ডিজিটাল প্রচার এবং অর্থসংস্থান

সিপিআই(এম) সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি ভারতের নির্বাচন কমিশনের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার শ্রী সুনীল আরোরাকে ডিজিটাল প্রচার ও অর্থসংস্থানের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে যে চিঠি দেন তার প্রতিলিপি প্রকাশ করা হল।

১৭ আগস্ট,২০২০
মাননীয় শ্রী আরোরা,


শুরুতে, আমরা এই সত্যটি স্বীকার করতে চাই যে ইসিআই আসন্ন বিহার বিধানসভা নির্বাচনে৬৪ বছর বয়সের বেশি সকল ভোটারকে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তকে স্থগিত রেখেছে।তবে আমাদের দৃঢ় মতামত যে অন্য সকল বিবেচনার ঊর্দ্ধে ভোটারদের শারীরিক যাচাইয়ের নীতিটি নিশ্চিত করতে এই সিদ্ধান্ত স্থায়ীভাবে পরিত্যাগ করা দরকার।

কমিশন যে কোনো সংস্কারের আগে পরামর্শ গ্রহণের অধিকারকে অস্বীকার করা সত্ত্বেও ,যেমনটা অতীতে অনুশীলন করা হয়েছে, আমরা বিশ্বাস করি যে যুক্তিপূর্ণ প্রস্তাবগুলো ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া উদ্রেক করবে।
অতএব, আমরা আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি ডিজিটাল নির্বাচনী প্রচারের প্রস্তাবের দিকে; আরও গুরুত্বপূর্ণ, নির্বাচনে অর্থসংস্থানের ক্ষেত্রে অন্তর্নিহিত প্রশ্নগুলোর দিকে।

প্রকৃতপক্ষে বিহারের মুখ্য নির্বাচন আধিকারিক,এই ভয়াবহ মহামরির পরিস্থিতে, ভার্চুয়াল মাধ্যমে গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দলই তার বিরোধিতা করে।এই পদ্ধতির সমস্যা শুধু এইটা নয় যে সংস্থানের বিপুল ঘাটতি রয়েছে বরং এটাও যে এই প্রক্রিয়া কার্যকর করে জনগণের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বিপুল আর্থিক খরচের প্রয়োজন রয়েছে।

নিম্নলিখিত ঘটনাগুলো বিবেচনা করুন। ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে তৎকালীন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে তাদের পার্টি ৩২ লাখ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের নেটওয়ার্ক দিয়ে কয়েক ঘন্টার মধ্যে সত্য বা মিথ্যা যে কোন খবর ভাইরাল করতে পারে।এর সাথে যুক্ত করুন যে আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট চেক ওয়েবসাইটগুলির সন্ধানের ফলে জানা গেছে যে ভারতে অপ্রতিরোধ্য গতিতে সর্বাধিক ভুয়ো খবর ছড়ানো হয় এবং এখন বিহার নির্বাচনের প্রাক্কালে বিজেপি অমিত শাহের ভাষণের জন্য ৭২,০০০ এলইডি টিভি মনিটর স্থাপন করে একটি ভার্চুয়াল নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছে।৬০টি ভার্চুয়াল সমাবেশ করার পরে, বিজেপি দাবি করেছে যে তাদের নির্বাচনী প্রচারের জন্য ৯,৫০০ জন আইটি সেল প্রধানদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে যারা , প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের জন্য একটি করে, মোট ৭২,০০০ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপকে সমন্বিত করবে; যার মধ্যে গত দু'মাসে ৫০,০০০ গঠিত হয়েছে।

প্রযুক্তি চালিত ব্যবস্থার জন্য এত লোককে একসাথে যুক্ত করতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে তা যথেষ্ট চিন্তার কারণ।নির্বাচনী ঋণপত্রের মাধ্যমে বেনামে তহবিল প্রচলিত হওয়ার আগেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্পোরেট অনুদানের যে পরিসংখ্যান জনসমক্ষে আছে তাতেও এটি স্পষ্ট ছিল যে বিজেপি এবং অন্যান্য সমস্ত দলের মধ্যে কর্পোরেট তহবিলের মধ্যে ব্যবধান বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।স্পষ্টতই, কোনও উচ্চতর সিলিং না থাকায় বেনামী কর্পোরেট তহবিলের সাহায্য নির্বাচনী গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘন্টা বাজাবে।

অতীতে নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছিল যে, নির্বাচনী বন্ড "রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক অনুদানের স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে গুরুতর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে"। তারা দেখিয়েছিল যে নির্বাচনী ঋণপত্রের মাধ্যমে প্রদত্ত অনুদানগুলির ক্ষেত্রে ২০১৭ সালের ফিনান্স অ্যাক্টে বাধ্যতামূলক প্রতিবেদনের মানদণ্ড এবং আয়কর আইনের পাশাপাশি জনগণের প্রতিনিধিত্ব আইনে পরিবর্তন করা হয়েছে।

"“নির্বাচনী ঋণপত্রের মাধ্যমে প্রাপ্ত রাজনৈতিক দলগুলোর অনুদানের বিষয়ে কোন তথ্য পাওয়া যায় না এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দল জনগণের প্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫১ এর ২৯ বি বিধি লঙ্ঘন করে কোন অনুদান নিয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায় না, যা রাজনৈতিক দলগুলিকে সরকারি সংস্থাগুলি এবং বিদেশী উৎস থেকে অনুদান নিতে নিষেধ করে " নির্বাচন কমিশনের হলফনামায় এই কথাগুলোর উল্লেখ ছিল।


ইসিআই আরও জানিয়েছিল যে হলফনামায় প্রকাশিত এই সমস্ত আশঙ্কাগুলো ইতিমধ্যে ২০১৭ সালের মে মাসে একটি চিঠির মাধ্যমে আইন মন্ত্রককে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। হলফনামায় তারা আরো জানায় যে নির্বাচনী সংশোধনীগুলো ২৯ অগাষ্ট,২০১৪ নির্বাচন কমিশনের জারি করা নির্দেশিকাগুলোকে নস্যাত করে দেয় যেখানে উল্লেখ ছিল রাজনৈতিক দলগুলিকে প্রাপ্ত অনুদান, তাদের নিরীক্ষিত বার্ষিক হিসাব এবং নির্বাচনী ব্যয়ের বিবরণী সম্পর্কে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।


২০১৭ সালের ফিনান্স অ্যাক্ট ১৯৫১ সালের জন প্রতিনিধিত্ব আইন (আরপি) আইন, আয়কর আইন এবং কোম্পানি আইন সহ বিভিন্ন আইন সংশোধন করেছে।তারা আরও মন্তব্য করে, ২০১৬ সালের ফিনান্স আইনে পরিবর্তনের বিষয়ে ইসির হলফনামায় বলা হয়েছে যে এটি ২০১০ সালের বৈদেশিক অনুদান (নিয়ন্ত্রন) আইনের পরিবর্তন ঘটায় ফলে যে ভারতীয় সংস্থাগুলির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশীদার বিদেশী সংস্থাগুলি তাদের কাছ থেকে অনুদান গ্রহণের সুযোগ দেয়। "এটি যেখানে বিদ্যমান বিদেশী অনুদান আইন অনুসারে সমস্ত বিদেশী উৎস থেকে অনুদানকে বাধা দিয়ে থাকে তার পরিবর্তন ঘটায়।এর ফলে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলির নিয়ন্ত্রনহীন বৈদেশিক তহবিলের সুযোগ হবে যা বিদেশী সংস্থাগুলির দ্বারা ভারতীয় নীতিগুলি প্রভাবিত করতে পারে "।

বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের অভিমত, বৃহত্তর স্বচ্ছতা আনার জন্য যদি নির্বাচনী বন্ডস স্কিম চালু করা হয়, সরকারের অবশ্যই উচিৎ এই জাতীয় অনুদানের বিবরণ জনসমক্ষে প্রকাশ করতে দেওয়া।

স্পষ্টতই, আমরা যদি নির্বাচনী বন্ড বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া নির্বাচন কমিশনের হলফনামার যুক্তিকেই গ্রহণযোগ্য মনে করি তাহলে এটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে নির্বাচনী বন্ডের ফলে কোনও অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না, কোনও সকলের জন্য সমান সুযোগ ও এতে তৈরি হয় না।


এদিকে, আরও দুটি বিষয় রয়েছে যা প্রকাশ্যে এসেছে এবং বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। প্রথমত, বিদ্যমান আইন (সংযোজনী১) লঙ্ঘন করে ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের সময় চালু করা রহস্যময় নামো টিভি চ্যানেল ভোটগ্রহণের পরে রহস্যজনকভাবে অদৃশ্য হয়ে গেল। ২০১৯ সালের এপ্রিলে, ইসিআই এর মুখপাত্র স্বীকার করে নিয়েছিল যে ডিটিএইচ প্ল্যাটফর্মগুলিতে চলা এই চ্যানেলটির জন্য বিজেপি টাকা দিয়েছিল। যদিও এখন এটা প্রকাশিত যে কমিশনে জমা করা বিজেপির নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবে এই খরচ উল্লেখ করা হয়নি।এটি সম্পূর্ণ নির্বাচনী অপরাধ। তাৎক্ষণিকভাবে যে প্রশ্নটি দেখা দেয়, ইসিআই কি এই বিষয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে কোনওশাস্তিমূলক ব্যবস্থা শুরু করেছে ? না হলে কেন? আমি সাহস সঞ্চয় করে এই কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি যে সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য কমিশনের দায়বদ্ধতার দিক থেকে এই বিষয়ে দ্ব্যর্থহীন দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ না করা কমিশনকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। কড়া হাতে নির্বাচনী দূর্নীতি রোখার বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পরে।

দ্বিতীয় বিষয়টি কমিশনের সোশ্যাল মিডিয়া প্রচারের সাথে সম্পর্কিত।এখন প্রকাশ্যে এসেছে, বিজেপির পদাধিকারীর মালিকানাধীন একটি বিজ্ঞাপনী এবং সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থাকে ২০১৯ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময় নির্বাচন-সংক্রান্ত অনলাইন বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য মহারাষ্ট্রের মুখ্য নির্বাচন আধিকারিক নিয়োগ করেছিলেন।পরবর্তীকালে, এটিও প্রকাশিত হয়েছে যে ভারতের নির্বাচন কমিশন নিজেই বিভিন্ন সরকারি সংস্থাকে ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের জন্য একই সামাজিক মাধ্যম এজেন্সিটিকে নিয়োগের অনুমতি দিয়েছে।এই বিষয়ে এখন জনসমক্ষে পর্যাপ্ত পরিমাণে উপাদান উপলব্ধ। সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার জন্য সংবিধানের ৩২৪ নং ধারা অনুসারে নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে স্বীকৃত।অতএব, এটি আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে যে ইসিআই কেবল ন্যায্য নয়, বরং স্পষ্টভাবে তার ন্যায্যতা প্রদর্শিতও হবে।

আপনার একান্ত
সাক্ষর
(সীতারাম ইয়েচুরি)
সাধারণ সম্পাদক, সিপিআই (এম)


শেয়ার করুন

উত্তর দিন