Site icon CPI(M)

An Artist’s Revolt: Ray – A Journey

Satyajit 100

উৎপল দত্ত

এটা প্রায় সকলেই মানেন যে, শিল্পীর চিন্তায়, শিল্পকর্মে আশেপাশের জীবনসংগ্রাম প্রতিফলিত হতে বাধ্য। শিল্পী নিজে যদি সেই হানাহানিতে নাও থাকেন, তবু তার কারবার তো জীবন নিয়ে। চোখ মেলে তাকালেই জীবনের জটিলতা যেমন তিনি দেখতে পান তেমনি দেখতে পান সে জীবনকে বদলে দেবার সংগ্রামটাকে। সেটা তার সৃষ্টিতে রস সঞ্চার করতে বাধ্য। তবে তার দেখার বিশেষ ভঙ্গিতে কারোর কারোর কাছে অভিনব বলেই অবোধ্য হয়ে পড়ে, অভিনব তো হবেই। সেটা শিল্পের প্রাকশর্ত। আর কেউ যেভাবে দেখেনি সেভাবে দেখাকেই বলে শিল্প। সেখানেই দা ভিঞ্চির সঙ্গে একটি ফটোর পার্থক্য। লেনিন লিখেছিলেন :

“একটি বস্তুকে জানা মানে হচ্ছে বস্তুর সঙ্গে চিন্তার সংগতি ঘটাবার এক অন্তহীন প্রক্রিয়া। মানুষের মনে প্রকৃতির যে প্রতিফলন ঘটে তা প্রাণহীন নয়, বিমূর্ত নয়, নিশ্চল নয়, দ্বন্দ্বহীন নয়। তা গতিশীল। তার মধ্যে দ্বন্দ্ব-উপস্থিত হয় এবং সে-দ্বন্দ্বের সমাধানও বেরিয়ে আসে।”

মানুষের মন যেহেতু সরল দর্পণ নয়, তাই যা ঘটে তার হুবহু প্রতিফলন সেখানে দেখা যায় না।

এমন অনেক শিল্পীকে জানি যারা কর্মক্ষেত্রের বাইরে মার্কস-এঙ্গেলস এর উদ্ধৃতি ব্যতীত কোন কথাই বলেন না। অথচ তাদের চলচ্চিত্র বা নাটকে এই চেতনার কোন প্রকাশ দেখা যায় না। বরং তাদের শিল্পকর্মে দেখি মধ্যবিত্তের অসুবিধার তালিকা। লোডশেডিং-এর বিষয়ে বস্তাপচা একটি উক্তি থাকবেই। তারপর থাকে মাস্তানদের দৌরাত্ম্য সম্বন্ধে নানা প্রগলভ মন্তব্য, যেগুলির জন্ম মধ্যবিত্তের মাস্তান ভীতি থেকে। ঠিক সময়ে ট্যাক্সি পাওয়া যায় না কেন, এই ছিঁচকাঁদুনিও এক-আধ বার গেয়ে রাখা হয়। তাছাড়া বাসে ট্রামে বাদুড়ঝোলা ভিড় সম্পর্কে ক্রুদ্ধ দু-চার কথা। অফিসের বড় সাহেব কি কি কুকীর্তি অনুষ্ঠিত করেছেন এসব থাকে এধারে ওধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, বিশেষ করে মহিলা কর্মীদের প্রতি তার যৌন আকর্ষণের উল্লেখ এক মধ্যবিত্ত ফ্যাশন। এই হচ্ছে বিপ্লবী চেতনার চৌহদ্দি।

