কাদা-মাটির স্বপ্ন ভাঙছে ডলারের বাজারে

Author
শমীক লাহিড়ী

ক্লাব নয়, এখন কর্পোরেট সাম্রাজ্য - একসময় ইউরোপের অধিকাংশ ক্লাব গড়ে উঠেছিল শ্রমিক সংগঠন, চার্চ, রেলওয়ে কর্মচারী, স্থানীয় সম্প্রদায় কিংবা সমর্থকদের উদ্যোগে। ক্লাব মানে ছিল একটি শহরের পরিচয়, মানুষের আবেগ, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতীক।

Dreams of mud and soil are breaking in the dollar market
ফুটবলের জন্ম কোনো প্রাসাদে বা কর্পোরেট বোর্ডরুমে হয়নি; এর জন্ম ধুলোমাখা মাঠে, শ্রমিক মহল্লায়। ব্রাজিলের ফাভেলা, আর্জেন্টিনার বস্তি, ফ্রান্সের অবহেলিত বঁলিইউ, কলম্বিয়ার কমিউনা, যুদ্ধবিধ্বস্ত ক্রোয়েশিয়ার শরণার্থী শিবির, উরুগুয়ের মন্তেভিডিও শহরের দরিদ্র 'বারিও', কেনিয়ার 'মাথারে', নাইজেরিয়ার 'আজেগুনলে' বস্তি কিংবা আফ্রিকার প্রত্যন্ত গ্রামে ফুটবল দরিদ্র মানুষের স্বপ্ন দেখার ভাষা। পেলে, ইউসোবিও, জিনেদিন জিদান, মারাদোনা, লুকা মাদ্রিচ, কিলিয়ান এমবাপে বা সাদিও মানের মতো কিংবদন্তিদের কাহিনী প্রমাণ করে, এই খেলা  নিচুতলার মানুষের সামাজিক উত্তরণের সিঁড়ি। কোটি কোটি শিশুর কাছে এই খেলাই ছিল দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও সামাজিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। খেলতে লাগত না দামি সরঞ্জাম — একটি পুরোনো বল বা কাপড়ের গোলকই ছিল যথেষ্ট। এজন্যই ফুটবল ‘দ্য বিউটিফুল গেম’- ‘গরিবের খেলা’।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়িত পুঁজিবাদ এই সুন্দরতম খেলাটিকে আমূল বদলে দিয়েছে। ফুটবল এখন শত শত বিলিয়ন ডলারের বিনোদন শিল্প। যে ক্লাবগুলো একসময় গড়ে উঠেছিল রেলওয়ে কর্মী, কয়লাখনির শ্রমিক বা স্থানীয় সম্প্রদায়ের হাত ধরে যেমন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বা আর্সেনাল, আজ সেগুলোর মালিক মার্কিন হেজ ফান্ড, রুশ অলিগার্কি বা মধ্যপ্রাচ্যের তেল ধনকুবের। ব্যবসার লাভ-ক্ষতির অঙ্কে তারা ফুটবলকে মাপে। আজ ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়। সুন্দরতম খেলা ফুটবল এখন শত শত বিলিয়ন ডলারের বিশ্বব্যাপী বিনোদন শিল্প, যেখানে ক্লাবগুলো বহুজাতিক কর্পোরেশনের মতো পরিচালিত হয়, খেলোয়াড়েরা আর শুধু ক্রীড়াবিদ নন — তাঁরা ‘অ্যাসেট’, ‘ব্র্যান্ড’ও ‘বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ’। সমর্থকরা আর কমিউনিটির সদস্য নন — তাঁরা ‘কনজিউমার’।

প্রশ্ন হলো — কীভাবে এমন হলো?
ক্লাব নয়, এখন কর্পোরেট সাম্রাজ্য - একসময় ইউরোপের অধিকাংশ ক্লাব গড়ে উঠেছিল শ্রমিক সংগঠন, চার্চ, রেলওয়ে কর্মচারী, স্থানীয় সম্প্রদায় কিংবা সমর্থকদের উদ্যোগে। ক্লাব মানে ছিল একটি শহরের পরিচয়, মানুষের আবেগ, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতীক।
একসময় ইউরোপের অধিকাংশ ফুটবল ক্লাব গড়ে উঠেছিল স্থানীয় সমাজের উদ্যোগে। ক্লাব ছিল একটি শহরের আত্মপরিচয়, শ্রমজীবী মানুষের গর্ব এবং কমিউনিটি অর্থাৎ সমাজের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। নিউটন হিথ এল ওয়াই আর ফুটবল ক্লাব থেকেই নাম পরিবর্তন করে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড ক্লাবের জন্ম। 'LYR' অর্থ  ল্যাঙ্কাশায়ার এন্ড ইয়র্কশায়ার রেলওয়ে। ১৮৭৮ সালে ল্যাঙ্কাশায়ার অ্যান্ড ইয়র্কশায়ার রেলওয়ের কোম্পানির নিউটন হিথ ডিপোর ক্যারেজ ও ওয়াগন বিভাগের কর্মীরা মিলে নিজেদের অবসরে খেলার জন্য এই ক্লাবটি গড়ে তুলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে আর্থিক সংকটে পড়ার পর, ১৯০২ সালে চারজন স্থানীয় ব্যবসায়ী ক্লাবে বিনিয়োগ করেন এবং নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় আজকের পরিচিত নাম — ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ফুটবল ক্লাব। একই সঙ্গে জার্সির রঙ বদলে লাল ও সাদা করা হয়। 
১৮৮৬ সালে লন্ডনের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত 'রয়্যাল আর্সেনাল' নামক একটি সরকারি অস্ত্র ও গোলাবারুদ তৈরির কারখানার শ্রমিকরা মিলে এই ক্লাবটি গঠন করেন। প্রতিষ্ঠার সময় ক্লাবটির প্রথম নাম রাখা হয়েছিল 'ডায়াল স্কোয়ার' । কারখানার প্রধান প্রবেশদ্বারের ওপরে থাকা একটি ঘড়ির নাম থেকেই এই নামকরণ করা হয়েছিল। এর কিছুদিন পরই নাম বদলে রাখা হয় 'রয়্যাল আর্সেনাল'। আর্সেনাল দলকে এই কারণেই বিশ্বজুড়ে 'গানার্স' বলা হয় এবং তাদের লোগোতে কামান ব্যবহার করা হয় ঐতিহ্য মেনেই। 

নেদারল্যান্ডসের ফুটবলের অন্যতম সফল এবং ঐতিহ্যবাহী ক্লাব পি এস ভি আইন্ডহোভেনের জন্মও হয়েছিল একটি বিখ্যাত কারখানার শ্রমিকদের হাত ধরে। PSV-এর পুরো নাম হলো Philips Sport Vereniging যার বাংলা অর্থ - ফিলিপস স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশন। নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই ক্লাবের শিকড়। ১৯১৩ সালের ৩১ আগস্ট আইন্ডহোভেন শহরে বিখ্যাত ইলেকট্রনিক্স কোম্পানি ফিলিপস-এর কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের জন্য একটি স্পোর্টস ক্লাব হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়, নেদারল্যান্ডসের স্বাধীনতা অর্জনের শতবর্ষ পূর্তি উদযাপনের অংশ হিসেবে। ক্লাবের উদ্বোধনী ম্যাচটিও খেলেছিলেন ফিলিপস কারখানার কর্মীরাই। 
জার্মান ফুটবলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাব শালকে ০৪ -এর ইতিহাস সরাসরি কয়লাখনি শ্রমিকদের রক্ত, ঘাম এবং সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে। এই ক্লাবটি জার্মানির রূঢ় শিল্পাঞ্চলের গেলসেনকির্খেন শহরের 'শালকে' নামক একটি জেলায় ১৯০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই পুরো অঞ্চলটি তৎকালীন সময়ে ইউরোপের অন্যতম প্রধান কয়লা ও ইস্পাত শিল্পাঞ্চল ছিল। শালকে ০৪-এর শুরুর দিনগুলোর খেলোয়াড়, কর্মকর্তা এবং সমর্থক — তারা প্রায় সবাই ছিলেন স্থানীয় কয়লাখনির সাধারণ মেহনতি শ্রমিক। শালকে দলকে জার্মানিতে ভালোবেসে 'ডি কনাপেন' বলা হয়, যার অর্থ 'খনি শ্রমিক'। আজ পর্যন্ত এই ডাকনামটি তাদের খনি সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে টিকে আছে। শালকে ০৪ তাদের এই কয়লাখনি শ্রমিকদের ইতিহাসকে এতটাই সম্মান করে যে, তাদের হোম ভেন্যু 'ভেলটিন্স অ্যারেনা'য় খেলোয়াড়দের মাঠে নামার প্লেয়ার্স টানেলটি হুবহু একটি কয়লাখনির ভেতরের মতো করে সাজানো হয়েছে। খেলোয়াড়রা যখন মাঠে নামেন, তখন তাদের মনে করিয়ে দেওয়া হয় তারা কার প্রতিনিধিত্ব করছেন।


