Aggressive Latent communalism

শমীক লাহিড়ী

কিছুদিন আগে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল, যাকে কেন্দ্র করে অনেক বিতর্কও হয়েছে। ভিডিও-তে দেখা যাচ্ছে একটি লোককে একজন মহিলা মারছেন। অভিযোগ লোকটি নাকি ঐ মহিলার আপত্তিকর ছবি তুলছিল। যে কারোর ছবি তার অজান্তে তোলা খারাপ কাজ, আর খারাপ দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে মহিলাদের ছবি তোলা তো অপরাধ। লোকটিকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়, নিশ্চয়ই তদন্ত চলছে। কে ঠিক কে বেঠিক, অভিযোগ সত্যি কিনা, অপরাধ করে থাকলে কি মাপের অপরাধ ইত্যাদি বিষয় অবশ্যই তদন্ত সাপেক্ষ। এই পর্যন্ত বিশেষ কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু তারপর যেভাবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক প্রচার শুরু হয়ে গেল, তা শিউড়ে ওঠার মতো। এই ঘটনায় মহিলাদের নিরাপত্তা বা ঐ ব্যক্তির খারাপ মানসিকতা (যদি সত্যি হয় এই অভিযোগ) ইত্যাদি নিয়ে সমালোচনা বিতর্কের ঝড় উঠুক, কোনও সমস্যা নেই। তবে সোশাল মিডিয়ায় ‘খাপ পঞ্চায়েত’ বসিয়ে বিচার করা, আর এক বিপজ্জনক প্রবণতা। মহিলা নিরাপত্তা, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সমস্যা ইত্যাদি নিয়ে সুস্থ এবং তীব্র বিতর্ক চলা উচিত সমাজ সভ্যতার অগ্রগতির জন্যই।

কিন্তু প্রচার শুরু হলো, লোকটি মুসলমান তাই সে অপরাধী। মহিলা হিন্দু সম্প্রদায়ের, তাই নাকি তার প্রতি এই অবিচার। সব মুসলমানই নাকি অপরাধী! দেশে এবং রাজ্যে মোট অপরাধের ৭৫-৮০ শতাংশই নাকি মুসলমানরা করে! ইত্যাদি ইত্যাদি নানাবিধ কল্পনাপ্রসূত অলীক প্রচার চলতে লাগলো এবং অবশ্যই যার বেশিরভাগ ভাষ্যই বিজেপি-তৃণমূলের আইটি সেল নির্মিত। হইহই করে নেমে পড়ল আরএসএস নিয়ন্ত্রিত নানান বাহিনী, এই ঘটনায় সাম্প্রদায়িক রঙ চড়াতে। উদ্বেগের বিষয় হলো, যারা সাধারণভাবে অসাম্প্রদায়িক ভাবনায় চলেন, তাদের একটা অংশও অজান্তেই সামিল হয়ে গেলেন এই প্রচারে। ফলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর সমস্যা, রাজ্যে দেশে মহিলাদের নিরপত্তা ইত্যাদি মূল বিষয়গুলো আড়ালে চলে গেল, আর সরকার, পুলিশ, সমাজপতিরাও তাদের দায়ভার ঝেড়ে ফেলতে পেরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

এটাই হলো সুপ্ত সাম্প্রদায়িকতা। কোন একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে কল্পিত বা অসত্য অথবা অর্ধসত্য নির্মাণ করে, নির্দিষ্ট সম্প্রদায়, ধর্ম, জাত, জাতি বা ভাষার মানুষের বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্বেষ তৈরি করা, যাতে মানুষের মধ্যে স্থায়ী বিভাজন সৃষ্টি করা যায় এবং ক্রমে তাকে ভাতৃঘাতী দাঙ্গার দিকে নিয়ে যাওয়া যায় – এটাই হলো সাম্প্রদায়িক শক্তির মূল লক্ষ্য। সাধারণ মানুষ যদি মনে করেন, অন্য ধর্ম বা ভাষা বা জাতির মানুষই তার জীবনের সব সমস্যার জন্য দায়ি, তাহলে আসলে শোষকদেরই সুবিধা। যাদের জন্য এত বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, অনাহার, দারিদ্র, অশিক্ষা তারা সাধারণ মানুষের দৃষ্টির আড়ালে থেকে নিরাপদে তাদের লুট চালিয়ে যেতে পারে। তাই বিভাজিত জনগণ সবসময়েই লুটেরাদের লুটের দ্বারকে প্রশস্ত ও অবারিত করে। ব্রিটিশদের ২০০ বছরের রাজত্বের অন্যতম সফল কৌশল ছিল, Divide and Rule।

