খনিজ সম্পদ ও সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে আরও একপ্রস্থ আলোচনা

জবাব দিয়েছিলেন হ্যারি ম্যাগডফ তাঁর “The Age of Imperialism” বইয়ে। তিনি গুরুত্বপূর্ণভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে, ব্যবহার-মূল্য (use-value) হিসেবে কাঁচামাল ছাড়া কোনো উৎপাদনই সম্ভব নয় - এবং সেটা সত্য, এমনকি যদি এই কাঁচামালের বিনিময়-মূল্য (exchange value) উৎপাদিত পণ্যের মোট বিনিময়-মূল্যের তুলনায় একেবারেই নগণ্য হয়।

বিশ্বে শিল্প পুঁজিবাদের সূচনা করেছিল শিল্পবিপ্লব, যা ব্রিটেনে শুরু হয়েছিল সুতি বস্ত্রশিল্পের মাধ্যমে; কিন্তু ব্রিটেন বা উত্তর ইউরোপের অন্য কোনো দেশেই এক ফোঁটা কাঁচা তুলার চাষ হতো না। অর্থাৎ, শিল্পপুঁজিবাদের উদ্ভবই নির্ভর করেছিল মেট্রোপলিটন দেশগুলোর জন্য বিশ্বের যেখানেই হোক না কেন, কাঁচামালের নিয়মিত/স্থায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর। এই অবস্থা আজও একবিন্দুও পরিবর্তিত হয়নি। সময়ের সাথে মেট্রোপলিটন পুঁজিবাদের উৎপাদনের ধরণ বদলেছে, নতুন পণ্য, পুরোনো পণ্যগুলিকে প্রতিস্থাপন করেছে; আর সেইসাথে প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সংমিশ্রণও বদলেছে। কিন্তু এসব কাঁচামালের একটি বড় অংশ এখনও মেট্রোপলিটন পুঁজিবাদের আওতাভুক্ত নয়, এবং এগুলোর নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করতেই মেট্রোপলিটন পুঁজিবাদকে বাইরের বিশ্বের ওপর সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে বাধ্য হতে হয়।
প্রথাগত বুর্জোয়া অর্থনীতি দাবি করে যে এই সরবরাহ মেট্রোপলিটন দেশগুলোতে পৌঁছায় সাধারণ পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে। অর্থাৎ, ধরে নেওয়া হয় যে এই কাঁচামালগুলো ইতিমধ্যেই পণ্য হিসেবে উৎপাদিত হচ্ছে; এবং চাহিদা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে এগুলোর সরবরাহ নিশ্চিত হয় মূল্যের ওঠানামার মাধ্যমে, যার ফলে সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণের কোনো প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু এই যুক্তি ধরে নেয় যে সমস্ত কাঁচামালের উৎপাদন ইতিমধ্যেই পুঁজিবাদী শর্তে পরিচালিত হচ্ছে, সম্ভবত মেট্রোপলিটন কাঁচামাল কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে। অর্থাৎ, এই যুক্তি আসলে দাবি করে যে সাম্রাজ্যবাদ ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে বিরাজ করছে, তাই সাম্রাজ্যবাদের আর কোনো প্রয়োজন নেই। অন্যভাবে বললে, এই দাবী, মনে করে যে মেট্রোপলিটন ও ‘বাইরের বিশ্ব’-এর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, কারণ ‘বাইরের বিশ্ব’ ইতিমধ্যেই মেট্রোপলিটন দ্বারা গ্রাস ও আত্তীকৃত হয়েছে। এখানে বিড়ম্বনা হল এই যে, ‘বুর্জোয়া অর্থনীতি সাম্রাজ্যবাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে গিয়েই ধরে নেয় যে সাম্রাজ্যবাদ ইতিমধ্যেই সর্বত্র বিরাজমান’!
