২০২৪ কেন্দ্রীয় বাজেটঃ দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার

ঈশিতা মুখার্জী

২০২৪ সালে নবগঠিত এনডিএ সরকারের প্রথম বাজেট। দেশের যে অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল এবং মোদী সরকারের অভিজ্ঞতায় যে প্রথম জোট সরকার তৈরি হল, তার প্রথম বাজেট ছিল এটি। বাজেট পেশ করার সময় বোঝা যাচ্ছিল যে জোট সরকারের কার্যকলাপের সাথে এই সরকার অপটু। অর্থমন্ত্রী শুধু মাত্র জোট শরিকদের রাজ্যের প্রতি কয়েকটি ঘোষণা করলেন, কিন্তু স্বাভাবিকভাবে দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি কোন চিন্তা ভাবনার তোয়াক্কা করলেন না। একদিন আগে পেশ করা আর্থিক সমীক্ষার সঙ্গে এই বাজেট সামঞ্জস্য রাখল না। মনে হয়, দেশের নির্বাচিত সরকার দেশের এই মুহূর্তের অর্থনৈতিক সমস্যা সম্পর্কে উদাসীন বললেও কম বলা হবে, অস্বীকারের পর্যায়ে চলে গেছে এই সরকার।

দেশে আর্থিক বৈষম্য চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছে। বেকারত্ব, ক্ষুধা, অপুষ্টি - দেশের বেশির ভাগ মানুষের বেঁচে থাকাই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে দেশের বৃহৎ অংশের পরিবারের। এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেটের থেকে মানুষের আশা ছিল যে, সরকার তার জীবন জীবিকার সঙ্কটের কিছুটা সুরাহা করার চেষ্টা করবে। প্রয়োজন ছিল সরকারী ব্যয়বরাদ্দ বৃদ্ধি করার। প্রয়োজন ছিল শিক্ষা, স্বাস্থ্যখাতে অর্থবরাদ্দ বৃদ্ধি করার। এর কোনটাই ঘটেনি। মানুষের চাহিদা ছিল মনরেগা প্রকল্পে, মানুষের চাহিদা ছিল অঙ্গনয়াড়ি প্রকল্পে, আশা ছিল আবাস যোজনায়, আশা ছিল গ্রামোন্নয়ন প্রকল্পে, ভরসা ছিল রেশন প্রকল্পে। এসব কোনও প্রকল্পেই ব্যয়বরাদ্দ বৃদ্ধি পায় নি, বরং কোনও কোনও ক্ষেত্রে কমে গেছে। একশ দিনের কাজ প্রকল্পে বছর বছর ব্যয়বরাদ্দ কমাতে কমাতে গত বছর খরচ হয়েছিল ৮৬,০০০ কোটি টাকা। সেটা যে পর্যাপ্ত ছিল না, তা আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা বুঝিয়ে দিয়েছে। এত মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে সেই বরাদ্দ এ বছরের বাজেটে একচুল বাড়ল না; প্রকৃত অর্থে তো বরাদ্দ কমেই গেল। তাহলে গ্রামের মানুষের এই প্রকল্পে কাজের সুযোগ কোথা থেকে হবে? গ্রামে কৃষি ব্যবস্থায় জোর দিয়েছেন বলে অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করলেন। কিন্তু যদি কৃষি এবং কৃষকের উন্নয়নের মন্ত্রকের ব্যয় দেখি, তাহলে গত বছরের শেষে ব্যয় হয়েছিল ১,১৬,৭৮৮.৯৬ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতায় এত জোরের কোনও প্রভাব দেখা গেল না বাজেট ব্যয়বরাদ্দে - এ বছর বরাদ্দ সামান্য বেড়ে হল ১,২২,৫২৮.৭৭ কোটি টাকা। সার দপ্তরের বাজেট বরাদ্দ গত বছর যা ব্যয় হয়েছে তার থেকে কমিয়ে দেওয়া হল। গত বছর ব্যয় হয়েছিল ১,৮৮,৯৪৭.২৯ কোটি টাকা। এ বছর বরাদ্দ হল ১,৬৪,১৫০.৮১ কোটি টাকা। সেচ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় গত বছর ব্যয় হয়েছিল ১০,৪২৭.৭৬ কোটি টাকা ; এ বছর সেই বরাদ্দ হয়েছে ১০,৮৬৪.০৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া বহুল বিজ্ঞাপিত প্রকল্প প্রধানমন্ত্রী কৃষি সিঞ্চয় যোজনায় গত বছর ব্যয় হয়েছিল ৬০০ কোটি টাকা, এ বছর তার বরাদ্দ একচুলও বাড়েনি। মহারাষ্ট্রে খরা প্রবণতার জন্য এ বছরে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষকের আত্মহত্যা সম্পর্কে আজও সরকার উদাসীন। এই ক্ষেত্রে ব্যয়বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় ১০০ কোটি টাকা কমিয়ে করা হয়েছে মাত্র ৬০০ কোটি টাকা। কোথায় এই বাজেট কৃষির উপর জোর দিল? আর্থিক সমীক্ষায় জোর দিয়ে বলা হল যে, কৃষিতে বিশ্বের সব দেশের সরকার জোর দিয়ে থাকে। সেচ এবং সারে ভর্তুকি না দিয়ে কোনও দেশ তার কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে নি। কি করল এই বছরের বাজেট? সেচে ভর্তুকি কমালো ২৪,৮৯৪ কোটি টাকা। মুখে বললেও স্বামীনাথন ফর্মুলা মেনে ফসলের ন্যুনতম সহায়ক মূল্য চালু করার কোনও প্রচেষ্টা দেখা গেল না।

