রাজ্য রাজনীতিতে সংগঠিত কুৎসা ও মিথ্যাপ্রচার
কালিদাস ঘোষ
সারা জীবন মিথ্যা ঘটনা ঘটিয়ে নিজের ইমেজ তৈরি করা, সংবাদের শিরোনামে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।

গতকাল রাত্রে আমি কিছুক্ষণের জন্যে এবিপি আনন্দ নিউজ চ্যানেল খুলেছিলাম।
ভেবেছিলাম যে, এবিপি আনন্দে আজ ডিএ সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে হয়তো আলোচনা হবে। কিন্তু সেখানে তখন শুভেন্দু অধিকারীর কনভয়ের উপর তৃণমূলের পাথর ছোড়ার ব্যাপার নিয়ে আলোচনা চলছে। বিরোধী দলের নেতা নেত্রীদের উপর শাসকদলের আক্রমন সমানে হচ্ছে এই কথা বলার সাথে সাথে সঞ্চালক সুমন দে বললেন, এভাবে বিরোধী দলের উপর আক্রমন বামফ্রন্ট আমলেও হয়েছে। এই প্রসঙ্গে সুমন দে তিনটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। প্রথম ঘটনা হাজরার মোড়ে মমতা ব্যানার্জীর উপর আক্রমন, দ্বিতীয় ঘটনা ২০০৭ সালের অক্টোবর মাসে নন্দীগ্রাম থেকে আসার পথে গোকুলনগরে মমতা ব্যানার্জীর গাড়ি লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ার ও গুলি চালানোর ঘটনা এবং তৃতীয় ও সর্বশেষ ঘটনা ২০০৮ সালের নভেম্বরে মমতা ব্যানার্জী যখন একদল সাংবাদিককে নিয়ে (সাংবাদিক সুমন দে’ও সেই দলে ছিলেন) সিঙ্গুর যাচ্ছিলেন তখন পথে সিপিআই(এম) সমর্থকরা তার গাড়ি ঘিরে ধরে মমতার বিরুদ্ধে শ্লোগান দিয়েছিল। গতকাল ওই অনুষ্ঠানে সিপিআই(এম) নেতা এবং সুবক্তা শতরূপ ঘোষ উপস্হিত ছিলেন। তিনি তার মতো করে ঐ তিনটি ঘটনা সম্বন্ধে বক্তব্য রেখেছিলেন। আজ আমি একটু বিস্তৃত করে ওই তিনটি ঘটনার পিছনে আসল সত্য তুলে ধরছি।
প্রথম ঘটনা হাজরার মোড়ে মমতা ব্যানার্জীর উপর আক্রমন। মমতা ব্যানার্জী তখন যুবকংগ্রেসের রাজ্য নেত্রী। ১৯৯০ সালের ১৬ ই আগষ্ট দুপুর ১২ টার দিকে মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বে হাজরার মোড়ে বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে যুব-কংগ্রেস একটা মিছিল বার করে, মিছিলে খুব বেশি হলেও শ’খানেক লোক ছিল। ঐ মিছিল চলাকালীন সিপিআই(এম)’র লালু আলম এবং আরও কিছু সিপিআই(এম) সমর্থক মিছিলের সামনে দাঁডিয়ে সিপিআই(এম)’র পক্ষে শ্লোগান দিতে থাকে। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে ধাক্কাধাক্কি এবং পরে মারপিট শুরু হয়। মমতা ব্যানার্জী ধাক্কাধাক্কির সময় পিচের রাস্তার উপর পড়ে যান এবং মাথায় আঘাত পান। তাকে বাইপাসের একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে ভর্তি করা হয়। পুলিস ঘটনার উপর সুয়োমটো কেস করে এবং রাতে লালু আলম সহ আরো ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। লালু আলমের দাদা বাদশা আলম ছিল দক্ষিন কলকাতার সিপিআই(এম) নেতা এবং লালুও ছিল পার্টি সদস্য। ঘটনার পরই সিপিআই(এম) নেতৃত্ব খুব কড়া অবস্হান নেয় , কারণ পার্টি এধরনের আচরনকে শুধুমাত্র শৃঙ্খলাহীনতা বলে থেমে থাকেনি, বাদশা আলম এবং লালু আলমকে পার্টি থেকে বহিস্কারও করা হয়। অনেকেই বলেন যে ঐ ঘটনা ছিল একটা গট-আপ ব্যাপার।
পরবর্তীতে লালু আলম এবং বাদশা আলম প্রথমে কংগ্রেসে এবং পরে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেয়। তদন্তের পর ১৯৯২ সালে পুলিস লালু আলম সহ ১১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশীট সাবমিট করে। মামলার শুনানির সময় প্রধান সাক্ষী মমতা ব্যানার্জীকে বারবার সমন করা সত্বেও তিনি আদালতে সাক্ষী দিতে আসেননি।
২০২৪ সালের আগষ্ট মাসে সরকারি উকিল আদালতকে জানিয়ে দেয় যে সরকার আর এই মামলা চালাতে চায় না। বাধ্য হয়ে আলিপুর কোর্টের অতিরিক্ত বিচারক পুস্কল শতপথী লালু আলম সহ ১১ জন অভিযুক্তকেই বেকসুর বলে খালাস করে দেন। এবার আপনারাই বলুন এ ঘটনাতে সিপিআই(এম)’র অপরাধ কী ছিল। এই ঘটনা নিয়ে মমতা পরবর্তীতে রাজ্যের মানুষকে অনেক গল্প শুনিয়েছে। যেমন তার মাথায় ৩৬ টা স্টিচ্ পড়েছিল, তার হাত পায়ের জয়েন্টগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, এই ঘটনার পরেই অভিষেক ব্যানার্জী (তখন বয়স মাত্র দুই বছর) একটা পতাকা নিয়ে বলতো, পিসিকে মারলে কেন সিপিএম জবাব দাও এবং তখনই ঠিক করে সে বড় হয়ে সিপিএমের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। কী দারুন প্রতিভা বলুন!
সুমন দে দ্বিতীয় যে ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন সেটি নন্দীগ্রামের ঘটনা। নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর বাহিনীর হাতে শঙ্কর সামন্ত শহীদ হবার পর থেকে ৩২ জন সিপিআইএম কর্মী সমর্থক শহীদ হয়েছিলেন। সব থেকে বেশি সিপিআই(এম) সমর্থক খুন হয়েছিলেন গোকুলনগরে। ওই গোকুলনগর ছিল তৃণমূলি এবং মাওবাদীদের মুক্তাঞ্চল। গোকুল নগরে মোট আট জন কমরেড নিহত হয়েছিলেন। আমি গোকুলনগরের ওই আটজন কমরেডের নাম এবং খুন হওয়ার তারিখ এখানে উল্লেখ করছি। ২৯.০৪.২০০৭ খুন হন দিলীপ মন্ডল, ২৭.১০.২০০৭ খুন হন সুনীল বর ও বচ্চন গড়ুদাস, ৩০.১০.২০০৭ খুন হন শ্রীমন্ত দাস, ০১.১১.২০০৭ তারিখে খুন হন গৌরহরি দাস এবং গোবিন্দ সিং, ০৩.১১.২০০৭ খুন হন তপন মান্না এবং ০২.১২.২০০৭ খুন হন দীপক দাস। গোকুলনগর তখন তৃণমূলি ও মাওবাদীদের অত্যাচারে কার্যত সিপিআই(এম) শূণ্য। সমস্ত বামপন্হীরা তখন আশ্রয় নিয়েছে খেজুরির ত্রাণশিবিরে। নন্দীগ্রামের সমস্ত পার্টি অফিস দখল করে নিয়েছিল তৃণমূলিরা। এ রকম একটা পরিস্হিতিতে গোকুলনগরে সিপিআই(এম) সমর্থকরা মমতা ব্যানার্জীর গাড়ি লক্ষ্য করে পাথর ছুড়বে গুলি চালাবে এটা গাঁজাখুরি গল্প হয়ে গেল না সুমনবাবু?
তৃতীয় ঘটনা, ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে মমতা ব্যানার্জী যখন সুমন দে সহ একদল সাংবাদিককে নিয়ে সিঙ্গুর যাচ্ছিলেন তখন রাস্তায় শতাধিক সিপিআই(এম) সমর্থক মমতার গাড়ি ঘিরে তার বিরুদ্ধে শ্লোগান দিতে থাকে। মমতা সাংবাদিকদের নিয়ে সিঙ্গুরে কী দেখাতে নিয়ে যাচ্ছিলেন বুঝতে পারলাম না! আসলে সাংবাদিকদের সামনে তৃণমূলের সমর্থকদের দিয়ে এই ঘটনা ঘটিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জী নিজেই আর ঘটনার সাক্ষী রেখেছিলেন তার অনুগ্রহ পুষ্ট সাংবাদিকদের।
মমতা ব্যানার্জী সারা জীবন ধরে যা করে এসেছেন এবং এখনও করছেন তা হলো মিথ্যা ঘটনা ঘটিয়ে নিজের ইমেজ তৈরি করা, সংবাদের শিরোনামে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।
বারবার এ রকম মিথ্যা ঘটনা ঘটিয়েই মমতা ব্যানার্জী আজ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন।
প্রকাশ: ০৭-আগস্ট-২০২৫
শেষ এডিট:: 07-Aug-25 08:29 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/‘i-am-not-what-i-am’-the-wb-story
Categories: Campaigns & Struggle
Tags: #chortmc, #tmcjungleraj, media
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (165)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (150)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (81)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)
সাম্প্রতিক পোস্ট / Latest Posts
সোহরাওয়ার্দী এভিনিউ-এর নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত ইতিহাস বিকৃতির বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত
- সিপিআই(এম) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
আমরা করব জয় নিশ্চয়
- সূর্যকান্ত মিশ্র
বিজেপি’র ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ — সম্পূর্ণতই ভুল এবং অনৈতিক
- সুজন চক্রবর্তী
কাদা-মাটির স্বপ্ন ভাঙছে ডলারের বাজারে
- শমীক লাহিড়ী
হিন্দুত্ববাদী অর্থনীতিতে হিন্দুদের কী লাভ? (প্রথম পর্ব)
- শমীক লাহিড়ী





