শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়: হিন্দুত্বের মহান প্রতীক, যিনি মুসলিম লিগ এবং ইংরেজ শাসকদের সঙ্গে আঁতাঁত করেছিলেন

Author
শামসুল ইসলাম

হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠন হিন্দু মহাসভা ও আরএসএস এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদী সংগঠন মুসলিম লিগ যে শুধুমাত্র ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’ বয়কট করেছিল তা-ই নয়, ইংরেজ শাসকদের অত্যাচারমূলক অভিযানকে সমর্থন করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা।

Shyama Prasad Mukherjee: The Great Symbol of Hindutva, Who Formed an Alliance with the Muslim League and the British Rulers

হিন্দুত্ব বাহিনী ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে একজন মহান জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক হিসেবে দেখাতে চায়, যিনি দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। মোদি বলেছেন, তিনি ছিলেন একজন রাষ্ট্রনেতা, চিন্তাবিদ এবং দেশপ্রেমিক, যিনি ভারতীয় অখণ্ডতাকে শক্তিশালী করে তোলার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। এমনকী আরএসএস ও হিন্দু মহাসভার সংগ্রহশালাতেও যে-সব সাম্প্রতিক নথিপত্র পাওয়া যাচ্ছে, তার আলোয় ড. মুখোপাধ্যায়ের দেশপ্রেম সম্বন্ধে হিন্দুত্ববাদী বিবৃতিগুলি নতুনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এইসব নথিপত্র খুঁটিয়ে দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় একজন ‘নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক’ এবং জন্ম থেকেই মহান দেশপ্রেমিক ছিলেন-এই কথাগুলো একেবারে নির্জলা মিথ্যা। ড. মুখোপাধ্যায় কখনোই ঔপনিবেশিকতাবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেননি। দেশপ্রেম বলতে যদি স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করা এবং বহু কিছু ত্যাগ করা বোঝায়, তাহলে বলতে হয় ড. মুখোপাধ্যায় যে শুধুমাত্র তা থেকে দূরে ছিলেন তা-ই নয়, ইংরেজবিরোধী মুক্তি আন্দোলন ভেঙে দেওয়া এবং সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে তার মেরুকরণ ঘটানোর জন্য ইংরেজ শাসক ও মুসলিম লিগের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সেই আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন।


প্রাক্-স্বাধীনতা পর্বে ভি.ডি. সাভারকরের নেতৃত্বাধীন হিন্দু মহাসভার একজন বিশিষ্ট নেতা ছিলেন তিনি। ১৯৪২ সালে ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’ শুরু করে ইংরেজদের ভারত ছেড়ে চলে দেওয়ার ডাক দেয় কংগ্রেস, তার উত্তরে এই গণ-আন্দোলনের ওপর বিপুল সন্ত্রাস নামিয়ে আনে ইংরেজ শাসকরা। কংগ্রেসকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়, কংগ্রেস পরিচালিত প্রাদেশিক সরকারগুলি ভেঙে দেওয়া হয়, সমগ্র ভারতবর্ষ একটা জেলখানায় পরিণত হয় এবং ইংরেজ ও দেশীয় শাসকদের সশস্ত্র বাহিনীর অত্যাচারে হাজার হাজার মানুষ নিহত হন। যাঁরা নিহত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেরই অপরাধ ছিল এই যে, তাঁরা একটা তেরঙা পতাকা বহন করছিলেন। হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠন হিন্দু মহাসভা ও আরএসএস এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদী সংগঠন মুসলিম লিগ যে শুধুমাত্র ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’ বয়কট করেছিল তা-ই নয়, ইংরেজ শাসকদের অত্যাচারমূলক অভিযানকে সমর্থন করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা।


১৯৪২ সালে কানপুরে হিন্দু মহাসভার ২৪তম অধিবেশনে প্রদত্ত সভাপতির ভাষণে হিন্দু মহাসভার সভাপতি ‘বীর’ সাভারকর মুসলিম লিগের সঙ্গে হিন্দু মহাসভার এই গাঁটছড়া বাঁধার কথা উল্লেখ করেন। এই বিস্ময়কর স্বীকারোক্তিটি বইয়ের শেষ পরিচ্ছেদে উল্লেখিত হয়েছে। ইংরেজদের সঙ্গে সহযোগিতা করার ব্যাপারে হিন্দু মহাসভার নির্দেশিকা অনুসরণ করে হিন্দুত্বের মহান প্রতীক ড. মুখোপাধ্যায় ১৯৪২ সালের ২৬ জুলাই তারিখের একটি চিঠিতে ইংরেজদের আশ্বস্ত করেন। ওই চিঠিতে তিনি লেখেন, “কংগ্রেস যে বিস্তৃত আন্দোলন শুরু করেছে, তার ফলস্বরূপ এই প্রদেশে কী পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, সে-ব্যাপারে কিছু বলতে চাই। যুদ্ধ চলাকালীন কেউ যদি মানুষকে উত্তেজিত করে তোলার চেষ্টা করে এবং তার ফলে যদি অভ্যন্তরীণ গোলযোগ বা নিরাপত্তাহীনতা দেখা দেয়, তাহলে যে-সরকার তখন ক্ষমতায় থাকবে সে অবশ্যই তাকে প্রতিরোধ করবে।”


হিন্দু মহাসভার সহযোগী ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলা সরকারের (যে-মন্ত্রিসভার উপ-মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়) গভর্নরের কাছে লেখা চিঠিতে ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’ বন্ধ করার সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, “প্রশ্নটা হল, বাংলায় কীভাবে এই আন্দোলনের (ভারত ছাড়ো) মোকাবিলা করা হবে? প্রদেশের প্রশাসন এমনভাবে চালাতে হবে যাতে কংগ্রেসের হাজারো চেষ্টা সত্ত্বেও এই আন্দোলন এই প্রদেশে দানা বাঁধতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে আমরা, বিশেষত দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা, মানুষকে বলতে পারব যে-স্বাধীনতার জন্য কংগ্রেস এই আন্দোলন শুরু করেছে, তা ইতিমধ্যেই জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে চলে এসেছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে জরুরি অবস্থায় এটি কিছুটা সীমাবদ্ধ হতে পারে। ভারতীয়দের উচিত ইংরেজদের ওপর আস্থা রাখা-ব্রিটেনের স্বার্থে নয়, ইংরেজদের অন্য কোনও সুবিধে পাইয়ে দেওয়ার জন্যও নয়, বরং প্রদেশের প্রতিরক্ষা ও স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্য। গভর্নর হিসেবে আপনি প্রদেশের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে কাজ করবেন এবং সম্পূর্ণভাবে আপনার মন্ত্রীদের পরামর্শ মেনে চলবেন।”


বিশিষ্ট ঐতিহাসিক আর.সি. মজুমদারকেও হিন্দুত্ব বাহিনী একজন 'হিন্দু' ঐতিহাসিক মনে করে। এই চিঠি সম্বন্ধে তিনি লিখেছেন, “কংগ্রেস কর্তৃক সংগঠিত গণ-আন্দোলনের আলোচনা করে চিঠিটা শেষ করেছেন শ্যামাপ্রসাদ। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে যুদ্ধ চলাকালীন জনতার অনুভূতিকে উত্তেজিত করে তুলে এই আন্দোলন অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে তুলবে। সেইসঙ্গেই তিনি জানান যে, ক্ষমতাসীন যে-কোনও সরকারের এই আন্দোলনকে দমন করা উচিত, তবে তাঁর মতে সে-কাজ শুধুমাত্র শাস্তি দিয়ে করা যাবে না।... এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য কী কী পদক্ষেপ করা উচিত, চিঠিতে এক-এক করে তা উল্লেখ করেন তিনি।”


প্রকাশ: ০৮-আগস্ট-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 08-Aug-26 09:31 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/shyama-prasad-mukherjee-the-great-symbol-of-hindutva-who-formed-an-alliance-with-the-muslim-league-and-the-british-rulers
Categories: Fact & Figures
Tags:
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড