অসংগঠিত শ্রমিক: অন্ধকারের রোজনামচা (পঞ্চম পর্ব)

চন্দন মুখোপাধ্যায়
বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকরা।পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া অদক্ষ বা আধা–দক্ষ, মাধ্যমিক অনুত্তীর্ণ শ্রমিকদের মধ্যে সব চেয়ে বেশি জন কাজ করছেন সৌদি আরবে। সরকারি ভাবে সেই সংখ্যাটা প্রায় ৪৫ হাজার।

পঞ্চম পর্ব
মুম্বইভিত্তিক সংস্থা ‘India Migrants Now’ একটি ‘আন্তঃরাজ্য মাইগ্রান্ট নীতি সূচক’ প্রকাশ করেছিল ২০১৯ সালে,যা কেরালাকে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য সর্বাধিক অনুকূল বলে দাবী করে।শুধু সর্বোচ্য মজুরি নয়,সমস্ত রকমের সুযোগ সুবিধা দেবার ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ রাজ্য এই কেরালা।এর জন্যে সরকারের সদিচ্ছা আর নীতির প্রয়োজন। বাম সরকার কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে এই অংশের শ্রমজীবী মানুষকে দেখে,তার প্রমাণ এটাই। তালিকায় এর পরেই রয়েছে মহারাষ্ট্র ও পাঞ্জাব। শ্রমিকদের উপর শোষণ ও আর্থিক বৈষম্যের দায়ে অধিকাংশ রাজ্যকেই এই রিপোর্ট অভিযুক্ত করেছে। সেখানে না আছে কাজের স্থায়ী চুক্তি,না আছে স্বাস্থ্য-শিক্ষার নিরাপত্তা কিংবা নাগরিক সুরক্ষা প্রকল্পের সুযোগ। এদের মধ্যেও সবথেকে খারাপ হাল যে রাজ্যগুলিতে গুজরাট তাদের মধ্যে অন্যতম। গুজরাটে পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য শুধুমাত্র বিশ্রামাগার ও স্থায়ী আবাসস্থলের আশ্বাস দেওয়া হয়। তারও সঠিক বাস্তবায়নের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই সে’রাজ্যে; আবার গত কয়েক বছরে মহারাষ্ট্রের পাশাপাশি দেশের পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিযানের কেন্দ্রও হয়ে উঠেছে গুজরাট। ২০২৪-২৫ সালের হিসাব দেখলে একটা বাম শাসিত রাজ্যের শ্রমিকদের কল্যাণের জন্যে কতদূর করা যায় উদাহরন পাওয়া যাবে। সব ধরণের শ্রমিক এবং অসংগঠিত অংশের শ্রমিকের মজুরি এবং জীবনধারণের সব সড়ক সুবিদ্ধা ব্যাপক হারে বাড়িয়েছে,যা সারা দেশে বিরল। এই নিচে দেওয়া লিংকে আপনি ভাৰতবর্ষের সব রাজ্যের হিসাব পাবেন,শুধু এই পশ্চিমবাংলার বর্তমান চেহারার কোনো তথ্যই পাবেন না। ওখানে লেখা পাবেন পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কোনো তথ্য দেওয়া নেই।
সূত্র:-



