Brinda Karat on CJI’s Comments

তারিখঃ মঙ্গলবার, ২ মার্চ – ২০২১

ভারতের প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বৃন্দা কারাতের চিঠি

কতিপয় মামলা সম্পর্কিত নিজস্ব পর্যবেক্ষণে ভারতের প্রধান বিচারপতির সাম্প্রতিক মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র পলিট ব্যুরো সদস্য বৃন্দা কারাত গতকাল নিম্নলিখিত চিঠিটি লিখেছেন।

সেই চিঠির সম্পূর্ণ বয়ান এখানে প্রকাশিত হল।

ভারতের প্রধান বিচারপতি

সুপ্রিম কোর্ট

নয়া দিল্লী

স্যর,

সম্প্রতি দুটি মামলার ক্ষেত্রে আপনার মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমি এই চিঠি লিখছি।

প্রথম মামলাটি নবম শ্রেণীর একটি ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তের জামিনের আবেদন সংক্রান্ত। এই মামলায় নিম্ন আদালতের রায় বদলে দিয়ে মহারাষ্ট্র হাইকোর্টের অন্তর্গত ঔরঙ্গাবাদ বেঞ্চ অভিযুক্তের জামিনের আবেদন খারিজ করে দেয়। শুনানি চলার সময় অভিযুক্তের আইনজীবীকে চিফ জাস্টিস বোবদে জিজ্ঞাসা করেন “অভিযুক্ত কি ধর্ষিতা মেয়েটিকে বিবাহ করবেন?” অভিযুক্তের আইনজীবী জানান তিনি এই বিষয়ে আলোচনা করে জানাবেন। তখন চিফ জাস্টিস বোবদে বলেন “কিশোরী মেয়েটিকে ধর্ষণ করার পূর্বে অভিযুক্তের চিন্তা করা জরুরী ছিল। তার মনে রাখা উচিত ছিল তিনি সরকারী কর্মচারী।… আমরা তাকে বিবাহ করতে জোর করছি না। আমরা এব্যাপারে অভিযুক্তের মতামত জানতে চাই।” এরপরে শুনানি চলতে থাকে, অভিযুক্ত বলেন “আমি মেয়েটিকে বিবাহ করতে চেয়েছিলাম। মেয়েটি বিবাহে অসম্মতি জানায়। এখন আমি বিবাহিত, আমার পক্ষে তাকে বিবাহ করা সম্ভব নয়।”  

এরপরেই আদালতের পক্ষ থেকে ধর্ষক ব্যাক্তিকে চার সপ্তাহের অন্তর্বর্তী জামিন দেওয়া হয় এবং সাধারণ জামিনের জন্য আবেদন করতে বলে।

স্যর,

অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ধর্ষণের ঘটনায় এমন ধারায় সওয়াল-জবাব জামিন মঞ্জুরির ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব আকর্ষণ করে। আমি আবেদন করছি যাতে এমন সওয়াল – জবাব এবং ধর্ষকের জামিন পুনর্বিবেচিত হোক। এই মামলায় ঔরঙ্গাবাদ হাইকোর্টের পক্ষ থেকে যে রায় হয়েছিল তাতে নিম্ন আদালত ধর্ষককে জামিন দেওয়ার ঘটনাকে ভয়াবহ বলে উল্লেখ করা হয়, আমার আবেদন ঔরঙ্গাবাদ হাইকোর্টের সেই রায়ই পুনর্বহাল থাকুক।

অপরাধী ১৬ বছরের মেয়েটিকে গলা টিপে ধরে ধর্ষণ করেছিল। ১০ থেকে ১২ বার সেই একই কায়দায় বারে বারে ধর্ষণ করা হয়। মেয়েটি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। এই ঘটনায় ধর্ষণে সম্মতির কোন সুযোগ ছিল বলে মনে হচ্ছে? অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ধর্ষণের ঘটনায় সম্মতি অপ্রাসঙ্গিক বলে সংশ্লিষ্ট আইনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।  

মাননীয় প্রধান বিচারপতি, এখন ১৮ বছর বয়সী ধর্ষিতা মেয়েটির উপরে এধরনের সওয়াল – জবাবের কি প্রতিক্রিয়া হবে? তার যন্ত্রণা, দুর্ভোগ এবং মানসিক যাতনার কোন মূল্য নেই? ধর্ষণের শিকার হওয়া মেয়েরা রোবট নয় যে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে তাদের অনুভুতি কিংবা চিন্তাভাবনা অন্যদের নিয়ন্ত্রণাধীন। তার বাবা মায়ের মতামত যাই হোক না কেন, মেয়েটি প্রথম থেকেই ধর্ষকের সাথে বিবাহে সরাসরি অসম্মতি জানিয়ে এসেছে।

ধর্ষিতার সম্মতি নিরপেক্ষভাবে এধরনের সওয়াল – জবাব ধর্ষকদের জন্য একটি বার্তা দেবে যে অপরাধের পরে বিবাহ করতে সম্মত হলেই কারাবাসের সাজা থেকে বেঁচে যাওয়া যায়। আমাদের সমাজে এখনও কিছু পশ্চাদপদ চিন্তাভাবনা রয়ে গেছে যার ফলে ধর্ষণের শিকার হওয়া মহিলা “বাজে মেয়ে” হিসাবে প্রতিপন্ন হয় এবং ধর্ষকের সাথে বিবাহের ফলে সে সমাজে তার হৃত সম্মান ফিরে পাবে বলে ধারণা করা হয়। এধরনের মানসিকতাকে কোনভাবেই দেশের সর্বোচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে সমর্থন যোগানো উচিত নয়।  

ধর্ষণের অপরাধে ন্যায়সঙ্গত বিধান ঘোষণার ক্ষেত্রে অপরাধের শিকার হওয়া ব্যাক্তির স্বার্থকেই বিবেচনায় প্রধান ধরা হয়। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের হলেও এই ঘটনায় সেই প্রক্রিয়ার ঠিক বিপরীত ঘটনা ঘটেছে।

দ্বিতীয় মামলাটিতে একটি মেয়েকে বিবাহের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস করার ঘটনায় অভিযুক্তের আবেদনের ভিত্তিতে শুনানি চলেছে। আইনে উল্লেখ রয়েছে এমন ঘটনা ধর্ষণের অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হয়। সুপ্রিম কোর্ট এই মামলার পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে অভিযুক্তের গ্রেফতারিতে স্থগিতাদেশ দিয়ে বলেছে স্বামীর আচরণ যতই অমানবিক হোক না কেন, যখন দুইজন ব্যাক্তি স্বামী, স্ত্রী হিসাবে একত্রে বসবাস করাকালীন সহবাস করে তখন সেই সহবাস কি ধর্ষণ হিসাবে বিবেচিত হবে? হ্যাঁ, মাননীয় বিচারপতি – সেই সহবাসকেও ধর্ষণ বলা যায়। বিবাহের নথী ধর্ষণের নির্ধারণ করে না, সম্পর্কে যুক্ত মেয়েটির ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তাকে সহবাস করতে বাধ্য করা হলে সেই ঘটনা ধর্ষণ বিবেচিত হয়। মামলায় জড়িত মহিলার উপরে চলা নৃশংসতা এবং অত্যাচারের ঘটনাকে শুনানি চলাকালীন বিভিন্ন মন্তব্যে কার্যত ন্যায্যতা দেওয়া হয়েছে।

দেশের সংসদের ভিতরে এবং বাইরে মহিলাদের অধিকারের লড়াই এবং ধর্ষিতাদের বিচার পাওয়ার আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবার সংগ্রামে একজন অংশগ্রহণকারী হিসাবে আমি মনে করি বিচারালয়ে এধরণের মন্তব্যে ন্যায় বিচারের লড়াই ধাক্কা খাবে।

এই চিঠির মাধ্যমে আমি আপনার কাছে আবেদন করছি উক্ত মামলাগুলিতে সংশ্লিষ্ট মন্তব্য, সওয়াল – জবাব এবং রায়সমূহ খারিজ হোক। দেশের সর্বোচ্চ আদালত ধর্ষণের অপরাধে বিচার করতে গিয়ে অপরাধের শিকার হওয়া মহিলাদের পাশে থেকে দোষীদের উপযুক্ত শাস্তিবিধান জানাবে, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ক্ষেত্রে আরও তৎপরতার সাথে সেই ব্যাবস্থা হবে – এমনটাই আমাদের দেশে মহিলাদের একান্ত প্রত্যাশা।    

সাক্ষর

বৃন্দা কারাত

Spread the word

Leave a Reply