Site icon CPI(M)

Employment: The Era Of Modi Govt. (Part – 4)

Modi Govt And Employment 4

ভারতে কাজের নিরাপত্তা এবং বিজেপি সরকার – ৪র্থ পর্ব

ওয়েবডেস্ক প্রতিবেদন

শ্রমিকদের যাবতীয় অধিকার বাতিল করছে সরকার

শ্রমিক কারা? মেহনতি মানুষের কোনও দেশ নেই, কমিউনিস্ট ইস্তেহারে ঘোষণা করেছিলেন মার্কস – এঙ্গেলস। তারা এও বলেছিলেন মেহনতি মানুষের যা নেই তাদের থেকে তা কেড়ে নেওয়া যায় না। আজকের দিনে পুঁজিবাদ শ্রমিকদের দেশ কেড়ে নিতে না পারলেও, শ্রমিক – মজদুর, মেহনতি মানুষের বহু সংগ্রামে অর্জিত অধিকারগুলি সর্বদাই কেড়ে নিতে চেয়েছে, অর্থনৈতিক সংস্কার, পুঁজি বিনিয়োগের পরিবেশ এইসব অজুহাতে পুনরায় দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধতে চায়। ভারতে পুঁজিবাদের হয়ে সেই কাজই করছে মোদী সরকার। ১. ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্ট, ২. ইন্ডাস্ট্রিয়াল এমপ্লয়মেন্ট স্ট্যান্ডিং অর্ডার অ্যাক্ট এবং ৩. ইক্যুয়াল রেমুনারেশন অ্যাক্ট – প্রচলিত এই তিনটি আইনকেই বাতিল করে দিয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশনস কোড-২০২০ প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকার বলছে নয়া আইনে শ্রমসম্পর্ক নমনীয় হবে ফলে বিপুল পরিমাণ পুঁজি চীন থেকে ভারতে ঢুকবে। এক কথায় বলা যায় সরকার মিথ্যা দাবী করছে, সম্প্রতি ভারত-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় দুইদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সমস্যার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমাদের দেশে শ্রমজীবী মানুষের যাবতীয় অধিকার কেড়ে নিতে চায় কর্পোরেটরা। মোদী সরকার কর্পোরেটদের সেই লালসাকেই পূরণ করতে চায় – তাই নয়া শ্রম আইন।

সরকার “ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশনস কোড-২০২০” আইনে শ্রমিকের সংজ্ঞা হিসাবে উল্লেখ করেছে –

“Worker” means any person (except an apprentice as defined under clause (aa) of section 2 of the Apprentices Act, 1961) employed in any industry to do any manual, unskilled, skilled, technical, operational, clerical or supervisory work for hire or reward, whether the terms of employment be express or implied, and includes working journalists as defined in clause (f) of section 2 of the Working Journalists and other Newspaper Employees (Conditions of Service) and Miscellaneous Provisions Act, 1955 and sales promotion employees as defined in clause (d) of section 2 of the Sales Promotion Employees (Conditions of Service) Act, 1976, and for the purposes of any proceeding under this Code in relation to an industrial dispute, includes any such person who has been dismissed, discharged or retrenched or otherwise terminated in connection with, or as a consequence of, that dispute, or whose dismissal, discharge or retrenchment has led to that dispute, but does not include any such person

(i) who is subject to the Air Force Act, 1950, or the Army Act, 1950, or the Navy Act, 1957; or

(ii) who is employed in the police service or as an officer or other employee of a prison; or

(iii) who is employed mainly in a managerial or administrative capacity; or

(iv) who is employed in a supervisory capacity drawing wages exceeding eighteen thousand rupees per month or an amount as may be notified by the Central Government from time to time:

Provided that for the purposes of Chapter III, “worker”—

(a) means all persons employed in trade or industry; and

(b) includes the worker as defined in clause (m) of section 2 of the Unorganised Workers’ Social Security Act, 2008.

২০২০ সালেই কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির পক্ষ থেকে ন্যুনতম মজুরি হিসাবে ২১,০০০টাকার দাবী জানানো হয়েছিল। পাঠক এই ধারাবাহিকের তৃতীয় পর্বে দেখে নিতে পারেন কিভাবে ন্যুনতম মজুরি নির্ধারিত হয়। এখন সরকার আইনে ঘোষণা করছে ১৮,০০০ টাকার উপরে মাসিক বেতন হলেই সেই ব্যাক্তিকে সুপারভাইজরের কাজে নিযুক্ত বলে ধরে নেওয়া হবে, তাকে এই “ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশনস কোড-২০২০” আইনের আওতা থেকে বাইরে করে দেওয়া হবে এবং তার কোনও ইউনিয়নের সদস্য হওয়া চলবে না। কারোর মনে হতে পারে এই ১৮,০০০ টাকাই সরকার একটি স্তর হিসাবে নির্বাচিত করল কেন, আসলে ২০১৫ সালে সরকারী কর্মচারীদের জন্য ৭ম বেতন কমিশন ১৮,০০০টাকা ন্যুনতম বেতনের সুপারিশ করে যা তখন কেন্দ্রীয় সরকার মেনে নেয়। এখন পাঁচ বছর পরে যখন বাজারমূল্য অনেকটাই বেড়ে গেছে তখনও বিজেপি সরকার ঐ বেতনকাঠামোতেই সবাইকে আটকে রাখতে চায়। এতে কোনো শ্রমিকের বেতন ন্যুনতম মজুরির বেশি দেখানো সহজ হবে, ফলে একধাক্কায় অনেককেই সেই আইনের বলে আর “শ্রমিক” বলা যাবে না এবং তাদের জন্য শ্রমিকদের অধিকারও আর প্রযোজ্য হবে না।

শ্রম সম্পর্ক বিষয়ক প্রচলিত তিনটি আইনকে বাতিল করে একটি আইন প্রণয়নের আসল উদ্দেশ্য আরও অনেক বেশি রাজনৈতিক। নয়া আইনে সরকার “ফিক্সড টার্ম এম্পলয়মেন্ট” মানে চুক্তি ভিত্তিক নির্দিষ্ট সময়ের কাজে নিয়োগকে বৈধতা দিয়েছে। এর ফলে যে কোনও কাজে স্থায়ী কর্মী নিয়োগ করার প্রয়োজন নেই বলে দেখানো যাবে, আবার নির্দিষ্ট সময় অন্তর নিযুক্ত শ্রমিককে বদলে দিয়ে কিংবা বারে বারে একই লোককে নিয়োগ করে খালি পদ নেই দেখিয়ে দেওয়া যাবে। অর্থাৎ সারা দেশে কোটি কোটি বেকারদের কাজের ন্যায্য দাবীকে সহজেই নস্যাৎ করতে চাইছে সরকার। এর সাথে অস্থায়ী কর্মচারী, মজদুরদের কাজ হারানোর ভয় দেখিয়ে কোনোরকম ন্যায্য দাবী, অধিকার থেকেও সরিয়ে রাখা সহজ হবে। নিস্কন্টক মুনাফার লক্ষ্যে কর্পোরেটরা তাই চায়, মোদী সরকার সেই ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিচ্ছে। মনে রাখতে হবে চুক্তি ভিত্তিক নির্দিষ্ট সময়ের কাজে নিয়োগকে আইনি বৈধতা দেবার বিষয়টি হঠাৎ করে বিজেপি’র মাথায় আসেনি, ২০০৩ সালে অটল বিহারী বাজপেয়ির নেতৃত্বে এন ডি এ সরকার প্রথম এমন আইনের প্রস্তাব করেছিল। তখন সারা দেশে কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির চাপে পড়ে তারা সেই আইন লাগু করতে পারেনি, এতদিন পরে মোদী সরকার সেই কাজ সম্পূর্ণ করছে। কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী নির্লজ্জের মতো দাবী করছেন এই নয়া শ্রম আইন প্রণয়নের পূর্বে তারা সবার সাথে আলোচনা করেছেন, আসলে বিজেপি চিরকালই কর্পোরেটদের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হতে চেয়েছে।

আইনে দাবী করা হয়েছে চুক্তি ভিত্তিক নির্দিষ্ট সময়ের কাজে নিজুক্তদের স্থায়ী কর্মীর মতোই বিএবচনা করা হবে। এই কথা একইসাথে দ্বিবিধ উদ্দেশ্য সাধন করবে। প্রথমত, এই প্রক্রিয়ায় শুন্যপদে স্থায়ী কর্মী নিয়োগের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া হবে, স্থায়ী নিয়োগের প্রক্রিয়াকেই পরে তুলে দেবার জন্য যা পরে কাজে লাগবে। দ্বিতীয়ত, সম কাজে সম বেতনের কথা আগেই সরকারী বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত ছিল, এখন প্রো-রাটা ভিত্তিতে গ্র্যাচুইটি দেবার কথা অকারণ বলা হচ্ছে। মালিকপক্ষ আদৌ সেই গ্র্যাচুইটি দেবে না, কাজের সময়কে এক বছরের কম দেখানো এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। প্রো-রাটা কি? বেতন কিংবা মজুরির ক্ষেত্রে এর মানে হবে – what the job pays on a full-time basis, what your employer views as full-time hours, the number of weeks you will be working during the year and your required work hours per week… এতে আর যাই হোক কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী যেমনটা বলছেন শ্রমিকদের উন্নতি কিছুই হবে না, বরং শোষণ বাড়বে।

এতদিন উৎপাদন কিংবা পরিষেবা মূলক যে কোনও সংস্থায় একশো জনের বেশি শ্রমিক – কর্মচারী থাকলে তাকে শিল্পসংস্থা হিসাবে চিহ্নিত করা হত, এবং সেই অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইন সমূহ প্রযোজ্য হত। যাতে আরও বেশি সংখ্যায় শ্রমিক – কর্মচারী শ্রমিক অধিকার আইনের সুবিধা পেতে পারেন তাই কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির দাবী ছিল শিল্পসংস্থায় ন্যুনতম শ্রমিক সংখ্যা ৫০ করার দাবী জানিয়েছিল। মোদী সরকারের যুক্তি ১০০ জন শ্রমিক থাকার আইনের কারনেই নাকি ছোট সংস্থাগুলি বড় হতে পারছেনা! এই অজুহাতে নয়া আইনে শিল্পসংস্থা হতে গেলে ন্যুনতম শ্রমিক- কর্মচারীদের সংখ্যা একধাক্কায় ৩০০ করে দেওয়া হয়েছে! এতে কি হল! আগে যা ছিল তার চেয়েও কম শ্রমিক এখন শ্রমিক অধিকার আইনের সুযোগসুবিধা পাবেন, বাকিরা সকলেই বঞ্চিত হবেন।

এখন ছোট, বড় কোনও সংস্থায় ট্রেড ইউনিয়ন নথিভুক্ত করতে হলে মোট শ্রমিকের ১০ শতাংশ অথবা ১০০ জনকে (যে সংখ্যাটি কম হবে) ঐ ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য হতে হবে, যদিও শেষ অবধি নথিভুক্তিকরণের সিদ্ধান্ত নিতে সরকারই একমাত্র নির্ধারক শক্তি! অর্থাৎ ঘুরপথে শ্রমিকদের সংঘবদ্ধ হতে বাধা দেওয়া হবে। নয়া আইনে সংগঠিত ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়নে কর্মকর্তাদের মোট সংখ্যার একের তিনভাগ অথবা ৫ জনকে (যেটি সংখ্যায় কম হবে) সংস্থায় কর্মরত হতে হবে – এর উদ্দেশ্য কি? ট্রেড ইউনিয়নের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে সর্বক্ষণের সংগঠকরা কাজ করেন, মালিকরা এদের ভয় দেখিয়ে ভুল অথবা অন্যায় কোনও সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য করতে পারে না। সারা দেশের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে এইসব সর্বক্ষণের সংগঠকরা অনেক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন। এদের সংখ্যা কমাতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অসংগঠিত ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়নের ৫০ শতাংশ কর্মীকে বাইরে থেকে নেওয়ার নিদান রয়েছে। ট্রেড ইউনিয়নের স্বীকৃতি সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় এতদিন অবধি গণতান্ত্রিক প্রকরণ হিসাবে শ্রমিকদের ভোটদানের সময় গোপন ব্যালটের ব্যবস্থা ছিল, এখন তা তুলে দেওয়া হল। ৫১ শতাংশ শ্রমিকদের সমর্থন আছে এমন ট্রেড ইউনিয়নকেই স্বীকৃতি দেবে সরকার – অথচ সেই প্রক্রিয়ায় গোপন ব্যালটে ভোট দেওয়া যাবে না! মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে নালিশ জানানোর সময়সীমা পূর্বে ছিল ৩ বছর, এখন করা হয়েছে ২ বছর! লেবর কোর্ট বাতিল হয়েছে, কোনও সমস্যায় মীমাংসা না হলে তাকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর বন্দোবস্ত ছিল আগের আইনে – নয়া আইনে সরকারের সেই বাধ্যবাধকতা থাকছে না। এমনকি যে সমস্ত মামলা ট্রাইব্যুনালে চলছে সেগুলির ক্ষেত্রে কার্যক্রম শেষ হবার ৬০ দিন পরে ধর্মঘটের সুযোগ রয়েছে। শ্রম দপ্তরে আলোচনা চলছে এমন সংস্থার ক্ষেত্রে আলোচনা শেষ হবার ৭ দিনের আগে ধর্মঘট করা যাবে না। এছাড়াও ন্যুনতম শ্রমিক সংখ্যার অজুহাতে শিল্পসংস্থা হিসাবে সরকার যে সংস্থাকে চিহ্নিত করতেই রাজি নয় সেখানেও ধর্মঘট করতে গেলে ৬২(১)(এ) ধারা অনুযায়ী ৬০ দিন আগে আবার ৬২(২) ধারায় ১৪ দিন আগে আগাম নোটিশ দেওয়া নয়া আইনের বলে বাধ্যতামূলক। দুই রকম সময় কেন? যাতে মালিক আইনের ফাঁক ব্যবহার করে ধর্মঘটকারী শ্রমিকদের ইচ্ছামতো শাস্তি দিতে পারে। এই সবকিছুই নমনীয় শ্রমসম্পর্কের বাস্তবতা। আজকের পৃথিবীতে একটি স্বাধীন দেশে শ্রমআইনের কি অসাধারণ সংস্কার !

এই অবস্থার বিরুদ্ধে শ্রমিকেরা লড়াই করছেন। গত বছর ২৬শে নভেম্বর সারা দেশে ঐতিহাসিক ধর্মঘট পালন করেছেন তারা – দেশজোড়া ঐক্য নির্মাণ করে। পুঁজিবাদ, কর্পোরেট এবং তাদের ধামাধরা মোদী সরকার যতই চেষ্টা করুক শ্রমিকদের সংগ্রামী ঐক্য ভেঙ্গে দিতে এদেশে শ্রমিক – মেহনতি জনতা জানেন তাদের একমাত্র হাতিয়ার ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম। আজকের দিনে শ্রমিকশ্রেনীর উপরে যে অভূতপূর্ব আক্রমন তার মোকাবিলায় লেনিনের কথা মনে রাখতেই হবে – “A basic condition for the necessary expansion of political agitation is the organisation of comprehensive political exposure.”

ওয়েবডেস্কের পক্ষেঃ সৌভিক ঘোষ

শেয়ার করুন