“পথের পাঁচালী” থেকেই সত্যজিৎ রায় ভিন্ন মার্গ অবলম্বন করেছেন। শ্রেনী সংগ্রামের কথা সে ছবিতে নেই, থাকার কথাও নয়। কিন্তু যে জন্য ছবিটিই এক নতুন দিগন্ত, তাহলো শহুরে মধ্যবিত্তের প্যানপ্যানানি থেকে মুক্ত এক গ্রামীণ জগতের সন্ধান সে ছবি দিচ্ছে। “পথের পাঁচালী”তেই আমরা দেখেছিলাম গ্রামের দরিদ্র মানুষকে, যারা ঘর ছেড়ে চলে যায় আর সাপ এসে সেই ঘরের দখল নেয়। একটিও সরাসরি কথা না বলে এত বড় নির্যাতনের কাহিনী বলা হয়ে গিয়েছিল। আর অনুভব করেছিলাম দরিদ্রের প্রতি দরদ – হরিহর, সর্বজয়া, দুর্গারা যে আমাদের কত আপন, সেটা প্রতিমুহূর্তে প্রেক্ষাগৃহ ভর্তি মানুষ অশ্রু বিমোচন করে অন্তরের গভীরে মেনে নিয়েছিল। এই বিপুল অপ্রতিরোধ্য ভালোবাসা সৃষ্টি করেছে যেন একটি বাউল গান। বানিয়া শাসিত ভারতবর্ষে ক্রমে মানুষের সব মহৎ আবেগ, সব কোমল বৃত্তি ব্যবসার পণ্য হয়ে গেছে। সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসাকেও ওরা ব্যবহার করে করুণ দৃশ্যের একটি উপাদান হিসেবে যাতে মায়ের অশ্রু দেখে লোকে আরো টিকিট কাটে। বানিয়া তার নিজের অর্থগৃধ্নুতা চাপিয়ে দেয় পুরো সমাজের ওপর। তার উৎকট রুচি ক্রমশ বিকৃত করে দেয় শিল্পীদের নান্দনিক বোধ।

তাই তাই তো দেখি একদিকে যেমন মাতৃস্নেহ, পিতৃভক্তি, মিত্রতা, অপত্য স্নেহ সবকিছুকে আতিশয্যের কোঠায় নিয়ে গিয়ে ছবি হিট করাবার প্যাঁচ অন্যদিকে শিল্পীদের মধ্যে যারা নিজেদের বুদ্ধিজীবী বলে বড়াই করেন তারা মানুষের আবেগ প্রকাশকেই উপহাস করেন এবং এড়িয়ে চলেন মানুষের অকপট আর্তি। এই ঝোঁক পাশ্চাত্যে কিছু প্রকট, ভারতে বুদ্ধির অহংকার করা শিল্পীদের মধ্যে যথেষ্টই বর্তমান। আস্ত ছবিতে কোথাও কেউ কাঁদে না, কোথাও কেউ ঘর কাঁপিয়ে হাসে না, সন্তানের মৃত্যু দেখলেও কেউ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছু করে না, মায়ের মৃত্যু-সংবাদ পেলে কেউ আচমকা সংবাদ বাহককে আঘাত করে বসে না। ওসব যে বড্ড বাড়াবাড়ি। ইউরোপের মানুষের বহিঃপ্রকাশ কম; তাদের দেখে বাঙালির আচরণ স্থির করেন বুদ্ধিজীবীরা। আরও বলা যায়, এটা তাদের মধ্যবিত্ততারই একটা প্রকাশ। মধ্যবিত্ত আবেগ প্রকাশ করতে লজ্জা পায় ( একমাত্র রিক্সাওয়ালার ওপর তর্জন-গর্জনের সময় ছাড়া)। যে পরিবেশে মধ্যবিত্ত বড় হয়েছে তা বড়ই সংকীর্ণ, ক্ষুদ্র গৃহ, ক্ষুদ্র মান-অভিমান, ক্ষুদ্র বিরক্তি, এর বেশি কিছু তার নাগালে নেই। বুদ্ধিবাদী শিল্পীরা এই জাতের মানুষ। তারা দেখেনই নি সেই সব খোলা হাওয়ার মানুষকে যারা সু-উচ্চ বিলাপে আকাশের ওপারে কোন বধির কর্তৃপক্ষের কানে পৌঁছে দিতে চায় প্রতিবাদ, বা বস্তির সেই শ্রমিককে যে মদ্যপান করে হিংস্র অশ্লীল গর্জনে দুনিয়াকে আহ্বান জানায় সম্মুখ সমরে। ছিঃ, ওসব যে বাড়াবাড়ি। তাই এইসব ছবিতে ঘটনাও যেমন ঘটে না, আবেগের অগ্নুৎপাতও ঘটতে নেই। মধ্যবিত্তের গণ্ডির মধ্যে কিবা আর ঘটবে যার ফলে কেউ কাঁদতে পারে, বা রাগতে পারে ?

“পথের পাঁচালী”তে শুনেছিলাম কন্যাহারা পিতার সেই হাহাকার – ” দুগগা, দুগগা” বলে যেন ঘটনাস্রোত রুদ্ধ করে দেবেন, বা চারুলতা বিছানার ওপর পড়ে ঠাকুরপোর নাম নিয়ে কাঁদতে দ্বিধাবোধ করেনি। মানুষকে ভালোবাসলে, তীব্রভাবে, প্রাণ দিয়ে ভালবাসলে তবে তার দুঃখে দুঃখী হওয়া যায়, তার সঙ্গে কাঁদা যায়। আর মানুষকে চাবি দেওয়া পুতুল মনে করে শুধুই বৌদ্ধিক নানা সমস্যার সমাধানে নামলে আর শিল্প সৃষ্টি হয় না, চলচ্চিত্রের প্রাবন্ধিক হতে হয়।

ইদানিং একটি দৈনিক পত্রিকা কথায় কথায় সত্যজিতের নাম টেনে আনছে “সিটি অফ জয়” ছবিকে নির্দোষ প্রমাণ করতে; বলছে, রোলান্ড জফ – না কি যেন নাম সেই হিট ছবি ব্যবসায়ীর – কি কলকাতার দারিদ্র দেখাতে পারবেন না ? সত্যজিৎ তো দেখিয়েছেন। এই পত্রিকার শিল্পচেতনা কোনদিনই বিশেষ বিকশিত নয়। জফকে কলকাতার দারিদ্র দেখাবার আগে জানতে হবে কলকাতার মানুষকে তিনি কতটা ভালবাসেন – তিনি মানুষকে কতটা মর্যাদা দিয়ে থাকেন। পাশ্চাত্যের মুনাফাবাজ একচেটিয়া পুঁজিপতিদের ক্রীড়নক জফ সাহেব তো শুনেছি একজন তৃতীয় শ্রেণীর ফাটকাবাজ। তার সঙ্গে সত্যজিতের অধিকারের প্রসঙ্গ গুলিয়ে ফেললে এই প্রশ্নই করতে হয় – শ্বেতাঙ্গ পদলেহন কি এবার বিনা দক্ষিণাতেই সারা হচ্ছে, না নগদপ্রাপ্তি ঘটেছে ? এই পত্রিকা সচ্ছন্দে একদিন লিখতে পারেন; বোম্বাইয়ের ছবিতে মারামারি থাকবেনা কেন; শেক্সপিয়র তো মারামারি দেখিয়েছেন।

“দেবী” ছবিতে এসে সত্যজিৎ তার বিদ্রোহী ভূমিকায় আত্মপ্রকাশ করেছেন। আমার হিসেবে “দেবী” একটি বৈপ্লবিক চলচ্চিত্র। আজ পর্যন্ত এ দেশে যত ছবি তৈরি হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে প্রচন্ড, আপষহীন এবং সুদূরপ্রসারী। এখানে শিল্পী হ্যাঁচকা টান মেরেছেন মনের সবচেয়ে গভীরে রোপিত ও রক্ষিত মূলটি ধরে – ধর্ম। সকলেই জানেন এদেশের বানিয়া শাসকশ্রেণী ধার্মিকতার একটা ভান সর্বসময় রক্ষা করে চলে। এই ধর্মনিরপেক্ষ দেশের প্রধানমন্ত্রীরা কুম্ভ মেলায় ডুব দেন। কপালে বীভৎস লাল ফোঁটা এঁকে মন্দিরে গিয়ে হত্যে দেন, নির্বাচনের মুখে জ্যোতিষীদের হাতে নিজেকে সঁপে দেন। মাচানবাবার লাথি মস্তকে ধারণ করেন। এখানে শাসকশ্রেণী আয়কর ফাঁকি দিয়েই হনুমানের মন্দিরে গিয়ে উপুড় হয়ে পড়ে। পৃথিবীর কোন দেশের বুর্জোয়ারা ভারতের মতন এত পশ্চাদপদ, এত অশিক্ষিত, এত কুসংস্কারাচ্ছন্ন নয়। স্বভাবতই তারা চায় সারাদেশ তাদেরই মতন হনুমান ভক্ত, সতীদাহ সমর্থক, নির্বোধ হয়ে উঠুক। যা-কিছু বীজ তারা বপন করেছিলো মানুষের মনে, ধর্মকে আফিমের মতন প্রত্যেকের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার যে বিপুল প্রচার তারা এত শতাব্দী ধরে চালিয়েছে, এত সহজ স্মর্ট মন্দির, রাজনৈতিক দপ্তর থেকে তারা দিনে-রাতে যে বিজ্ঞানবিরোধী মতাদর্শ ছড়িয়ে এসেছে, অসমসাহসিক একটি চলচ্চিত্র তার মোকাবিলায় অবতীর্ণ হয়েছিল – “দেবী”। আজকে হিন্দুত্ব ও হিন্দুরাষ্ট্রের অশ্লীল আস্ফালন দেখে আরো হৃদয়ঙ্গম হয়, কত আগে সত্যজিৎ এই বিপদ সম্পর্কে দেশের মানুষকে জাগাবার চেষ্টা করেছিলেন।

একথা সর্বজনবিদিত, ধর্মীয় বিশ্বাসের ভয়াবহতা নিয়ে এদেশে ছবি হয় না, উল্টোটাই হয়। কারণে অকারণে দেবীপ্রতিমা দেখিয়ে তার অলৌকিক ক্ষমতায় শবদেহের ধীরে ধীরে চক্ষু উন্মীলনই অনবরত দেখানো হয়ে থাকে।

দেবীমাহাত্ম্যে অন্ধের চক্ষুলাভ, সর্পদংশনে মৃতের প্রাণলাভ, মৃত শিশুর জীবনলাভ ইত্যাকার নানা নগদ লাভের ব্যবসাতে মা নৃ-মুণ্ডমালিনীকে পার্টনার করে নেয়াই এদেশে রেওয়াজ।

আর বুদ্ধিবাদী চলচ্চিত্রকাররা ধর্মের তল্লাটই মাড়ায় না। হয়তো তারা নিজেরা গোপনে দেবীমাহাত্ম্য বিশ্বাস করেন বলে। অথবা, যেটা আরো নিন্দনীয়, স্রেফ ভয়ে। ধর্মকে ঘিরে গড়ে ওঠে ট্যাবু। ওটা নিষিদ্ধ এলাকা। বোর্ড টানিয়ে দিয়েছে রক্তচন্দনচর্চিত পুরুতের দল, আর সেই মানা মেনে সাত হাত পিছিয়ে আসেন সবাই। বিদ্রোহী সত্যজিৎ সেই ট্যাবু ভেঙেছেন, সবচেয়ে বেআইনি কথাগুলো সোচ্চারে বলেছেন। এবং এদেশেই প্রয়োজন এই বিদ্রোহের। সবাই যদি তাই করতো তাহলে ইঁটপুজোও হত না, অযোধ্যায় বানরসেনার জগঝম্পও হতো না।

ফিরে যাই লেনিনের কথাগুলোয়। বিদ্রোহী শিল্পীর নিজস্ব চিন্তার সঙ্গে বাস্তবের চলতে থাকে বোঝাপড়া। অন্তহীন যে কোন মুহূর্তে শিল্পী শুধুমাত্র নিজের চেতনা দিয়েই বাস্তবকে যাচাই করেন না। যে সমাজে তিনি বাস করেছেন, পুষ্ট হয়েছেন, তার সংস্কার, আচার, চিন্তাধারা, দৃষ্টিভঙ্গি ছাপ ফেলে যায়। “দেবী” ছবির পেছনে স্পষ্ট অনুভূত হয়, শুধু কুসংস্কার ও ধর্মের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য নয়, সেই ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে বাংলার সুদীর্ঘ সংগ্রামের ঐতিহ্যটাও বটে। সেটি শুধুমাত্র ছবির মধ্যে বিদ্যাসাগর ও বিধবা বিবাহের উল্লেখেই মূর্ত হয় না, পুরো ছবির বিজ্ঞানমনস্ক তীক্ষ্ণ যুক্তিবাদীতার মধ্যেই দেখতে পাই রামমোহন রায়, ডিরোজিও, বিদ্যাসাগর থেকে শুরু করে, তাদের উত্তরসূরি আজকের শক্তিশালী বামপন্থী আন্দোলনের স্পষ্ট উপস্থিতি। বাংলায় যে দাঙ্গা হয় না তার চিন্তাগত কারণগুলো এসে “দেবী” ছবিতে জমাট বেঁধেছে। “দেবী” ছবিকে দেখতে হবে বাংলার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক-সামাজিক সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে, তবেই তার তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম হয়। ব্যক্তিগত বিদ্রোহ সেটি নয়। যে সমাজে সত্যজিৎ বড় হয়েছেন সেটা সেই সমাজের বিদ্রোহ। সত্যজিৎ তার কণ্ঠস্বর।

তেমনি বাংলার কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়েছিল জরুরি অবস্থার অত্যাচারের কালে – “জন-অরণ্য” ছবিতে, দেওয়াল লিখনে মাও সে তুংয়ের স্থানে ‘এশিয়ার মুক্তি সূর্য যুগ যুগ জিও’র আবির্ভাব, শ্রীমতি গান্ধীর অবয়ব সমেত। সেইসঙ্গে দেখেছিলাম পরীক্ষাকেন্দ্রে গণটোকাটুকির সেই লজ্জাকর অধ্যায়, শিক্ষা-সংস্কৃতির সেই অবমাননা। অনেকেই ছিলেন জরুরি অবস্থার ঘোরতর বিরোধী। কিন্তু তাদের শিল্পকর্মে সেই বিরোধিতা প্রকাশ পেল এমন কৌশলগত পাঁয়তাড়ার মাধ্যমে যে মুহূর্তের জন্যেও বাংলার মানুষ ভাবতে পারলেন না এটা তাদেরই বিপর্যয়ের খতিয়ান; বুদ্ধির ধাঁধা মেলাতে মেলাতেই তাদের মাথা ঘুরে গেল। “জন-অরণ্য” রাজনৈতিক প্রতিবাদ উত্থাপন করেই থেমে থাকেনি। সদর্পে প্রবেশ করেছে মধ্যবিত্তের আর এক নিষিদ্ধ অঞ্চলে – পয়সার লোভে মধ্যবিত্ত যে ঘরের মা-বোনকে বৃহৎ পুঁজিপতির অঙ্কশায়িনী করে দিয়ে আসতে পারে, এই ভয়াবহ সত্য উচ্চারিত হলো ছবিটিতে। এটাই ঘটে বুর্জোয়া সমাজে। যা কিছুকে মানুষ মনে করত পবিত্র, সবকিছুকে বিকিকিনির বাজারে টেনে নামায় বুর্জোয়া। মাতৃজাতির প্রতি যে ভক্তির কথা মধ্যবিত্ত অনবরত লেখে ও বলে, সেটা আসলে বুর্জোয়াদের নারীমাংস ব্যবসাকে আড়াল করার জন্য একটা আত্মপ্রতারণা মাত্র। বিদ্রোহী শিল্পী সে আড়াল ছেড়ে এক মুমূর্ষু শ্রেণীর আত্মবিক্রয়ের ভয়ঙ্কর চেহারা তুলে ধরলেন।

স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ “হীরক রাজার দেশে” ছবিতে দড়ি বেঁধে শাসকের মূর্তি টেনে ধুলিসাৎ করার দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপ পেয়েছে, যা চিরন্তন। পুরো ছবিটার স্ক্রিপ্ট রূপকথার আদলে লেখা এবং সংলাপ প্রায় সবটা ছড়ায় বাঁধা। স্বভাবতই আমি কাব্যের মর্যাদা রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। প্রথম দিন প্রথম শট এর পরেই দীর্ঘদেহ পরিচালক নিচু হয়ে আমার কানে কানে বললেন, “গ্রামীণ একটা উচ্চারণে বল!” আমার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে বললেন, “এই ধরনের মানুষ গ্রামের জোতদারের চেয়ে মোটেই কালচার্ড নয়, নইলে অন্য মানুষকে পদদলিত করার কথা তার মাথাতেই আসতো না।” এই ধরনের কথা বলেছিলেন, যথাযথ উদ্ধৃত করতে পারলাম না। মানুষকে যারা দাবিয়ে রাখে তারা সংস্কৃতিহীন। তার হাতের দন্ডটা যত দীর্ঘই হোক না কেন, তাকে অতি দুর্বল এক গেঁয়ো মাস্তান হিসেবেই দেখতে হবে। মনে পড়েছিল চেয়ারম্যান মাও’র “কাগুজে বাঘের” তত্ত্ব। স্বৈরাচারীকে হাস্যকর এর পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে চলচ্চিত্রে, সাহিত্যে, নাটকে। এবং “হীরক রাজার দেশে” চলচ্চিত্রে সেই দুরূহ কার্যে আমাকেও যোগদান করতে হবে। কতদূর কৃতকার্য হয়েছিলাম জানিনা, তবে ঈষৎ গ্রামীণ উচ্চারণের সাহায্যে অভিনয়টা সহজ মনে হচ্ছিল – যেমন, “এঃ, মালা ঝুলায়েছে গলে” প্রভৃতি কথা বলার সময়ে। যারা সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের গবেষক, যারা সমাজতত্ত্বের পটভূমিকায় তাঁর ছবির আলোচনা করেন, তাদের কাছে অনুরোধ, চিন্তা করে দেখুন – “হীরক রাজার দেশে”র বিপুল ঐশ্বর্যের উৎপাদক যারা সেই খনি শ্রমিকদের কেন সামনে নিয়ে এলেন সত্যজিৎ। কেন তাদের সম্ভাব্য বিদ্রোহই ছবির মূল কাঠামো। জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে বহুবিধ প্রতিবাদ আমরা শুনেছি। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষকে দমন করার উদ্দেশ্যেই যে সেই আইনের রচনা এ কথাটা তো বলতে ভুলে যান সবাই। বিদ্রোহী সত্যজিৎ ভোলেন না। এখানেই তার আধুনিক বিদ্রোহী চরিত্র।