রেশন ব্যবস্থা দেশে ভেঙে পড়েছে, দেশের ক্ষুধা সূচকের নিরিখে ভারতের অবস্থান মোদী রাজত্বে ক্রমশ নীচের দিকে নেমে গেছে। দেশের মানুষ ভেবেছিলেন বোধহয় এই জোট সরকার এবং মানুষের রায় দেখে রেশন ব্যবস্থায় কিছুটা বরাদ্দ বাড়বে। এই পরিপ্রেক্ষিতে অমানবিক ভাবে খাদ্য এবং গণবন্টন দপ্তরের বরাদ্দ ২,২১,৯২৪.৬৪ কোটি টাকা থেকে কমে এই বছর করা হল ২,১৩,০১৯.৭৫ কোটি টাকা। আসলে খাদ্যে ভর্তুকি কমে গেল এক বছরে ৭,০৮২ কোটি টাকা। এই পরিপ্রেক্ষিতে দেশের মানুষ অভুক্ত থাকছে, খাদ্যপণ্যের দাম ক্রমাগত বেড়েই চলেছে - বাজেট তৈরি করবার সময়ে এই সব বাস্তবতার কোন খেয়াল রাখল না সরকার? অর্থমন্ত্রী অবশ্য ঘোষণা করেছেন যে বিনামূল্যে রেশন প্রকল্প আরও পাঁচ বছর জারি থাকবে, কিন্তু তা কিভাবে চলছে তা আমরা সকলেই জানি।

শিক্ষায় প্রকৃত বরাদ্দ কমেছে এই বাজেটে, যদিও দেখা যাচ্ছে ব্যয়বরাদ্দ একই রকম আছে বহু ক্ষেত্রে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষায় ব্যয়বরাদ্দ বাড়েনি। মাদ্রাসা শিক্ষায় বরাদ্দ কমে গেছে। অঙ্গনওয়াড়ি এবং পোষণ প্রকল্পে বরাদ্দ কমে গেছে। স্বাস্থ্যখাতেও বরাদ্দ বাড়েনি। যে নতুন প্রকল্প বা সুযোগ সরকার দিচ্ছে তা শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যখাতে বেসরকারী ক্ষেত্রের। বেসরকারী ক্ষেত্রে ছাত্রদের শিক্ষানবিশ থেকে কাজের সুযোগ করে দেবে সরকার। ছাত্রদের পড়াশোনার জন্য ঋণ দেবে সরকার - এই ধরণের ঘোষণা করা হয়েছে। এই ঘোষণাগুলি সম্পর্কে একটি কথাই বলা যায় যে এই বিষয়ে সরকারের করণীয় কি? ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদানের বদলে তাদের ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ঋণের জালে জড়ানো কি সরকারের কাজ? বেসরকারী কোম্পানিতে শিক্ষানবিশিতে সরকারের কি মাথাব্যথা থাকে? সরকার তো দেশের মানুষকে শিক্ষিত করার জন্য ব্যয়বরাদ্দ করবে, বিশ্বের সব দেশে তো এমনটাই ঘটে। বেসরকারী ক্ষেত্রকে আমাদের দেশের শিক্ষা কতটা সাহায্য করবে এটা আজকের প্রশ্ন, না কি আমাদের দেশের শিক্ষা আগামী দিনে দেশকে কতটা এগিয়ে নিয়ে যাবে সেটা প্রশ্ন - আমাদের দেশের মানুষ এবং সরকারকে এই কথা ভাবতে হবে। তাহলেই এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে, আমাদের দেশের সরকার শিক্ষা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অগ্রাধিকার বলতে কোনটা বোঝে। দেশের সরকার যদি বেসরকারি কোম্পানির মুনাফার দিকটা ভাবে, তাহলে ২০২৪ সালের বাজেট এইরকমই হবে; আর শিক্ষা, স্বাস্থ্যখাতে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকা এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকাকে যদি অগ্রাধিকার দেয় সরকার তাহলে বাজেটে ব্যয়বরাদ্দ বাড়বে। এই বাজেট তো সঙ্কোচনমুখী বাজেট। বাজেটে আয় বাড়লেও ব্যয় বাড়েনি। দেশের সরকার মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকার দেয় না, এরকম সরকার কোন দেশে থাকতে পারে?

মোবাইল ফোনের দাম কমছে বাজেটে, কিন্তু ইন্টারনেট পরিষেবার খরচ? কেন সরকার ইন্টারনেট ভর্তুকি দিয়ে চালু করবে না, যদি সরকার বাস্তবেই ডিজিটাল দেশ গড়তে চায়। এ প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই। মহিলাদের অগ্রাধিকার শুধুমাত্র বাজেট বক্তৃতায়, কিন্তু ব্যয়বরাদ্দে নয়। শ্রমজীবী মানুষের মজুরি কমছে - এক্ষেত্রে কি করেছে এই বাজেট? বাজেট বলেছে যে বছরে ১ লাখ টাকার কম মজুরিতে যারা কাজ পাবে, তাদের প্রথম ৩ মাসের কিস্তিতে ৫০০০ পর্যন্ত টাকা দেবে; কিন্তু নিয়োগকর্তাকে সরকার দেবে ৭২,০০০ টাকা। সুতরাং সরকার যে শ্রমিকদের পক্ষে বাজেটের নিশানা রেখেছে, তা নয়। কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন উৎপাদনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা, বিনিয়োগ বৃদ্ধির চেষ্টা করা। এর কোনটাই বাজেট করেনি। তাছাড়া দেশের মানুষের চাহিদা বাড়ানো প্রয়োজন। তার জন্য প্রয়োজন হাতে টাকা - যা কোনোভাবেই এই বাজেট দিতে পারছে না।

ব্যয়বরাদ্দ সঙ্কোচনের আর্থিক পরিস্থিতি ছিল না এই বাজেটে। দেখা যাচ্ছে সরকারের রাজস্ব আয় বেড়েছে ১৪.৫%, কিন্তু ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ৫.৯৪%। প্রত্যক্ষ কর সংগ্রহ থেকে দেখা যায় যে, কর্পোরেট কর সংগ্রহ যত হয়েছে, তার থেকে বেশি সংগ্রহ হয়েছে আয়কর এবং পণ্য-পরিষেবা কর থেকে। আমাদের দেশে এরকম অবস্থা এই প্রথম হল। অর্থাৎ এই বিপুল আর্থিক বৈষম্যের নিরিখে সেই বৈষম্য কমানোর কোনও সম্ভাবনা নেই এই বাজেটে, বরং তা বাড়িয়ে দেওয়ার সব ব্যবস্থা পাকা করছে সরকার। পরিশেষে যে কথা আমাদের রাজ্যের জন্য প্রয়োজনীয় তা হল, এই বাজেট পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কথা ভাবেনি। সিকিমে বিপর্যয়ের মোকাবিলা করার কথা বলা হয়েছে বাজেট বক্তৃতায়, কিন্তু সিকিমের সড়ক যোগাযোগ যে উত্তরবঙ্গে এবং উত্তরবঙ্গের পাহাড়ের রাস্তা যে বিপর্যস্ত, বন্যাবিধবস্ত উত্তরবঙ্গের কথা এলই না বাজেটে। বার বার ঝড়ে নাকাল সুন্দরবনের কথাও এল না বাজেট বক্তৃতায়, যদিও বেশ কয়েকটি রাজ্যের কথা অর্থমন্ত্রী বলেন। অর্থমন্ত্রী পরিবেশের কথাও বলেন, কিন্তু এই বিপদের মোকাবিলা করার জন্য কোনও ব্যয়বরাদ্দ রাখলেন না। পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে এতটুকু গুরুত্ব বাজেট বক্তৃতায় দেননি অর্থমন্ত্রী। নীতি আয়োগ চিহ্নিত দরিদ্র জেলাগুলি নিয়েও কোন হেলদোল ছিল না বাজেটে।

বাজেট একটি বিষয়েই যত্ন নিয়েছে - কোনভাবেই যেন ধনী, অতিধনীদের আয়ের ওপর কোনও কোপ না আসে, বেসরকারি ক্ষেত্রের ওপর কোনও কোপ না পড়ে, বিশেষ করে কোটিপতি কর্পোরেটদের ওপর কোনও কোপ না পড়ে। কোটিপতির ঘরে দেশের প্রাচুর্য্য নিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান যেন বহাল থাকে, আর বেকারত্বের জ্বালায়, কৃষি ব্যবস্থার মোকাবিলা না করতে পেরে আত্মহত্যা বাড়তে থাকে। দেশের মানুষ হোক ঋণগ্রস্ত। বাড়ুক পরিযায়ী শ্রমিকের স্রোত। সরকার এই বাজেট নিয়ে সমস্ত বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে অস্বীকার করে চলে যাক শীতঘুমে আবার, আগামী বছরের বাজেট পর্যন্ত। (আজ গণশক্তি পত্রিকায় প্রকাশিত)


শেয়ার করুন

উত্তর দিন