Employment and BJP Govt 3

"ইস্ট ফোর ড্যুইং বিজনেস" বলে আসলে মালিকদের শোষণের ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে

ভারতে কাজের নিরাপত্তা এবং বিজেপি সরকার - ৩য় পর্ব

ওয়েবডেস্ক প্রতিবেদন

বেতনকাঠামো বাতিল করতে আইন করেছে সরকার

জীবনধারণের উপযুক্ত কাজ এবং সেই কাজের শেষে উপযুক্ত রোজগার, আমাদের দেশে সাধারণ মানুষ এর বেশী স্বপ্ন দেখেন না, কোন সরকারের থেকে এর চেয়ে বেশী আশাও করেন না। বেঁচে থাকার জন্য ন্যায্য মূল্যে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এই যদি হয় মানুষের ন্যুনতম প্রয়োজন তবে গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো, বিচারব্যবস্থা এবং শিক্ষান্তে কাজের সঠিক পরিসর - এর চেয়ে বেশী কিছু ভারতের জনসাধারণের চাহিদা নয়।

অর্থনীতিতে যাকে বাজার বলে (পণ্য হোক বা পরিষেবা) তার একটা অংশ বিক্রেতার, আরেকটি ক্রেতাদের। বুর্জোয়া অর্থশাস্ত্রে চিরকালই আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে (যাকে সহজ কথায় বাজারের ভালো অবস্থা বলা হয়) যোগান বা বিক্রেতার ভূমিকাকে বড় করে দেখানো হয়, যদিও উৎপাদিত পণ্য কিংবা উপযুক্ত পরিষেবা কেনার মতো সামর্থ্য ক্রেতার না থাকলে বাজার কখনো ভালো থাকতে পারে না এই সহজ সত্যের প্রতি পুঁজিবাদের বড় অনীহা। সুতরাং বাজার চাঙ্গা থাকার অর্থ ক্রেতার অভাব না থাকা। ক্রেতার অভাব হয় যদি মানুষের হাতে খরচ করার মতো নগদ টাকা না থাকে, বিপণনের অবস্থা তেজি হলে বিনিয়োগ এবং বিক্রি উভয়ের জোরেই ব্যবসায় পূঁজির অভাব ঘটে না - একেই ক্যাশ ইনফ্লো বলে। মানুষের হাতে খরচ করার মতো (অর্থাৎ পণ্য এবং পরিষেবা খরিদ করার মতো) টাকা থাকে যখন তার রোজগার ঠিক থাকে। এই কারনেই অর্থনীতিতে বেতন কিংবা মজুরির গুরুত্ব যথেষ্ট।

দেখে নেওয়া যাক সরকার কীভাবে বেতন এবং মজুরির গড় মাপকাঠি ঠিক করে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পরে ১৯৪৮ সালে ভারতে "দ্য মিনিমাম অয়েজেস অ্যাক্ট" বা ন্যুনতম মজুরি বিধি লাগু হয়। ফেয়ার ওয়েজ নামের একটি কমিটি ন্যুনতম মজুরি সম্পর্কে ধারণা গ্রহণ করে। যদিও এই কমিটি কীভাবে সেই মজুরি হিসাব করা হবে কিংবা সময়োপযোগী করা হবে সেই নিয়ে কোন সিদ্ধান্তে উপনিত হতে পারেনি। পরে ১৯৫৭ সালে ইন্ডিয়ান লেবর কংগ্রেসের অধিবেশনে সেই কাজ করা হয়। ন্যুনতম মজুরির উদ্দেশ্য কি? সরকারী বয়ান বলছেঃ

The scope of the Minimum Wages Act is to prevent employers from exploiting the employees. It ensures the worker is sufficiently paid to provide enough for his/her basic needs such as food, shelter and clothing. The core objectives of the Act are listed below.

  1. Provide minimum wages to employees in the organized sector.
  2. Prevent exploitation of employees.
  3. Empower the government to fix and revise minimum wages promptly.
  4. Apply this order for most of the sections in the organized sector.

অর্থাৎ শ্রমিকদের বা বলা চলে মেহনতি জনগণের কল্যানে এই ব্যবস্থা একটি রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করে। এই আইনে মালিকপক্ষের দায়কেও আইনানুগ করা হয়।

Every employer must pay wages that meet the minimum wage guidelines put forth by the government.

  1. Wages should be paid in cash, cheque or bank transfer.
  2. In order to fix the minimum wages, the employment should be in Schedule originally or must be added to the Schedule by notification under Section 27 of the act.
  3. Employers should double the pay for excess work hours considering 9 hours per day and 48 hours per week as the standard.
  4. Under the provisions of the act, every employer should assure the minimum wage as prescribed by the class-wise minimum wages notifications.
  5. Employer should fix the wage period at intervals not exceeding one month or as prescribed by the authorities
  6. If less than 1000 personnel are employed, the wages should be paid by the 7th day of the following month. For employers having more than 1000 workers, this can exceed till the 10th day of the following month.
  7. For discharged employees, wage settlement should be done within the 2nd working day after the discharge.
  8. Every employer should maintain a wages register specifying the following particulars for each worker.
    1. Minimum payable wages
    2. Days with overtime work
    3. Gross wages
    4. Wages paid and date of payment
  9. Employers should manage to get the signature or thumb impression of every worker on the wage register and wage slips.
  10. Employers should exhibit a notice in English and local language at the main entrance of the establishment or offices depicting the following attributes.
    1. Minimum wage rates
    2. Abstracts of applied acts and rules
    3. Name and details of the Labour Inspector/ Asst. Commissioner of Labour etc.

এটুকু পড়লেই বোঝা যায় কেন মোদী সরকার ২০১৯ সালেই মজুরি সংক্রান্ত আইন সংস্কার করেছিল। সেইসময় সরকারের প্রস্তাবে সংশোধনের দাবী করেছিল বামপন্থী সাংসদেরাই, সংশোধনী চেয়ে আইনসভায় ৮টি ভোট পড়েছিল যার ছটিই বামপন্থী সাংসদদের। এর আগে ২০১৮ সালে শ্রম সংক্রান্ত সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটি কিছু প্রস্তাব করেছিল, মোদী সরকার সেইসব সুপারিশে কোন আমলই দেয় নি।

১৯৫৭ সালে ইন্ডিয়ান লেবর কংগ্রেসের অধিবেশনে ন্যুনতম মজুরি ঠিক করতে পাঁচটি ভিত্তি চিহ্নিত করেছিল - কিছু বছর আগে সুপ্রিম কোর্ট সেগুলিতে কিছু কথা যুক্ত করে, তবে ১৯৫৭ সালের প্রস্তাবসমূহই এখনও অবধি প্রামান্য। দেখে নেওয়া যাক কোন কোন বিষয়ের উপরে ন্যুনতম মজুরি নির্ধারিত হয় -

১) একজন রোজগেরে মানুষকে তিনজনের জন্য পণ্য / পরিষেবার সংস্থান করতে হয়।

২) একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের গড়ে ২৭০০ ক্যালরির উপযুক্ত খাদ্য গ্রহনের প্রয়োজন হয়।

৩) আমাদের দেশে একটি পরিবারে বছরে ৭২ ইয়ার্ড অথবা ৬৫.৮৩৬৮ মিটার কাপড়ের প্রয়োজন হয়।

৪) বাড়িভাড়া (বাসস্থান সংক্রান্ত) খাতে ন্যুনতম খরচকে সরকারী আবাসন প্রকল্পের খরচের সাথে সমানুপাতিক ধরা হয়।

৫) ন্যুনতম মজুরির অন্তত ২০ শতাংশ জ্বালানি এবং বিবিধ খরচ ধরতে হয়।

উপরের পাঁচটি পরিমাপকের দিকে নজর দিলেই বোঝা যায় ভর্তুকিহীন রান্নার গ্যাসের দাম বেড়ে ৮৪৫ টাকা প্রতি সিলিন্ডার হলে কেন মানুষের দুর্দশার শেষ থাকে না অথবা পেট্রোপণ্যের দাম বেড়ে গিয়ে সবকিছুর (পণ্য এবং পরিষেবা) দাম বাড়লে কেন তা জনজীবনে দুর্ভোগ নামিয়ে আনে। ২০১৯ সালে মোদী সরকার বেতন সংক্রান্ত কোড অন ওয়েজেস নিয়ে এসে একধাক্কায় চারটি আইন ক) পেমেন্ট অফ ওয়েজেস, খ) মিনিমাম ওয়েজেস অ্যাক্ট, গ) পেমেন্ট অফ বোনাস অ্যাক্ট এবং ঘ) ইক্যুয়াল রেমুনারেশন অ্যাক্ট বাতিল করে দিয়েছে। তাদের বক্তব্য বেতন সংক্রান্ত সমস্ত আইনকে একটি আইনের আওয়তায় নিয়ে আসাই সরকারের উদ্দেশ্য। এতকিছু বলার পরে ২০১৯'এর জুলাই মাসে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে দিন প্রতি ১৭৮ টাকা ন্যুনতম মজুরি নির্ধারিত হয়েছে! এই মজুরির নাম দেওয়া হয়েছে ফ্লোরলেভেল ওয়েজ! ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং অন্যান্য ৩১টি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ন্যুনতম মজুরিও এর চাইতে অনেকটা বেশী! বুঝতে সমস্যা হয় না এই সরকার কাদের কথা ভেবে কাজ করছে।

আইনের ভাষায় আরও কিছু সমস্যা দেখ দিয়েছে, যদিও একটু ভাবলেই বোঝা যায় সেই ভাষাগত দ্বিধার প্রধান কারন রাজনীতি এবং অবশ্যই শ্রেণী রাজনীতি। আইনের একজায়গায় লেখা হয়েছে এমপ্লয়ী (কর্মচারী) আরেকজায়গায় রয়েছে ওয়ার্কার (মজদুর)। এতে সমস্যা কোথায়? আইনের ফাঁকটুকু কাজে লাগিয়ে এক বিরাট অংশের কর্মরত জনগণকে বিভিন্ন সুযোগসুবিধা থেকে খুব সহজেই সরিয়ে রাখা যাবে, মালিকদের খরচ কমবে, মুনাফা আরও বাড়বে। সংসদের শ্রমবিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটি এই সমস্যাকে নির্দেশ করে ইতিমধ্যেই প্রস্তাব করেছে। সেই প্রস্তাব কেন্দ্র সরাসরি উপেক্ষা করেছে।

এই আইনে শ্রমিকদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অংশটি মোদী সরকারের শ্রেণীচরিত্র স্পষ্ট করে দেয়। একদিন ধর্মঘটের শাস্তি হিসাবে আটদিনের মজুরি কেটে নেবার নিদান দেওয়া আছে। দ্বিতীয় পর্বে আমরা দেখেছিলাম লেবর ইন্সপেক্টরকে কীভাবে নয়া শ্রম কোডে হাত পা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ফলে একদিকে শ্রমিকদের আইনি পথে অসন্তোষ জানানোর উপায় বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে আরেকদিকে প্রতিবাদ জানানোর শেষ অস্ত্র হিসাবে ধর্মঘটের জবাবে চড়া শাস্তির নিদান স্থির করা হচ্ছে। সন্দেহ নেই এরা কাদের ধামা ধরতে চাইছেন! সেই প্রত্যাশা পূরন করতে চেয়েই বোধহয় কেন্দ্রের সরকার গোটা পৃথিবীতে "ইস্ট ফোর ড্যুইং বিজনেস" বলে বিজ্ঞাপন দিয়েছে!

মুনাফার লোভে পুঁজিবাদ কতটা নির্লজ্জ হতে পারে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে লেনিন বলেছিলেন "মুনাফার গন্ধ পেলে এরা পারে না এমন কোন কাজ নেই, প্রয়োজনে মৃত মায়ের চামড়া ছাড়িয়ে ডুগডুগি বাজাতেও এরা পিছপা হবে না।" - আজকের ভারতে সরকারের ভূমিকা দেখলে তিনি কি বলতেন সেই কথা উপলব্ধি করতে পন্ডিত হতে হয় না।

ওয়েবডেস্কের পক্ষেঃ সৌভিক ঘোষ


শেয়ার করুন

উত্তর দিন