Resurrection is now our Keyword

মহম্মদ সেলিম

১৯৫৩, এই মাদুরাই শহরে হয়েছে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির তৃতীয় কংগ্রেস। নেতৃত্বে ছিলেন আমাদের প্রথম প্রজন্মের নেতারা। সেদিন সাধারণ সম্পাদক অজয় ঘোষকে স্বাগত-শুভেচ্ছা জানানোর জন্য গোটা রাস্তায় ছিলেন হাজারো মানুষ। যে কারণে ট্রেন পৌঁছয় দু’ঘণ্টা দেরিতে। শুধু মাদুরাই স্টেশনেই ছিলেন কুড়ি হাজারের বেশি মানুষ। ওই কংগ্রেসে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা ও জমি বণ্টন নিয়ে হয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

সিপিআই(এম) প্রতিষ্ঠার পর, ১৯৭২ সালে এই মাদুরাই শহরে হয়েছে পার্টির নবম কংগ্রেস। নেতৃত্বে ছিলেন আমাদের নবরত্ন নেতারা। এই শহরের রয়েছে লড়াই-সংগ্রামের এক উজ্জ্বল ইতিহাস। প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক কমরেড সীতারাম ইয়েচুরি যেমন বলেছিলেন, ‘মাদুরাই, ভারতের অন্যতম বিপ্লবী কেন্দ্র।’এবার সেই শহরেই হচ্ছে ২৪-তম কংগ্রেস। সম্মেলনস্থলের নামকরণ করা হয়েছে কমরেড সীতারাম ইয়েচুরির নামে। এছাড়াও, আরও দু’টি গুরুত্বপূর্ণ কংগ্রেসের আয়োজক ছিল তামিলনাডু। সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর ১৯৯২-তে মাদ্রাজে হয় ঐতিহাসিক চতুর্দশ কংগ্রেস। গৃহীত হয় কমরেড ইয়েচুরি উত্থাপিত ‘কয়েকটি মতাদর্শগত প্রশ্নে’-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। পরে ২০০৮ সালে কোয়েম্বাটোরে উনিশতম কংগ্রেস।
১৭ অক্টোবর ১৯২০, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম ইউনিটের প্রতিষ্ঠা। ওই বছরই অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা। পরের বছরই অমর স্লোগান: ইনকিলাব জিন্দাবাদ। একশো বছর অতিক্রান্ত। একশো মানে নিছক কোনও সংখ্যা নয়। সংগ্রাম আত্মত্যাগের এক শতাব্দী।

একশো মানে স্বাধীন ভারতের চেহারা নির্মাণে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কমিউনিস্টদের নির্ণায়ক ভূমিকা। জরুরি ইস্যুগুলিকে জাতীয় অ্যাজেন্ডার কেন্দ্রে নিয়ে আসা। বিরাট আত্মত্যাগ। শহীদ বরণ। একটি তথ্যই যথেষ্ট: ১৯৪৩ সালে বোম্বাইয়ে পার্টির প্রথম কংগ্রেসে ১৫,৫৬৩ জন পার্টি সদস্যের প্রতিনিধি হয়ে যে ১৩৯ জন উপস্থিত হয়েছিলেন, তাঁরা সবমিলিয়ে জেলে ছিলেন ৪১১-বছর! অন্যভাবে বললে, রাজনৈতিক জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় পার্টি নেতারা কাটিয়েছেন জেলের ভিতরে! যেমন কল্পনা দত্ত, কমলা চ্যাটার্জিরা সাড়ে সাত বছর ছিলেন কারাগারে বন্দি। পার্টির ওপর থেকে তখন নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও কংগ্রেস চলাকালীন ৬৯৫ জন পার্টি সদস্য ছিলেন জেলে। তাঁদের মধ্যে ১০৫ জন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে।

