নবজীবনের পথে (২য় পর্ব)

Author
আব্দুল হালিম

বেকার অবস্থায় আমি কিছুতেই মন স্থির করিতে পারিতেছিলাম না। অর্থ সম্বলও আমার ছিল না। অনাহারে আর কতদিনই বা কাটাইব? একটি ছাত্র পড়াইবার কাজ যোগাড় করিয়া লইলাম; কিন্তু কিছুদিন পরই সে কাজও গেল। কিছুদিন রাস্তায় রাস্তায় বই ফেরি করিয়া কাটাইলাম।

On the Path to a New Life (Part II)
(শ্রমজীবী থেকে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজে যুক্ত হওয়ার ইতিহাস)

২য় পর্ব


ভূমিকাঃ কমরেড আব্দুল হালিম স্বাধীনতা পূর্ব বাংলা তথা ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার অন্যতম ব্যক্তিত্ব। গ্রামের স্কুলে পাঠ অসমাপ্ত রেখেই তরুণ বয়সে চাকরীর সন্ধানে কলকাতায় আসেন। জাহাজ কোম্পানিতে ঠিকা শ্রমিকের কাজ পান। সেভাবেই শ্রমজীবীদের জীবন-সংগ্রামের উপলব্ধি, দেশের পরিস্থিতি, লড়াই আন্দোলনের আঁচ তাঁকে কাছে টেনে নিয়েছিল, সেভাবেই ক্রমশ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। পরিচিত হন মুজফফর আহমদের সঙ্গে, হয়ে ওঠেন তাঁর একান্ত সহযোগী। বাংলা ক্যালেন্ডারের হিসাবে ১৩৯১ সালে, মুখপত্র পত্রিকার শারদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা দীর্ঘ প্রবন্ধ ‘নবজীবনের পথে’। সেই প্রবন্ধই চার পর্বে প্রকাশিত হল। শিরোনামের সঙ্গে বন্ধনীর মধ্যে লেখা ‘শ্রমজীবী থেকে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজে যুক্ত হওয়ার ইতিহাস’ ওয়েবডেস্কের তরফে সংযোজন। যে উপলব্ধির প্রভাবে তিনি নিজের পথচলাকে ‘নবজীবনের পথে’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন, কমিউনিস্ট হয়ে ওঠার সংগ্রামে সেই শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক। মূল লেখার বানানই যতদূর সম্ভব বজায় রাখা হয়েছে।

এখানে আমার ব্যক্তিগত জীবনের ইতিহাস আলোচনা না করিয়া, কিভাবে আমি শ্রমিক আন্দোলনের দিকে ঝুঁকিয়া পড়িলাম এবং ক্রমশ কমিউনিস্ট আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করিলাম, কেবল সেই কথাই লিপিবদ্ধ করিতে প্রয়াস পাইব। ১৯২২ সালের বসন্তকালে আমি জেল হইতে ছাড়া পাইলাম। ইতিমধ্যেই চৌরিচৌরার কৃষক বিদ্রোহের পর গান্ধীজী আইন অমান্য আন্দোলন প্রত্যাহার করিয়া লইয়াছিলেন। কংগ্রেস-আন্দোলনের গতি থামিয়া গিয়াছিল। চৌরি-চৌরাতে পুলিস-হত্যার অপরাধে ১৭২ জন কৃষকের প্রতি ফাঁসির হুকুম হইয়াছিল এবং আপীলে ৫৩ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল ছিল। এই ঘটনার পর এবং এক বৎসরে 'স্বরাজের' আশা ধূলিসাৎ হওয়ায় জন-সাধারণের ন্যায় আমার মনেও হতাশা জাগিয়াছিল। জেল হইতে বাহির হইয়া পুনরায় গোলামী করিতে আমার প্রবৃত্তি হইল না। দেশের জন্য কাজ করাই ঠিক করিয়া ফেলিলাম; কিন্তু প্রকৃত পথের সন্ধান খুঁজিয়া পাইলাম না। এই সময়ে কয়েকজন 'সন্ত্রাসবাদী' নেতার সহিতও আমার পরিচয় হইয়াছিল। কিন্তু 'সন্ত্রাসবাদী'দের পথে ভারতের স্বাধীনতা আসিবে এ-বিশ্বাস আমার ছিল না; তবুও দেশের জন্য কাজ করিবার প্রবল আগ্রহ লইয়া আমি অনেক রাজনৈতিক কর্মীর সংস্পর্শে আসি। বেকার অবস্থায় আমি কিছুতেই মন স্থির করিতে পারিতেছিলাম না। অর্থ সম্বলও আমার ছিল না। অনাহারে আর কতদিনই বা কাটাইব? একটি ছাত্র পড়াইবার কাজ যোগাড় করিয়া লইলাম; কিন্তু কিছুদিন পরই সে কাজও গেল। কিছুদিন রাস্তায় রাস্তায় বই ফেরি করিয়া কাটাইলাম। নূর মোহাম্মদ লেনের 'এলবিয়ন প্রেস'-এর জনৈক ভদ্রলোকের সহিত আমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা শামসুদ্দীন হোসেনের পরিচয় ছিল। তিনি সেখানে ফেরি করার জন্য বইয়ের ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছিলেন। হোটেলে-মেসে ঘুরিয়া ঘুরিয়া ফেরির কাজে অন্নসংস্থানে বিশেষ সুবিধা হইল না। অগত্যা তাহা ছাড়িয়া দিয়া ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলে চাকুরির চেষ্টা করিতে লাগিলাম, কিন্তু সে চেষ্টাও ব্যর্থ হইল। এই সময়ে দারুণ দুরবস্থার মধ্যে পড়িয়া-ছিলাম। থাকা খাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না, তাই বাধ্য হইয়া কলিকাতা ত্যাগ করিয়া বীরভূম জেলার সিউড়ীতে গিয়া কিছুকাল কংগ্রেস অফিসে ও গ্রামে গ্রামে ঘুরিয়া কাটাইলাম। কিন্তু কিছুতেই প্রকৃত মুক্তিপথের সন্ধান পাইলাম না।

দোদুল্যমান চিত্তে পুনরায় জুন-জুলাই মাসে কলিকাতা আসিলাম। এই সময় আমি ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রীটে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির পত্রিকার অফিসে প্রায়ই যাইতাম। সাহিত্য সম্পর্কে পড়া-শুনা ও জানিবার আগ্রহও প্রবল ছিল। শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী সম্পাদিত 'সার্ভেন্ট' পত্রিকা আমি নিয়মিত পড়িতাম। তাহা ছাড়া 'ভারতবর্ষ', 'বিজলী', 'আত্মশক্তি' প্রভৃতি মাসিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকাও নিয়মিত পড়িতাম। তাহার ফলে আমার দৃষ্টিভঙ্গিও প্রসারিত হইয়াছিল। কিন্তু ভারতের জনসাধারণের প্রকৃত মুক্তি কোন্ পথে আসিবে তাহার স্পষ্ট ইঙ্গিত তখনও পাই নাই। এইভাবে ভবঘুরে জীবন লইয়া আমার দিন অতিবাহিত হইতে লাগিল। জীবিকারও আমি কোনো সুরাহা করিতে পারিলাম না, মুক্তিপথও দুরধিগম্য মনে হইতে লাগিল। চাকুরির সন্ধানে এবং দেশসেবার প্রবল ইচ্ছা লইয়া যত্রতত্র ঘুরিতাম; কিন্তু পুনরায় কংগ্রেসে ফিরিয়া কাজ করিবার প্রবৃত্তি হইল না।

তদুপরি গান্ধীজী পরিচালিত অহিংসা নীতিতে আস্থা রাখিতে পারিলাম না। গান্ধীজীর সূতা-কাটা, খদ্দর-পরিধান ও অহিংস অসহ-যোগের পথে ভারতের দরিদ্র কৃষক-শ্রমিকদের যে স্বাধীনতা লাভহইবে না সে-সম্বন্ধে আমার দৃঢ় প্রত্যয় হইয়াছিল। জীবনের এই। যুগসন্ধিক্ষণে আমি বিভ্রান্ত চিত্তে মুক্তির পথ খুঁজিতে লাগিলাম। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির পাঠাগারে কমরেড মুজফ্ফর আহ্ মদকে দেখিতাম। একদিন তিনি ডাকিয়া আমার সহিত কথা বলিলেন। তাঁর সঙ্গে এইভাবে কথাবার্তা চলিতে লাগিল। আমার ব্যক্তিগত অবস্থা ও রাজনীতি সম্বন্ধে অনেক আলাপ হইল। তাঁহার সহিত আলাপে আমি অত্যন্ত মুগ্ধ হইলাম এবং ঐদিন হইতেই আমার ভবিষ্যুৎ চলার পথ ও রাজনীতি চিরকালের জন্য স্থির হইয়া গেল। কমরেড মুজফ্ফরের থাকা খাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট স্থান ছিল না। মণ্ডলভী ফজলুল হক সাহেব কর্তৃক পরিচালিত ‘দৈনিক নবযুগ’ পত্রিকা ইতিপূর্বে উঠিয়া গিয়াছিল। কমরেড মুজফ্ফর আহমদ একদিন আমাকে প্রতাপ চ্যাটার্জী লেনে নজরুল ইসলামের ‘ধূমকেতু’ অফিসে লইয়া গিয়া নজরুলের সামনে উপস্থিত করিলেন। নজরুলের সহিত আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় ও বন্ধুত্বের সূত্রপাত হইল সেইদিন হইতে।

আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের সহিত সংশ্লিষ্ট এই সন্দেহে গোয়েন্দা পুলিস সারাক্ষণ কমরেড মুজফ্ফরকে অনুসরণ করিত। বিদেশ হইতে ‘ভ্যানগার্ড’, ‘অ্যাডভান্সগার্ড’ ও মানবেন্দ্রনাথ রায়ের রচিত বইগুলি গোপনে দেশে আসিত। তাহা ছাড়া, ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রেস করেস্পনডেন্স’, ‘লেবর মন্থলী’ এবং রুশ-বিপ্লবের ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকখানি পুস্তকও এদেশে আমদানী হইয়াছিল। তাহার মধ্যে ‘দি রাশিয়ান রেভোলিউশন’ এবং বিখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক জন রীডের ‘টেন ভেজ, দ্যাট শুক দি ওয়ার্ল্ড’ বই দুইখানিতে নভেম্বর-বিপ্লবের চমকপ্রদ কাহিনী বর্ণিত হইয়াছিল। মার্কস্-এঙ্গেলস্এর বিখ্যাত ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ এবং লেনিনের লেখা বইও কিছু কিছু আমদানী হইয়াছিল। মার্কসবাদী সাহিত্য প্রচারের মারফত ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টির তাত্ত্বিক বনিয়াদ গঠনের সম্ভাবনা তখন হইতেই শুরু হইল।

 


প্রকাশ: ০৯-আগস্ট-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 08-Aug-26 10:18 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/on-the-path-to-a-new-life-part-ii
Categories: Fact & Figures
Tags:
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড