রাতে বদলি বিচারপতি দিনে বদল রায়েও

Author
ওয়েবডেস্ক

Judge Transferred At Midnight! Verdicts Too!

প্রকাশ: ২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২০

নয়াদিল্লি, ২৭ ফেব্রুয়ারি- মাঝরাতেই বদলি বিচারপতি, দিনের আলোয় বদলে গেল রায়ও। 

বুধবার দিল্লি হাইকোর্ট বিজেপি নেতাদের ঘৃণা ছড়ানো ভাষণের বিরুদ্ধে এফআইআর করার নির্দেশ দিয়েছিল দিল্লি পুলিশকে। বিচারপতি এস মুরলীধর ও তলবন্ত সিংয়ের বেঞ্চ তীব্র ভর্ৎসনা করেছিল এতদিন এই এফআইআর না করার জন্য। দিল্লি পুলিশের হয়ে সওয়াল করতে গিয়ে সলিসিটর জেনারেলকে শুনতে হয়েছিল বিচারপতিদের ক্ষোভ: ‘আর কত প্রাণ গেলে আপনাদের টনক নড়বে?’ 

মধ্যরাতেই দিল্লি হাইকোর্ট থেকে বদলি করে দেওয়া হয়েছে বিচারপতি মুরলীধরকে। রাত বারোটার কিছু আগে এমন নির্দেশ দেওয়া হয়। তাঁকে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের যুক্তি এই যে সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়াম ১২ ফেব্রুয়ারি তাঁর বদলির নির্দেশ দিয়েছিল। সেই নির্দেশই কার্যকর করা হয়েছে। কেন কালকের কড়া রায়ের পরে ঝড়ের গতিতে এবং রাতের অন্ধকারে বিচারপতি বদল করতে হল, সেই প্রশ্নে ঝড় উঠেছে রাজনৈতিক এবং আইনজীবী মহলে। 

বিচারপতি বদলে বৃহস্পতিবার বেঞ্চও বদলে গেছে। হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ডি এন প্যাটেল এবং বিচারপতি সি হরিশঙ্করের বেঞ্চে আজ মামলা উঠলে বদলে গেছে রায়ও। কেন্দ্রীয় সরকার এই মামলার পক্ষভুক্ত হতে চাইলে বিচারপতিরা অনুমতি দেন। সেইসঙ্গে বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে এফআইআর করার আবেদনের জবাব দেবার জন্য কেন্দ্রকে চার সপ্তাহ সময় দিয়ে দেন। বুধবার বারংবার আলোচনা হচ্ছিল এই সময় দেওয়া নিয়েই। বিচারপতিরা বলছিলেন, বিষয়টি জরুরি। দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে সওয়াল করে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা দাবি করছিলেন, তেমন জরুরি নয়। গতকাল বিচারপতিরা চাইছিলেন, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। সলিসিটর জেনারেল বলে চলেছিলেন, ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে সহায়ক সময় আসেনি। বৃহস্পতিবার আগের রায় উলটে সময় দেওয়া হলো কেন্দ্রকে। আপাতত রেহাই বিষাক্ত ভাষণের দায়ে অভিযুক্ত বিজেপি নেতাদের! 

বুধবার বেনজির ঘটনায় প্রথমে কপিল মিশ্র, পরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর, বিজেপি সাংসদ পরবেশ ভার্মার ভাষণের ক্লিপ চালিয়ে হাইকোর্টের বিচারপতি এস মুরলীধর ও তলবন্ত সিংয়ের বেঞ্চ বলে, এই রকম ভাষণের পরেও পুলিশ এফআইআর দায়ের করেনি কেন? দিল্লি পুলিশের তরফে আদালতে হাজির হওয়া সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলার চেষ্টা করেছিলেন, এ তেমন কোনও জরুরি বিষয় নয়। আদালত বলে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে এফআইআর করা জরুরি নয় তো কোন ঘটনা জরুরি? শত শত লোক এই ভিডিও দেখেছে, এর পরেও বলছেন জরুরি নয়? তিন বিজেপি নেতাই দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে প্ররোচনামূলক ভাষণ দিয়েছিলেন। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের ‘গুলি করে মারার’ উসকানিও দিয়েছিলেন। পরে আবার জাফরাবাদে অবস্থান শুরু হবার পরে পুলিশের সামনেই কপিল মিশ্রকে বলতে শোনা যায়, তিনদিনের মধ্যে ফাঁকা না হয়ে গেলে আর কারোর কথা মান্য করা হবে না। দিল্লি পুলিশকেও হুমকি দেন মিশ্র। তাঁর এই ভাষণ দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের পিছনে কাজ করছে বলে জোরালো অভিযোগ উঠেছে।