একশো মানে ১৯২১, আমেদাবাদে কংগ্রেসের অধিবেশনে কমিউনিস্টরাই প্রথম তোলেন পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি। পূর্ণ স্বাধীনতার এই দাবি তোলেন একজন মওলানা, আর একজন স্বামী, মওলানা হসরত মোহানি আর স্বামী কুমারানন্দ। পরের বছর আবার, কংগ্রেসের গয়া অধিবেশনে কমিউনিস্টরা তোলেন পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি। গান্ধীজীর তখন পছন্দ হয়নি। আট বছর পর, শেষে ১৯২৯-এ কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে গৃহীত হয় পূর্ণ স্বরাজের স্লোগান। ১৯৩১, করাচি অধিবেশনে স্বাধীন ভারতের রূপরেখা।
১৯২২, কংগ্রেসের গয়া অধিবেশনে কমিউনিস্টরা যে ইশ্তেহার বিলি করেন, তাতে ছিল শ্রমিক ইউনিয়নের স্বীকৃতি, ধর্মঘটের অধিকার, আট-ঘণ্টার কাজের অধিকার, ন্যূনতম মজুরির জন্য লড়াই-আন্দোলনের ডাক। গয়া কংগ্রেসের এই ইশতেহারের কথাই পরে কানপুর ষড়যন্ত্র মামলায় (১৯২৪) ব্রিটিশ পুলিশ কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ হিসাবে পেশ করে।
২ অক্টোবর, ১৯৩৯। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজার পর এই বিশ্বে প্রথম শ্রমিকশ্রেণির যুদ্ধ-বিরোধী ধর্মঘট বোম্বাইয়ে। নেতৃত্বে কমিউনিস্টরা। অবশ্য তার আগেই জুলাই, ১৯০৮। ‘দেশদ্রোহের’ অভিযোগে তিলকের ছ’বছর কারাবাসের সাজা ঘোষণা। ইতিহাসবিদ বিপান চন্দ লিখছেন, প্রতিবাদে সমস্ত সুতাকল ও রেলশ্রমিকদের সর্বাত্মক ধর্মঘটে স্তব্ধ বোম্বাই। নামানো হয় সেনা। রাস্তায় শহীদ হন ১৬ জন শ্রমিক। জখম আরও ৫০ জন।

ভারতে শ্রমিকদের ধর্মঘট দেখে ‘ইনফ্লেমেবেল মেটেরিয়াল ইন ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স’ নিবন্ধে ভ্লাদিমির লেনিন লিখলেন, ‘ইতিমধ্যে ভারতেও সর্বহারা জনগণ সচেতন রাজনৈতিক গণসংগ্রাম গড়ে তুলছেন। এবং তার ফলে ভারতে রুশ ধাঁচের ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থার হালও শোচনীয় হয়েছে।’ কমরেড বিটি রণদিভে লিখছেন: ‘এই প্রথম শ্রমিকশ্রেণি সমস্ত শিল্পে তার শক্তিশালী হাতিয়ার ধর্মঘটকে ব্যবহার করল একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের জন্য এবং দেখালো সাধারণ মানুষকে জড়ো করতে পারার দক্ষতা।’

কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগেই ভারতে প্রথম ‘মে দিবস’ উদ্যাপন। কমরেড সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ারের নেতৃত্বে। এই তামিলনাডুরই মাদ্রাজে। এপ্রিল, ১৯১৮। অক্টোবর বিপ্লবের ছ’মাসের মধ্যেই, অবিভক্ত ভারতে প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা। মাদ্রাজ লেবার ইউনিয়ন। ১ মে, ১৯২৩। ভারতে প্রথম মে দিবস উদ্যাপন। অবিভক্ত ভারতের আকাশে লাল ঝান্ডা। একইসঙ্গে পালিত হয় দুই জায়গায়। একটি মাদ্রাজ হাইকোর্টর বিপরীতে সমুদ্রতটে। অন্যটি ট্রিপ্লিকিন সমুদ্র সৈকতে। সভা থেকে মে দিবসকে সরকারি ছুটির দিন হিসাবে ঘোষণার দাবি জানানো হয়। সেইসঙ্গেই, স্বাধীনতা অর্জনে শ্রমিকশ্রেণিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেওয়া হয়। পরদিন, ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় সেই প্রতিবেদন।

কমিউনিস্ট পার্টি মানে, সেলুলার জেল। স্মৃতিফলকে লেখা নামের আশি শতাংশই অবিভক্ত বাংলা ও পাঞ্জাবের কমিউনিস্টরা। শিব বর্মা, হরেকৃষ্ণ কোঙার থেকে সুধাংশু দাশগুপ্ত। যেমন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার অভিযানের অন্যতম সদস্য কল্পনা দত্ত থেকে গণেশ ঘোষ, সতীশ পাকড়াশি থেকে সুবোধ রায়।

১৯৪২, ভারত ছাড়ো আন্দোলন। তার পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে ১৯৯২ সালের ৯ আগস্ট রাত বারোটায় সংসদের বিশেষ অধিবেশন। রাষ্ট্রপতি শঙ্করদয়াল শর্মা ভাষণ দিতে গিয়ে ব্রিটিশ গোয়েন্দা দপ্তরের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ভারত ছাড়ো আন্দোলনে কমিউনিস্টদের ভূমিকা ছিল ‘ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবীর’। দেশের রাষ্ট্রপতি ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর উদ্যাপনে সংসদে দাঁড়িয়ে বলছেন, কমিউনিস্টদের ভূমিকা ছিল ‘ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবীর’! আগস্ট আন্দোলনের ঘাঁটি আমেদাবাদে পুলিশের গুলিতে প্রথম শহীদ হয়েছিলেন একজন কমিউনিস্ট কর্মী। উমাভাই ফাদিয়া। কলকাতায় যেদিন লাঠি চলেছিল পুলিশের, সেই লাঠিও সকলের আগে পড়েছিল কমিউনিস্ট ছাত্রদের মাথাতেই।

একশো মানে, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এবং পরে অসংখ্য বিপ্লবী ও শহীদের বিপুল আত্মত্যাগ। আর পার্টির নেতৃত্বে এই গৌরবময় সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে ভারতের ইতিহাস বিকাশে এক উজ্জ্বল অবদান। জনগণের প্রকৃত সমস্যা ও ইস্যুকে জাতীয় স্তরে তুলে ধরা।

স্বাধীন দেশে নতুন ভারত নির্মাণের প্রতিটি প্রশ্নে ছিলেন কমিউনিস্টরা। জমির প্রশ্নকে তোলা। জমিদার জোতদারদের বিরুদ্ধে জমির লড়াই। তেভাগা থেকে তেলেঙ্গানা। ভূমি সংস্কারের প্রশ্নকে জাতীয় অ্যাজেন্ডায় পরিণত করা। ভাষার বিপুল বৈচিত্রের স্বীকৃতি স্বরূপ ভাষার ভিত্তিতে রাজনৈতিক মানচিত্র তৈরিতে অন্যান্যদের সঙ্গে সংগ্রাম। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো, কেন্দ্র-রাজ্যের সম্পর্কের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সামাজিক ন্যায়বিচার থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা। সেই ১৯৩১, কমিউনিস্ট পার্টিই প্রথম ‘ড্রাফ্ট প্ল্যাটফরম অব অ্যাকশান’-এ জাতপাত ব্যবস্থা ও অস্পৃশ্যতার অবসানের ডাক দেয়।

ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র, সকলকে নিয়ে ভারত গড়ার কমিউনিস্ট দৃষ্টিভঙ্গির অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রকে পৃথক বলে না ভাবা। কমিউনিস্টদের নীতিগত অবস্থান হলো ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ রাজনীতি থেকে ধর্মকে পৃথক রাখা। বস্তুত, কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের পরপরই ১৯২০’র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষিতে পার্টির তরফে এমএন রায় লিখেছিলেন, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের একমাত্র প্রতিষেধক হলো সমস্ত জাত-সম্প্রদায়ের শ্রমজীবী মানুষের শ্রেণি ঐক্য।

কমিউনিস্ট পার্টি মানে কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরায় রাজ্য সরকার চালানোর অনন্য অভিজ্ঞতা। এই ব্যবস্থার মধ্যে থেকেও বিকল্পের দিশা দেখানো।

এই সময়ে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এগিয়েছে পার্টি। পরাধীন ও স্বাধীন ভারতে বহু আক্রমণ, দমনপীড়নের মোকাবিলা করতে হয়েছে। দুই ভারতেই পার্টিকে কাটাতে হয়েছে বেআইনি কাল। যেতে হয়েছে শ্রেণি ও গণসংগ্রামের নতুন রূপের মধ্যে দিয়ে। আর এই পথ কখনোই মসৃণ ছিল না। বরং মুজফ্ফর আহ্মদের কথায় তা ছিল ‘কাঁটা বিছানো’ পথ। খুন, জখম, মিথ্যা মামলা, জেল-জরিমানা! কী কঠিন ও জটিল পরিস্থিতি, কী প্রতিকূল অবস্থা! পার্টি সাফল্যের সঙ্গে সেইসব পরিস্থিতি অতিক্রম করেছে। কত আক্রমণ, কত কুৎসা, কত উগ্র জাতীয়তাবাদী অপপ্রচার, পার্টির বিরুদ্ধে জনগণকে বিভ্রান্ত করার কত অপপ্রয়াস! কিন্তু পার্টি বিচলিত হয়নি, হতোদ্যম হয়নি।

এর মধ্যেই অবিভক্ত পার্টির অভ্যন্তরে মতাদর্শগত বিতর্ক। শ্রেণিসংগ্রাম বনাম শ্রেণিসহযোগিতার লাইন নিয়ে আড়াআড়ি অবস্থান। ১১ এপ্রিল, ১৯৬৪, সংশোধনবাদী লাইন পরিত্যাগ করে জাতীয় পরিষদ থেকে ৩২ জন সদস্যের বেরিয়ে আসা। তিনদিন বাদে, তাঁদের তরফে পার্টির সমস্ত সদস্যের কাছে এক যৌথ বিবৃতি। শেষে জুলাইয়ে তেনালি কনভেনশন। পার্টির পতাকা উত্তোলন করে মুজফ্ফর আহ্মদের আহ্বান ছিল: ‘আসুন, আমরা একটি প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার অঙ্গীকার করি।’ ওই বছরই অক্টোবরের শেষে কলকাতার মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে রাজ্য সম্মেলন। সেখানে তেনালি কনভেনশনের সেই প্রস্তাবকে সমর্থন। আর অক্টোবরের শেষদিন থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত কলকাতার ত্যাগরাজ হলে সপ্তম কংগ্রেস। সারা দেশের ১,০৪,৪২১ জন পার্টি সদস্যের প্রতিনিধি হিসাবে উপস্থিত ৪২২ জন প্রতিনিধি। এভাবেই প্রায় এক দশক চলা মতাদর্শগত সংগ্রামের শেষে পুনর্গঠিত হয় বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)’র আত্মপ্রকাশ।

সাম্রাজ্যবাদ থেকে সঙ্ঘ। বরাবরের টার্গেট কমিউনিস্টরা। বিপরীতে, গণবিপ্লবী পার্টি গড়ার ডাক থেকে গণ-লাইন সম্পন্ন বিপ্লবী পার্টি গড়ার অঙ্গীকার। সাধারণ মানুষের ভরসার উপযুক্ত হিসাবে নিজেদের গড়ে তোলার শপথ।

আবার একশো মানে, শুধু ইতিহাস চর্চা নয়। পিছনে ফিরে দেখা নয়। অতীতকে দেখা মানে আজকের সময়কে মোকাবিলা করে সামনের দিকে এগিয়ে চলা। অতীতকে আমাদের জানতে হবে। বোঝার চেষ্টা করতে হবে। অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে। কিন্তু, কমিউনিস্টরা কখনও অতীতের কারাগারে বন্দি হয়ে থাকতে পারে না। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, লড়াই-সংগ্রাম, নানা ত্রুটি-বিচ্যুতির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েই বোম্বাই থেকে মাদুরাই, ২৪-তম কংগ্রেসের পথে।

আজ এক কঠিন সময়। রাজনৈতিকভাবে নয়া উদারবাদের সঙ্কটের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে অতি দক্ষিণপন্থা ও নয়া ফ্যাসিস্তদের বাড়বাড়ন্তে। ভারতে, একথা ঠিক, লোকসভা নির্বাচনে তাৎপর্যপূর্ণ ধাক্কা খেয়েছে বিজেপি। কিন্তু রয়ে গিয়েছে মসনদে। রয়ে গিয়েছে বিপদ। এককভাবে গরিষ্ঠতা না পেলেও বিজেপি সরকার গড়েছে। এককভাবে গরিষ্ঠতা না পেলেও বিজেপি এখনও একক-বৃহত্তম দল। পেয়েছে ৩৬.৫৭ শতাংশ ভোট। পাঁচ বছর আগের তুলনায় ভোট কমেছে সামান্যই, ১.১ শতাংশ। প্রধানমন্ত্রীর তৃতীয় ইনিংসে নরেন্দ্র মোদী। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলি দখল করার সঙ্গেই শিক্ষা, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সমস্ত ক্ষেত্রেই হিন্দুত্বের মতাদর্শকে চাপিয়ে দেওয়ার অভিযান অব্যাহত। চলছে বিদ্বেষ-বিভাজনের রাজনীতি। মসজিদের মাটি খুঁড়ে মন্দির খোঁজার ফিকির। দেশের সামনে বিপদ তাই কাটেনি। এই ধরনের মনোভাবকে আমরা খসড়া প্রস্তাবে নয়া ফ্যাসিস্ত প্রবণতা বলে চিহ্নিত করেছি।

বৃহত্তর ঐক্য গড়ে আমরা যদি এই প্রবণতাকে রুখতে না পারি তবে নয়া ফ্যাসিবাদ আমাদের দেশে কায়েম হবে। এই বিষয়ে আমাদের সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে। বাম-গণতান্ত্রিক শক্তিকে এর বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে চালাতে হবে মতাদর্শগত সংগ্রাম।
গত লোকসভা নির্বাচনের আগে ‘ইন্ডিয়া মঞ্চ’ গঠনের মধ্য দিয়ে বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ করে বিজেপি’র সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন ঠেকানো গেছে। ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলির বৃহত্তর ঐক্যের জন্যই এটা জরুরি ছিল। কিন্তু সিপিআই(এম)’র স্বাধীন শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গেই বামপন্থীদের শক্তিশালী করতে হবে। আরএসএস’র সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ এখন দেশের নানা প্রান্তে জনভিত্তি পেয়েছে। এর বিরুদ্ধে মতাদর্শগত এবং রাস্তার লড়াই লড়তে গেলে সিপিআই(এম)’র স্বাধীন শক্তিবৃদ্ধি ও বামপন্থীদের শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।
মানব সভ্যতার ইতিহাস সাক্ষী, প্রত্যেক যুগে নতুন নতুন ধরনের সঙ্কট, বৈষম্য হাজির হয়। নতুন প্রজন্মের উন্নত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কৃৎকৌশল আবিষ্কার করে সেই সঙ্কটের মোকাবিলা করে উত্তরণ ঘটানোর চেষ্টা হয়। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন হয় পরিস্থিতির বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ, শতাব্দী সঞ্চিত অভিজ্ঞতা, উন্নততর দর্শন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং তার প্রয়োগ। প্রথমত, মার্কসবাদী-লেনিনবাদী হিসাবে আমাদের পাথেয় উন্নততর মতাদর্শ। তাতে নিজেদের আরও শাণিত করতে হবে। মতাদর্শের চর্চাই শেষ কথা নয়, শ্রেণি আন্দোলন-সংগ্রাম, সংগঠনের মধ্য দিয়ে সেই মতাদর্শকে প্রয়োগ করতে হয়। তা থেকে লব্ধ শিক্ষাকে আয়ত্ত করে, মার্কসবাদের সৃজনশীল প্রয়োগের মাধ্যমে আমাদের সংগঠনকে আরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলা, পরিচালনার জন্য আরও যত্নশীল, পারদর্শী হয়ে উঠতে হবে। সংগঠন গড়ে তোলা এবং পরিচালনায় আরও নিষ্ঠা, সততা ও ত্যাগের ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নীতিনিষ্ঠভাবে সাংগঠনিক কায়দা কানুন প্রয়োগ করতে হবে।

বাংলার এই মাটি শক্ত মাটি। শত শহীদের রক্তে-আত্মত্যাগে উর্বর প্রতিরোধের মাটি। আমরা হেরেছি ঠিকই। কিন্তু হারিয়ে যাইনি। আমরা নিশ্চিত, ঘুরে দাঁড়াবে এই বাংলা। ঘুরে দাঁড়াবেই। পরাজয় মানে শেষ কথা নয়। সংগ্রামে পিছিয়ে পড়া মাত্র। প্রতিটি পরাজয়ই আসলে শ্রমিকশ্রেণি, মেহনতি মানুষের জন্য ভবিষ্যতের সংগ্রামকে শক্তিশালী করার একটা শিক্ষা।

পশ্চিম এশিয়ার শহীদ মার্কসবাদী চিন্তক মাহদি আমেল যেমন বলেছেন, You are not defeated, As long as you are resisting! তুমি ততক্ষণ পরাজিত নও, যতক্ষণ তুমি প্রতিরোধে!

Resurrection is now our Keyword! বাংলার পুনর্জাগরণের জন্য প্রয়োজন বামপন্থার পুনরুত্থান! বামপন্থার পুনরুত্থানেই নিহিত বাংলার ভবিষ্যৎ! আর সেকারণে সিপিআই(এম)’র পুনরুত্থান অতীব জরুরি।

Spread the word

Leave a Reply