খরা পরিস্থিতির বিপদ – ভবিষ্যৎ সঞ্জয় পূততুন্ড

১৭ জুন ২০২২( শুক্র বার)


প্রকৃতির সাথে নিবিড় সম্পর্ক নিয়েই সভ্যতার বিকাশ। সম্পর্ক সর্বদাই অনুকূল থাকেনি। আবার এই সমগ্র পর্বেই প্রকৃতির রুদ্ররুপ প্রয়াশ সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে গিয়ে মানুষ নিজেকে মানিয়ে নেয়, প্রকৃতিকে ব্যবহার করে। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম পরিবর্তন করতে পারে না। বাস্তবতা অনুযায়ী প্রকৃতিকে ব্যবহারের পথ খুঁজে নেয়। বছরের বিভিন্ন ঋতুর পরিবেশে মানুষ অভ্যস্থ। বর্ষায় বৃষ্টিপাত হয়। কখনও তা বিরক্তি কর, এমনকি সমস্যা হিসাবেও দেখা দেয়। কিন্তু বৃষ্টির প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা যায় না। প্রয়োজনীয় পরিমাণ বৃষ্টির অভাবে দেখা দেয় খরা পরিস্থিতি।


মানুষ সহ সমস্ত প্রাণী এমনকি উদ্ভিদকূলের অস্তিত্বের পক্ষে বৃষ্টি অবশ্য প্রয়োজনীয়। বিপরীতে খরা পরিস্থিতি বিপজ্জ্বনক, এমনকি ধ্বংসাত্মকও বটে। তাই সর্বত্রই বৃষ্টির জলের সদ্বব্যবহারের উদ্যোগ। নদী-খাল-বিল-জলধার বর্ষায় জল ধারণ করে সারা বছর প্রাণী জগতের প্রয়োজন মেটায়। বাড়তি জল বয়ে যায় সমুদ্রের দিকে। একটি অংশ যায় মাটির নীচে – সঞ্চিত থাকে ভূগর্ভস্থ জল সম্পদ। মানুষের জরুরী প্রয়োজনে তা ব্যবহৃত হয় – বাঁচিয়ে রাখে অরণ্য সম্পদ।
আমাদের দেশে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বছরে ১১৮ সে:মি: (৩ফুটের বেশি) পশ্চিম বাংলায় তা ১৭৫ সে: মি: (প্রায় ৫ ফুট)। বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন বছরে খরার উপদ্রব দেখা দেয়। পশ্চিম বাংলায় সর্বশেষ খরা পরিস্থিতি দেখা গিয়েছে ২০০০ সালে। অন্যান্য বছরে কমবেশি হয়ে থাকে। সারা পৃথিবীতেই কৃষিকাজ এবং জীবজগতের স্বার্থে বর্ষার জলের উপযুক্ত ব্যহারের চেষ্টা হয়। আমাদের দেশে প্রথম এবং দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৫২-১৯৬২) ভাখরা নাঙ্গাল, নার্গাজুন, দামোদর ভ্যালি সহ নানা প্রকল্পে বর্ষার জল ধরে সেচ-বিদ্যুৎ উৎপাদন সহ বহুমুখী উদ্যোগ হয়। এ প্রকল্প কৃষিপণ্য ও বিদ্যুৎ সহ সামগ্রিক অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানে প্রভূত ভূমিকা পালন করে।

বিশ্বের পরিবেশবিদ সহ শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ পরিবেশ নিয়ে চিন্তিত। তাঁদের মতামতকে মর্যাদা দিয়ে আর্ন্তজাতিক স্তরেও বিষয়টি বহুল চর্চিত। সমস্যা সমাধানের জন্য সমস্ত দেশের রাষ্ট্রপ্রধাণ এবং পরিবেশ বিজ্ঞানীরা নিয়মিত সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন। সম্মেলনগুলি থেকে সমাধানের পথও সিদ্ধান্ত হিসাবেই সামনে এসেছে। কিন্তু বিশ্বের ধনীদেশগুলি, বিশেষত আমেরিকা তা কার্যকর করতে অস্বীকার করে। সর্বশেষ জাপানের সম্মেলনে কোন সিদ্ধান্ত না নিয়েই সমাপ্তি ঘোষণা করতে হয়েছে।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বাজার তথা মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যেই সমস্ত কার্যকলাপ পরিচালিত। আমাদের রাষ্ট্রও সে পথেরই অনুসারী। ফলে ১৯৮০-র দশক থেকে খরা মোকাবিলায় প্রস্তুতি ভারত রাষ্ট্রের কার্যকলাপের তালিকায় আর থাকলনা। এমনকি নদী বিক্রির উদ্যোগও হয়েছে। প্রকৃতির জল ব্যবহার করে দেশি-বিদেশী কোম্পানী বোতলজাত করে বিক্রি করে বিপুল মুনাফা লুঠছে। তাদের তত্ব পয়সা দিয়ে জল কিনলে তার অপব্যবহার বন্ধ হবে। প্রাকৃতিক সম্পদ দখল নিয়ে মুনাফা লুঠের প্রস্তাবটি আড়ালে থাকল।
উষ্ণায়ন রুখতে, স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের জন্য বন সৃজনের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা সর্বজন স্বীকৃত। কিন্তু মুনাফার লোভে বিশ্বজুড়ে চরছে বন সংহারকার্য। বন সৃজনের জন্য বিজ্ঞাপনী প্রচার হয় – দিবস পালিত হয়। কিন্তু বন রক্ষা বা বন সৃষ্টির তেমন কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় যথেষ্ট সীমিত। পশ্চিম বাংলায় বাম সরকারের উদ্যোগের ভূমিকা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে – আর্ন্তজাতিক পুরস্কার এনেছিল বাংলা।


খরা মোকাবিলায় জলধার রক্ষা এবং নতুন জলধার তৈরীর কাজ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ব্যবসায়িক স্বার্থে, ক্ষমতাবানদের স্বার্থে বাস্তবে পরিবেশ সংক্রান্ত আইন বেপরোয়াভাবে লঙ্ঘন করা হচ্ছে। কলকাতা শহর এবং শহর সংলগ্ন পূর্ব প্রান্তের বিস্তীর্ণ জলাভূমিকে ‘রামসার সাইট’ এর শিরোপা এনে দেয় পূর্ব কলকাতার জলাভূমি। আজ সে জলাভূমি রক্ষা পাচ্ছে না। আইন ভাঙ্গার কাজ চলছে। পরিবেশ বিদদের সতর্কবানী উপেক্ষা করেই এ অপকর্ম চলছে।
সারা দেশের সমুদ্র উপকূলের বিস্তীর্ণ জলাভূমিকে মুনাফা শিকারীদের হাতে তুলে দেবার কাজ ভারত সরকার শুরু করেছে। এখানে তৈরী হচ্ছে নানা বিনোদন কেন্দ্র। অন্যদিকে দেশের পাহাড় জঙ্গল এলাকাকে নানা রাজ্যে করর্পোরেট পুঁজির হাতে তুলে দেবার কাজও চলছে। এখানে খণিজ সম্পদ আহরণ হবে – ধ্বংস করা হবে জঙ্গল ও বসতি। যে আদিবাসী জনগণ জঙ্গলের রক্ষক, তাদেরই উৎখাত করা হবে। অর্থলোলুপ হায়নারা হানা দিয়েছে বীরভূমের দেউচা পাঁচমারীতে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ দুষিত করার উদ্যোগ চলছে। এমন উদ্যোগ আবশ্যিক ভাবেই প্রকৃতির নিযম ভেঙ্গে চরম বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে চলছে। পরিবেশবিদরা সতর্ক করলেও সতর্কবানী সরকারের কানে যায় না।


বর্ষার মরশুম বাদে অন্য সময়ে সারা দেশের নদীগুলির করুণ ছবি কারও দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না। সংস্কারের কোন উদ্যোগ নেই। ‘রেগা’ প্রকল্প ব্যবহার করে বহু নদীখালের পরিবর্তন সম্ভব ছিল। সরকার এ প্রকল্প বন্ধ করার দিকেই এগোচ্ছে। মূল্যবান সম্পদকে অবহেলার মাশুল দিতে হচ্ছে – ভবিষ্যৎ পরিণতি বিপজ্জ্বনক অবস্থার সৃষ্টি করবে।
পশ্চিম বাংলার বাম সরকারের সময়ে সেচ সেবিত জমির পরিমাণ ৭২ শতাংশে পৌঁছায়। সারা দেশে এর পরিমাণ মাত্র ৪৯ শতাংশ। ২০০৮ সালে চীন দেশ বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে সেচ জমির পরিমাণ ৭০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশে পৌঁছতে পেরেছে। আমাদের দেশ ভিন্ন পথযাত্রী। এখানে পুঁজির মুনাফাই একমাত্র লক্ষ্য।
খরা – বন্যা প্রাকৃতিক নিয়ম আজও মানুষ সবটা জানেন না। কিন্তু খরা মোকাবিলায় মানব সভ্যতা যথেষ্টই সক্ষম। তা কার্যকর করায় বাঁধা পুঁজিবাদী লুঠের ব্যবস্থা। সমস্যার সমাধান করতে প্রয়োজন এই মানুষ মারা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ উৎখাত। এই শ্রেণী সংগ্রামের পথই সভ্যতাকে রক্ষা করবে – এগিয়ে নিয়ে যাবে।

Spread the word

Leave a Reply