শ্রমিককে ভুলতে পারেন না বলেই তিনি তৈরি করেন ‘সদগতি’, যেখানে ভারতীয় মজদুরের শ্রমক্লান্ত, ঘর্মাক্ত মুখ অন্য সব শ্রেণীর মানষপটে আঁকা হয়ে যায়। ভারতের মজদুর দ্বিবিধ পেষণে জর্জরিত-এক, শ্রমিক হিসেবে; দুই, ছোট জাত হিসেবে। এই সামাজিক সত্যকে বহুদিন পূর্বেই তুলে ধরে, ভারতের শ্রমিক আন্দোলনের একটি গুরুতর দুর্বলতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন সত্যজিৎ। শ্রমিকদের সামনে গিয়ে লড়াইয়ের নানা কায়দায় ও অধিকার রক্ষার মূল শিক্ষাগুলো সঙ্গে সঙ্গে তুলে ধরা উচিত ছিল বর্ণভেদ নামক সামাজিক অভিশাপের বিষয়টি। বর্ণ ও শ্রেণীর সম্পর্ক কি, প্রাচীন ভারতের সুকৌশলী শাসকশ্রেণীগুলি শূদ্রকে অত্যাচারে সমর্থক করে তুলল কি করে – ব্রাহ্মণের পদসেবার অধিকার পেতে শূদ্রকে মাতোয়ারা করে তুলল কি করে – এগুলোই তো ভারতের শ্রমিক সংগ্রামের পূর্ব-কথা। এগুলোই ভারতীয় শ্রমিককে বিশ্বের অন্য শ্রমিক থেকে বিশিষ্ট করেছে। এগুলোই তার ইতিহাস। ইতিহাস বাদ দিয়ে আচমকা আজকের ভারতীয় শ্রমিককে যে দলে টানা যায় না “সদগতি” ছবি সেই ইঙ্গিত দিয়েছে দেশের শ্রমিক দরদীদের প্রতি, আজকের সংরক্ষনের সমর্থনে বিপুল আন্দোলন শুরু হবার অনেক আগে।

সত্যজিতের বিদ্রোহ ক্রোধ কম্পিত হয়ে উঠেছে তার “শাখা-প্রশাখা” ছবিতে। সুবিধাবাদী, অসৎ মধ্যবিত্তের অর্থলোভের ভয়ঙ্কর ছবি “শাখা-প্রশাখা”। যেখানে শিশুও শিখে ফেলেছে দু-নম্বরী কথাটা। যেখানে অসদাচরণ হচ্ছে অহংকারের বস্তু। বড়লোক হওয়া ধর্মের চেয়ে দরকারী। কথার চাবুকে এই নীতিহীন শ্রেণীকে জর্জরিত করেছেন সত্যজিৎ। আর এদের মধ্যে একমাত্র সততা রক্ষা করে ঘুরে বেড়ায়, সে বাড়ির ছোট ছেলে। সে জোচ্চুরির প্রতিবাদে চাকরিতে ইস্তফা দেয়। লক্ষনীয়, এই ছেলেটি কমিউনিস্ট। আজকের পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ে সে বুক ভরা বেদনায় নীরব হয়ে গেছে।

সত্যিই, দেশের মার্কসবাদী মাত্রেই বুঝতে পারবেন, অবমানিত শ্রমিক রাষ্ট্রগুলির পরাজয়ে যে নিজেকে পরাজিত মনে করে, সাম্রাজ্যবাদের উল্লসিত আস্ফালনের ফলে বিশ্বশান্তি যে বিপন্ন এটা যে বুঝতে পেরেছে, সেই মার্কসবাদী একদল তস্করের উল্লম্ফনের সামনে নীরবতা পালন ছাড়া আর কিই বা করতে পারে। তবু “শাখা-প্রশাখা”র শেষে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় মানবিক মূল্যবোধ। বিকৃত মস্তিষ্কের পুত্র এসে যখন অপূর্ব মমতা মাখা কন্ঠে বাবা বলে ডাকে। এক লহমায় লুপ্ত পারিবারিক সম্পর্ক গুলি যেন অর্থগৃধ্নুতার বিচ্ছিন্নতা ভেদ করে আবার স্বাভাবিক হয়। অজিত বন্দোপাধ্যায় ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে আসে নেকড়েদের গুহা থেকে মানুষের জগতে।

সত্যজিৎ রায়ের সত্তর বছর পুর্তি উপলক্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি, নন্দন, কলকাতা – মার্চ, ১৯৯২

শেয়ার করুন