Greed Will Kill Us : Joshimath Just The Beginning – Mayukh Biswas

চীন সীমান্ত ঘেষা চামোলি জেলার ঐতিহাসিক শহর যোশীমঠ। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ছ’হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতে হাতে গোনা যে কটি বিশ্বখ্যাত শীতকালীন ক্রীড়াক্ষেত্র আছে, তারমধ্যে অন্যতম আউলি। সেখানে যেতে গেলে এই যোশীমঠই ভরসা। চারধামের (যমুনোত্রী, গঙ্গোত্রী, কেদারনাথ ও বদ্রীনাথ) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাম বদ্রীনাথ, শিখ সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান হেমকুন্ড সাহেব, রূপের ডালি সাজিয়ে থাকা ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্সের প্রবেশপথ উত্তরাখণ্ডের এই প্রাচীন শহর। ধৌলি গঙ্গা ও অলকানন্দার সঙ্গমস্থল বিষ্ণুপ্রয়াগ থেকে যোশীমঠের দূরত্ব প্রায় ১৩ কিলোমিটার। প্রতিবছর এখানে কয়েক লাখ তীর্থযাত্রী এবং পর্যটক এখানে আসেন। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে ২০২২ সালে প্রায় পাঁচ কোটি পর্যটক, ৩.৮ কোটি কানেয়ার যাত্রী এবং ৪৫ লাখ চারধাম যাত্রী উত্তরাখণ্ডে গিয়েছিলেন। করোনা পরবর্তীকালে অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রের মতোই ভীড় জমেছিলো এখানে। বহু বছর পূর্বে গৌরা দেবী পরিবেশ-জঙ্গল বাঁচানোর জন্যে এই শহরের পাশে রৈণী গ্রামে শুরু করেন চিপকো আন্দোলন। শীতকালে এই যোশীমঠে বদ্রীনাথের দেবতার মূর্তি নৃসিংহ মন্দিরে রাখা হয়। ট্রেকিং প্রিয় নব্য-বাঙালীর নয়নের মণি ভ্যালি অব্ ফ্লাওয়ারস্, হেমকুণ্ড সাহিব, চ্যাং ব্যাং বেস ক্যাম্প যাওয়ার পথে যে অসংখ্য গ্রাম পরে, তাঁদেরও শীতকালীন ঠিকানাও হয় এই যোশীমঠেই।

শিকড়ের সন্ধানে

এই চামোলি জেলায় সিপিআই(এম) প্রভাব আছে কিছু গ্রামে। উত্তরাখণ্ডের এই অংশ অর্থাৎ চামোলি ও পাশ্ববর্তী গোপেশ্বর, কর্ণপ্রয়াগ বা একটু দূরের রুদ্রপ্রয়াগে ছাত্র রাজনীতি করতে এসে বার বার পরিচয় হয়েছে স্থানীয় লোকসংস্কৃতির সাথে। এই অঞ্চলের দ্রোণগিরি গ্রাম বিশ্বাস করে গন্ধমাদন পর্বত তাদের উপাস্য এবং হনুমান তাদের গ্রামের সম্পদ লুঠ করে নিয়ে গেছে।অনেকটা হলিউডের ‘অবতার’ সিনেমার মতো। জল জমি জঙ্গল রক্ষার পৌরাণিক রূপ এই প্রাচীন গ্রাম। সেই গ্রামের লোককথা বলে, সেই থেকে গ্রামে নিদান দেওয়া হয়, বজরঙ্গবলীর যেন পুজো না করা হয়। আজও সেই রীতি বজায় রয়েছে।  এই অঞ্চলের কিছু গ্রামে রয়েছে দুর্যোধনের মন্দির। দুর্যোধন এখানে কোনও ভিলেন নন। বরং তিনি এখানকার উপাস্য দেবতা। গ্রামবাসীরা বিশ্বাস করেন, মহাভারতের যুদ্ধে হেরে গিয়ে দুর্যোধন এখানকার জলাশয়ে লুকিয়েছিলো। এই জেলার পাশেই রুদ্রপ্রয়াগ জেলার লামগোন্ডি গ্রামে আছে বানাসুরের মন্দির। পুরাণ বলে এই অসুরকে কেন্দ্র করে জন্যে শিব ও বিষ্ণুর মধ্যে মারাত্মক লড়াইও হয়। এদিকে ট্রেকিং করতে আসা বহু মানুষের স্মৃতিতে থাকবে কিভাবে আমাদের দেশের আদিম অধিবাসীদের নিয়ে গর্বের কেন্দ্র বিন্দু হয়ে আছে (এখন বলা ভালো ‘ছিলো’) এই পাহাড়ী অঞ্চলের নানা ছোট ছোট জনপদ। তাদের লোকাচার-লোককথার মাধ্যমে।
এই লোকসংস্কৃতি, লোকসম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাস ও আচার-আচরণ, জীবন-যাপন প্রণালী, চিত্তবিনোদনের উপায় ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সংস্কৃতি। এটা সম্পূর্ণই তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা এই সংস্কৃতি তাদের প্রকৃত পরিচয় বহন ‘করেছিলো’। এখন এই সংস্কৃতিকেই ভুলিয়ে দেওয়ার ছক করছে সংঘ। এক রাজা, এক নীতি, এক ভাষা, এক শাসন চালু করে। আর মানুষ শিকড় ভুলে গেলে, জল জমি জংগলের প্রতি ভালোবাসা ভুললে আসল মুনাফা হয় কর্পোরেটের। যে প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে বাঁচতো প্রাচীন জনপদ, আজ তা সংকটে।কারণ ‘স্বচ্ছ ভারতে’ নদীও এই রাজ্যে বিক্রি হচ্ছে। আদানি বা কর্পোরেটরা প্রকৃতির তেরোটা বাজিয়ে অতিসংবেদনশীল অঞ্চলে নদীকে আটকে যথেচ্ছ বাঁধ বানাচ্ছে এবং সেখানে মানুষ ঘর হারাচ্ছে- জঙ্গল সাফ হচ্ছে। এই শিল্পগোষ্ঠীগুলিই আবার জল ছাড়ছে, বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে, তাদের মর্জি মাফিক। ‘ঢঙ্গিবাবা’ রামদেবের পতঞ্জলি ব্যবসার বিশাল বাজার খুলে বসেছে এখানকার দুর্লভ প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ করে। আর উত্তরাখণ্ডের ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’ নির্বাক দর্শক। 


‘ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে/অন্ধ সে জন শুধু মারে আর মরে।’

লোভের বশে ধর্মীয় পর্যটনের নামে পরিষেবার অতি উৎপাদন, বাস্তুতন্ত্রের সাথে যা কিনা সঙ্গতিহীন, এই বিপদ, এই মহামৃত্যুভয় ডেকে এনেছে। অর্থনৈতিক অধোগতি যে বিপুল অংশের মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে, সেই নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে দেয় অলৌকিক/অতিমানবিক শক্তির প্রতি নির্ভরশীলতা। এই দুর্বলতার সুযোগ নেয় কর্পোরেট মদতপুষ্ট রাষ্ট্রীয় সাম্প্রদায়িকতা। তাই বাসস্থান, পানীয় জলের সমস্যার তুলনায় অগ্রাধিকার পায় কেবল-কারে চাপিয়ে “দেব দর্শনের” ব্যবস্থাপনা। আর এখানেই বেঁধেছে গ্যাড়াকল। মোদির ‘ডবল ইঞ্জিন’ এর অবিমৃষ্যকারীতার ফল ভোগ করছে গোটা দেবভূমি। একদিকে মোদীর ‘হিন্দু জাগরণের’ স্বপ্নের মহা কর্মযজ্ঞ- চারধামের রাস্তা চওড়া, অন্যদিকে চীন জুজু দেখিয়ে অবৈজ্ঞানিকভাবে চীন সীমান্তে যাওয়া সবকটা রাস্তায় একটার পর একটা প্রজেক্ট। অসংখ্য টানেল। অসংখ্য ছোট বড় বাঁধ। হিমালয়ের মতো নবীন ভঙ্গিল পর্বতে। যেখানে ভূ-কম্পন যে কোনোও সময় হতে পারে। অরুণাচল থেকে কাশ্মীর অবধি যে কোনোও জায়গায়। যে কোনোও সময়ে। সরকার বাহাদুরের সর্বগ্রাসী লোভ শেখেনি ২০১৩ সালের ‘হিমালয়ান সুনামি’ থেকে। প্রায় পুরোটাই নিশ্চিহ্ন হতে বসেছিল গাড়োয়াল। সেই বিপর্যয়ের কয়েক বছর পরে গিয়েও দেখেছি ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তন। সরু নদী হয়েছে বেশ চওড়া। নদীর বেস লেভেলও উঠেছে ৪ মিটারের মত। সেদিনের ধ্বংসের ছাপ ছিলো সর্বত্র মন্দাকিনী নদীর পাশে ছোট্ট জনপদ গুলিতে। কিন্তু শিক্ষা নেয়নি সরকার। সরকারের স্বল্পকালীন মুনাফার জন্যে এই ভয়ংকর বিপদের সম্মুখীন এতোগুলো মানুষ। ২০২১ এর রিপোর্ট বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে অন্তত ১২৮টি ধসের মুখে পড়েছে চামোলি-যোশীমঠ এলাকাটি। ২০২১ সালে তপোবন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছেই কাদা-ধসের বন্যায় তলিয়ে গিয়ে প্রায় ২০০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। তারমধ্যে বেশীরভাগই পরিযায়ী শ্রমিক ছিলো। উত্তরাখণ্ডে সিপিআইএম সীমিত ক্ষমতা নিয়েও সেদিন শ্রমিক পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছিলো। কিন্তু ডবল ইঞ্জিন বিজেপি সরকার শিক্ষা নেয়নি। শিক্ষা নেয়নি ২০১৩ সালের কেদারনাথ বিপর্যয়ের থেকে। শিক্ষা নেয়নি ১৯৭০ সালে ধৌলিগঙ্গায় আসা হড়কা বান থেকে। যার ফলে পাতাল গঙ্গা, হেলং থেমে টাক নালা অবধি বড় ভূ-ভাগকে একদিকে হেলিয়ে দিয়েছিলো। আবার অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আরোও ‘উন্নয়ন’! আর এইসবের পরিণাম – তলিয়ে যাচ্ছে যোশীমঠ। গোটা এলাকাকে ‘সিঙ্কিং জোন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে উত্তরাখণ্ড প্রশাসন।


স্মৃতির অতলে চলতে থাকা এক আতঙ্ক নগরী


হাসিখুশিশহরের প্রতি কোণায় এখন স্বপ্নভঙ্গের আখ্যান। কান্নার রোল। টেলিভিশনের পর্দায় ফাটল-ভাঙ্গনের ছবিগুলো দেখা যাচ্ছে। ভূ-ধ্বসের কারণে শহরের গান্ধী নগর, লেওর বাজার, নৃসিংহ মন্দির, সিংহধার, মনোহর বাগ, জেপি কলোনি, বিষ্ণুপ্রয়াগ, সুনীল, পরসারি, রবিগ্রাম সর্বাধিক আক্রান্ত। ছোট্ট পাহাড়ি শহরে ইতিমধ্যে ৬৮০ টি বাড়িকে বিপর্যস্ত চিহ্নিত করেছে সরকার। তারমধ্যে স্কুল-কলেজ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র সব আছে। ক্ষেত,জমি, সারা জীবনের কামাইয়ে গড়া বাড়ি ধুলো হয়ে যেতে দেখতে হচ্ছে। হিমালয়ের এই তীব্র শীতে খোলা আকাশ ঠিকানা হচ্ছে অসংখ্য মানুষের। কিন্তু যোশীমঠের অধিবাসীরা বহুদিন ধরেই ভূ-ধ্বসের থেকে বাঁচতে সরকারের কাছে আর্জি জানিয়ে আসছে। ১৯৭৬ সালে তৎকালীন গাড়োয়ালের অফিসার এমসি মিশ্রের নেতৃত্বে এক কমিটি বলেছিলো, হিমালয়ের বিপজ্জনক ধ্বসপ্রবণ এলাকার উপরে গড়ে উঠেছে শহরটি। প্রাকৃতিক ও মানুষের কর্মকাণ্ড অনুধাবন করে হিসাব করা হয়েছিলো, ভূমিকম্প তীব্রতার ৫ম জোনের অন্তর্ভুক্ত যোশীমঠের স্থায়িত্ব বড়জোর ১০০ বছর। এর মধ্যে শহরটি ধীরে ধীরে তলিয়ে যাবে। কমিটি বার বার বারণ করেছিলো বড় প্রজেক্ট না করতে। কিন্তু কে কার কথা শোনে? ২০০০ সালে গড়ে উঠলো উত্তরপ্রদেশ ভেঙ্গে নতুন পাহাড়ি রাজ্য। সুড়ঙ্গ খুঁড়ে তৈরি হয়েছে রাস্তাঘাট, নতুন জনবসতি। সঙ্গে একের পর এক জলাধার। এরপর হিন্দুত্বের ধ্বজা উড়িয়ে ‘হিন্দু হৃদয় সম্রাট’মোদির আচ্ছে দিনের বন্ধুরা মুনাফা কামানোর জন্যে গড়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। তারপর শুধু ২০২২ এই বিদ্যুতের দাম বেড়েছে চারবার। স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরোধ উড়িয়ে এই অঞ্চলে বড় বড় হোটেল নির্মাণ তাও বটেই, ৫২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাযুক্ত তপোবন বিষ্ণুগাঢ় প্রকল্প, যোশীমঠ শহরের নীচে চারলেনের বাইপাশ গড়া হয় ডিনামাইট দিয়ে ভারী বিস্ফোরণ ঘটিয়ে। এরফলে বিশেষজ্ঞদের অনুমান পুরো শহরটিই হেলে গেছে।
কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, যোশীমঠ যেখানে অবস্থিত সেখানে কয়েক শতাব্দী আগে জনবসতি ছিলো। সেটিও ধ্বসের কারণে শেষ হয়। এরপর সেই ধ্বস অর্থাৎ আলগা মাটির ওপর নতুন শহরটি গড়ে ওঠে। ফলে সেটি যে কোনোও সময় বিপজ্জনক।  আর মোদির ডবল ইঞ্জিন সরকার সেই ভঙ্গুর শহরের নীচ থেকে এনটিপিসি তপোবন বিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ গড়েছে। তাও বিপর্যয়ের এক কারণ মনে করা হচ্ছে। বৈজ্ঞানিকভাবে একথা প্রমাণিত পাহাড়্গুলোর মধ্যে নবীন হল ভঙ্গিল পর্বত। সেইরকমই এক পর্বত হিমালয়ের গঠনকাজ এখনো চলছে। আর এর ওপর গাড়োয়াল হিমালয়ের এই অংশ ধ্বস, ভূ-কম্প প্রবণ হওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে দুর্বল ও ভঙ্গুর। বেশি ভার বইতে পারে না। তা সত্ত্বেও লাগাতার ‍‌তৈরি হয়েছে-হচ্ছে বড় বড় প্রকল্প। মোদির স্বপ্ন চরিতার্থ করতে।


ব্রাত্য সেই প্রান্তিক জন“Environmentalism without class struggle is gardening.” – চিকো মেন্ডেস


আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে উন্নয়ন বনাম প্রকৃতি বা পরিবেশের দ্বন্দ্বে বারবার মুনাফার সামনে পরিবেশ বা প্রকৃতিকে বাঁচানোর প্রশ্নটাকে উপেক্ষিতই হতে হয়েছে। তুতিকোরিনে আমরা দেখেছি, মুনাফার শক্তির সামনে দূষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে আসা মানুষ খুন হয়েছেন মুনাফার বুলেটে। আর এইবার ‘বিকাশের’ নামে ধর্মের মোহ সৃষ্টিকারী অনুকূল পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে গোটা হিমালয়ের পাহাড়ী অঞ্চলে বিপর্যয় নামিয়ে আনার, বিপজ্জনক খেলায় নেমেছে আরএসএস-কর্পোরেট চালিত বিজেপির কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার। 
সাম্প্রতিক অতীতে আমরা দেখেছি, লকডাউনের পরিস্থিতি ব্যবহার করে একটার পর একটা জনবিরোধী নীতি নিয়েছিলো কেন্দ্রের মোদী সরকার। কখনো কৃষি বিল আনা, শ্রম আইন সংশোধন, নয়া শিক্ষানীতি, ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ সংক্রান্ত বিল লঘু করা বা গণআন্দোলনের নেতা কর্মীদের গ্রেপ্তার যার অন্যতম উদাহরণ। আর এই তালিকাতেই আরেকটি সংযোজন ছিলো EIA ২০২০। এরফলে বাস্তুতান্ত্রিকভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলের খুব কাছে কোনো প্রোজেক্ট করতে গেলে আগে যেখানে নিয়ম ছিল ১০ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে প্রোজেক্ট-এরিয়া হলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের পারমিশন লাগবে। সেটা ব্যাসার্ধ কমিয়ে ৫ কিমি করা হয়েছে। অর্থাৎ বাস্তুতান্ত্রিকভাবে সংবেদনশীল এলাকার মাত্র ৫ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে শিল্প-প্রোজেক্টের জন্য স্টেট অথরিটির সায়ই যথেষ্ট। ফলত বাস্তুতান্ত্রিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি এলাকায় জঙ্গল সাফ করে একটার পর একটা প্রকল্প গড়া হবে। যেমন হয়েছে বলসারানোর ব্রাজিলে- পৃথিবীর ফুসফুস আমাজনে। কর্পোরেট ফ্রেন্ডলি বলসারানোর দোস্ত মোদি সরকারও কোম্পানিদের ‘পরিবেশগত ছাড়পত্র’ দেওয়ার জন্য যাবতীয় পদ্ধতিকে সরল এবং বিজনেস-ফ্রেন্ডলি করে তুলেছে। এর প্রভাব আমরা দেশের সর্বত্র দেখছি। বিশেষতঃ সবচেয়ে বিপদের মুখে পড়ছে ‘ইকোলজিক্যাল হট স্পট’ গুলো। এর অন্যতম হিমালয়, আমাদের জংগল, পশ্চিমঘাট, উপকূল অঞ্চল ইত্যাদি। সেইরকমই এখন বিপন্নতায় ভুগছে উত্তরাখণ্ডের মানুষ। প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে উত্তরাখণ্ডের মানুষকে অবৈজ্ঞানিকভাবে, অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কড়া মাসুল তো দিতে হচ্ছেই। সাথে প্রত্যেকদিন উচ্চ বিদ্যুৎমাশুলও গুনতে হচ্ছে।
যোশীমঠের ওপরের গ্রামগুলোতে বসবাসরত বেশীরভাগ মানুষই পর্যটন ও পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল। এই বিপর্যয়ের ফলে তাদের অঞ্চল ছাড়তে বলা হয়েছে। কিন্তু তাদের বেশীরভাগের কাছে পরিচয়পত্র বা জমি-জমার কাগজ নেই। প্রান্তিক পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎও তাই অনিশ্চিত। দুনিয়া জুড়ে ঘটে চলা জলবায়ু পরিবর্তনে আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি উপকূল বা দ্বীপ অঞ্চলের বাসিন্দাদের বেঘোর হওয়ার চিত্র। এখন বাদ যাচ্ছে না হিমালয়ও। 


আগামীতে কার পালা?

“এই জায়গাটাকে আর তুমি উপভোগ করো? তোমার লেখায় যা দেখছি, সেই সৌন্দর্য ছিল একসময়!এখন যা দেখছি সেটাই কিন্তু ভবিতব্য।”
(Is this the place you celebrate?In prose you made it sound so great!It was……..before I knew it was fate.)
রাস্কিন বন্ডের লেখা ‘DIRGE OF DEHRA DUN’ (দেরাদুনের বিলাপ)। বন্ডের হাহাকার আজ কিন্তু ছুটে বেড়াচ্ছে দেশের পাহাড়ি রাজ্য উত্তরাখণ্ডের সর্বত্র। ২০০০ সালে উত্তরপ্রদেশ ভেঙ্গে আলাদা পাহাড়ি রাজ্য- উত্তরাখণ্ডের জন্ম। কথা ছিলো ছোট পাহাড়ি অঞ্চলের সার্বিক উন্নতি। কিন্তু এই ক’বছরে দেখা যাচ্ছে উত্তরাখণ্ডের রাজধানী দেরাদুনের জনসংখ্যা, রাজ্যের প্রায় ৬০% এর বেশী। সমস্ত জনসংখ্যা ও উন্নয়ন কেন্দ্রীভূত দুন উপত্যকা, সমতলের হরিদ্বার কেন্দ্রিক। ক্রমবর্ধমান প্রাকৃতিক বিপর্যয়, আর্থিক অনিশ্চিয়তার ফলে ওপরে পাহাড়ি জনপদ গুলো ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। তার ওপর উন্নয়নের চাপ। অতীতে তেহরি বাঁধ করতে গিয়ে বহু মানুষকে স্থানান্তরিত করতে হয়েছে দেরাদুনে। এরপর কেদারনাথ, যোশীমঠ বিপর্যয়। সংখ্যা বাড়ছে। কর্ণপ্রয়াগ, মুসৌরিতেও ভাঙ্গন দেখা যাচ্ছে। এদিকে জনসংখ্যার চাপ নিতে পারছে না দুন উপত্যকাও। ছোট পাহাড়ি নদী গুলো নালায় পরিণত হচ্ছে। কাটা পড়ছে বনাঞ্চল। ওপরে পাহাড় ভাঙ্গতে শুরু করলে, নদীর প্রকৃতি পরিবর্তন হলে আর কতোদিন থাকবে দেরাদুন, হরিদ্বার? শুধু হিমালয়ের ওই অংশই নয়, গোটা হিমালয় সংকটে। মানুষের অপরিকল্পিত উন্নয়নের প্রভাবে।উত্তর সিকিমের অতি সংবেদনশীল ভূ-কম্পন জোনের অন্তর্গত মঙ্গনে বা তিস্তার ওপরে নানা স্থানে গড়া হয়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং বাঁধ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখানে বাঁধ ভাঙ্গলে সিকিম, দার্জিলিং এর অস্তিত্ব থাকবে না। দুনিয়ার এক উচ্চতম হ্রদে রূপান্তরিত হবে গোটা এলাকা। ভেসে যাবে উত্তর বাংলা। একই হাল আসামের কামলাং ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারির। ১৭৫০ মেগাওয়াটের লোয়ার ডেমওয়ে হাইড্রোইলেক্ট্রিক প্রোজেক্ট করা হচ্ছে ওখানে। যা বিরল জীবজন্তুর বাস। সাথে অতিসংবেদনশীল প্রাকৃতিক অঞ্চল। ওপর দিকে বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রতলের উচ্চতা বাড়ছে। ডুবতে বসবে উপকূল বা নীচু এলাকা। কলকাতা, চেন্নাই, মুম্বাইয়ের মতো মহানগর ডুবে যাবে। ফলে মানুষ যাবে কোথায়?


পরিবেশকে করতে হবে রাজনৈতিক ইস্যু


সিপিআইএম শুরু থেকে পরিবেশের সাথে সাজুয্য রেখে উন্নয়নের পক্ষপাতী। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের ব্রাত্য রেখে, তাদের সর্বনাশ ডেকে আনা সরকারের এক অমানবিক নিষ্ঠুরতার প্রমাণ। পার্টি ইতিমধ্যেই বদ্রীনাথ অবধি গোটা অঞ্চলের জন্যে দীর্ঘস্থায়ী মাস্টার প্ল্যান, পরিবেশ রক্ষা, এবং এই বিপর্যয়কে জাতীয় বিপর্যয় ঘোষণার দাবী জানিয়েছে। এর সাথে দ্রুততার সাথে আক্রান্ত পরিবারগুলিকে আপাতত অস্থায়ী বাসস্থান, গরম কাপড়-কম্বল, খাবার, ওষুধ দেওয়ার দাবী জানিয়েছে। ইতিমধ্যেই এই দাবী নিয়ে জেলা সদর গুলো থেকে দেরাদুন সর্বত্র বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে সিপিআইএম উত্তরাখণ্ড রাজ্য কমিটি। যোশীমঠে, চামোলির স্থানীয় কমরেডরাও ‘যোশীমঠ বাঁচাও সংঘর্ষ সমিতি’র সাথে যুক্ত আছে। পার্টি নেতৃত্ব লাগাতার আক্রান্ত অঞ্চল পরিদর্শন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে যোগাযোগ রেখে চলছে এবং তাঁদের স্থায়ী পুনর্বাসন ও উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণের দাবীতে লড়াই করছে। আক্রান্তদের জন্যে আর্থিকভাবে সাহায্য করার আবেদনও জানিয়েছে রাজ্যবাসীর কাছে।এসবের মধ্যে মূল বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে যে, জলবায়ু পরিবর্তন হোক বা ভূমিরূপের পরিবর্তন, এইসবে আক্রান্ত হয় মূলত গরীবতম মানুষ। কিন্তু কর্পোরেট লোভে এই পরিবর্তন ঘটছে দ্রুত। আক্রান্ত হচ্ছে সবাই। কেউ বাদ যাচ্ছে না। তাই হাতে সময় কম। আমাদের গ্রহকে বাঁচাতেই হবে ধনতান্ত্রিক লুঠের হাত থেকে। না হলে আমরা কেউ বাঁচবো না। স্মরণে থাক ফিদেল কাস্ত্রোর মন্ত্র-“Tomorrow it will be too late to do what we should have done a long time ago.”

Spread the word

Leave a Reply