সুপ্ত সাম্প্রদায়িকতা কী? সুপ্ত সাম্প্রদায়িকতা (Latent Communalism) হল এমন এক ধরনের সাম্প্রদায়িকতা, যা প্রকাশ্যে দেখা যায় না, বরং সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকে এবং ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণকে প্রভাবিত করে। এটা অনেক ক্ষেত্রেই সরাসরি সাম্প্রদায়িক হিংসা বা বিদ্বেষ ছড়ায় না, বরং অবচেতনভাবে মানুষের মানসিকতায় সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করে।

সুপ্ত সাম্প্রদায়িকতার বৈশিষ্ট্য হলো অবচেতন পক্ষপাত (Unconscious Bias) অর্থাৎ মানুষ অনেক সময় সচেতনভাবে সাম্প্রদায়িক হয় না, কিন্তু তাদের চিন্তাভাবনার মধ্যে সাম্প্রদায়িক প্রবণতা থাকতে পারে। যেমন এক সম্প্রদায়ের প্রতি সন্দেহ বা অবিশ্বাস, অন্য সম্প্রদায়ের মানুষদের ‘অন্য’ বা ‘ভিন্ন’ হিসেবে দেখা বা মনে করা, নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষদের অপরাধপ্রবণ, বিশ্বাসঘাতক বা কাফের বলে মনে করা ইত্যাদি।

ভাষা ও কথোপকথনেও প্রচ্ছন্ন সাম্প্রদায়িকতা লুকিয়ে থাকে। সুপ্ত সাম্প্রদায়িকতা সমাজে ভাষা ও কথোপকথনের মাধ্যমেও ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। যেমন, ‘ওরা সবসময় এরকম করে’। একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় সম্পর্কে সাধারণীকরণের উদাহরণ। ‘ওই ধর্ম বা জাতের মানুষদের বিশ্বাস করা যায় না’ – কল্পিত বা ভিত্তিহীন প্রচারের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তার ভিত্তিতে চলা। নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতি নেতিবাচক প্রবাদ প্রচলন করা বা রসিকতা করা।

কিছু সিনেমা, নাটক বা সংবাদমাধ্যমে কিছু বা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষদের সবসময় অপরাধী বা নেতিবাচক চরিত্রে দেখানো হয়। ইতিহাস রচনায় নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ভূমিকা উপেক্ষা করা বা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা এবং নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সাফল্য বা অবদানকে ছোট করে দেখানো ইত্যাদি।

সুপ্ত সাম্প্রদায়িকতা সমাজের ভেতরে ভেতরে বিভাজন তৈরি করে, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রতিফলিত হয়। ভিন্ন জাত বা ধর্ম বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে দ্বিধা করা, বিয়ের ক্ষেত্রে এমনকি বন্ধু নির্বাচনেও ধর্মীয় বা জাতগত পরিচয়কে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে দেখা, নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাসের এলাকা বা বাজার বা দোকান এড়িয়ে চলা ইত্যাদি।

রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে সুপ্ত সাম্প্রদায়িকতা থাকলে তার প্রভাব সুবিস্তৃত হয়। সরকারি চাকরি, শিক্ষা বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনও জাত, সম্প্রদায়  অথবা ভাষার মানুষকে অগ্রাধিকার দেওয়া, নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণ করা – যার মাধ্যমে আইন ও প্রশাসন তার নিরপেক্ষতা হারায়। শিক্ষাক্রম বা পাঠ্যবইতে ইতিহাসকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়, সাম্প্রদায়িক মনোভাব নির্মাণ করার জন্য।