এই ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে শ্রম মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী শোভা কারান্দালাজে জানান, দেশের অসংগঠিত শ্রমিকদের যাবতীয় তথ্য পেতে কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রম মন্ত্রক ই-শ্রম পোর্টাল চালু করেছিল। সব রাজ্যকে তাদের অসংগঠিত শ্রমিকদের তথ্য সেই পোর্টালে আপলোড করতে বলা হয়। সেই তথ্য অনুযায়ী পর্যন্ত দেশে ৩০ কোটি ৯৪ লক্ষ অসংগঠিত শ্রমিক রয়েছেন। পাশাপাশি, ভিন্রাজ্যে কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য দেশে কী কী আইন রয়েছে, সঙ্গে রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকার সেই আইন মারফৎ পরিযায়ী শ্রমিকদের সুরক্ষার কোন কোন বন্দোবস্ত করতে পারে, তারও উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তবে পরিযায়ী শ্রমিকদের সম্পর্কে তিনি কোনও তথ্য দিতে পারেননি ।সরকারের কাছে পরিযায়ী শ্রমিকদের কোনও সময়োপযোগী বা নির্ভরযোগ্য তথ্যই নেই। তারা জানেই না কত জন পরিযায়ী শ্রমিক মারা গিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের ছবিটা কি?
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গোটা ভারত থেকে সরকার স্বীকৃত এজেন্সিগুলোর হাত ধরে প্রায় ১৪ লক্ষ ৮২ হাজার শ্রমিক কাজের সন্ধানে এই ১৭টি দেশে পাড়ি দিয়েছেন। প্রশাসন সূত্রের খবর, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ছাড়াও এমিগ্রেশন চেক রিকোয়্যার্ড (ইসিআর)–দেশগুলোর তালিকায় থাকা আফগানিস্তান, বাহরাইন, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, জর্ডন, কুয়েত, কাতার, লেবানন, মালয়েশিয়া, ওমান, উত্তর আফ্রিকার সুদান, পূর্ব আফ্রিকার সাউথ সুদান, সিরিয়া, থাইল্যান্ড, ইয়েমেনে ছড়িয়ে রয়েছেন বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকরা।পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া অদক্ষ বা আধা–দক্ষ, মাধ্যমিক অনুত্তীর্ণ শ্রমিকদের মধ্যে সব চেয়ে বেশি জন কাজ করছেন সৌদি আরবে। সরকারি ভাবে সেই সংখ্যাটা প্রায় ৪৫ হাজার। তার পরেই সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। সেখানে কাজ করছেন বাংলা থেকে যাওয়া প্রায় ১৭ হাজার শ্রমিক। কুয়েত ও কাতার— এই দু’টি দেশে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক সরকারি ভাবে কাজের সন্ধানে গিয়েছেন।এই সব শ্রমিকের কেউ কৃষিকাজ, কেউ কাঠের কাজ, কেউ প্লাম্বিং, কেউ ওয়েল্ডিং, আবার কেউ কেউ নির্মাণের কাজ করছেন। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে অনেকেই খামার বাড়িতে কাজ করছেন, কেউ কেউ কাজ করছেন হোটেল-রেস্তোরাঁর সাফাইকর্মী হিসেবেও।একটি সূত্রের খবর, মালয়েশিয়ায় কদর বাড়ছে বাংলার কৃষি শ্রমিকদের। সেখানে পাম চাষে দরকার হচ্ছে এ রাজ্যের কৃষি শ্রমিকদের।কেন্দ্রীয় সরকারের রিপোর্ট বলছে, এ বছরের মে মাসকে সময়সীমা ধরলে শেষ পাঁচ বছরে মোট ৩০ হাজার ২৮১ জন গরিব মানুষ শুধু মুর্শিদাবাদ থেকেই সরকারি স্বীকৃত এজেন্সির হাত ধরে ইসিআর–দেশগুলোয় কাজের সন্ধানে গিয়েছেন। শ্রমিকের সংখ্যার নিরিখে তার পর রয়েছে নদিয়া, কলকাতা, দক্ষিণ ও উত্তর ২৪ পরগনা। কলকাতা থেকে গত পাঁচ বছরে ১৮ হাজার ১৭৪ জন ইসিআর–তালিকায় থাকা ১৭টি দেশে কাজের সন্ধানে সরকার স্বীকৃত এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে গিয়েছেন। বাকি সব জেলা থেকেই প্রচুর পরিমাণে মানুষতো আছেই। কেন্দ্রীয় এমিগ্রান্ট দপ্তরের আধিকারিকদের মতে, সরকারি এজেন্সি ছাড়া আরও তিন ভাবে কাজের সন্ধানে ওই ১৭টি দেশে পাড়ি দিয়েছে বহু মানুষ। এক, ওই সব দেশে কর্মরত পরিচিত বা আত্মীয়দের সূত্রে ব্যক্তিগত ভিসা নিয়ে। দুই, সরকার স্বীকৃত নয়, এমন এজেন্সির মাধ্যমে। তিন, ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে। কিন্তু এই তিন ভাবে কত জন গিয়েছেন, তার সঠিক তথ্য নেই।পশ্চিমবঙ্গ থেকে দেশের বিভিন্ন রাজ্য তো বটেই, এমনকী বিভিন্ন দেশে কাজ করতে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের সংখ্যা এখন কত, তার কোনও সঠিক তথ্য ও সরকারি পরিসংখ্যান নেই। বিষয়টি এখন বিতর্কের কেন্দ্রে।
কেবল সরকার স্বীকৃত ৩৬টি এজেন্সির মাধ্যমে যত অদক্ষ শ্রমিক ১৭টি দেশে কাজ করছেন, তার পরিসংখ্যান রয়েছে।বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকার স্বীকৃত ৩৬টি এজেন্সি পশ্চিমবঙ্গে কাজ করলেও এর বাইরে রয়েছে বেশ কিছু এজেন্সি। যেগুলোর আবার একটা বড় অংশই ভুয়ো। সেই সংখ্যাটা এখন ১ লক্ষ ৭৯ হাজার ৫৯৭। কিন্তু তার বাইরে ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে এবং সরকার স্বীকৃত নয়, এমন কিছু এজেন্সির মাধ্যমে বাংলার বহু শ্রমিক বিদেশে কাজ করছেন। সেই সংখ্যাটা পুরোপুরি অস্পষ্টই।পুলিশ–প্রশাসন দেখেছে, পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলোর মধ্যে থেকে সব চেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ কাজের সন্ধানে সরকার স্বীকৃত এজেন্সির পরিবর্তে ভুয়ো এজেন্সির পাল্লায় পড়ে বিদেশে পাড়ি দিয়ে প্রতারিত হয়েছেন। কিন্তু এই বিষয় সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই। এই ইসিআর–দেশগুলোর তালিকায় লিবিয়া থাকলেও আপাতত ভারত সরকার সেখানে পরিযায়ী শ্রমিকদের যাওয়ার উপর নিষেধজ্ঞা জারি করেছে। অর্থাৎ, আইনি রাস্তায় ভারত থেকে কোনও শ্রমিক লিবিয়ায় এখন যেতে পারবেন না।আজ তাই যেভাবে হোক বেঁচে থাকার তাগিদে নিজের সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
আগামীকাল প্রকাশিত হবে ষষ্ঠ পর্বঃ
বিষয় থাকবে - (১) ভারতে পরিযায়ী শ্রমিকদের আন্তঃরাজ্য অবস্থান বাকি অংশ।
(২)মোদী সরকারের আমলে শ্রমিকদের অবস্থান।

প্রকাশ: ১৫-জানুয়ারি-২০২৬
শেষ এডিট:: 16-Jan-26 08:45 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/unorganized-workers-chronicle-of-darkness - exists in postID 32076
Categories: Fact & Figures
Tags: kerala ldf govt, labour law, migrant workers, west bengal, west bengal labour, kerala labour
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (159)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (144)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (80)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)
সাম্প্রতিক পোস্ট / Latest Posts
গ্রেট নিকোবর প্রকল্পঃ পরিবেশ বিধ্বংসী নকশা
- সৌরভ চক্রবর্ত্তী
বৈষম্যের স্থাপত্য
- শমীক লাহিড়ী





