অর্থনীতি যখন সাম্রাজ্যবাদের আরও এক কৌশল (পর্ব ২)

১৯৩০-এর দশকে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতিতে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছিল। এই সংকটের প্রক্রিয়া, দীর্ঘ মেয়াদে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আগ্রহ বাড়ায়, রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। আবার, এই সময় থেকেই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উত্থান ঘটে। ফ্যাসিস্ত-বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রভাবও ছিল।

ইউরোপের বণিকদের যোড়শ শতক থেকেই নজর ছিল – মসলার দ্বীপ – ইন্দোনেশিয়ার উপর। ঔপনিবেশিক যুগের সময়ে, ইন্দোনেশিয়া ছিল আমেরিকার চেয়েও অনেক বেশি সম্পদশালী এক সমৃদ্ধ রাজত্ব। স্প্যানিশ, ডাচ, পর্তুগিজ এবং ব্রিটিশ, সকলেরই নজর ছিল। অবশেষে ইন্দোনেশিয়া’কে দখল করে নেদারল্যান্ডস। ডাচ উপনিবেশবাদীরা ছিল নির্মম। ইন্দোনেশিয়া থেকে লুণ্ঠিত ধনসম্পদ ছিল ডাচ সামাজিক পুঁজির একটি বড় অংশ। ইন্দোনেশিয়ার জনগণের জীবনযাত্রার মান খারাপ হচ্ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগেই জাভায় বিদ্রোহের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল।
ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সুকর্ন; জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯২৭ সালে ইন্দোনেশিয়ান ন্যাশনাল পার্টি (পিএনআই) এর প্রতিষ্ঠা, নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে পূর্ণ স্বাধীনতার প্রকাশ্য দাবি। সুকর্নের আকর্ষণীয় নেতৃত্ব এবং শক্তিশালী বক্তৃতা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে প্রেরণা জুগিয়েছিল। ১৯৩০ এর দশকে, সুকর্ন গ্রেপ্তার হন ডাচ কর্তৃপক্ষের হাতে; তার জনপ্রিয়তা এবং প্রভাব আরো বাড়ে। এরপর জাপান আক্রমণ চালিয়ে ডাচদের পরাস্ত করে ১৯৪২ সালে।
১৯৪৫ সালের ১৭ আগস্ট জাপানের আত্মসমর্পণের পর, সুকর্ন, ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। চার বছর পরে, ১৯৪৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর, ডাচরা আনুষ্ঠানিকভাবে সার্বভৌমত্ব হস্তান্তর করে। সুকর্ন ইন্দোনেশিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তার প্রেসিডেন্সির সময়কাল জুড়ে দেশের সার্বভৌমত্ব জোরদার করার প্রচেষ্টা ছিল, ডাচ-অধিকৃত ব্যবসাগুলির জাতীয়করণ এবং একটি ঐক্যবদ্ধ ইন্দোনেশিয় পরিচয় প্রচার তার প্রধান উদ্যোগ ছিল।
তবে, ডাচদের হারানোর চেয়ে ইন্দোনেশিয়া শাসন করা ছিল আরো কঠিন কাজ। ১৭,৫০০টিরও বেশি দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই দ্বীপপুঞ্জ ছিল বিভিন্ন উপজাতি, ভিন্ন সংস্কৃতি, শতাধিক ভাষা এবং উপভাষার মিশ্রণে পরিপূর্ণ, যেখানে জাতিগত গোষ্ঠীগুলির মধ্যে ছিল শতাব্দী-প্রাচীন বিদ্বেষ। প্রায়শই নির্মম সংঘর্ষ লেগে থাকত।
ইন্দোনেশীয় কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সুকর্নের সম্পর্কটি জটিল ছিল। অনেকে মনে করেন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে ঘনিষ্ঠতাই সুকর্নের পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার কারণ। এইরকম আলোচনা শুধুমাত্র ১৯৬৫ সালের ট্র্যাজেডির সরলীকরণ এবং ঘটনাটির নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের প্রচেষ্টাকে বাধা দেয়। সুকর্ন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে ঘনিষ্ঠ ছিলেন অনেকটা নিজের প্রয়োজনে। সুকর্নের নিজের দল, পিএনআই-এর সংগঠন ছিল দুর্বল। এছাড়া, সেনাবাহিনীর শক্তির সাথে ভারসাম্য বজায় রাখতেও সুকর্নর প্রয়োজন ছিল কমিউনিস্ট পার্টির জোরালো সংগঠন।
সুকর্নর মালয়েশিয়া দখলের অভিযান নিয়ে সেনাবাহিনী বিভক্ত ছিল। একটি অংশ অভিযানের বিরুদ্ধে ছিল কারণ তারা মালয়শিয়াকে, ব্রিটিশদের সহায়তার কারণে, বেশি শক্তিশালী মনে করত। তাদের ধারণা ছিল, হেরে গেলে, তা কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে লাভজনক হবে। অন্য পক্ষটি সুকর্নর মালয়েশিয়া আক্রমণের পরিকল্পনাকে সমর্থন করত।
১৯১১ সালে দেশে জাতীয় পর্যায়ে প্রথম গণরাজনৈতিক আন্দোলন, সারেকাত ইসলাম, প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১৪ সালে ইন্দোনেশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক অ্যাসোসিয়েশন (আইএসডিভি) প্রতিষ্ঠা হয়। ছোটখাট বিবাদ সত্ত্বেও, আইএসডিভি এবং সারেকাত ইসলাম ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হচ্ছিল, এবং এই সূত্র থেকেই প্রথম প্রজন্মের ইন্দোনেশীয় মার্কসবাদীরা আসতে শুরু করে। ১৯১৭ সালে প্রথম ইন্দোনেশীয় ভাষার সমাজতান্ত্রিক সংবাদপত্র, সোয়েরা মারডিকা (মুক্ত কণ্ঠ) প্রকাশিত হয়।
১৯১৭ সালের অক্টোবরের বলশেভিক বিপ্লব, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার বিপ্লবীদের জন্য প্রেরণাদায়ক ছিল, রাশিয়ার মতো একটি পিছিয়ে থাকা দেশে শ্রমজীবী মানুষের রাষ্ট্রব্যবস্থা। আইএসডিভি যোদ্ধা এবং নাবিকদের সোভিয়েত (পরিষদ) সংগঠিত করা শুরু করে– রেড গার্ডিস্টস। আইএসডিভি-র নাম পরিবর্তন করে ১৯২০ সালে ইন্দোনেশীয় কমিউনিস্ট পার্টি (পিকেআই) নামকরণ করা হয়।
১৯২০-এর দশকের শুরুতে পিকেআই অনেকগুলি বড় ধর্মঘটের নেতৃত্ব দেয়, বিশেষ করে ১৯২২ সালে বন্ধকী দোকানের কর্মীদের এবং ১৯২৩ সালে রেলওয়ে কর্মীদের ধর্মঘট। তবে ধর্মঘটগুলি সফল হয়নি। পিকেআই-এর কার্যকলাপের উপর দমনপীড়ন বাড়ে। কিছু সক্রিয় নেতাদের ইন্দোনেশিয়া থেকে বহিষ্কার করা হয়। ১৯২৫ সালের মাঝামাঝিতে, আরও ধর্মঘট– সেমারাংয়ে প্রধান ধর্মঘট, এরপর মেডান, বাটাভিয়া, এবং সুরাবায়ায় ধর্মঘট। দমন-পীড়ন বাড়ে, সমাবেশের অধিকার নিষিদ্ধ হয়। হতাশা এবং নিরাশা বাড়তে থাকে, বিশেষ করে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে।
পরের বছরের জন্য একটি বিদ্রোহ সংগঠিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে তখন জাভার প্রধান বিপ্লবী শক্তি, শ্রমিক ইউনিয়নগুলি, অগোছালো অবস্থায় ছিল। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বিশেষ ছিল না। আরও বিপদের কারণ, দলের নেতৃত্ব নিজেই বিদ্রোহের প্রশ্নে বিভক্ত ছিল। বিদ্রোহগুলি বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। তেরো হাজার জন গ্রেপ্তার হয়, কতজনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল তা নির্দিষ্ট করে জানা যায় না। ১,৩০০ জনকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছিল। এভাবেই ইন্দোনেশিয়ায় খোলামেলা কমিউনিস্ট কার্যকলাপের প্রথম পর্ব শেষ হয়।
১৯৩০-এর দশকে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতিতে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছিল। এই সংকটের প্রক্রিয়া, দীর্ঘ মেয়াদে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আগ্রহ বাড়ায়, রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। আবার, এই সময় থেকেই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উত্থান ঘটে। ফ্যাসিস্ত-বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রভাবও ছিল।
ইন্দোনেশিয়ায়, ফ্যাসিস্তবিরোধী ‘পপ্যুলার ফ্রন্ট’ নীতির অর্থ ছিল শুধুমাত্র ইন্দোনেশিয় বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী নয়, ডাচদের সঙ্গেও সহযোগিতা! ১৯৪২ সালে জাপানের আক্রমণের সময় পিকেআই-এর অবস্থান ছিল, ইন্দোনেশিয়ার জনসাধারণকে ডাচদের সাথে একত্রে জাপানিদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার জনসাধারণ এ ধরনের চুক্তির অংশ হতে চাননি। ব্যাপক বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল। ডাচদের সঙ্গে ‘সহযোগিতা’ নীতির পরেও, জাপানি দখলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য পিকেআই সম্মান অর্জন করে। ‘জাতীয় স্বার্থের’ নামে শ্রমিক ও কৃষকদের দাবিগুলি উপেক্ষা করা হয়েছিল। শ্রমিক ও কৃষকের কার্যক্রমকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এইভাবে পার্টি আগস্ট বিপ্লবে নেতৃত্বদানের সুযোগ হারিয়েছিল। এসব সত্ত্বেও, পিকেআই মানুষের সমর্থন পায়, সহানুভূতিশীল সামরিক ইউনিটগুলিও পাশেই থাকে।
এরপর সেনাবাহিনীর মধ্যে ‘পুনর্গঠন’ শুরু হয় – পিকেআই প্রভাবিত ইউনিটগুলি ভেঙে দেওয়া হয়। পিকেআই সমর্থক এবং বিরোধী সামরিক ইউনিটগুলির মধ্যে সংঘর্ষ বাড়ে। পিকেআই সমর্থক সৈন্যরা সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ সালে পূর্ব জাভার কেন্দ্রীয় শহর মাদিয়ুনের নিয়ন্ত্রণ দখল করে। স্থানীয় স্তরের বাইরে অপারেশনটির পরিকল্পনায় পিকেআই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সম্ভবত জড়িত ছিল না। তবে বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর, পিকেআই নেতা মুসো নিজেকে বিকল্প সরকারের প্রধান ঘোষণা করেন। ১৯২৬/২৭ সালের মতোই, একে দ্রুত দমন করা হয়– যদিও এবারের পরিস্থিতি ছিল অনেক বেশি রক্তাক্ত।
খুব দ্রুতই পিকেআই আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। তিন বছরের মধ্যে পার্টি বড় বড় ধর্মঘট আন্দোলন পরিচালনা করতে শুরু করেছিল। ১৯৫১ সালে, একদল তরুণ পার্টির নেতৃত্বে আসেন। এখান থেকেই পার্টির তৃতীয় পর্যায় শুরু হয়। ১৯৫২ সালের শুরুতে ৭,০০০ এরও কম সদস্য থেকে, ১৯৫৪ সালে দলের সদস্য সংখ্যা ১,৫০,০০০ এর বেশি হয়ে উঠেছিল। এর উপর, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন (সোবসি) দেশের বৃহত্তম ইউনিয়নে পরিণত হয়। পিকেআই নীচু থেকে একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট গড়ে তোলার উপর মনোনিবেশ করে। ১৯৫০-৫১ সাল ও বিদ্রোহ-পরবর্তী অবস্থায় দ্রুত পুনরুদ্ধার ও কয়েকটি শক্তিশালী গণসংগঠনের বিকাশের মূল কারণগুলির মধ্যে একটি কারণ ছিল ঐ মনোযোগ। দৈনন্দিন জীবনের দারিদ্র্য ও কষ্ট থেকে ইন্দোনেশীয় জনগণ দ্রুত আবিষ্কার করেছিল যে এই স্বাধীনতা যথেষ্ট নয়।
এদিকে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটছিল, তীব্র বেকারত্ব দেখা দেয়। কমিউনিস্টদের শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৫৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে, পিকেআই ১৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল এবং এর দু’বছর পর স্থানীয় নির্বাচনে তারা সেন্ট্রাল জাভার সবচেয়ে জনপ্রিয় পার্টি হয়ে উঠেছিল। ১৯৫৮ সালের মধ্যে পিকেআই’র সদস্য সংখ্যা ১৫ লক্ষে পৌঁছে যায়। মন্ত্রীসভা গঠন ও পতনের মধ্য দিয়ে একটা অনিশ্চয়তার পর্ব চলছিল। সামরিক বাহিনীর বরিষ্ঠ স্তরের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছিল, যারা অনেকটাই শক্তি সঞ্চয় করেছিল। ধারাবাহিক সংকটের মুখে, ১৯৫৯ সালে প্রেসিডেন্ট সুকর্ণ সেনাবাহিনীর চাপে সংসদ ভেঙে দেন এবং এর পরিবর্তে একটি পছন্দমত নিয়োগ করা, বাছাই করা ‘পরামর্শদাতা কংগ্রেস’ গঠনের ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে শুরু হয় ‘নির্দেশিত গণতন্ত্রে’র সময়কাল; একটি নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়নি। পিকেআই সুকর্ণের সেই পদক্ষেপ’কে সমর্থন করে।
১৯৫৬ সাল পর্যন্ত অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় পুঁজিপতিশ্রেণির বিকাশের জন্য জরুরী পরিকাঠামের সরবরাহ, দেশীয় পুঁজির ক্ষমতার বাইরের প্রয়োজনীয় উদ্যোগগুলিকে পরিচালনা করা এবং দেশীয় বুর্জোয়াদের সুরক্ষা দেওয়া। তবে রাষ্ট্রের তরফে সেই প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ১৯৬৫ সালের মধ্যে দেশীয় বুর্জোয়াদের বিশেষ অগ্রগতি হয়নি। এদিকে শ্রমিকশ্রেণিও জাতীয় বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে পারছিল না, কারণ তারা তথাকথিত মৈত্রীজোটের মধ্যে ছিল। বুর্জোয়াদের স্বার্থই প্রাধান্য পাচ্ছিল, শ্রমিকদের স্বার্থ পিছনে চলে গিয়েছিল। শ্রমিকদের আত্মত্যাগ এবং অন্যান্য শ্রেণি ও জাতির প্রতি তাদের রাজনৈতিক দায়িত্বের উপরই জোর দেওয়া হয়েছিল। সার্বিক পরিস্থিতির মধ্যে এমন অবস্থা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তবে পিকেআই সে সময়ে প্রচলিত দুর্নীতির অভিযোগ থেকে তুলনামূলকভাবে অক্ষত ছিল এবং জনসাধারণ ভেবেছিল তারা অন্তত কিছু করতে চেষ্টা করছে। এভাবে ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে, পিকেআই ছিল কার্যত ইন্দোনেশিয়ায় এক বড় ফ্যাক্টর হিসাবে বিবেচনা করার মতো একমাত্র দল।
অন্য দিকে ছিল সেনাবাহিনী। তাদের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব ছিল ইন্দোনেশীয় বুর্জোয়া/ সামন্ত রাজনৈতিক দলগুলির দুর্বলতা এবং মৌলিকভাবে ইন্দোনেশীয় বুর্জোয়াদেরও দুর্বলতার একটি প্রতিফলন। এমন সময় বুর্জোয়া গণতন্ত্রের বিকাশ হওয়া উচিৎ ছিল। তবে পুঁজিপতি শ্রেণি এত দুর্বল ছিল যে এর প্রকাশ্য প্রতিনিধিত্ব করতে হয়েছিল সামরিক বাহিনীকে যা সাধারাণত পুঁজিবাদের শেষ রক্ষাকবচ!
১৯৬০-এর সূচনায় ইন্দোনেশিয়ায় শ্রেণিশক্তিগুলি সংঘর্ষের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল– জনসাধারণের জন্য পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠছিল। ১৯৬৩ সালের শেষে জাভার ফসল উৎপাদন অত্যন্ত কমে গিয়েছিল, খরা ও ইঁদুরের উৎপাতের কারণে। কেন্দ্রীয় জাভায় দশ লক্ষাধিক মানুষ অনাহারে ছিল। ওনোসারি জেলার মধ্যে প্রতিদিন দুই থেকে ছয় জন মানুষ খাদ্যাভাবের কারণে মারা যাচ্ছিল। ১২,০০০ মানুষ পুষ্টিহীনতার চিকিৎসা নিচ্ছিল এবং ১৫,০০০ পরিবার তাদের জমি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। বালিতে ১৮,০০০ মানুষ অনাহারে ছিল এবং দক্ষিণ সুমাত্রায় ধানের গুরুতর ঘাটতি ছিল। কিছু এলাকায় মানুষ সবকিছু ‘এমনকি তাদের সন্তানদেরও’ বিক্রি করছিল।
ভূমি সংস্কার আইন ১৯৬০ সাল থেকে বিদ্যমান থাকলেও বাস্তবে কিছুই পরিবর্তন হয়নি। হতাশায় আক্রান্ত কৃষকরা জমি দখল করতে শুরু করলে পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং গ্রামাঞ্চলের প্রতিক্রিয়াশীলরা হিংসার পথ নেয়।
দেশটি ধ্বংসের পথে যাচ্ছিল, নাগরিক ও সামরিক প্রশাসনে দুর্নীতি এবং চোরাচালান ছিল ব্যাপক। সামরিক কর্মকর্তাদের ব্যবস্থাপনাগত অদক্ষতা এবং দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পগুলি ধ্বংস হয়ে গেছিল। উৎপাদন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে যা ছিল তার নিচে চলে গিয়েছিল– একসময়ের চাল উদ্বৃত্ত অঞ্চল, প্রতি বছর ১,৫০,০০০ টন চাল আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছিল। টিন এবং রাবারের রপ্তানিও কমে যায়। বিশ্বের ব্যাংকগুলির কাছে ঋণ বাড়ছিল এবং প্রতি বছর বাজেট ঘাটতি দ্বিগুণ হচ্ছিল। দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রাস্ফীতির ফলে রুপি-র মূল্যের পতন হয়েছিল ব্যাপক। একই সময়ে, রাষ্ট্রের বাজেটের একটি অবিশ্বাস্য ৭৫% সশস্ত্র বাহিনীর উপর ব্যয় করা হচ্ছিল। সুকর্ণ ব্যস্ত ছিলেন ইন্দোনেশিয়দের ‘জাতীয় পরিচয়ের গর্ববোধ’ তৈরি করতে– কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়েছিল জাকার্তায় মর্যাদাপূর্ণ বিল্ডিং, নতুন রাস্তা এবং বড় প্রতিমূর্তি নির্মাণে।
১৯৬৫ সালের আগস্ট মাসের মধ্যে, পিকেআই বিশ্বের তৃতীয় সর্ববৃহৎ কমিউনিস্ট পার্টিতে পরিণত হয়েছিল। পঁয়ত্রিশ লক্ষ ইন্দোনেশিয়ান মানুষ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন।
যে ঘটনাটি ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায় অর্থাৎ ১৯৬৫’র ঘটনা তাতে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য সমর্থক ছাড়াও কমিউনিস্ট সন্দেহেও প্রায় ১০ লক্ষ মানুষকে খুন করা হয়েছিল। সামরিক বাহিনীর প্রধান হিসাবে জেনারেল সুহার্তো প্রেসিডেন্ট হন। দক্ষিণপন্থী সামরিক জেনারেল নাসুতিয়ন এবং সুহার্তোর নিষ্ঠুর এবং বীভৎস সন্ত্রাসের একটি সময়কালের শুরু হয়। সুহার্তোর শাসনের সময়, তার বামপন্থী-বিরোধী রাজনৈতিক এজেন্ডা ইন্দোনেশিয়ার অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক নীতিতে দেখা যেতে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঐ স্বৈরশাসনকে সমর্থন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুগের সবচেয়ে বড় মানবাধিকার লঙ্ঘন ছিল ঐ শাসনকাল। তা স্বত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন জুটল কারণ ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সমাজতন্ত্রের সম্প্রসারণ সম্পর্কে তারা ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিল।
১৯৯৯ সালে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ‘দ্য মার্কসিস্ট’ পত্রিকায় (জানুয়ারি-মার্চ, ৯৯ সংখ্যা) সিপিআই(এম)-র প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক হরকিষেন সিং সুরজিৎ যা লিখেছিলেন তারই একটি অংশ এ আলোচনায় উল্লেখ করা হল-
“Indonesia, which has always been affected by regional strife, is worst- affected with growing political unrest. Suharto’s ascent to power by a US-engineered military coup was marked by a ruthless militarization of all the spheres of social and economic life.
Practically all important seats of the government, including justice, state and private enterprises, were occupied by military generals or officers of the armed forces. The beginning of Suharto’s military dictatorship was marked by the rise and omnipresence of the military and the killing of at least 600,000 communists, progressive and democratic-minded people.
Political activities remained, in practice, banned throughout the Suharto reign and the draconian military rule mastered the creation of an authoritarian State controlling political parties and mobilizing fundamentalist forces. Two political formations were allowed to function within the framework of military stipulations. Social and political discontent burst out in public outrage against the military rule and in favour of democracy that in 1984 culminated into the killings of a large member of people. Limited democracy was allowed after the change in the world situation in the nineties. The general election of 1997 was overshadowed by the public anger aroused against the government’s efforts to curb opposition to the ruling party. The Suharto regime suppressed all opposition, and the consequent violence claimed more than 250 lives. The other two contesting parties were United Democratic Party defending Islamic interest and Indonesia Democratic Party representing democratic and national aspirations of the people. The landslide victory of the government party was made possible by widespread electoral manipulations and fraud. The repression that continued till the fall of Suharto regime was directed mainly against followers of Megawati Sukarnopurti and radical journalists, writers, artists, politicians, student and trade union leaders. The financial crisis sparked off nationwide revolt against the military regime. The military was not able to contain the mounting revolt and it climaxed in the ouster of Suharto’s 32-year reign in May 1998.
Habibie, who succeeded Suharto, is regarded by many as a transitional leader for holding general election and ushering in democracy. Meanwhile there has been outbreak of social-ethnic and religious conflicts engulfing the entire country. It is in this context general election is going to be held in June this year. The army which has been supervised by US imperialism is not in a position to exercise its old authority but is still active to take control of the situation if need be. The Indonesian Democratic Party led by Megawati Sukarnopurti is gathering considerable support from the people. The Islamic fundamentalist forces are also very active. One section of the army apparently critical of the former regime is also trying to garner support. A new situation has developed in East Timor as a result of the Indonesian crisis. East Timor which has been under forcible occupation of the Indonesia regime. The people have been fighting for the independence. In the past, the process of elections held in East Timor had always been manipulated. The results have always been contrary to the wishes of the majority of Timorese. The presence of the parties was a mere formality. Ultimately, the soldiers compelled the Timorese to vote for the government party. 70per cent of Indonesian economy is in the hands of the military. After the invasion of East Timor in 1975, the coffee production in the region fell into the hands of three generals who were instrumental for the occupation in direct contact with the CIA. In the 19 years since 1975, 200,000 Timorese have been killed. Women, the aged and the
children were concentrated in camps where they do forced labour and many starved to death. With the support of US administration Suharto regime had violated all the resolutions of the United Nations and Security Council which recognised the rightful demand of self-rule and independence of East Timor. Now the new government is forced to come to a negotiating table and agrees to provide self-rule as an interim arrangement. The Habibie government was forced to recognise the principle of self determination for East Timor. However, the military and the ruling circles will maneouvre to engineer conflicts with the liberation movement through their armed militias.
Indonesia is a classic example of how a big country which adopts neo-colonial policies and authoritarianism at the service of imperialism reaches a dead-end with the very existence of the multinational state being endangered.”
একেবারে শেষ অনুচ্ছেদটি আমাদের অবশ্যই মনে রাখা উচিত।
তথ্যসূত্র:
১) কনফেসনস অফ অ্যান ইকোনমিক হিট ম্যান, জন পার্কিন্স
২) দ্য মার্কসিস্ট, জানুয়ারি-মার্চ, ২০১৯
ছবিঃ সোশ্যাল মিডিয়া
লেখাটি তিন পর্বে শেষ হবে
প্রকাশ: ৩১-অক্টোবর-২০২৫
শেষ এডিট:: 31-Oct-25 11:41 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/economy-the-other-way-part-ii-
Categories: International
Tags: economic crisis, economic inequality, economy
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (159)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (144)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (80)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)





