিক স্পষ্টতা লাভ করেছিল, একথা অনস্বীকার্য। এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতেই প্রকাশিত হয় নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ কবিতাটি। নজরুলের কবিতাতেও একটা বাঁক বদলায় এখানে। “আমার লেখার উদ্দামতা হয়ত কমে আসছে— তার কারণ আমার সুরের পরিবর্তন হয়েছে। আপনি কি আমার ‘সাম্যবাদী’ পড়েছেন?” — আনোয়ার হোসেনকে চিঠিতে লেখেন নজরুল।

এদিকে ১৯২৬-এর একেবারে শুরুতেই কলকাতায় ফিরে এসেছেন মুজফফর আহমদ। ওঠেন ৩৭ নং হ্যারিসন রোডে ‘লাঙল’ দপ্তরে। প্রায় আড়াই বছরের কারাজীবন শেষে যক্ষা রোগ বুকে নিয়েই ফিরেছিলেন তিনি। ফিরেই ‘লাঙল’-এর চতুর্থ সংখ্যায় “ভারত কেন স্বাধীন নয়” শীর্ষক প্রবন্ধ লেখেন। ‘লাঙল’-এর শ্রেণিদৃষ্টিভঙ্গিকে আরও স্পষ্টতা দেওয়ার ব্যাপারে মুজফফর আহমদ যে অত্যন্ত যত্নশীল ও সচেষ্ট ছিলেন তা তাঁর এই লেখা থেকে বোঝা যায়। বোঝা যায় পরের সংখ্যাগুলি থেকেও।

এক মাস পরই, ফেব্রুয়ারির ৬ ও ৭ তারিখই কৃষ্ণনগর টাউন হলে ‘লেবার স্বরাজ পার্টি’র দ্বিতীয় সম্মেলন হয়। সংগঠনের নাম পরিবর্তিত হয়- ‘বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দল’। আর কংগ্রেসের মধ্যের একটি সংগঠন হয়ে না থেকে স্বতন্ত্র অস্বিত্ব নিয়েই আত্মপ্রকাশ করে দলটি। কার্যকরী কমিটিতে নির্বাচিত হন নজরুল ইসলাম ও মুজফফর আহমদ দু’জনই। মুখপত্র থাকে ‘লাঙল’-ই।

যদিও ১৫ই এপ্রিল শেষ প্রকাশিত হয় ‘লাঙল’। তারপর বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যাওয়ার মূল কারণ ছিল আর্থিক অনটন, তার সাথে ছিল ১৯২৬ এপ্রিলে কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা পরিস্থিতি। আগস্টের ১২ তারিখ ‘বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দল’-এর নতুন মুখপত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ‘গণবাণী’।

“লাঙল কৃষকদের প্রতীক। কাগজের ‘লাঙল’ নাম হওয়াতে অনেকে ভাবতেন যে কাগজখানা কৃষকদেরই মুখপত্র। কাগজখানাকে যেভাবে পরিচাওলনা করা হত তাতে তা মেহনতী জনসাধারণের মুখপত্রেরই রূপ নিয়েছিল। তাই ঠিক করা হল যে ‘লাঙল’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘গণবাণী’ করা হবে।” — ‘সমকালের কথা’য় লিখেছেন মুজফফর আহমদ।

বিকশিত শ্রেণিচেতনার এই পত্রিকাতেই, কিছু পরে, শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক সঙ্গীতের প্রথম বাংলা তর্জমা ছাপা হয়েছিল। তখন বাংলাদেশের কারো কাছেই গানটির কোনও স্বরলিপি ছিল না, সুরটি জানতেন না কেউ। কেবলই গানের কথা প’ড়ে করা হয়েছিল বাংলা অনুবাদ। বলাই বাহুল্য— কে আর করবেন সে কাজ— একমদ্বিতীয়ম নজরুল ইসলাম ছাড়া!     

এহেন পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যাতেই এপ্রিলের দাঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে লেখেন নজরুল। ‘মন্দির ও মসজিদ’ শিরোনামে।

একদিনে নজরুল ওই লেখায় গিয়ে দাঁড়াননি। ওই সাহসী সাবলীল গদ্যে, ঐ বলিষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষ্যে আচমকা একদিন পৌঁছে যাওয়াও যায় না। ‘গণবাণী’ও তো ভুঁই ফুঁড়ে ওঠেনি একদিনে। রাজনৈতিক চেতনা ও সাংগঠনিক উদ্যোগের ধারাবাহিক বিকাশের মধ্যে দিয়েই এই ভাষা, এই বোধ অর্জন করেছি আমরা। নজরুলের পর, কাকাবাবুর পর, ‘ধূমকেতু’-‘লাঙল’-‘গণবাণী’র পর বহু পথ পেরিয়ে এসে আজও যার পুনঃপাঠ ভীষণই প্রয়োজন।

পুনরায় ফিরে পড়া দরকার বাংলা ভাষায় গণ-কবিতার প্রথম কবিকে। তাঁর যাত্রার সমগ্র পথটিকে।   

Spread the word

Leave a Reply