বুধবার বিচারপতিরা বলেছিলেন, পুলিশ ব্যর্থতা দেখিয়েছে। সলিসিটর জেনারেল বলেন, এখন অভিযোগ দায়ের করার যথাযথ সময় আসেনি। বিচারপতিরা বলেন, যথাযথ সময় বলতে আপনি কী বোঝেন? গোটা শহর পুড়ে ছাই হয়ে গেলে সময় আসবে? আমরা দৃষ্টিহীন হয়ে থাকতে পারি না। আরও কত প্রাণ গেলে, আরও কত সম্পত্তি ধ্বংস হলে সময় আসবে? সলিসিটর জেনারেল আদালতকে ‘ক্রুদ্ধ’ হতে বারণ করলে বিচারপতি মুরলীধর বলেন, এ ক্রোধ নয়, ক্ষোভ। আপনাদের কোনও সতর্কতার মনোভাবই নেই। তৎপরতাই নেই। এই শহর অনেক হিংসা দেখেছে। আবার একটা ১৯৮৪ চাই না। আইন মেনে চলুন। 

বৃহস্পতিবার বিচারপতি বদলাতেই আরও সোৎসাহে সলিসিটর জেনারেল বলতে থাকেন, এখন আদালতের হস্তক্ষেপ করাই উচিত না। পুলিশ কর্তৃদক্ষের অভিমত এখন এফআইআর করার উপযুক্ত সময় নয়। পরে কখনও সে বিষয়ে বিবেচনা করা যাবে। আবেদনের উত্তর দেবার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং পুলিশের সময় প্রয়োজন। সেই সময় এদিন আদালতের তরফে পেয়েও যান। 

স্বভাবতই বিচারপতিকে বদলির পিছনে রাজনীতি কাজ করছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সিপিআই(এম) পলিট ব্যুরো বলেছে, দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি এস মুরলীধরকে বদলি করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়ামের সুপারিশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের বার অ্যাসোসিয়েশন প্রতিবাদ জানিয়েছিল। বিচারবিভাগীয় এবং প্রশাসনিক যুক্তিও দেখিয়েছে তারা। যেভাবে দ্রুত এই বদলি কার্যকর করা হলো তার সঙ্গে গতকাল দিল্লি ঝাইকোর্টের শুনানির যোগাযোগ স্পষ্টই। বাছাই করা তৎপরতা দেখিয়েছে কেন্দ্র। দিল্লি পুলিশ শীর্ষ বিজেপি নেতাদের ঘৃণা ছড়ানো ভাষণকে আড়াল করছিল। হাইকোর্ট তা উন্মোচিত করে দিয়েছিল। পলিট ব্যুরো এদিন দাবি করেছে আস্থার প্রকট অভাবের এই সময়ে এই বদলির আদেশ স্থগিত রাখতে হবে। দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা অটুট রাখতেই তা করা দরকার। 

কংগ্রেসের তরফে অভিযোগ করা হয়েছে, বিচারালয়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া হচ্ছে। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেছেন, বিচারের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে। সাহসী বিচারবিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা ভেঙে দেওয়ার নিন্দনীয় চেষ্টা হচ্ছে। রাহুল গান্ধী কটাক্ষ করে বলেছেন,‘বিচারপতি লোয়ার কথা মনে পড়ছে, তিনি বদলি হননি’। উল্লেখ্য, সোহরাবুদ্দিন ভুয়ো সংঘর্ষ মামলায় বিশেষ সিবিআই আদালতের বিচারপতি লোয়া অমিত শাহের বিরুদ্ধে মামলা শুনছিলেন। তাঁর রহস্যজনক মৃত্যু হয়। কংগ্রেসের মুখপাত্র রণদীপ সূরযেওয়ালা বলেছেন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। 

বিচারপতি বদলির জোরালো সমালোচনা করেছেন আইনজীবীদের বড় অংশও। আইনজীবীরা বলেছেন, বদলির ক্ষেত্রে বিচারপতিদের যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে বদলির চরিত্র দেখে শাস্তিমূলক বদলি বলেই মনে হচ্ছে। সরকার প্রতিহিংসা থেকেই কাজ করছে। বরিষ্ঠ আইনজীবী সঞ্জয় হেগড়ে বলেছেন, বুধবার দিল্লি পুলিশের সমালোচনার করার পরই এভাবে তড়িঘড়ি বদলি করা হলো বিচারপতিকে। লক্ষণীয়ভাবে বুধবার শুনানির সময়ে সলিসিটর জেনারেল অন্তত একদিন সময় চেয়েছিলেন। সেই একদিনেই বদলি হয়ে গেলেন বিচারপতি। সরকারের পদক্ষেপ এ কারণে আরও সন্দেহজনক। 

কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ অবশ্য এই বদলিকে ‘নিয়মমাফিক’ বলে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু কেন মধ্যরাতে বদলির আদেশ, এই অস্বাভাবিক তৎপরতার কারণ কী, তা ব্যাখ্যা করতে পারেননি মন্ত্রী। 

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 28-Feb-20 11:14 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/3869
Categories: Current Affairs
Tags: delhi violence, modi govt 2.0
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড