Site icon CPI(M)

Wonder Lamp : Minati Ghosh

৫ মে ২০২৩ (শুক্র বার)

কাল মার্কসের ২০৬ তম জন্ম দিবস উদযাপন হচ্ছে সারা বিশ্বজুড়ে। জন্মের ২০৫ বছর পরেও উদযাপন চলছে “দুনিয়ার মজদুর এক হও” – এই স্লোগান পুঁজিবাদী দুনিয়াতেও আজকের দিনে বেশি বেশি করে শোনা যাচ্ছে। সংকট যত বাড়বে মানুষের জীবনে, গলার জোরও তত বাড়বে – এটাই স্বাভাবিক।

বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ কার্ল মার্কসের জীবনে যে কতজন ব্যক্তির ভূমিকা ছিল, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ফ্রেড্ররিক এঙ্গেলস, তাঁর বাবা হেনরি মার্কস, মা হেনরিয়েটা, ব্যারন ল্যুডভিক ফন ভেস্টাফেলান অন্যতম। ছাত্রজীবন থেকে আমৃত্যু তাঁর জীবনে ছড়িয়ে ছিলেন ল্যুডফিক ফনের কন্যা জেনি। সে সময়ে প্রাশিয়ার সমাজ জীবনে ইহুদিদের জন্য কতকগুলি নির্দিষ্ট আইন ছিল। জীবিকায় ও কিছু উচ্চপদের অধিকার তাঁদের ছিলনা। ফরাসি জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে তাঁর বাবাকে আইনজীবী পদে থাকবার জন্য পিতৃপুরুষের ধর্ম-বিশ্বাস ত্যাগ করে প্রোটেস্টান্ট ধর্ম গ্রহন করতে হয়। চার পুত্র, পাঁচ কন্যার জননী হেনরিয়েটার জন্ম হল্যান্ডে। তাঁকে সংসারের দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। মা-বাবার জীবনচর্যা মার্কসকে ছোটবেলাতেই প্রভাবিত করেছিল। তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী, মেধাবী ছাত্র কার্ল-কে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিলেন ল্যুডভিগ ফন তাঁর অগাধ পান্ডিত্যের কারনে। দুটি পরিবারই ঘনিষ্ট ছিলেন।মার্কসের সারাজীবনের সাধনা ও সংগ্রামের সাথী জেনি ভেস্টাফালেন ছিলেন তাঁর দিদি সোফিয়ার বান্ধবী। এ এক আশ্চর্য মেলবন্ধন। যে বাঁধন ছিড়েছিল জেনির মৃত্যুর পর। চার বছরের বড় দিদির বান্ধবী জেনির প্রতি তাঁর প্রেম তিনি গোপন করেন নি। সামাজিক। আর্থিক, খ্যাতি প্রতিপত্তিতে ব্যারন পরিবারের সাথে তাঁদের আকাশপাতাল পার্থক্য ছিল। ১৮৫০-১৮৫৮ পর্যন্ত প্রাশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন জেনির বড় দাদা। সেই পরিবারের অসামান্য সুন্দরী, বিদূষী, অভিজাত সমাজে যাঁর নিত্য যাতায়াত, সেই মধুর স্বভাবা, ব্যাক্তিত্বময়ী কন্যার পাণিপ্রার্থী হলেন কিনা অখ্যাত এক ছাত্র।

১৮৩৫ সালের অক্টোবর মাসে বন বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশাস্ত্র বিভাগে ভর্তি হলেন কার্ল মার্কস। একবছর শিক্ষালাভের পর চলে আসেন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বার্লিন যাত্রার আগে ১৮৩৬ সালের গ্রীষ্মকালে জেনি ফন ভেস্টাফালেনের সঙ্গে মার্কসের বাগদান অনুষ্টিত হয়। এই ঘটনা তাঁরা সাতবছর গোপন রাখতে বাধ্য হন। কারণ ভাবী বধূর জন্য না আনতে পারছেন কোন খেতাব বা সম্পদ – এমন এক ছাত্রের সঙ্গে অভিজাত মহলের নামকরা সুন্দরী মেয়ের পরিনয়ে জেনির প্রতিপত্তিশালী পরিবার বাধা দিতে পারতেন। মার্কসের সঙ্গে তাঁর মনের মিল ঘটার মূল কারণ তাঁর লক্ষ্যনিষ্ট স্বভাব, অপূর্ব বৃদ্ধিবৃত্তি ও উদার মনোভাব। সে কারনেই সমস্ত প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে মার্কসের প্রতি জেনির প্রবল গভীর অনুভুতি সমস্ত দ্বিধাকে উপেক্ষা করতে পেরেছিল।

এদিকে আবেগপ্রবণ মার্কস কঠোর বিজ্ঞানসাধনার সাথে সাথে সাহিত্য সাধনায় প্রচুর সময় ব্যয় করেন। তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে প্রিয়তমার প্রতি আকুল প্রেম, তাঁর জন্য তীব্র মনোবেদনা, আকুতি। তিনটি কাব্যগ্রন্থে যা উজাড় করে দিয়েছেন। ১ এবং ২ নামে প্রেমগ্রন্থ এবং ৩ নম্বরটি গীতিমালা। কাব্যগ্রন্থ দুটি প্রিয়তমা জেনি এবং ‘গীতিমাল্য’ উৎসর্গ করেছিলেন পিতাকে। ১৮৪৩ সালের ১৯শে জুন তাঁরা পরিনয়সূত্রে আবদ্ধ হন।

শুরু হয় এক অন্যন্য দাম্পত্যজীবন যা আর পাঁচটি পরিবারের সাথে মেলে না। “মানব জাতির জন্য কাজ করা” – যাঁর জীবনের মূলমন্ত্র, যে উক্তিটি তাঁর অন্যতম প্রিয় উক্তি, তিনি সেই লক্ষ্যেই অবিচল থেকেছেন সমগ্র জীবনব্যাপী। নানা দার্শনিকেরা এ বিশ্বকে নানাভাবে ব্যখ্যা করেছেন। কিন্তু আসল কথা হলো পরিবর্তন করা। এই বদলের আকাঙ্ক্ষাই সারা জীবন শ্রমিক আন্দোলঙ্কে শক্তিশালী করার কাজে তাঁকে নিয়োজিত রেখেছে। ১৮৪৮ সালে মার্কস-এঙ্গেলস রচনা করেন কমিউনিস্ট ইস্তেহার – যা চিরকালীন, যা অজেয়, যা ভাবীকালকে পথ দেখাবে। মার্কসের রাজনৈতিক এবং পারিবারিক সুহৃদ, নিঃস্বার্থ বন্ধু এঙ্গেলস সারা জীবন তাঁকে যে সাহায্য করেন তাঁর ভূমিকা বিরাট। লেনিন লেখেন – “এঙ্গেলসের নিরন্তর আত্মোৎসর্গপরায়ন সহায়তা না থাকলে মার্কস যে কেবল ‘পুঁজি’ শেষ করতে পারতেন না, তা নয়, দারিদ্রের চাপে পরে নির্ঘাত মারাই যেতেন।” – মার্কস-এঙ্গেলস, জার্মান ভাবাদর্শ। বহুবছর তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন শহরে কাটাতে হয়। কিন্তু হৃদয়ের বন্ধন ছিল অটুট।

অন্যন্য দার্শনিক, বিজ্ঞান সাধক, গণিতজ্ঞ কার্ল মার্কস ব্যক্তিজীবনের অঙ্কে পারদর্শী ছিলেন না। তাঁর আজীবন বন্ধু জেনি মার্কসও স্বামীর পথকেই অনুসরণ করেছিলেন। চরম দারিদ্র তাঁদের পিছু ছাড়েনি। অকল্পনীয় এক জীবন তাঁদের কাটাতে হয়েছে। ছিল না উপযুক্ত খাদ্য, বিশ্রাম, নিশ্চিন্ত জীবন। রাজরোষে পড়ে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গা ছুটে বেড়াতে হয়েছে জীবনের দীর্ঘসময়। ব্রাসেলস থেকে প্যারিস, লন্ডন, মাঝেমধ্যে হোটেল, দুকামরার ঘর – আলোহীন, স্যাঁতস্যাঁতে। না ছিল উপযুক্ত খাদ্য, বিশ্রাম। জেনি জন্ম দিয়েছেন সাত সন্তানের। এক পুত্র ও ছয় কন্যা। মেয়ের মৃত্যুর পর কফিন কেনার পয়সা পর্যন্ত ছিল না। ছোট্ট মৃতদেহটিকে পাশের ঘরে রেখে অপর সন্তানদের নিয়ে আকুল হয়ে কেঁদেছেন সারারাত, পরস্পরকে জড়িয়ে। দিনের আলো ফুটলে বন্ধুর কাছে ধার করে তাকে সমাহিত করা হয়। একমাত্র পুত্র যক্ষ্মায় মারা যায়। মানসিকভাবে প্রচন্ড আঘাত পেয়েছেন মার্কস দম্পতি। চারটি সন্তানের মৃত্যু যন্ত্রনা সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়েছে তাঁদের। অসহনীয় দারিদ্রের চাপে পিতৃগৃহ থেকে পাওয়া রূপোর বাসনপত্র বন্ধকি কারবারীদের হাতে তুলে দিতে হয়েছে। নিজেদের শীতবস্ত্র, আসবাবপত্র পর্যন্ত মাঝেমধ্যে বন্ধক রাখতে হয়েছে। তবু তাঁরা অবিচল। কোনও শ্রমিকের দুঃখকষ্ট দেখলে নিজেদের অসুবিধা সত্বেও সাহায্য করেছেন বারবার।

সারা ইউরোপজুড়ে তখন চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা। শ্রমিকশ্রেণির পক্ষে প্রকাশিত পত্রিকা সরকার থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরিবার থেকে প্রাপ্য অর্থ দিয়ে পত্রিকার দায়ভার মিটিয়েছেন। একদিকে রাজনৈতিক কাজকর্ম পরিচালনা করা, পত্রিকা প্রকাশনা, প্রচার পুস্তিকা তৈরী করা – সব কাজ একসঙ্গে করেছেন। ১৮৬৪ সালে মহান আন্তর্জাতিক শ্রমিক সঙ্ঘ গঠনে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। ১৮৭২ সাল পর্যন্ত যা টিকে ছিল। বেলজিয়ামে যখন বিপ্লবী পরিস্থিতি দানা বেঁধে উঠেছে, শ্রমিকশ্রেণি সংগঠিত হচ্ছেন। কার্ল মার্কস শুধু চিন্তার জগতের খোরাক জোগাচ্ছেন না, অস্ত্রশস্ত্র কেনার কাজে অর্থের জোগান কিছুটা হলেও দিচ্ছেন তিনি। একথা জেনে তাঁর নামে গ্রফতারি পরোয়ানা শুধু নয়, তাঁকে গ্রেফতার কর হলো। অন্ধকার রাতে জেনি তাঁকে মুক্ত করার জন্য পাগলের মত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। জেনিকেও গ্রেফতার করে হাজতে পোরা হয়েছে। সারা রাত তাঁকে “নিরাশ্রয় ভিখারী” বংশপরিচয়হীন আর রাস্তার পতিতা মেয়েদের সাথে আটক করা হয়। বুকচাপা গুমরানো কান্না নিয়ে খুপরিতে ঢোকার পর আমার দুর্দশার সঙ্গী একটি দুঃখী মেয়ে আমার সঙ্গে তার শোবার জায়গাটা ভাগাভাগি করে নিতে চাইল। জায়গাটা ছিল শক্ত কাঠের তক্তার বিছানা।”….

জেনি ও কার্ল মার্ক্স

জেনি পরদিন সকালে তিনটি দুধের শিশুর কাছে যেতে পেরেছিলেন। মহান দার্শনিক ‘পুঁজি’-র স্রষ্টা কয়েকদিন পর ছাড়া পেয়েছিলেন। জেনি ছিলেন এমনই একজন মহিলা যিনি স্বামীর আদর্শের প্রতি অবিচল নিষ্ঠায় জীবনের সমস্ত চাহিদাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছেন। জেনি কয়েক দশক ধরে মার্কসের সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দুঃসাধ্য হস্তলিপি পাঠোদ্ধার করে ‘পুঁজি’-র প্রথম খন্ডেরও কপি প্রস্তুত করেন। তিনি ছিলেন সুরুচিসম্পন্না, সাহিত্যবিদ ও শিল্পরসিক। সাহিত্য সমালোচনামূলক প্রবন্ধ ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন। রাশিয়া ও অন্যান্য দেশের শ্রমিক ও বিপ্লবী আন্দোলনের গতিবিধি জেনি গভীর সহানুভূতির সঙ্গে লক্ষ্য রাখতেন।

বারবার অসুস্থ হয়েছেন তাঁরা। দু:খকষ্ট ভাগ করে নিয়েছেন একে অপরের। সম্পর্কের বিশ্বস্ততা তাঁদের বেঁধে রেখেছিল আমৃত্যু। তাঁদের উভয়ের সম্পর্কের রসায়নের মূল কথাই হলো মার্কসের দর্শনের প্রতি তাঁর আস্থা ও বিশ্বাস।

দুজনেই ছিলেন আবেগপ্রবন, উদ্দীপনায়ভরা মানুষ। রাজনৈতিক বন্ধুদের আশ্রয়স্থল ও চর্চাকেন্দ্র ছিল তাঁদের আবাসস্থল। নানা আঘাতে জর্জরিত হওয়া সত্তে¡ও মার্কসের পরিবার ছিল সুখী পরিবার। হেলেন তেমুন ছিলেন তাঁদের পরিবারের আজীবন সুখ:-দু:খের সাথি।

১৮৮১ সালের ২রা ডিসেম্বর জেনির মৃত্যু তাঁদের পরস্পরকে বিচ্ছিন্ন করেছে। তাঁরও মানসিক মৃত্যু ঘটে ছিল। এক বৎসর পর বড় মেয়ে জেনির মৃত্যুশোক বহন করতে হয়।

মার্কস দেখে গিয়েছিলেন ১৮৭১ সালে ফ্রান্সে শ্রমিক বিপ্লব। টিকে ছিল মাত্র ৭১ দিন। মহান দার্শনিক কার্ল মার্কস কিন্তু ভবিষ্যবাণী করে গিয়েছেন – ”কমিউনের পতন হলেও কমিউনের আদর্শের পতন হয়নি।” বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ভিত্তিস্থাপক চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন ১৮৮৩ সালের ১৪ই মার্চ। মৃত্যুর সময় কোনও দেশেরই নাগরিক ছিলেন না। অথচ সারা বিশ্বেই তাঁর নাগরিকত্ব স্বীকৃত তাঁর বস্তুবাদী দর্শনের আলোকে।

শ্রমিক ও মালিকের তীব্র দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই মজুরি নির্ধারিত হয়। পৃথিবীর সব পুঁজিবাদী দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা একই সুতোয় বাঁধা। শোষক ও শোষিতের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক ছাড়া আর কোনও সম্পর্ক নেই। যত দিন মালিক ও শ্রমিক থাকবে ততদিন পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের পথ প্রদর্শক কার্ল মার্কসের নাম উচ্চারিত হবে।

পুর্নমুদ্রন

শেয়ার করুন