Site icon CPI(M)

মৃণাল সেন: ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রাকৃত প্রমিথিউস

১৪ মে,২০২৩ (রবিবার)

তপারতি গঙ্গোপাধ্যায়

“You must remember that of all the arts, for us the cinema is most important.”
– Vladimir Lenin, interview with Anatoli Lunacharsky in 1922

“With all technical resources promising to open out ever newer horizons and with heaps of social contradictions offering sharper class consciousness, today’s cinema of India has indeed a big role to play. A battle, so to say, needs to be continuously fought by our filmmakers on social, political and ideological planes..”
– Mrinal Sen, The October revolution and its impact on World cinema, (A paper read in an international seminar in Moscow, 1977 )

কে অগ্রাধিকার পায়? ব্যক্তি পরিচালক, তাঁর মাধ্যম, নাকি এই প্রক্রিয়ার তিনি যে মানুষের কথা বলছেন, তাঁরা? পরিচালক মৃণাল সেন নিজেকে সবার শেষে রেখেছেন। মৃণাল বলতেন, আমার তিন প্রণয়িনী। আমার কাহিনী, আমার মাধ্যম এবং আমার সময়। কাহিনী যে সময়ের কথা বলে, শিল্প তাকে পেরিয়ে চিরকালীন হয়ে উঠতে চায়। কিন্তু তার প্রয়োগ বর্তমান নির্ভর। তাই প্রত্যেক সিনেমার সাথে মানুষ হিসেবেও গড়ে ওঠার একটা গতিশীল, সমান্তরাল তাগিদ কাজ করে।

চারের দশক জুড়ে পদার্থবিজ্ঞান থেকে সিনেমার যাত্রায় তাঁর দীর্ঘ সঙ্গী ছিল ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরী। রুডলফ আর্নহেইম, ভ্লাদিমির নিলসেন এর পাশাপাশি ১৯৪৪ সালে বিজন ভট্টাচার্যর “নবান্ন”, ১৯৪৬ সালে আই পি টি এ র প্রযোজনায় খ্বাজা আহমেদ আব্বাসের “ধরতি কে লাল”, ১৯৫০ এ নিমাই ঘোষের “ছিন্নমূল” তাঁর আঞ্চলিক দর্শনকে সংগ্রামী ভাষা দিয়েছিল। ১৯৪১ এ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিনে নিমতলা ঘাটে হাজার শোকাহত মানুষের ভীড়ে একটি শিশুকে পদপিষ্ট হয়ে থেঁতলে যেতে দেখেছিলেন। ১৯৪৩ এর মন্বন্তরে মফস্বলের ক্ষুধার্ত ভিড় দেখেছেন কলকাতায়। খাদ্যশস্যের বিপুল ভান্ডার ইউরোপে চালান হয়ে যাচ্ছে, দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর বিনিময়ে। সেই নিষ্ঠুরতা প্রতিফলিত হয়েছিল ১৯৬০ কানাই বসুর গল্প অবলম্বনে তৈরি “বাইশে শ্রাবণ” এ। এই ছবির নামের জন্য কলকাতা সেন্সর বোর্ড এর বাধার মুখোমুখি হয়েছিলেন মৃণাল সেন। কিন্তু বাইশে শ্রাবণ যে আসলে যেকোনো একটি দিন, যেদিন শুধু রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু না, আরো অসংখ্য মানুষের জন্ম, মৃত্যু, বিবাহের ঘটনা ঘটতে পারে, যেটা সেইসব মানুষের কাছে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, এবং তাকে অ্যাড্রেস করতে গেলে রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধার বিন্দুমাত্র ক্ষয় হয় না, এই সচেতন বোধ যে অনন্য মেধা থেকে আসে, সেটা আমরা মনে হয় উপলব্ধি করতে পারিনি এখনও।


“The man was no villain, the woman was all grace. It was a cruel time. I wanted to make a cruel film and Baishey Sravana is one such.”
– Mrinal Sen, Baishey Sravana and the great famine in 1943 (1977)

রবীন্দ্রনাথ নামক প্রতিষ্ঠান বাংলা ভাষার ঘাম, রক্ত, তীক্ষ্ণতা থেকে অনেকটা পেলব দূরত্বে নিয়ে গেছে আমাদের। ক্ষুধার্ত, বিকল্প সাহিত্য না থাকলে হয়তো আমরা নিজের ভাষার নগ্নতার অসীম শক্তিকে উপলব্ধি করতেই পারতাম না। মৃণাল তাঁর চলচ্চিত্রে সেই ক্ষুধা আন্দোলন নিয়ে এসেছিলেন। তীব্রতা, শহুরে বিষাদ, ক্যেওস, নিরাপত্তাহীন মানুষ, সময়ের ছবি। হয়তো “প্রাইভেট মার্ক্সিস্ট” বলেই পেরেছিলেন।

বিপ্লবের মাঝেই এসেছিল প্রেম। ১৯৪৬ সালে উত্তরপাড়ার গীতা সোমের সাথে দেখা হয় কোনো এক ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার সময়। তারপর কত ট্রেন তাঁকে নিয়ে গেছে মফস্বলে, কত ট্রেন তিনি মিস করেছেন, বালী ব্রিজে প্রথম হাতে হাত রাখার রোমাঞ্চে গঙ্গাবক্ষে ভেসে গেছে উইলিয়াম গ্যালাকর এর “এ কেস ফর কমিউনিজম”। ১৯৫৩ সালে তাঁরা বিয়ে করেন। গীতা ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই মৃণালের সহযোদ্ধা। মৃণাল সেনের “কলকাতা ৭১”, “খণ্ডহর”, শ্যাম বেনেগালের “আরোহণ” গীতা সেনের রাজনৈতিক থিয়েটার চর্চার স্বাক্ষর বহন করে।

নির্বাক থেকে সবাক ছবির উত্তরণের পথ দীর্ঘ। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবীতে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে প্রভাবিত হয় শিল্পচর্চা। সাহিত্য, থিয়েটার, সঙ্গীত, চলচ্চিত্র। ১৯৪৮ সালে ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্ট এর সাথে বিশ্ব চলচ্চিত্রের দরজা খুলে গেল বাঙালির কাছে। ১৯৫৫ সালে মুক্তি পেল সত্যজিৎ রায়ের “পথের পাঁচালী”। আর সেই বছরই স্বরাজ বন্দোপাধ্যায় এর গল্প অবলম্বনে মৃণাল সেন তৈরি করলেন তাঁর প্রথম ছায়াছবি “রাতভোর”। মুখ্য চরিত্রে উত্তমকুমার এবং সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। সঙ্গীত পরিচালক সলিল চৌধুরী। রাতভোর কে নিজের সিনেমা বলেই মানতে চাননি মৃণাল সেন। সারাজীবন বারবার বলেছেন, “রাতভোর একটি হাস্যকর সিনেমা, it was rubbish! আমার কোনো ছাপ নেই সেখানে!” নিজের ছবির পাশে নিজেই দাঁড়াননি মৃণাল সেন। চার বছর অন্তরালে ছিলেন। ১৯৫৭ সালে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এর অনুরোধে মহাদেবী ভার্মার কাহিনী অবলম্বনে, “নীল আকাশের নিচে” ছবির স্ক্রিপ্ট লেখা শুরু করেন। পরে পরিচালকের সাথে বিভিন্ন জটিলতায় হেমন্তবাবু মৃণালের উপর এই ছবি পরিচালনার দায়িত্ব দেন, তাঁর আপত্তি সত্ত্বেও রাজি করান। চীন ভারত সমস্যার প্রেক্ষাপটে বিবিধ রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ১৯৫৯ সালে ছবিটি মুক্তি পায়। নেহরুর, ইন্দিরার অকুণ্ঠ প্রশংসা পেয়েছিলেন, বাইসাইকল থীভস এবং পথের পাঁচালীর সাথে তুলনা করা হয়েছিল এই ছবিকে। সবথেকে ব্যতিক্রমী ছিল মুজফফর আহমেদ এবং জ্যোতি বসুর উদ্যোগে কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র “স্বাধীনতা” র সম্পাদকীয় জুড়ে এই চলচ্চিত্রের আলোচনা।

১৯৬৫ সালে তৈরি “আকাশ কুসুম” ছবিটি ঘিরে দীর্ঘ বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। এর পরেই ১৯৬৬ সালে কালিন্দীচরণ পানিগ্রাহীর কাহিনী নিয়ে ওড়িয়া ভাষায় তৈরি করেন “মাটির মনিষ”। তার প্রিন্ট এখন বেশ দুর্লভ। ওই সময় থেকেই ভাবনাচিন্তা শুরু করেন স্বল্প বাজেটের সিনেমা নিয়ে। দর্শকের কাছে পৌঁছনোর রাস্তায় ভারতের দীর্ঘ ঔপনিবেশিক ইতিহাসের প্রাচীর তৈরি হয়েছিল। ভারতের অর্থনৈতিক লড়াই, বাজারের চাহিদা অনুযায়ী একটা দেশের মানুষের সাংস্কৃতিক ভিত তৈরি করার বিরুদ্ধে অসম আন্দোলন শুরু করেছিলেন মৃণাল সেন।
“চলচ্চিত্র নির্মাণ তেমন খরচসাপেক্ষ না যতটা আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়। প্রযুক্তির নতুন আবিষ্কারের প্রতি আমার গভীর আগ্রহ, কিন্তু এটাও সত্যি, প্রযুক্তির দ্রুত উদ্ভাবনের সাথে যেটা সবথেকে বেশি হারাচ্ছি, তা হলো সাহস, প্রত্যয় এবং সৃজনশীলতা। এটা শুধু আমাদের না, সারা পৃথিবীর সমস্যা।”
(- রাজীব মেরহোত্রার সাথে এক সাক্ষাৎকারে।)

সময়ের অকৃত্রিম দাবীকে স্ক্রীনে প্রজেক্ট করছেন। তাঁর আগে এই সিনেম্যাটিক নগ্নতা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আর কেউ ব্যবহার করেননি। তিনি সিনেমাকে নতুন বর্ণমালা দিয়েছেন।

“New Cinema stands for a film “with a signature.” New Cinema engages itself in a ruthless search for “truth” as an individual artist sees it. New Cinema lays stress on the right questions and bothers less about the right answers. New Cinema believes in looking fresh at everything including old values and in probing deeper everything, including the mind and the conditions of man.
New Cinema seeks the clues to mankind’s riddles in men’s personal relationships and private worlds. New cinema encourages film-makers to bring to their work improvisation, spontaneity and youthful enthusiasm. New Cinema expects of its audience the kind of participation and involvement which modern art demands.”
– Manifesto of the new cinema movement
Arun Kaul and Mrinal Sen (1968)

অর্থাৎ “ফেয়ারলি ব্যাকওয়ার্ড অডিয়েন্স” এর প্রতি অভিমান নিউ ওয়েভ সিনেমার অন্তরায়। কমিউনিজমের গভীর ধারণা ছাড়া এই প্রয়োগ অসম্ভব। অরুণ কৌল তাঁর বহু কাজের সঙ্গী। ১৯৬৮ সালে মুম্বাইতে অরুণের অফিসে মাত্র চার ঘণ্টায় বনফুলের গল্প থেকে চিত্রনাট্য লিখে ফেললেন মৃণাল। ১৯৬৯ এ মুক্তি পেল ভারতীয় নিউ ওয়েভ সিনেমার সেই অপ্রতিরোধ্য মাইলস্টোন “ভুবন সোম”। মৃণাল সেন এবং উৎপল দত্তের প্রথম হিন্দি কাজ। সুহাসিনী মুলের জীবনের প্রথম অভিনয়। অমিতাভ বচ্চনের ফিল্ম কেরিয়ার এর শুরু। বিজয় রাঘব রাও এর প্রথম চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা। স্বল্প বাজেটের ক্ষেত্রেও রেকর্ড এই ছবি। মাত্র দু লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল। ছবিটি সেই অর্থে পূর্ণদৈর্ঘ্যেরও ছিল না। অতএব, “ভালো ছবি নাকি দীর্ঘ ছবি” এই নতুন চিন্তাধারারও জন্ম হলো। আমার কাছে ভুবন সোম আন্তর্জাতিক সিনেমার সেতু। তার দুই বছর আগেই জাক তাতি প্লে টাইম সিনেমাটি তৈরি করেন। মঁসিয়ে উলো আর ভুবন সোম এর আইসোলেশন কি অদ্ভুত, অথচ দুটি সিনেমা সব দিক থেকে একদম আলাদা। ঠিক সেভাবেই ত্রুফোর আঁতোয়ান বা তারকোভস্কির রুবলেভ। সমসাময়িক কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর কাজ। সারা পৃথিবীর চেতনার যোগাযোগই নিউ ওয়েভের মূল। সেই কারণেই ভারতীয় এবং ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভের ইতিহাসে মৃণাল সেন নামটি ভাস্বর।

শীতল যুদ্ধের পৃথিবীতে স্বাধীন চলচ্চিত্র ছিল দিনবদলের হাতিয়ার। ফার্নান্দো সোলানাস এর ভাষায় Cinema as Gun । ১৯৬৮ থেকে ১৯৭৮ সারা পৃথিবীর এক উত্তাল রাজনৈতিক সময়। মৃণাল সেনের “কলকাতা ৭১” এর সাথে চিলির প্যাট্রিসিয়ো গুসমানের “দ্যা ফার্স্ট ইয়ার” মিলেমিশে যাচ্ছে, তখন গুসমান জেলবন্দি। ১৯৭৩ সালে জার্মানির ম্যানহাইম চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি সভাপতি মৃণাল সেন। উৎসবের শেষ দিনে চিলির মিলিটারি হুন্টার বিরুদ্ধে একত্রিত রেসোলিউশন পাঠ করলেন সমস্ত জুরিরা, গুসমান এর নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে।
১৯৭৩ সালে বার্লিন ফোরামে মৃণালের সাথে আলাপ হয় আর্জেন্টিনার পরিচালক গ্লেজিয়ের এর। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের লিফলেট বিলি করছিলেন গ্লেজিয়ের। তাঁর ছবি “দ্যা ট্রেটর” এক ট্রেড ইউনিয়ন নেতার জীবনের সত্য অবলম্বনে তৈরি। তার কিছুদিন পরে বুয়েনোস আইরেস এর রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে খুন করা হয়েছিল তাঁকে।
ব্রাজিলের গ্লবার রশা র বিরুদ্ধে একাধিক ক্রিমিনাল কেস সাজানো হচ্ছে, এর মধ্যেই তিনি তৈরি করছেন “লায়ন হ্যাজ সেভেন হেডস”। বলিভয়ার হোর্হে সানসিনেস এর “ব্লাড অফ দ্যা কনডোর”, আর্জেন্টিনার সামরিক শাসন, স্পেনের গৃহযুদ্ধ, লাতিন আমেরিকার ভয়াবহ ঔপনিবেশিক যন্ত্রনা থেকে সোলানাস এর “আওয়ার অফ দ্যা ফার্নেসেস”! তাঁর বিখ্যাত লাইন, We fear peace more than war! নিও-কলোনিয়ালিজম এর প্রতিক্রিয়া,
My first name : VICTIM
My surname: HUMILIATION
My condition: REBEL
ঠিক তেমনই “কলকাতা ৭১” এর শুরুতেই পর্দায় ভেসে ওঠে,
“আমি পায়ে পায়ে হেঁটে চলেছি
হাজার বছর ধরে
দেখছি
ইতিহাস
দারিদ্র্যের ইতিহাস
বঞ্চনার ইতিহাস
শোষণের ইতিহাস”

একজন কমিউনিকেটর হিসেবে নিজের মাধ্যমকে বেছে নেবার তাগিদ, সংশয় এবং আবেগ থেকেই
মৃণাল সেন মানুষের সংগ্রাম দেখিয়েছেন। “ইন্টারভিউ”, “কলকাতা ৭১” এবং “পদাতিক” এর যে সমষ্টিলদ্ধ ইমারত, তাতে চরাচরব্যাপী মানুষের কান্না ভাসে। বারবার সেই ঢেউ আছড়ে পড়ে আমাদের আপাত উদাসীন যাপনে। যতবার আমাদের মূল্যবোধ ধূলিসাৎ হবে, যতবার সাম্রাজ্যবাদী লোভ, মেরুকরণ নতুনের পথ আটকাবে, ততবার কুড়ির তারুণ্য পথে নামবে, পালিয়ে বেড়াবে, কাঁচের ঘর ভাঙবে, অনন্ত দারিদ্র্য আর ক্ষুধা নিয়ে খুন হবে, অথবা হারিয়ে যাবে। আর ততবারই আমাদের ফিরে যেতে হবে এই “কলকাতা ট্রিলজি”র কাছে।

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রবাহ প্রেমচন্দকে যেভাবে বদলে দিয়েছিল, তার প্রভাব পড়েছিল মৃণালের মধ্যেও। ১৯৭৭ সালের মে মাসে তেলেঙ্গানায় প্রেমচন্দের কাহিনী “কফন” থেকে “ওকা উড়ি কথা” (A Village Story) ছবির শুটিং শুরু হয়। নিজামশাহী, রাজাকারদের বিরুদ্ধে গেরিলাযুদ্ধের সৈনিক কৃষ্ণমূর্তি ছিলেন তাঁর গাইড। খম্মম, নালগোণ্ডা, ওয়ারঙ্গল এর হতদরিদ্র কৃষকরা পরিণত হয়েছেন মাটিকাটা শ্রমিকে। সেইসব গ্রাম থেকে মৃণাল তুলে এনেছেন সিনেমার চরিত্রদের।
“With all their life-long experience of grinding poverty and yet of intense passion for living, the villagers walked right into our shots. As they did so, we sharpened our own understanding of the reality, correcting our own failings as often as we felt necessary and adding authenticity to our work.To be candid, never before did I find myself thrown into such a creative milieu. My unit members and I were stirred by the contagion of this collective passion.”
– Mrinal Sen, Filming in Telangana

এভাবেই তাঁর ছবিরা একেকটি জীবন্ত সত্তা হয়ে ওঠে। জীবনের, প্রতিবাদের অস্ত্র সমেত ছুটে আসে আমাদের দিকে। আমরা পালাবার সময়টুকুও পাই না।

ভগবতীচরণ পানিগ্রাহীর কাহিনী অবলম্বনে ১৯৭৬ সালে তৈরি করেন “মৃগয়া”। প্রেক্ষাপট ১৯৩০, কিন্তু সিনেমার ভাষা দেশ কালের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের দ্বারা মানুষের শোষণের কথা বলেছে। ১৯৮০ সালে অমলেন্দু চক্রবর্তীর কাহিনী নিয়ে আবার ফিরে যান দুর্ভিক্ষের আবহে, “আকালের সন্ধানে”। তাঁর কথায় ফিল্ম উইদিন এ ফিল্ম। আমি দেখি টাইম উইদিন এ টাইম এর মতো। ১৯৪৩ এবং ১৯৮০, এই দুই সময় একে অপরের মধ্যে ঢুকে আছে। বারবার এই সময় থেকে ওই সময়ে যাতায়াত। ছবির চরিত্ররা দুই সময়েরই বার্তাবাহকের কাজ করছে। মন্বন্তর এবং বর্তমান। ১৯৮৩ সালে প্রেমেন্দ্র মিত্রের তেলেনাপোতা আবিষ্কার হয়ে ওঠে “খণ্ডহর”। ১৯৮৬ সালে ফ্রান্স, বেলজিয়াম এবং সুইটজারল্যান্ড এর যৌথ প্রযোজনায় সমরেশ বসুর কাহিনী অবলম্বনে তৈরি করলেন “জেনেসিস”। কমিউনিস্ট তত্ত্বের অদ্ভুত পরিভাষা। উৎপল দত্ত লিখেছিলেন,
“With a narrative firmly confined to the archetypal trader, weaver and farmer, the film attains the quality of a parable, and gives a feel of the sharp-edged simplicity of a fairy tale.”

১৯৯৩ সালে সাদাত হাসান মান্টোর গল্পে তৈরি “অন্তরীণ”, আসলে তো প্রেমের ধ্বংসাবশেষ! তাঁর গল্প নির্বাচনের বৈচিত্র্য, নিজস্বতা, ব্যাপ্তি এবং সিনেম্যাটিক ট্রান্সফর্মেশন অসামান্য। চরিত্রকে বাস্তব করে তোলার অন্যতম প্রক্রিয়া ছিল চারপাশের মানুষের থেকে রসদ সংগ্রহ। তাঁর স্ক্রিপ্ট অনেক সময়ই প্রতিদিনের শুটের সাথে বদলে যেত। অভিনেতার সাথে অন্তরঙ্গ আলোচনা অভিনয়ের ক্ষেত্রে চরিত্রের সাথে একাত্মতা বাড়িয়ে তুলেছে। একজন শ্রমজীবীর ভাষা, কৃষকের ভাষা, আবার শহরের ভাষা, আঞ্চলিক উচ্চারণ, তাঁদের যাপনের সাথে জুড়ে থাকা অঙ্গসঞ্চালন, সবটা তিনি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গ্রহণ করতেন, চরিত্রের মধ্যে প্রবাহিত হতো, জীবন্ত হয়ে উঠত তারা। যেমনটা ফেলিনি বলতেন, সিনেমা আসলে অংক। observe, improvise, create।

ঋত্বিক আর মৃণাল ছিলেন অবিচ্ছেদ্য বন্ধু

মৃণাল সেনের উত্তরসূরি হিসেবেই নিউ ওয়েভ এর ধারাকে ভারতীয় সিনেমায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন মনি কৌল, আদুর গোপালকৃষ্ণন, কুমার সাহানী, জন আব্রাহাম। পুণে ফিল্ম ইনস্টটিউটে ঋত্বিক ঘটকের ছাত্র ছিলেন এঁরা। ঋত্বিক আর মৃণাল ছিলেন অবিচ্ছেদ্য বন্ধু। সেই ১৯৪৮ থেকে মৃণাল, ঋত্বিক, সলিল চৌধুরী, তাপস সেন, কলিম শরাফী, হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায় এবং আরো অনেকের স্বপ্নসন্ধানের সাক্ষী দক্ষিণ কলকাতার প্যারাডাইস ক্যাফে। ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি, “মৃগয়া” তৈরি হবার সময় ঋত্বিক মারা যান। ঋত্বিকের মৃত্যু মৃণালকে কিছুটা বিধ্বস্ত করেছিল। লিখেছিলেন, “আমার চিন্তাভাবনায় জীবনের থেকেও বড় ঋত্বিক বেঁচে আছে। অবাধ্য ঋত্বিক, হৃদয়হীন ঋত্বিক, শৃঙ্খলাহীন ঋত্বিক আবার সবার ওপরে সম্মাননীয় ঋত্বিক।”

মৃণাল সেনের বহু সিনেমার মূল ক্যানভাস কলকাতা। মন্বন্তর, ছাত্র আন্দোলন, নকশালবাড়ি, মধ্যবিত্তের দ্বিধা, সাম্রাজ্যবাদের অলিগলি, সবটাই কলকাতা। প্রিয় বন্ধু, জার্মান চলচ্চিত্রকার রাইনহার্ড হফ ১৯৮৪ সালে মৃণাল সেনের উপর একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেন। Ten days in Calcutta : A portrait of Mrinal Sen. ঠিক দশদিনেরই শুটিং ছিল। কাজটি সম্পূর্ণ হবার পরে মিউনিখে ছবিটি দেখানো হয়েছিল। সেন উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিলেন, এইভাবে কলকাতাকে এর আগে কেউ দেখায়নি। উত্তরে টাইমস পত্রিকার ডেভিড রবিনসন তাঁকে বলেন, “you can’t see the tip of your nose, can you ?”

মৃণাল সেন ও সত্যজিৎ রায়

১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬, পুণে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট এর চেয়ারম্যান ছিলেন মৃণাল সেন। তিনি প্রথম চেয়ারম্যান যিনি গভর্নিং কাউন্সিলের মিটিংয়ে ছাত্রদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেন। মিটিং এবং মিটিং এর বাইরেও মেসে ছাত্রদের সাথে লাঞ্চ খেতেন। ক্লাসরুমের বাইরে ক্যাম্পাসে ছাত্রদের সাথে তাঁর নিয়মিত আদানপ্রদান হতো। ছাত্রদের খুব প্রিয় ছিলেন। ছাত্রদের প্রতি তাঁর বার্তা ছিল,
“… মনে রেখো, যখন এই ফিল্ম মিডিয়াম কে তোমরা ছুঁয়েছ, তখন জানবে তোমরা মানুষকে ছুঁয়েছ, মানুষের মনকে ছুঁয়েছ। সিনেমার প্রতি দায়বদ্ধতা মানে তোমার নিজের বিবেকের প্রতিও দায়বদ্ধতা। যখন এই শিল্পজগতে প্রবেশ করবে, তখন ঝুঁকিও নিতে পারো, আবার সাবধানেও পা ফেলতে পারো। কোনটা করবে বেছে নেবার ভার তোমাদের। আমি শুধু বলব তৈরি হও তোমরা, সামনে কিন্তু কঠিন সময়!”

সাতাশটি পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র, চৌদ্দটি শর্ট ফিল্ম, পাঁচটি তথ্যচিত্র, দেশ বিদেশের অসংখ্য সম্মান, পুরস্কারের পরেও কাজের অনাবিল ক্ষিদেই তাঁর জীবনীশক্তি ছিল। চ্যাপলিনের মত তিনিও মনে করতেন, “To work is to live and I love to live.” ১৯৭২ সালে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ৮২ বছরের চ্যাপলিনের মুখোমুখি হয়েছিলেন মঞ্চে। “আমার ভুবন” এর পরে জীবনের অনেকটা সময় যখন ছবি করতে পারছেন না আর, তখনও তাঁর স্মৃতিকথা জুড়ে চ্যাপলিন। “I will never be able to retire because ideas just keep popping into my head.” তবু নিজের কোনো কাজকেই তিনি আঁকড়ে থাকেননি। এই নির্লিপ্ত থাকার ক্ষমতাই হয়তো তাঁকে এমন দূরদর্শী করেছিল। তাঁর প্রক্রিয়ার উদারতা, তাঁর আনকোরা সিনেমার ভাষা লিপিবদ্ধ করেছেন অত্যন্ত সারল্যের সাথে।

মৃণাল সেনের মত এমন দানবীয় মেধাকে, তাঁর আদর্শগত লড়াইকে চর্চা করার তেমন কোনো চেষ্টাই আমরা করিনি। তাঁর মত স্বতঃস্ফূর্ত স্পর্ধা আমাদের মগজে, হৃদয়ে আর ফিরবে কিনা জানা নেই। চিরকাল ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স এর বার্তা দিয়েছেন, সাস্টেইনেবল সিনেমার উদাহরণ তৈরি করেছেন। পরম ভরসাস্থল ছিল নতুন প্রজন্ম, তাদের ক্ষোভ, বিচলন থেকে নিপীড়িত মানুষের চর্চা। তাঁর কাজ সময়ের সাথে আরো প্রাসঙ্গিক হচ্ছে, আমাদের সামনে প্রকাণ্ড আয়নার মত হয়ে উঠছে, যদিও আমরা সেদিকে বিশেষ তাকাচ্ছি না। জীবনের সাথে শিল্পের দূরত্ব এত দ্রুত বাড়ছে, ফেরার পথ কঠিনতর হচ্ছে। তবু যতবার তাঁর সিনেমা, তাঁর লেখার মুখোমুখি হই, দেখি এই চরম সাংস্কৃতিক সংকটেও আমাদের বৌদ্ধিক, প্রাণোচ্ছল লড়াইয়ের নিরন্তর বার্তা দিয়ে চলেছেন ভারতীয় আঞ্চলিক সিনেমার এই আশ্চর্য আন্তর্জাতিক যাযাবর।

শেয়ার করুন