Panchayat: A Story Of Loot (Part XI)

চন্দন দাস

একাদশ পর্ব

মহিলা খেতমজুররা রাজ্যে প্রথম সম্মেলন করেন ১৯৭৫-এ! জরুরী অবস্থার মধ্যে। উপস্থিত ছিলেন ১০৪জন।

সম্মেলনটি হয়েছিল উত্তর ২৪ পরগনার হাড়োয়াতে। তখন অবশ্য অবিভক্ত ২৪ পরগনা। কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপের মহিলা খেতমজুরদের সেখানে উপস্থিত হওয়ার পরিবেশ ছিল না। রাজ্যে তীব্র সন্ত্রাস — তৃণমূলীদের পূর্বসূরীদের। আশেপাশের কয়েকটি থানা এলাকার খেতমজুর মহিলারাই সেই সম্মেলনে উপস্থিত হতে পেরেছিলেন। সিপিআই(এম)-র ত্রয়োদশ রাজ্য সম্মেলনের রিপোর্ট জানাচ্ছে,‘‘তার মধ্যে কেবল আদিবাসী মেয়েরাই নয়, মুসলিম খেতমজুর মেয়েরাও থাকেন এবং বেশ কয়েকজন আলোচনায় শরিক হন। এ রকম সম্মেলন পশ্চিমবাংলায় প্রথম।’’

প্রশ্ন স্বাভাবিক — কৃষক সভা মহিলা খেতমজুরদের সম্মেলন আয়োজন করল কেন?

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের মধ্যেই তখন রাজ্যে খেতমজুরদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন চলছিল। প্রায় ছ’ হাজার গ্রামে খেতমজুরদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল। প্রভাব পড়েছিল আরও প্রায় পাঁচ-ছ’ হাজার গ্রামে। খেতমজুর ও গরিব কৃষকদের মধ্যে বিপুল উদ্দিপনা দেখা দেয়। সামগ্রিকভাবে এই অর্থনৈতিক আন্দোলন রাজ্যের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছিল।

সেই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন খেতমজুর, গরিব কৃষক পরিবারের মহিলারা।

ইঙ্গিত স্পষ্ট — গ্রামের সরকার প্রতিষ্ঠা হলে মহিলারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবেন।

হলোও তাই। ভূমিসংস্কার এবং পঞ্চায়েত গ্রামের গরিবের জাগরণে প্রধান দুটি অনুঘটক। একইসঙ্গে তা সামন্ততন্ত্রের লালন পালনে আধিপত্য কায়েম করে বসে থাকা লিঙ্গ বৈষম্যকে জোরালো আঘাত করেছিল।

ভূমিসংস্কারের মাধ্যমে প্রায় ৩০লক্ষ পরিবার জমি পেলেন। সেই ভূমিসংস্কারেই মহিলা-পুরুষ যৌথ পাট্টার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হল প্রায় ৬লক্ষ ৪ হাজারটি পরিবারে। ১লক্ষ ৬২ হাজারের বেশি পাট্টার অধিকারী হয়েছেন শুধু মহিলারা — সারা দেশে এই দৃষ্টান্ত তৈরি হল।

আর্থিক স্বনির্ভরতার ভিত্তি গড়ে তুলল সিদ্ধান্ত গ্রহণের দুনিয়ায় সমানাধিকারের ভিত।

এখন উল্‌টো ছবির আয়না পশ্চিমবঙ্গ। গনতন্ত্র যখন বিধ্বস্ত মহিলারা আক্রান্ত হবেনই। প্রমাণ আজকের পশ্চিমবঙ্গ। মাইলের পর মাইল পঞ্চায়েত দখল করেছে তৃণমূল ২০১৮-তে। সেই ‘বিরোধীশূণ্য’ পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় মহিলাদের ঠকিয়ে লুটের পঞ্চায়েত।

একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। উদাহরণ হোক একশো দিনের কাজের প্রকল্প(রেগা)।

২০২১-২২ আর্থিক বছরে রেগা মহিলারা গড়ে কাজ পেয়েছেন ৩৩.২৮ দিন। রাজ্য সরকারের হিসাব। অথচ গড়ে গ্রামবাসীরা ৪৭.৯৪ দিন কাজ পেয়েছে বলে রাজ্য সরকারই জানাচ্ছে। অর্থাৎ কাজ মহিলাদের কম দেওয়া হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য কত? প্রায় ১৫৯৫ টাকা ৩৬ লক্ষ ৭৬ হাজার ৫২৩ টাকা।

শুধু এই একটি বছরের তথ্য নয়।  

২০১৮-১৯-এ এই বৈষম্য আরও অনেক বেশি। সেই আর্থিক বছরেই পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়েছিল। বিরোধীদের প্রার্থী পদ জমা দিতেই দেওয়া হয়নি। পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রার্থী পদ জমা দিতে যাওয়া বামফ্রন্টের মহিলা প্রার্থীকে চুলের মুঠি ধরে, রাস্তায় ফেলে মেরেছিল তৃণমূলের নেতারা। এমন আক্রমণের ঘটনা আরও ঘটেছিল রাজ্যে। সেই পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরে নতুন লুটের পঞ্চায়েত বানিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রীর দলবল। দেখা গেল সে বছর গড়ে কাজের দিন হয়েছে ৭৭.০৩ দিন। আর মহিলাদের? ৪৬.৮৩ দিন। 

ঠকেছেন মহিলারা। মারাত্মকভাবে তাঁদের ঠকিয়েছে তৃণমূল।

আগেও এমনই ঘটেছে। যেমন ২০১৪-১৫। গড় কাজের দিন ছিল ৩৩.১৩দিন। মহিলারা কাজ পেয়েছিলেন ২৪.২১দিন। ২০১৫-১৬-তে গড় কাজের দিন দেখানো হয়েছিল ৪৬.৮৮দিন। মহিলাদের গড় কাজের দিন ছিল ৩৩.১০। ২০১৬-১৭-তে গড় কাজের দিন ছিল ৪০.৪৩দিন। মহিলাদের গড় কাজ ছিল ২৮.৮০দিন।

সেই মহিলাদের অধিকার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি উচ্চারিত হয়েছিল ১৯৭৮-র পার্টির সেই রাজ্য সম্মেলনে মহিলা ফ্রন্টের রিপোর্টে। লেখা হল,‘‘…সর্বনিম্ন স্তরের ব্লক কমিটি, পঞ্চায়েত, মিউনিসিপ্যালিটি, কর্পোরেশন থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরের মধ্যে যথাসম্ভব দায়িত্বের মধ্যে টেনে এনে নারী কর্মীদের সামাজিক ও প্রশাসনিক কাজে শিক্ষিত ও যোগ্য করে তুলতে হবে।’’ পার্টি ‘গ্রামের সরকার’ গড়ে তোলার পথে গরিব পরিবারের মহিলাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছে। মহিলাদের জন্য পঞ্চায়েতে এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ তার নজির। মহিলাদের জন্য ৫০% আসন সংরক্ষণের উদ্যোগও বামফ্রন্টেরই।

এরই মাধ্যমে দেশের সামনে হাজির হল কুলটিকরি! প্রথম মহিলা পরিচালিত পঞ্চায়েত।

অবিভক্ত মেদিনীপুর তখন। আজ তা ঝাড়গ্রাম জেলার মধ্যে। ব্লকের নাম সাঁকরাইল। মাওবাদী-তৃণমূলী সন্ত্রাসে সেই জনপদ মারাত্মকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে। ১৯৯৮-এ সেই সাঁকরাইল ব্লকের কুলটিকরি পঞ্চায়েতটির প্রত্যেক সদস্য হলেন মহিলা। ২০০৮ পর্যন্ত সেই ধারাই অক্ষুন্ন ছিল।

চতুর্থ পঞ্চায়েত নির্বাচন ১৯৯৩-এ। তার আগে রাজ্যের পঞ্চায়েত আইন সংশোধন করে বামফ্রন্ট সরকার। চালু হয় পঞ্চায়েতে মহিলাদের এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ। সংবিধানে এই সংক্রান্ত সংশোধন তারপরে। রাজ্যে ১৯৯৩-র নির্বাচনে প্রায় ৫৬হাজার সদস্যের মধ্যে প্রায় ২২হাজার মহিলা সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৮-এ মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ পদাধিকারীদের ক্ষেত্রেও চালু হল। অর্থাৎ প্রধান, উপপ্রধান থেকে সভাধিপতি, সহ-সভাধিপতি পদও মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত হল। ৭জন সভাধিপতি মহিলা হলেন — উত্তর ২৪ পরগনায় অপর্ণা গুপ্ত, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় শোভা দত্ত, হাওড়ায় ছায়া সেন চৌধুরী, কোচবিহারে চৈতি বর্মন, জলপাইগুড়িতে দীপ্তি দত্ত, মালদহে শেফালি খাতুন এবং বাঁকুড়ায় তরুবালা বিশ্বাস।

এই ক্ষেত্রে উল্লেখ্য, পঞ্চায়েতে মহিলাদের কোনও সংরক্ষণ ছাড়া নির্বাচিত হওয়ার প্রবণতা প্রথম থেকেই দেখা গেছে। যেমন, ১৯৮৮। পঞ্চায়েতে ৫৭০৫জন মহিলা নির্বাচিত হন। পঞ্চায়েত সমিতিতে ৪০৭জন এবং জেলা পরিষদে ২৪জন মহিলা জয়ী হয়েছিলেন। এই ধারা ক্রমাগত প্রসারিত হয়েছে।

কিন্তু হরিয়ানা, রাজস্থান কী বলছে? সেখানে বিজেপি-র সরকার। পঞ্চায়েত সংক্রান্ত আইন পাশ করিয়েছে সেখানকার রাজ্য সরকার। কী আছে?

পঞ্চায়েত নির্বাচনের সমস্ত প্রার্থীদের ন্যূনতম মাধ্যমিক পাশ হতেই হবে — রাজস্থানে নির্দিষ্ট এই ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকায় গ্রামীণ জনসংখ্যার ৭৫%-ই ভোটে দাঁড়াতে পারেননি, তাঁদের বয়স ২০ বছরের ঊর্ধ্বে হওয়া সত্ত্বেও। তফশিলি জাতির ৯৩% মহিলা এবং সামগ্রিকভাবে ৮২% মহিলা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেননি বিজেপি শাসিত সেই রাজ্যের নির্বাচনে।

হরিয়ানাতেও এভাবেই বঞ্চিত হয়েছেন সমাজের তথাকথিত পিছিয়ে পড়া সাধারণ মানুষেরা। তার মধ্যে মহিলারাও আছেন। রাজস্থানে ১৩টি পঞ্চায়েত এবং হরিয়ানায় ২১টি পঞ্চায়েতে সরপঞ্চ নির্বাচনই সম্ভব হয়নি। দুই রাজ্যে ব্লক স্তরে যথাক্রমে ৭০% এবং ৫০% প্রার্থীপদ নির্বাচনের সময় বাতিল হয়েছে।

অর্থাৎ কৌশলে মহিলা, আর্থিক-সামাজিক ভাবে পিছিয়ে থাকা অংশকে পঞ্চায়েত পরিচালনার সংবিধানসম্মত অধিকার থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে উচ্চবর্ণ, ধনীদের পরিচালিত বিজেপি। মারাত্মক আক্রান্ত মহিলাদের অধিকার।

আর উত্তর প্রদেশে? দেশের বেশিরভাগ রাজ্যে পঞ্চায়েতে মহিলাদের ৫০% আসন সংরক্ষণের নিয়ম আছে। যোগী-রাজ্যে নেই!

বিজেপি-র পঞ্চায়েত ভাবনা এমনই।

ক্রমশ

পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ব্যবস্থার অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক চন্দন দাসের এই প্রবন্ধটি মোট ১২ টি পর্ব প্রকাশিত হবে।

Spread the word

Leave a Reply