বুর্জোয়া অর্থনীতির আরেকটি যুক্তি হলো - মেট্রোপলিটন উৎপাদনের মোট মূল্যের তুলনায় ‘বাইরের বিশ্ব’ থেকে আসা কাঁচামালের অংশ অতি নগণ্য। তাই, তারা বলে, এত অল্প পরিমাণ কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত করতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা মেট্রোপলিটন পুঁজিবাদের পক্ষে অর্থহীন।
এই দাবির জবাব দিয়েছিলেন হ্যারি ম্যাগডফ তাঁর “The Age of Imperialism” বইয়ে। তিনি গুরুত্বপূর্ণভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে, ব্যবহার-মূল্য (use-value) হিসেবে কাঁচামাল ছাড়া কোনো উৎপাদনই সম্ভব নয় - এবং সেটা সত্য, এমনকি যদি এই কাঁচামালের বিনিময়-মূল্য (exchange value) উৎপাদিত পণ্যের মোট বিনিময়-মূল্যের তুলনায় একেবারেই নগণ্য হয়। যেহেতু বিনিময়-মূল্য সমাজ দ্বারা নির্ধারিত, তাই মেট্রোপলিটন পুঁজির ক্ষমতার কারণে কাঁচামালের বিনিময়-মূল্য শূন্যের কাছাকাছিও নামিয়ে আনা সম্ভব; কিন্তু উৎপাদনের জন্য কাঁচামালের ভৌত ব্যবহার (physical use) প্রাকৃতিকভাবে নির্ধারিত, এবং কোনওমতেই বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। আর এই ভৌত কাঁচামাল ‘বাইরের বিশ্ব’ থেকে পাওয়া মেট্রোপলিটন পুঁজিবাদের জন্য একান্ত অপরিহার্য। তাই, কাঁচামালের বিনিময়-মূল্য কম বলে এগুলোর উৎপাদনগত গুরুত্ব নগণ্য ধরে নেওয়া, বা এগুলোর উৎসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে গৌণ মনে করা, এক মারাত্মক ভুল।
কৃষিজাত কাঁচামাল ও খাদ্যশস্য উভয়ই মেট্রোপলিটন পুঁজিবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এবং সে কারণেই এটি বিশ্বজুড়ে জমির ব্যবহারের ধরণ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, যাতে তার নিজের ও তার অধিবাসীদের চাহিদা পূরণ হয়। তবে এখানে আমরা শুধু খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রটির ওপর আলোকপাত করব। সম্প্রতি আমেরিকার ‘বিরল ধাতু’[1] (rare earths) সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা থেকে মেট্রোপলিটন পুঁজিবাদের ‘বাইরের বিশ্ব’-এর খনিজ আমদানির ওপর নির্ভরতার গুরুত্ব ফুটে উঠেছে। ট্রাম্প যখন চীন থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর হুমকি দেন, তখন চীন সরকার কিছু ‘বিরল ধাতুর’ আমেরিকায় রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিরল মৃত্তিকা ধাতুর উৎপাদক, মোট বিশ্ব উৎপাদনের প্রায় ৭০% এর জোগানদাতা, এবং বিরল ধাতুর প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতার দিক থেকে তাদের অংশ প্রায় ৯০%। তাই, চীনের রপ্তানি বন্ধের ফলে আমেরিকা একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। শুধু চীন থেকেই নয়, অন্য কোনো দেশ থেকেও তারা চীনের জোগান প্রতিস্থাপন করতে পারে না, কারণ চীনের উৎপাদন ক্ষমতার পরিমাণের কাছাকাছি কেউই নেই। ফলে, আমেরিকাকে চীনের সাথে শুল্ক সংক্রান্ত আলোচনায় বসতে হয়, যাতে চীন আবার বিরল মৃত্তিকা ধাতুর সরবরাহ চালু করে।
কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো - ২০২৪ সালে আমেরিকায় আমদানিকৃত বিরল মৃত্তিকা ধাতুর মোট মূল্য ছিল মাত্র ১৭০ মিলিয়ন ডলার। ওই বছর আমেরিকার মোট আমদানির পরিমাণ ছিল ৪.১১ ট্রিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ বিরল মৃত্তিকা ধাতুর আমদানির অংশ ছিল মাত্র ০.০০৪%! ব্যবহার-মূল্য ও বিনিময়-মূল্যের মধ্যে পার্থক্য এর চেয়ে স্পষ্ট হতে পারে না - এমন কিছু খনিজ উপাদান, যা আমদানির মাত্র ০.০০৪% হলেও ইলেকট্রনিক্স থেকে অটোমোটিভ, উইন্ড টারবাইন, উচ্চক্ষমতা চুম্বক, চিকিৎসা সরঞ্জাম - এমন অসংখ্য শিল্পের জন্য এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, এগুলোর সরবরাহ সাময়িক বিঘ্নিত হলেও তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই উদাহরণ থেকে সাম্রাজ্যবাদী সম্প্রসারণের জন্য অনুপ্রেরণাটিও স্পষ্ট হয়ে যায়। চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে আমেরিকা গ্রীনল্যান্ডের মতো বিকল্প উৎস খুঁজছে। অবশ্য গ্রীনল্যান্ডে আমেরিকার আগ্রহ শুধু বিরল মৃত্তিকা ধাতুর জন্য নয়, আরও নানা খনিজ সম্পদের জন্য; কিন্তু চীনের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় এই সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতা আরও জোরদার হয়েছে। যদিও চীনের কাছে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক বিরল মৃত্তিকা ধাতুর মজুদ থাকায়, বিকল্প উৎস কখনওই চীনকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারবে না; তবু এই ঘটনা থেকে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদের একটি মুখ্য প্রেরণা স্পষ্ট হয়।
নিশ্চিতভাবে, এটাই একমাত্র প্রেরণা নয়। রোজা লুক্সেমবার্গ সঠিকভাবেই সাম্রাজ্যবাদের বাজার-সংক্রান্ত প্রেরণার ওপর জোর দিয়েছিলেন - মেট্রোপলিটন পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত পুঁজি সঞ্চয়ের জন্য বাইরের প্রাক-পুঁজিবাদী বাজারে অনুপ্রবেশ করা অপরিহার্য, এবং সে জন্যই এই বাইরের অঞ্চলগুলোর ওপর সাম্রাজ্যবাদী দখলদারি কিন্তু যদিও পুঁজিবাদী খাতের জন্য বাহ্যিক উদ্দীপনা কল্পনা করা সম্ভব, যেমন প্রাক-পুঁজিবাদী বাজার ছাড়াও অন্যান্য উৎস -যেমন এই উৎপাদন পদ্ধতির মধ্যেই অবস্থিত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের চাহিদা (যদিও বিশ্বায়নের যুগে এই বিকল্প উদ্দীপনার গুরুত্ব হ্রাস পায়), তবুও মহানগরীভিত্তিক পুঁজিবাদের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত কাঁচামালের বিকল্প উৎস মহানগরীভিত্তিক পুঁজিবাদের নিজস্ব কাঠামোর মধ্যে থাকা সম্ভব নয়। তাই খনিজ সহ বিভিন্ন কাঁচামালের সন্ধান পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদের একটি স্থায়ী উদ্দীপনা হিসেবে কাজ করে।
এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে, উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর দ্বারা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে তীব্র সংঘাত তখনই শুরু হয়েছিল, যখন তারা রাজনৈতিক ডি-কলোনাইজেশনের পর অর্থনৈতিক ডিকলোনাইজেশন অর্জনের জন্য তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষত খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল। ইরানে মোসাদ্দেগ, গুয়াতেমালায় আরবেঞ্জ, চিলিতে আলেন্দে এবং কঙ্গোতে লুমুম্বার বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা সংঘটিত অভ্যুত্থানগুলো এই নেতাদের নিজ দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষত খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার সাথে জড়িত ছিল।
গ্লোবাল সাউথের ওপর নিওলিবারেল শাসন চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে, যার ফলে বহু ক্ষেত্রে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আবার মেট্রোপলিটন পুঁজির হাতে চলে যায়, একটি স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি কিছুটা হলেও অভ্যুত্থানের প্রয়োজনীয়তা কমিয়েছিল; এখন সরকার পরিবর্তনের বদলে এই দেশগুলোর ওপর কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাগুলোই সেই ভূমিকা পালন করতে শুরু করে। কিন্তু নিওলিবারেল ব্যবস্থা এখন সংকটে পড়েছে, এবং এই সংকট মোকাবেলায় আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদ “প্রতিবেশীর ক্ষতিসাধন করে নিজের উন্নয়ন করো” (অন্য দেশগুলোর, বিশেষত গ্লোবাল সাউথের ক্ষতি করে নিজের লাভ নিশ্চিত করা) নীতি চাপিয়ে দিচ্ছে, ফলে পরিস্থিতি আবার বদলাচ্ছে। এই নতুন পরিস্থিতিতে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রাম আরও শক্তিশালী হবে; এবং তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষত খনিজ সম্পদের ওপর পুনঃনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আগামী দিনগুলোতে আরও জোরদার হবে। এইভাবে, পুঁজিবাদের সংকট সাম্রাজ্যবাদকে আরও দুর্বল করছে, এবং তাই সাম্রাজ্যবাদ আরও নির্মম হয়ে উঠছে।
পিপলস ডেমোক্রেসী পত্রিকায় ২১-২৭ জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত
ভাষান্তরঃ অঞ্জন মুখোপাধ্যায়
[1] বিরল মৃত্তিকা ধাতু (Rare Earth Metals) বলতে বোঝায় সেইসব ধাতু বা মৌল যাদের পৃথিবীর ভূত্বকে (Earth's crust) স্বাভাবিকভাবে প্রাপ্তির পরিমাণ খুবই কম। এই ধাতুগুলি পর্যায় সারণীর ল্যান্থানাইড সিরিজের অন্তর্ভুক্ত, এবং এদের সাথে স্ক্যান্ডিয়াম (Sc) ও ইট্রিয়াম (Y) যোগ করে মোট ১৭টি মৌলকে বিরল মৃত্তিকা ধাতু হিসেবে ধরা হয়।
প্রকাশ: ২৪-আগস্ট-২০২৫
শেষ এডিট:: 22-Aug-25 11:37 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/once-more-on-minerals-and-imperialism
Categories: International
Tags: economic downslide, economy, freemarketeconomy, imperialism, neofascism, neo-liberalism
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (159)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (144)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (80)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)