সুপ্ত সাম্প্রদায়িকতার প্রভাবে সমাজে ধীরে ধীরে অবিশ্বাস ও বিভাজন তৈরি হয়। এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি অবচেতনভাবে বৈষম্যমূলক আচরণ করে। কট্টর সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দিলে তা ক্রমে প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে পরিণত হতে পারে। গণমাধ্যম, রাজনীতি ও শিক্ষা ব্যবস্থায় সাম্প্রদায়িকীকরণের প্রভাব ছড়ায়। মনে রাখা দরকার, সুপ্ত সাম্প্রদায়িকতা সরাসরি হিংসা বা বিদ্বেষ ছড়ায় না, কিন্তু এটা সমাজের ঐক্যকে ভেতর থেকে ভয়ঙ্কর ভাবে দুর্বল করে দেয় এবং ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টি হয়, যা ক্রমান্বয়ে সংঘাতের পথ তৈরি করে।

সাধারণ মানুষের ধর্মীয় বা জাতিগত বা ভাষাগত ভাবাবেগকে অত্যন্ত সুচারু ভাবে ব্যবহার করা হয় সুপ্ত সাম্প্রদায়িক মনোভাব নির্মাণ করার কাজে। ধার্মিক মানুষ ধর্ম পালন করবেন এটাই স্বাভাবিক। বাড়িতে বসে বা নির্দিষ্ট উপাসনালয় অর্থাৎ মন্দির, মসজিদ, গুরুদ্বার, গীর্জা, গুম্ফা, সীনাগগ যাই হোক না কেন, সেখানে ধার্মিকরা যান। প্রাত্যহিক ধর্মপালন যারা করেন না, এমনকি যারা আদৌ তেমন ভাবে ধার্মিকই নন, বড় বড় ধর্মীয় উৎসবে তারাও সোৎসাহে অংশগ্রহণ করেন। এতে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু যখন সেই উৎসবকে ঘিরে গণহিস্টিরিয়া তৈরি করা হয় একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে, অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ তৈরি করার জন্য, তখন সেই ধর্মীয় উৎসবে সাম্প্রদায়িকতার ছোঁয়া লেগে যায়।

যেমন সম্প্রতি মহাকুম্ভ মেলাকে কেন্দ্র করে গণ হিস্টিরিয়া নির্মাণ করা হলো। প্রধানমন্ত্রীর বিশাল ছবি সহ কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে, টেলিভিশন সঞ্চালকদের কপালে তিলক কাটিয়ে ধুন্ধুমার প্রচারের ঝড় তোলা হলো। প্রচার তুঙ্গে তোলা হল – কুম্ভে স্নান করুন, সব পাপ ধুয়ে ফেলুন আর কাঁড়ি কাঁড়ি পূণ্য নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। কুম্ভ স্নানের রীতি কি মোদিজি’র আবিষ্কার নাকি আদিত্যনাথের মস্তিষ্ক প্রসূত? তাহলে ওদের পাতা জোড়া ছবি, টেলিভিশনের পর্দায় প্রচার কেন? কারণ, ধর্ম পালন করা ওদের উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য ধর্মের নামে মানুষের মধ্যে অন্ধ কুসংস্কার তৈরি করা, যাতে মানুষের মধ্যে যুক্তিবোধ বিলুপ্ত হয়। অন্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার চাষ করতে সুবিধা হয়।

ধর্মের নামে ব্যবসা চলে, ভণ্ড সাধুর মেলা,

মানবতার কান্না শোনে, কে বোঝে তার জ্বালা!

একইভাবে রামনবমীকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক নেতাদের গদা, অস্ত্র হাতে লম্ফঝম্প করার উদ্দেশ্য কি? রামের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো? মোটেই নয়। মানুষের ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ, বিভাজন এবং ক্রমান্বয়ে দাঙ্গা বাধিয়ে বিদ্বেষ-বিভাজনকে স্থায়ী রূপ দেওয়াই এদের ‘রাম ভক্তি’র মূল কারণ। না হলে অযোধ্যায় রামের মন্দির উদ্বোধনে রামের ছবির ১০ গুণ বেশি সংখ্যক মোদীর ছবি কেন লাগানো হয়েছিল? রামের কাটআউট ৫ ফুট, মোদির কাটআউট কেন ৫০ ফুট? রামের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের এই তো নমুনা! এরা ধর্ম করছে, নাকি সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াচ্ছে – ভাবুন!

‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি,/ ঘটে যা তা সব সত্য নহে। কবি, তব মনোভূমি/ রামের জনমস্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।’ রবীন্দ্রনাথ নয়, গদা তরোয়াল হাতে তিলক কেটে নৃত্যরত অর্ধশিক্ষিত ক্ষমতালোভী দিলীপ-শুভেন্দু বাংলার মানুষকে ইতিহাসের শিক্ষা দেবে?

এদের অনেকেই বামপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন, তারা যতটা হিন্দুত্ববাদীদের সাম্প্রদায়িক কার্যকলাপ নিয়ে সরব, ঠিক ততটা সরব নয় মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। উল্লেখ করে রাখা ভালো, বামপন্থীরা যে কোনও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এবং যুক্তি ও বিজ্ঞানের পক্ষে। বিশ্বজুড়ে এটাই কমিউনিস্টদের মতাদর্শ। ভাষা, জাতপাত, জাতি, ধর্ম এসব কিছুকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠতে পারে সাম্প্রদায়িকতা। সব ক্ষেত্রেই এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে কমিউনিস্টরা। আমাদের দেশে আরএসএস বা হিন্দু মহাসভার বা মুসলীম লীগের দেশভাগের অবস্থানের কঠোর বিরোধিতা বামপন্থীরা করেছে কীভাবে, তা ইতিহাসের পাতায় বর্ণিত আছে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, যে কোনও দেশেই সংখ্যাগরিষ্ঠের সাম্প্রদায়িকতার বিপদ কিন্তু তুলনামুলক অনেকে বেশি।

স্বাধীনতার পরে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠন মেনে নিতে পারেনি আরএসএস এবং তার সহযোগিরা। বারবার চেষ্টা করেছে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বহুত্ববাদী দেশকে আঘাত করতে। উল্লেখ্য ‘হিন্দুত্ব’ আর হিন্দু ধর্ম কখনই এক নয়, যেটা এখনকার হিন্দুত্ববাদীরা প্রচার করে। আরএসএস-এর মতবাদ ‘হিন্দুত্ব’ এবং ‘হিন্দু ধর্ম’ এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণা হলেও, নামের জন্য অনেকেরই এর মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা নেই। আর এই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতেই এই মতবাদের নাম দেওয়া হয়েছে ‘হিন্দুত্ব’। এই বিভ্রান্তি ছড়াতে সাম্প্রদায়িক শক্তি সর্বদা সচেষ্ট।

হিন্দু ধর্মের ইতিহাস সুদীর্ঘ। হাজার হাজার বছর ধরে নানা বাঁক-মোড় পেরিয়ে, নানান ধর্মীয় আচার, লোকাচার মিলেমিশে নানাবিধ ভিন্নতা নিয়েই হিন্দু ধর্ম পালিত হয়ে আসছে। চলার পথে এর থেকেই জন্ম নিয়েছে বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম সহ আরও কত মতবাদ। বৈদিক যুগের হিন্দু ধর্ম আর আজকের হিন্দু ধর্মের রীতিনীতি মোটেই একইরকম নয়। সময়ের সাথে সমাজ প্রগতির পথে তার বহু বিবর্তন ঘটেছে, যে আলোচনা করা এই ছোট্ট পরিসরে সম্ভব নয়, সেই উদ্দেশ্যেও এই নিবন্ধ লেখা নয়। আর ‘হিন্দুত্ব’ মতবাদের জন্ম মাত্র ১০০ বছর আগে, এক রাজনৈতিক নেতা বিনায়ক দামোদর সাভারকারের হাত ধরে। নাম ‘হিন্দুত্ব’ হলেও ধর্ম পালনের দিশা দেখানোর জন্য এর সৃষ্টি নয়। এর সাথে হিন্দু ধর্ম পালনের রীতিনীতির কোনও সম্পর্কই নেই। সাভারকারের কথাতেই, হিন্দুত্ব একটা রাজনৈতিক প্রকল্প, যার ভিত্তিতে ক্ষমতা দখল করে দেশ চালানোই এর লক্ষ্য। এদের মতবাদ নিয়ে বিস্তর আলোচনাও এখানে সম্ভব নয়, অন্য অবসরে তা করা যেতে পারে।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশ, মহাকাশে নিত্যনৈমিত্যিক পদচারণা করছে, পদার্থবিদ্যার কোয়ান্টাম তত্ত্বকে হাতিয়ার করে প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার দূরের দুই বস্তুর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে ফেলেছে। এখন কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরিতে মনোনিবেশ করেছে। এই তত্বের অগ্রগতি পালটে দিতে পারে এতাবৎ কালের আবিষ্কৃত পদার্থ বিজ্ঞান বা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সংক্রান্ত যাবতীয় ধ্যানধারণাকেই। বিশ্বের চিকিৎসা বিজ্ঞান কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তৈরিতে ব্যস্ত। আর এখানে মোদি-বিজেপি-আরএসএস আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ছেড়ে গোমূত্র-গোবর খাইয়ে রোগ নির্মূলের দাওয়াই দিচ্ছে। দেড়-দু’হাজার বছর আগের পৃথিবীতে ভারতবর্ষকে নিয়ে যেতে চাইছে। আপনি কোন দিকে থাকবেন?

“বেদ কোরান একে মনে, নফসের অজ্ঞানে, কোনো নামের গোলকধাম, ধর্মের একি খানে।” এর অর্থ, ‘বেদ ও কোরানকে একই জ্ঞান হিসেবে মনে করো, শুধুমাত্র অজ্ঞতার কারণে তুমি নিজেকে আলাদা ভাবছো। বিভিন্ন নামে ঈশ্বরের গোলকধাঁধা তৈরি না করে, ধর্মকে এক হিসেবে দেখো।’ এই হলো সন্ত কবীরের কথা। কার বাণীতে দেশ চলবে – সন্ত কবীর না মোহন ভাগবতের ঘৃণা বিদ্বেষ হিংসার বাণী?

‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে। লালন বলে জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে।’ অথবা ‘জাত গেল জাত গেল বলে একি আজব কারখানা, সত্য কাজে কেউ নয় রাজি দেখি তা না না না।’ রামকৃষ্ণ দেবের কথায়, ‘জ্ঞান আমাদের ঐক্যের দিকে নিয়ে যায়, আর অজ্ঞানতা আমাদের পরস্পরের থেকে আলাদা করে রাখে।’ লালন ফকির, রামকৃষ্ণ দেবকে ছুঁড়ে ফেলে দুস্কৃতীদের মতো গদা তরোয়াল দা-কাটারি হাতে ঘোরা দাঙ্গাবাজদের দেবেন ঠাইঁ এই বাংলায়?

‘ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে, অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।……ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো, এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক আনো।’ রবীন্দ্রনাথের জ্ঞানের আলোয় নয়, দেশ-রাজ্য চলবে মোদী-শাহ্-আদিত্যনাথের অন্ধকারাচ্ছন্ন কুসংস্কারে?

দেশ-রাজ্য জুড়ে লুট চলছে। মোদির আশীর্বাদে আম্বানি-আদানি আর রাজ্যে পিসী-ভাইপো’র জুটি আর এদেরই স্যাঙাৎ বাহিনী লুটে নিচ্ছে মানুষের পকেট, রুটিরুজি, কাজ, দেশের সম্পদ, জল-জঙ্গল-মাটি, সরকারি অর্থ। সবকিছুর লুট চলছে। এই লুট থেকে নজর ঘোরাতেই হিন্দু-মুসলমান, উঁচুজাত-নীচুজাত, বাঙালি-অবাঙালি, জনজাতি, উপজাতি সবাইকে টুকরো করে দাও, লড়িয়ে দাও ভাতৃঘাতী দাঙ্গায়। লুটের থেকে নজর ঘুরিয়ে দাও। লুটের মাথাদের আড়ালে পাঠাও, সামনে কল্পিত শত্রু খাড়া করে দাও। গরীব লড়ুক গরীবের বিরুদ্ধে, রক্ত ঝরুক। আসল শত্রু – চোর, জোচ্চোর, বাটপার, লুটেরা সবাই আড়ালেই থাকুক। এটাই চায় আরএসএস-বিজেপি-তৃণমূল যুগলবন্দী, আর তাদের পোঁ ধরা সংবাদ মাধ্যম।

রুখে দাঁড়ান। দাঙ্গাবাজদের হাতিয়ার দা-কাটারি-তরোয়াল-গদা। বাংলার মানুষের হাতিয়ার নজরুল – ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? / কাণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!’

Spread the word

Leave a Reply