সেল্টিক ১৮৮৭ সালে গ্লাসগোর দরিদ্র আইরিশ অভিবাসী সম্প্রদায়ের সহায়তার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অন্যদিকে স্পেনের অ্যাথলেটিক বিলবাও ও এফসি বার্সেলোনা স্থানীয় আঞ্চলিক পরিচয় ও নাগরিক সমাজের প্রতীক হিসেবে বিকশিত হয়। অর্থাৎ, ক্লাব ছিল কেবল ফুটবল দল নয়; ছিল একটি সমাজ, একটি ইতিহাস এবং একটি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব।
আজ সেই ক্লাবগুলোর মালিক কারা? আমেরিকার হেজ ফান্ড, প্রাইভেট ইকুইটি কোম্পানি, রুশ অলিগার্ক, মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ রাজপরিবার কিংবা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌম সম্পদ তহবিল। যেমন— প্যারিস সেইন্ট জার্মেই (PSG)-এর মালিক কাতারের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা। ম্যানচেস্টার সিটি পরিচালিত হয় আবুধাবির শাসক পরিবারের নিয়ন্ত্রণাধীন সিটি’র ফুটবল গ্রুপের মাধ্যমে। নিউক্যাসল ইউনাইটেডের মালিক সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড। এই মালিকদের কাছে ক্লাব কেবল ফুটবল দল নয়; এটি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নির্মাণ যার কেতাদুরস্ত নাম Sportswashing, বিজ্ঞাপন এবং বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ড তৈরির একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
অর্থ দিয়ে ট্রফি কেনার প্রতিযোগিতা - ফুটবলে প্রতিযোগিতা একসময় নির্ধারিত হতো প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও প্রতিভার মাধ্যমে। আজ তা অনেকাংশেই নির্ধারিত হয় ব্যাংক ব্যালেন্স দিয়ে। ২০১৭ সালে নেইমারের দলবদল প্রায় ২২২ মিলিয়ন ইউরোতে বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টি করে। এরপর এমবাপে, ডেকলান রাইস, জুড বেলিংহ্যাম, এনজো ফার্নান্দেজ — শত শত মিলিয়ন ইউরোর বাজার এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বরং ‘নতুন স্বাভাবিক’ (Neo-Normal)। একজন শীর্ষ ফুটবলারের সাপ্তাহিক বেতন কয়েক লক্ষ থেকে এক মিলিয়ন ইউরোর কাছাকাছি পৌঁছায়। অর্থাৎ একজন খেলোয়াড় এক সপ্তাহে যা আয় করেন, পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ তা সারা জীবনেও উপার্জন করতে পারেন না।
এর ফল কী? মাঝারি ও ছোট ক্লাবগুলো প্রতিভা তৈরি করে, আর ধনী ক্লাবগুলো অর্থের জোরে সেই প্রতিভা কিনে নেয়। এটি অনেকটা এমন এক অর্থনীতি, যেখানে গরিব কৃষক ফসল ফলায়, কিন্তু ফসল নিয়ে যায় বড় কর্পোরেট।
সাধারণ সমর্থকদের মাঠছাড়া করা হচ্ছে - ফুটবলের প্রাণ কখনোই ভিআইপি বক্স ছিল না। প্রাণ ছিল সেই শ্রমিক, ছাত্র, রিকশাচালক, কারখানার কর্মী, দোকানদার — যারা সপ্তাহজুড়ে কঠোর পরিশ্রম করে শনিবার বিকেলে গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে নব্বই মিনিট প্রাণ খুলে চিৎকার করতেন, গান গাইতেন। আজ সেই মানুষগুলো ধীরে ধীরে স্টেডিয়াম থেকে বিতাড়িত হচ্ছে। প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা ইউরোপের অন্যান্য শীর্ষ প্রতিযোগিতার টিকিটের দাম এতটাই বেড়েছে যে বহু স্থানীয় সমর্থকের পক্ষে নিয়মিত মাঠে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। অন্যদিকে স্টেডিয়ামের ঐতিহ্যবাহী স্ট্যান্ড ভেঙে তৈরি হচ্ছে বিলাসবহুল কর্পোরেট বক্স, ভিআইপি লাউঞ্জ ও আতিথ্য কেন্দ্র। যেখানে একসময় শ্রমিক শ্রেণি গান গাইত, আজ সেখানে ব্যবসায়িক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

খেলা নয়, সম্প্রচার-সাম্রাজ্য - আজ ফুটবলের সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস টিকিট বিক্রি নয় — সম্প্রচার স্বত্ব। বিশ্বের বড় বড় সম্প্রচার সংস্থা ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে লিগগুলোর সম্প্রচার অধিকার কিনে নিচ্ছে। জি (Zee) এবং ফিফার মধ্যকার এবারের চুক্তিটির আর্থিক মূল্য আনুমানিক ৪ কোটি ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৩৩০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকার কাছাকাছি। তবে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ৮ বছরের চুক্তি। এর আওতায় ২০২৬ এবং ২০৩০ সালের পুরুষ বিশ্বকাপ এবং ২০২৭ সালের নারী বিশ্বকাপসহ ফিফার মোট ৩৯টি টুর্নামেন্টের স্বত্ব পেয়েছে জি। ডিজিটাল স্ট্রিমিংয়ের জন্য খেলাগুলো আমরা দেখতে পাচ্ছি জি’র ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জি ৫-এ এবং টেলিভিশনে দেখানোর জন্য তারা নতুন স্পোর্টস চ্যানেল গুচ্ছ 'Unite8 Sports' চালু করেছে। ফিফা শুরুতে ভারতীয় বাজারের জন্য প্রায় ১০ কোটি ডলার (প্রায় ৮৯০ কোটি টাকা) দাবি করেছিল। তবে রিলায়েন্স এই বিপুল অর্থ ব্যয় করার ঝুঁকি নেয়নি বলে, ফিফা এই দাবি কমাতে বাধ্য হয়। ফিফার অফিশিয়াল বাজেট এবং সম্প্রতি প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চার বছরের বাণিজ্যিক চক্রে (২০২৩-২০২৬) বিশ্বব্যাপী শুধু সম্প্রচার স্বত্ব থেকেই ফিফার আয় হচ্ছে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার, ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৩৩,০০০ কোটি টাকা। 

ফলাফল কী? একসময় যে খেলা টেলিভিশনে বিনামূল্যে দেখা যেত, আজ তা দেখতে হলে একাধিক সাবস্ক্রিপশন কিনতে হয়। এক লিগ এক প্ল্যাটফর্মে, অন্য লিগ আরেকটিতে, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ তৃতীয়টিতে। অর্থাৎ নিজের প্রিয় দলকে সমর্থন করাও এখন একটি ব্যয়বহুল পণ্য। ফুটবল আর জনসাধারণের সাংস্কৃতিক সম্পদ নয় — এটি ‘Pay to Watch’ অর্থাৎ ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’ মার্কা বিনোদন।
শিশুদের স্বপ্নও এখন বাজারের পণ্য - একসময় কোনো গ্রামের মাটির মাঠে অসাধারণ খেললেই স্কাউটের নজরে আসার সম্ভাবনা ছিল। আজ বাস্তবতা ভিন্ন। নামী একাডেমিতে ভর্তি হতে মোটা ফি, আধুনিক প্রশিক্ষণ, পুষ্টিবিদ, ব্যক্তিগত কোচ, বিদেশ সফর — সবকিছুই বিপুল অর্থনির্ভর। দরিদ্র অথচ প্রতিভাবান অসংখ্য শিশু শুরুতেই বাদ পড়ে যায়। অর্থাৎ ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নও আজ ক্রমশ শ্রেণিনির্ভর হয়ে উঠছে।
সুপার লিগ, কর্পোরেট ফুটবলের পর্দাফাঁস - ২০২১ সালে ইউরোপের ধনী ক্লাবগুলো যখন ইউরোপিয়ান সুপার লিগ গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল, তখন পৃথিবী প্রথমবার স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে কর্পোরেট ফুটবলের প্রকৃত চেহারা। পরিকল্পনাটি ছিল ভয়ংকর। কোনো অবনমন থাকবে না। কোনো ছোট ক্লাব উপরে উঠতে পারবে না। লাভ ভাগাভাগি করবে কেবল ধনী ক্লাবগুলো। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা নয়, নিশ্চিত মুনাফা। সমর্থকদের প্রবল আন্দোলনের মুখে পরিকল্পনাটি আপাতত থেমে গেলেও সেটি দেখিয়ে দিয়েছে — আধুনিক ফুটবলের ক্ষমতার কেন্দ্র আর মাঠে নয়, কর্পোরেট বোর্ডরুমে।

ক্লাব এখন ব্র্যান্ড, সমর্থক এখন উপভোক্তা - আজ বিশ্বের বড় ক্লাবগুলো ফুটবল দলের পাশাপাশি পোশাক, ভিডিও গেম, স্ট্রিমিং, ক্রিপ্টো টোকেন, পর্যটন, বিজ্ঞাপন, ডিজিটাল কনটেন্ট — সর্বত্র ব্যবসা করছে। একটি ক্লাবের মূল্য নির্ধারিত হয় শুধু তার ট্রফি দিয়ে নয়, তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারী, জার্সি বিক্রি, স্পনসরশিপ, ডিজিটাল সম্পৃক্ততা এবং বিশ্ব বাজার দখলের ক্ষমতা দিয়ে। খেলার চেয়ে ব্র্যান্ডের মূল্য অনেক সময় বড় হয়ে উঠছে। সম্প্রতি আমার সুযোগ হয়েছিল ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড ক্লাবে যাওয়ার। সেখানে অত্যন্ত সাধারণ একটি টুপির দাম ১৯ ব্রিটিশ পাউন্ড, অর্থাৎ ২,০৮০ টাকা। এই টুপি কলকাতার ফুটপাতে ১০০ টাকায় পাওয়া যায়। কিন্তু প্রবল আবেগের বশে আমিও একখানা কিনে ফেললাম ক্ষমতার বাইরে গিয়েই। এভাবেই মানুষের আবেগকে পুঁজি করে এই কর্পোরেট ক্লাবগুলো ব্যবসা করে। 
মানুষের খেলা ফিরিয়ে আনার প্রশ্ন - ফুটবল আজও ১১ জন বনাম ১১ জনের খেলা। কিন্তু মাঠের বাইরের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একদিকে অগাধ সম্পদ এবং কর্পোরেট ক্ষমতা; অন্যদিকে ছোট ক্লাব, স্থানীয় সমর্থক এবং দরিদ্র প্রতিভাদের ক্রমাগত প্রান্তিক হয়ে পড়া। যে খেলা একসময় শ্রমিক শ্রেণির আনন্দ ছিল, তা আজ ধনকুবেরদের বিনিয়োগ পোর্টফোলিও। যে গ্যালারিতে মানুষের কণ্ঠে প্রতিবাদ ও আবেগের ঢেউ উঠত, সেখানে আজ কর্পোরেট আতিথ্যের নীরবতা। যে বলটি একসময় ধুলোমাখা গলিতে গড়াত, আজ সেটি বিলিয়ন ডলারের সম্প্রচার চুক্তি, স্পনসরশিপ এবং শেয়ার বাজারের হিসাবের মধ্যে বন্দি।

ফুটবল এখনও সুন্দর - এখনও একটি গোলের উল্লাসে অচেনা মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। এখনও কোনো শিশুর পায়ের কাছে গড়িয়ে যাওয়া একটি বল তার ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হয়ে ওঠে। এখনও নব্বই মিনিটের একটি ম্যাচ ভাষা, ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও রাষ্ট্রের সীমানা অতিক্রম করে কোটি কোটি মানুষকে একই আবেগে একত্রিত করে। আফ্রিকার কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের শিশু ব্রাজিলের জার্সি পরে নেচে ওঠে। ভারতের অনেক প্রান্তে আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের পতাকা উড়ে। ইউরোপের কোনো ক্লাবের জয়ে এশিয়ার কোনও শহরে মানুষ আনন্দে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। পৃথিবীর ৮০০ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ৭০০ কোটি মানুষের আবেগকে একই সুতোয় গেঁথে রাখার ক্ষমতা আর কোনও কিছুরই নেই; আছে শুধু ফুটবলেরই।
ঠিক এই কারণেই ফুটবল কেবল একটি খেলা নয় — এটি মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, মানুষের সম্মিলিত অনুভূতির ভাষা। আর সেই কারণেই ফুটবলকে কর্পোরেট মুনাফার বন্দিশালায় আটকে ফেলা শুধু একটি খেলার বাণিজ্যিকীকরণ নয়; এটি মানুষের স্বপ্ন, সংস্কৃতি এবং সামাজিক সংহতির ওপরও চরম আঘাত।

ফুটবল আজও মাঠে এগারো জনের বিরুদ্ধে এগারো জনের লড়াই। কিন্তু মাঠের বাইরের লড়াইটা আরও কঠিন — মানুষের ফুটবল বনাম বিশ্বায়িত পুঁজির ফুটবল। একদিকে গ্যালারির গান, পাড়ার মাঠ, শ্রমজীবী মানুষের আবেগ; অন্যদিকে সম্প্রচার স্বত্ব, শেয়ারমূল্য, স্পনসরশিপ আর কর্পোরেট মুনাফার অঙ্ক।
ইতিহাস সাক্ষী, মানুষের ভালোবাসা দিয়েই ফুটবলের জন্ম। তাই শেষ পর্যন্ত ফুটবলের ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করবে মানুষই — বিলিয়নেয়ারদের বোর্ডরুম নয়। কারণ বলের প্রকৃত মালিক কখনো কর্পোরেটরা নয়; বলের প্রকৃত মালিক সেই শিশুটি, যে খালি পায়ে ধুলোভরা মাঠে প্রথম লাথি মারে। ফুটবলের প্রকৃত ঠিকানা এখনও সেই গলি, সেই বস্তি, সেই শ্রমিক মহল্লা, যেখানে স্বপ্নের দাম এখনও কোনো মুদ্রায় মাপা যায় না।
প্রকাশ: ২২-জুন-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 20-Jun-26 18:08 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/dreams-of-mud-and-soil-are-breaking-in-the-dollar-market
Categories: Fact & Figures
Tags: dollar, football
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড