ব্যক্তির নাম বড়, না পার্টির কাজ? -প্রতীকউর রহমান...

২৩ মার্চ ২০২৩

একটি মজবুত আর ব্যাপক সংগঠন

অন্ধকার একটুকরো ঘরে আলোচনা চলছে রামপ্রসাদ বিসমিল কে কিভাবে জেল থেকে মুক্ত করা যায়। ভগৎ সিং, শিব বর্মা ও জয়দেব। শারীরিক গঠনে জয়দেব, শিব বর্মা অপেক্ষা অনেক শক্তিশালী ও মারকুটে স্বভাবের, তাই ভগৎ সিং ঠিক করেন সে ও জয়দেব বিসমিল মুক্ত অ্যাকশনে যাবে। শিবের নিজের দুর্বল শরীর এর উপর খুব রাগ হচ্ছিল, নিজেকে পার্টির কাজের যোগ্য বলে মনে হচ্ছিল না, চুপ করে ঘুমানোর ভান করেই শুয়ে ছিলেন, পাশেই ভিক্টর হুগোর উপন্যাস পড়ছিলেন ভগৎ সিং, আস্তে করে ডাকলেন শিব! একটা কথার উত্তর দাও।

ব্যক্তির নাম বড়, না পার্টি র কাজ?

উল্টো দিকের বক্তা বলেন পার্টির কাজ।

আর পার্টির কাজ যাতে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে চলে, আমাদের সব ' অ্যাকশন' যাতে সফল হয়, দেশবাসীর কাছে আমাদের কথা যাতে নিয়মিত ভাবে পৌঁছোয়, আমাদের এই স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রত্যেকটি স্তরে আমরা সাফল্য লাভ করতে পারি তার প্রথম শর্ত কী?
একটি মজবুত আর ব্যাপক সংগঠন।

ও বললো , সংগঠন আর প্রচার। দেশের জনসাধারণ আমাদের সাহস আর আমাদের নানান কাজের প্রশংসা করলেও আমাদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করতে পারছে না। এখনও আমার খোলাখুলি তাদের এ কথাও বলতে পারছিনা যে, আমরা যে স্বাধীনতার কথা বলছি তার কাঠামো কেমন হবে, ইংরেজ চলে যাবার পর যে সরকার হবে, তা কেমন হবে, কারা হবে। আমাদের আন্দোলনকে গণভিত্তি দেবার জন্য আমাদের অভীষ্ট কে জনসাধারনের মধ্যে নিয়ে যেতে হবে। জনসাধারণের সমর্থন না পেলে পুরানো কায়দায় দু-একজন ইংরেজ কর্মকর্তা বা সরকারি টিকটিকি কি রাজসাক্ষী কে মেরে আমাদের আর চলবে না। কিছুক্ষন চুপ থেকে আবার বলা শুরু করলো, আমরা সবাই সৈনিক। সৈনিকের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ রণক্ষেত্রের প্রতি। তাই অ্যাকশন এ যাবার কথা উঠতেই সবাই উন্মত্ত হয়ে ওঠে। তবু আন্দোলন এর কথা মনে রেখে কাউকে না কাউকে তো অ্যাকশন-এর মোহ ছাড়তে হবে। সাধারণত অ্যাকশন এ যারা লড়ে বা ফাঁসি তে ঝোলে, শহীদত্বের বরণমালা তাদের গলায় পড়ে, এ কথা ঠিক। ইমারতের সিংহ দরজায় হীরার যে অলংকরণ, এদের মূল্যও তাই। অথচ ইমারতের দিক থেকে দেখতে গেলে, ভিতের নিচে চাপা পড়া একটা পাথরের তুলনায় এদের মূল্য কিছুই নয়। এযাবৎ আমাদের আন্দোলন হীরা উপার্জন করেছে, বনেদের পাথর জড়ো করতে পারি নি। তাই এত ত্যাগ পরেও ইমারত তো দূরের কথা, তার কাঠামো পর্যন্ত আমরা খাড়া করতে পারি নি, আজ আমাদের প্রয়োজন বনেদের পাথর। ত্যাগ আর আত্মবলিদানের ও দুটো রূপ। এক হলো গুলি বা ফাঁসিতে লটকে মরা। এর চমকটাই বেশি, কষ্ট টা কম।

দ্বিতীয়টা হলো পিছন থেকে সারাজীবন ইমারতের বোঝা বয়ে বেড়ানো।

সময়ের সঙ্গে নিজের পথ এর প্রতি অবিচল থেকে নিজের পথ ত্যাগ না করে, ইমারতের বোঝায় যাদের পা টলে না, কাঁধ বাঁকে না, তিল তিল করে যারা নিজেদের গলিয়ে যায়, জ্বালিয়ে যায় যাতে প্রদীপ এর জ্যোতি মলিন না হয়, নিস্তব্ধ পথে যাতে আঁধার না ছেয়ে আসে, সেই সব লোকের ত্যাগ ও আত্মবলিদান কি প্রথম দের তুলনায় বেশি নয়? "

এতদিন পর এই সময় আমরা দেখি আমাদের নেতারা যখন বলেন ব্যক্তি নয় পার্টি বড় সব সময় মনে রাখবে, তখন মনে হয় কতদিন আগে ভগৎ সিং এর বলে যাওয়া কথা গুলো কতটাই সত্য!

পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি...


ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস দেখলে আমরা দেখতে পাই প্রথম জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বের অনুনয়-বিনয় ও দাবিসনদ পেশে ডমিনিয়ন স্টেটাস, উল্টো দিকে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি ও মানুষের সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রাম, পরে এই অংশটি কমিউনিস্ট ধারা নামে পরিচিতি লাভ করে, বিংশ শতকের শুরুর দিক থেকেই সশস্ত্র বিপ্লবী ধারায় মুক্তিসংগ্রাম ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে সারা দেশে। বাংলা, পাঞ্জাব এবং মহারাষ্ট্র ছিল এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। চাপেকর ভাতৃদ্বয়ের বিদ্রোহ, বাংলা প্রদেশের যুগান্তর দল ও অনুশীলন সমিতি পরিচালিত সশস্ত্র সংগ্রাম, বুড়াবালংয়ে যতীন দাস ও তার সঙ্গীরা, চট্টগ্রামে সশস্ত্র অভ্যুত্থান, পাঞ্জাবে গদর দল ইত্যাদি প্রচেষ্টা। অনুনয়-বিনয়ের নীতি ছাড়িয়ে রক্তত্যাগ ও প্রত্যাঘাতের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন করার মহাযজ্ঞে ব্রতী হয়েছিল। জানের পরোয়া না করেই হেমচন্দ্র কানুনগো, যতীন দাস, ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী, বারীন ঘোষ, সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বীণা দাসরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেই মহাযজ্ঞের আগুনে। কিন্তু কয়েকজন মানুষের সশস্ত্র অভ্যুত্থানে কিছু ব্যক্তি শাসক হত্যা হলেও শাসকশ্রেণীকে পরাস্ত করে দেশ স্বাধীন করার সম্ভাবনার যৌক্তিকতার প্রশ্ন উঁকি মেরেছিল বিপ্লবীদের মননে। ইংরেজদের তাড়িয়ে দিলেই দেশবাসী মানুষজনের বহমান দুর্দশা কি মিটবে? এই প্রশ্নও নাড়া দিয়েছিল তাদের। সুস্পষ্ট পথ ও লক্ষ্যের সন্ধানে বেরিয়েই দ্বিতীয় ধারার নিবেদিত প্রাণেরা খুঁজে পায় রুশ বিপ্লবের সাফল্য, পত্রপত্রিকার প্রবন্ধ ও অভিজ্ঞতালব্ধ উপলব্ধির সংমিশ্রণে উন্মুক্ত হয় সংগঠিত গণআন্দোলনের ধারা। এই নবধারায় যে সমস্ত জঙ্গি নেতৃত্ব ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল, তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে সাম্রাজ্যবাদের বুকে কাঁপন ধরিয়েছিল, ভগৎ সিং তাঁদেরই একজন।

সে মাটি তে রাইফেল পুঁতবে...!!!


চক নং ১০৫, লায়লপুর জেলার(বর্তমান পাকিস্তানে) বাংগা গ্রামে কিষেন সিং ও বিদ্যাপতির কোলে জন্মানো এই বীর যুবক পারিবারিক সহচর্যেই দেশপ্রেমের পাঠ শুরু করেছিল। ৪বছর বয়সে ভগৎ সিং স্বাধীনতা সংগ্রামী মেহতা আনন্দ কিশোর কে বলেছিলেন সে মাটি তে রাইফেল পুঁথবে, তাতে গাছ হবে এবং রাইফেল ফলবে সেই রাইফেল দিয়ে ইংরেজ তাড়াবে। যখন ১২ বছর বয়স, ১৯১৯ এপ্রিল মাস জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যার খবর শুনে স্কুলে না গিয়ে চলে যায় জালিয়ানওয়ালাবাগে, সেখান থেকেই হাজার হাজার মানুষের রক্ত ভেজা মাটি সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। ঐ মাটিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন অনেক দিন, এইঘটনা ভগৎ কে গভীর ভাবে নাড়া দিয়েছিল। শহীদ কর্তার সিং সারাভারের( প্রথম লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় কর্তার সিং সারাভার ১৯ বছর বয়সে ফাঁসি হয়) একটা ছবি সবসময় থাকতো ভগৎ সিং এর পকেটে, তিনি ছিলেন ভগৎ এর আইডল । ন্যাশনাল কলেজে ভর্তি হয়ে শিখলেন উর্দূ, ইংরেজি, হিন্দি । ১৭ বছর বয়সে বাবা বিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন, তাই বাড়ি ছাড়লেন ভগৎ , চলে এলেন কানপুরে 'হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন'-এ যোগদান। এখানেই আলাপ শচীন্দ্রনাথ সান্যাল , বিজয়কুমার সিনহা, শিব ভার্মা(পরে CPIM উত্তর প্রদেশ রাজ্যের সম্পাদক), জয়দেব কাপুর,বটুকেশ্বর দত্ত, অজয় ঘোষ (পরে কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক)।১৯২৬ সালে গঠন করেন নওজোয়ান সভা। এই সময় বহু গদর বিপ্লবীরা মস্কো থেকে মার্কসবাদে প্রশিক্ষিত হয়ে ফেরেন, এঁদের কয়েক জনের চেষ্টায় পাঞ্জাবী পত্রিকা "কীর্তি" প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকায় ভগৎ সিং লেখেন ও কিছুদিনের জন্য পূর্ণ সময়ের কর্মী হন। পরে গোড়ার যুগের কমিউনিস্ট সত্যভক্ত, রাধামোহন গোকুলজি, শওকত উসমানি প্রমুখের সঙ্গে মিলিত হন। ভগৎ সিং উল্লেখ করেছেন কানপুরে সেই সময় বড় মাপের কমিউনিস্ট নেতা মুজফফর আহমেদ এর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল। ঘুরিয়ে বলা যায় এই সময় তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত না হয়েও কমিউনিস্ট আন্দোলনের অংশ হয়ে পড়েন।

জেল খানার নোটবুক

তাঁর জেল খানার নোট বুক ৫০,৫১,৫৩,৫৬,৫৭,৬০,৬১,৬২,৬৩,৬৪,৬৫,৬৯,৭০,৭১,৭২,৭৩,১০১,১০২, নং পৃষ্টা থেকে জানতে পারি।

১৯২৮সালের ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক হয়, ঠিক হয় সংগঠনের নামের সঙ্গে যুক্ত করা হবে 'সোশ্যালিস্ট' শব্দটি। তৈরি হলো হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন। মার্কিন কায়দায় ফেডেরাল রিপাবলিক আর নয় এবার লক্ষ্য রুশ কায়দায় সোস্যালিস্ট রিপাবলিক।

১৯২৮সালে ৩০শে অক্টোবর সাইমন কমিশন লাহোর এলে জনগণ কালো পতাকা দেখায়, সেখানে পুলিশ নির্মম ভাবে লাঠচার্জ করে লালা লাজপত রায় মারাত্মক ভাবে আহত হন ও ১৯শে নভেম্বর শহীদ হন। ক্রোধের আগুনে ঘি পড়লো, সবার মুখে একটাই প্রশ্ন আমরা কি এতটাই অসহায়, যে জাতির সম্মান রক্ষা করতে পারছি না? লালাজি জীবনের শেষের দিকে বিপ্লবী দের সম্পর্কে বিরক্তি প্রকাশ করতেন। ভগৎ সিং ও সুখদেবের জন্য তার বাড়ীর দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দিয়েছিলেন, শেষের দিকে সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতির সঙ্গ নিতে শুরু করে ছিলেন। তার পরও HSRA সভায় ঠিক হয় লালাজির উপর প্রহর মানে জাতির উপর প্রহার তাই এখন মূল কাজ হলো এই হত্যার বিচার যা ইংরেজ আদালতে সম্ভব নয়। সাণ্ডর্স সাহেবকে হত্যা করে প্রতিশোধ নেওয়া হলো। এই ঘটনার বিবরণ দিয়ে ইংরেজিতে ইশতেহার বিলি করা হয়, দেয়ালে পোস্টার মারা হয় শহর জুড়ে। সাণ্ডর্স কে হত্যা করা হবে এর প্রস্তাব দেন ভগৎ সিং, কিন্ত হত্যার পর দিন থেকে তার মন উদ্বেল হয়ে রইলো। বিপ্লবী হলেও রক্ত পিপাসু সে ছিল না। তার উদ্দেশ্য ছিল গোটা মানব জাতির সুখী করা। বিপ্লবী রা খুনি নয়, মানবতার পূজারী সেই জন্য মানুষের প্রাণ নিতে স্বভাবতই তাদের দুঃখ হয়।

এই প্রসঙ্গে দলের পক্ষ থেকে দিল্লির অ্যাসেম্বলিতে যে ইশতেহার ছড়ানো হয়, তাতে বলা হয়েছিল: "মানুষের জীবন আমরা পবিত্র বলে মনে করি। এমন এক উজ্বল ভবিষ্যতের আমরা বিশ্বাস রাখি যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি পূর্ন শান্তি ও স্বাধীনতার সুযোগ পেতে পারে। মানুষের রক্ত ঝরাতে বাধ্য হই বলে আমরা দুঃখিত। তবে বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে সকলকে সমান স্বাধীনতা দিতে, মানুষের দ্বারা মানুষের শোষণ শেষ করতে, বিপ্লবে কিছু না কিছু রক্তপাত অনিবার্য" সাণ্ডর্সহত্যার পর পুলিশ ভগৎ কে হন্যে হয়ে খুঁজছিল, তখন পুলিশের চোখে ধুল দিয়ে রাজগুরু ও ভগৎ সিং কলকাতায় চলে আসেন, এখানে সাক্ষাৎ হয় যতীন দাশের সঙ্গে, যতীন দাস বোমা তৈরি তে পারদর্শী ছিলেন, ভগৎ সিং আগ্রা তে এসে তার সাথীদের বোমা তৈরি শিখিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। বোমা তৈরির আরও একটা বাধা তাদের থেকে দূর হলো তখন। এই সময় কমিউনিস্ট দের নেতৃত্ব শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত হছিল, শ্রমিকদের এই এই আন্দোলন অঙ্কুরে শেষ করার জন্য কেন্দ্রীয় বিধান সভায় ট্রেড ডিসপ্যুট বিল ও পাবলিক সেফটি বিল আনা হয়। গোটা দেশ জুড়ে সব রাজনৈতিক দল ও দেশবাসী একসুরে এর বিরোধিতা করতে থাকে। ভগৎ সিং কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক ডাকে, ঠিক হয় এর বিরোধিতা করতে হবে। কিন্তু সরকার যদি কালা হয় তাকে শোনানোর জন্য জোরে আওয়াজ এর প্রয়জন তাই ঠিক হয় বোমা নিক্ষেপ করে গ্যালারি থেকে ইশতেহার বিলি হবে আর বয়রাদের কান খোলা হবে। জয়দেব কে দায়িত্ব দেওয়া হয়, অ্যাসেম্বলি ভবন (এখন লোকসভা) এর নস্কা তৈরি করা, পরে সে ভগৎ সিং কে বুঝিয়ে দেবে ১৯২৯ সালের ৮ই এপ্রিল ভগৎ সিং ও বটুকেস্বর দত্ত বোমা নিক্ষেপ করে, যদিও বোমা গুলি তে কোনো স্প্লিন্টার ছিল না যাতে কোন মানুষ মারা যান তার পর সেই বিখ্যাত ইশতেহার "বধির কে শোনাতে হলে জোরালো গলা চাই"।

অসহায় ভারতীয় জনগনের হয় প্রতিবাদ করতে আমরা একটি শিক্ষার উপর জোর দিতে চাই; এই শিক্ষা ইতিহাসে বহুবার পুনরাবৃত্ত যে, ব্যক্তিকে সহজেই খুন করা যায় কিন্তু ধারনা কে খুন করা যায় না। বড় বড় সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে গেছে কিন্তু ধারনা গুলি কালোউত্তীর্ণ।

ইনকিলাব জিন্দাবাদ

বোমার মামলা চলাকালীন 'বিপ্লব'র স্বরূপ লিখতে গিয়ে লেখেন, "…অতএব একটা মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন এবং যারা এ কথা উপলব্ধি করেছে তাদেরই দায়িত্ব সমাজকে সমাজতান্ত্রিক ভিত্তির ওপরে পুনর্গঠিত করা।" তিনি বিপ্লব মানে ওই ব্যাখায় লিখেছিলেন, "বিপ্লব সর্বদা রক্তাক্ত সংঘাতে জড়িত নয় এবং তার মধ্যে ব্যক্তিগত প্রতিশোধেরও স্থান নেই। বিপ্লব মানে বোমা-পিস্তলের পূজা নয়। বিপ্লব বলতে আমরা বুঝি যে, বর্তমান ব্যবস্থা যা স্পষ্টতই অন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তাকে পালটাতে হবে।"
ক্ষমতার হস্তান্তরের মধ্যে দিয়ে ব্রিটিশ শাসন অপসারিত হওয়াটাই লক্ষ্য না, একটা বাস্তবসম্মত সঠিক বিকল্প দরকার জনগণের কাঙ্খিত স্বাধীনতার বাস্তবায়নের জন্য। এই উপলব্ধির সক্রিয় প্রয়োগগত কারণেই আপামর দেশবাসীর ইউথ আইকন হয়ে আজীবন থেকে যাবেন শহীদ ভগৎ সিং। ফাঁসিকাঠে ওঠার আগে শেষ চিঠিতে দেশের যুবসমাজের কাছে তিনি বার্তা দিয়ে গেছেন, "জাতীয় ইতিহাসের এই সংকটকালে যুবসমাজকে এক বিশাল দায়িত্ব নিতে হবে। …..তাদের দায়িত্ব শিল্প-এলাকার কোটি কোটি বস্তিবাসী ও কোটি কোটি জীর্ণ কুটিরে আসিন গ্রামীণ মানুষকে জাগিয়ে তোলা, যাতে আমরা স্বাধীন হতে পারি, যাতে মানুষের হাতে মানুষের শোষন হয়ে ওঠে অসম্ভব।" তাঁর বার্তা জলের মতো স্বচ্ছ। সমাজতান্ত্রিক স্বাধীনতায় পারবে পরাধীনতার, গ্লানির শৃঙ্খল ভেঙে চুরমার করতে।

সংগ্রামের রণকৌশলের অপরিহার্য অঙ্গ জঙ্গি আন্দোলন

কিন্তু সেই জঙ্গি আন্দোলনের স্বরূপ কেমন হবে তা তিনি দৃঢ়তার সাথে জানান দিয়ে গেছেন বারবার। বিপ্লবের সংজ্ঞায়নের মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন অহেতুক হিংসাত্মক ভঙ্গিমা বা প্রতিশোধপরায়নতায় হত্যালীলা কোনো বৈপ্লবিক গঠনমূলক কর্মকাণ্ড না। রোমাঞ্চের তাগিদে অস্ত্র ধরলে স্বাধীনতা অধরাই থেকে যাবে। একমাত্র সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সংগঠিত গণআন্দোলনের মধ্য দিয়েই স্বাধীনতা আস্বাদন করা সম্ভব। এই গণআন্দোলনের একাগ্রতাই হল তাঁর মতে জঙ্গি আন্দোলন। গণআন্দোলন গড়ে তোলার জন্য আত্মত্যাগী মনোভাবে সর্বাত্মক নিয়োগই জঙ্গি আন্দোলনের রপ।

কিন্তু তা বলে তিনি বর্তমান ব্যবস্থার উৎপাটনে সদা সর্বদা শান্তির ললিত বাণী শোনানোর দলে ছিলেন না। অহিংসতার বুলি তাঁর কাছে ছিল ফাঁকা আওয়াজ। ইউটোপিয়ো আখ্যা দিয়েছিলেন অহিংস মতবাদকে। তিনি জানতেন যখন শাসকের শ্রেণী স্বার্থ বিপদসঙ্কেত দেখতে পাবে, তখন তারা শক্তিপ্রয়োগ করবেই। তার মোকাবিলা করতে গেলে পাল্টা শক্তিপ্রয়োগ অপরিহার্য। এইচআরএ'র ইশতেহারে অনেক আগেই ঘোষনা ছিল, "এই সরকারি সন্ত্রাসবাদের জবাব অবশ্যই পালটা-সন্ত্রাসবাদ দিয়ে দিতে হবে।…….পার্টি কখনো ভুলবে না যে সন্ত্রাশবাদ তাদের লক্ষ্য নয়।" বধিরকে শোনাতে হলে উচ্চনাদ প্রয়োজন, তাই অহিংসাত্মক মিনমিন দিয়ে কাজ হবেনা।
ভারতীয় বিপ্লবের সমার্থক হয়ে ওঠা ভগৎ সিংয়ের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত ভারতবাসীর হৃদয়ে বিপ্লবের শৃঙ্গার বাজিয়ে দেয়। কোর্টের ট্রাইব্যুনালকেও তাঁরা ব্যবহার করেছিলেন দেশবাসীর সামনে মতাদর্শ তুলে ধরার ও বিকল্পের হদিস পৌঁছে দেওয়ার মঞ্চ হিসেবে। জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোও নিবেদিত ছিল মুক্তিসংগ্রামের স্বার্থে।
এই বিরাট অনুকরণীয় দৃষ্টান্তমূলক জীবনকে স্মরণ করতে হবে তাঁর ভাবাদর্শগত প্র্যাক্সিসের মাধ্যমে। যুবসমাজকে তিনি যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন সেই কাজ এখনও অসম্পূর্ণ। যদি আমরা নিজেদের ভগৎ সিংয়ের উত্তরাধিকার মনে করে থাকি তাহলে সেই অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব কাঁধে নিতে হবে। সম্পৃক্ত হতে হবে তাঁর ভাবধারার সাথে। মানুষ কর্তৃক মানুষের শোষনের সংকটমোচন করে শৃঙ্খলমুক্ত করতে হবে ভারতের সমাজকে। ছিনিয়ে আনতে হবে তাঁর ও তাঁদের মতো বিপ্লবীদের স্বপ্ন দেখা সেই কাঙ্খিত স্বাধীনতা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই থেকেই প্রেরণা নিয়ে আধুনিক অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের ভারতীয় এজেন্টদের মোকাবিলা করতে হবে। 'কেন আমি নাস্তিক' প্রবন্ধতে তাঁর ঘোষনা "সমগ্র মানবসমাজকে পুঁজিবাদী শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে হবে।" সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের কঠোর সমালোচনা সমেত আন্তর্জাতিকতাবাদী দেশপ্রেমের সেনানী ও প্রচারক হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

কেন আমি নাস্তিক


বর্তমান ভারতে উগ্র হিংস্র জাতীয়তাবাদী শাসক বিজেপি-আরএসএস ভগৎ সিংয়ের আদর্শের বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। ওরা বলে বোমা নিক্ষেপ করার আগে, হেডগোয়েকার এর কাছে গিয়ে পা ছুঁয়ে প্রনাম করে এসেছিলেন ভগৎ সিং ও বটুকেস্বর
ইতিহাস ভুলিয়ে দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে ভগৎ সিংকে হিন্দুরাষ্ট্রের পোস্টার বয় হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে হিন্দুত্ববাদীরা। ওদের বীর ব্রিটিশ প্রভুদের কাছে মুচলেকা দিয়ে ছিল আর ভগৎ সিং মৃত্যুর আগে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট কে বলেন "আপনি সত্যি সত্যিই বড় ভাগ্যবান, কারণ আপনি এই দৃশ্য দেখার সুযোগ পাচ্ছেন যে ভারতীয় বিপ্লবী তার মহান আদর্শের জন্য কিভাবে হাসতে হাসতে মৃত্যু কে আলিঙ্গন করে"। এটাই একজন বিপ্লবী আর একজন তবেদার এর মধ্যে পার্থক্য । প্রকৃত ঘটনা হল বস্তুবাদের প্রতি অটুট আস্থা ও ধর্ম সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। যার প্রাথমিক প্রমাণ তাঁর নিজের লেখা প্রবন্ধ 'কেন আমি নাস্তিক'। তাঁকে ধর্মীয় এজেন্ডার মুখ করে তোলাটা গভীর চক্রান্ত। এই চক্রান্তের মুখোস না খুলতে পারলে তা হবে মুক্তিসংগ্রামের সমস্ত শহীদের সর্বোচ্চ অপমান। আজাদ হিন্দ ফৌজেরও অনেক আগে ধর্মনিরপেক্ষ ক্যান্টিনের পত্তন করেছিল এইসএসআরএ। এ'প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, অসহযোগ আন্দোলন স্তিমিত হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে ভগৎ সিং 'কীর্তি' পত্রিকায় উৎকণ্ঠা নিয়ে লেখেন, “ধর্মকে যদি রাজনীতি থেকে পৃথক করা যায়, তাহলে আমরা সকলে যৌথভাবে সামিল হতে পারি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়, ধর্মীয় বিষয়ে যতই তফাত থাকুক না কেন। আমরা অনুভব করছি যে ভারতের প্রকৃত হিতৈষীরা এই নীতিগুলো অনুসরণ করে ভারতকে বাঁচাবেন সেই আত্মহননের পথ থেকে যে পথে আজ সে চলছে।” তিনি সমাধানের ইঙ্গিত দেন ওই লেখাতেই।

শ্রেণিচেতনাই প্রধান হাতিয়ার যা সহায় হতে পারে দাঙ্গা রুখতে

২৩শে মার্চ ১৯৩১ মানবতা কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিয়ম এর তোয়াক্কা না করে সন্ধ্যা বেলা ফাঁসি দেওয়া হয়, তার পরে দেহ গুল কে টুকরো টুকরো করে কেটে চটের বস্তায় ভরে শতদ্রু নদীর তীরে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। কারণ ভগৎ সিং এর বিখ্যাত কথা "জীবিত ভগৎ সিং এর থেকে মৃত ভগৎ সিং ব্রিটিশ শোষক দের কাছে আরো বেশি বিপদজনক হবে"।
কথা ছিলো স্তালিনের সাথে সাক্ষাতের। ১৯২৮ সালে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের ষষ্ঠ কংগ্রেসের ডাক এসেছিলো শওকত ওসমানির সাথে অংশগ্রহণের। ভারতবর্ষে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লববাদী ধারা তখন শিখরে! পরিকল্পনা চলছে মুক্তিকামী মানুষের সর্বোচ্চ আওয়াজ হুকুমতের কানে পৌঁছে দেওয়ার। যাওয়া হলো না ভারতের স্বাধীনতার লড়াইয়ের বিপ্লবী প্রবাহের অনন্য আইকন ভগৎ সিংয়ের। তারও বছর তিনেক পর, ফাঁসির মঞ্চ আর কয়েকঘন্টা দূরে! কুঠুরিতে বসে ভগৎ সিং পড়ছেন লেনিনের কথা। এক বিপ্লবী পরিচিত হচ্ছেন আরেক বিপ্লবীর সাথে। লেনিনের ইনকিলাবি ভাবনায় সেঁকে নেওয়া হচ্ছে ভারতের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী মনন। সেই বইটা শেষ করা হয়নি শহীদ-এ-আজম ভগৎ সিংয়ের। এদেশের বুকে সমাজতান্ত্রিক নির্মাণের পথের সন্ধান ঐ বইয়ের মুড়ে রাখা পাতা অবধি এগিয়ে নিয়ে গেছেন ভগৎ সিং। বাকি পথটুকু খুঁজতে, মেলাতে হবে রাজপথের সাথে, বাকি পাতা গুলো পড়ে সেই অসম্ভবের স্বপ্ন দেখা পথটাকে।


শেয়ার করুন

উত্তর দিন