একালের শিক্ষা (ষষ্ঠ পর্ব)

প্রতীম দে
বর্তমানে বাজারে একটা ডিমের দাম ৭ টাকা। মে মাসের আগে প্রাথমিক স্তরে প্রতি পড়ুয়ার মাথাপিছু মিড ডে মিলের জন্য বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ ছিল ৬ টাকা ২৯ পয়সা, যা গত মাসে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৬ টাকা ৭৮ পয়সা।

ষষ্ঠ পর্ব
পড়ুয়াদের মুখের খাবারও কেড়ে নিচ্ছে তৃণমল
কেন্দ্রে বামপন্থীদের সমর্থন নিয়ে তৈরি হলো ইউপিএ ১ সরকার। সেই সরকারের সময় তৈরি হলো শিক্ষার অধিকার আইন। ভারতের প্রতিটা প্রান্তে শিক্ষ পৌঁছে দেওয়ার জন্য চালু হলো সর্বশিক্ষা মিশন। এই সর্বশিক্ষা মিশনের আওতায় শুরু হলো মিড ডে মিল প্রকল্প। সরকারি স্কুলের ছেলে মেয়েদের স্কুলে খাবার দেওয়া হবে। পুষ্টিকর খাবার। স্কুলেই হবে রান্না। তার জন্য লোক নিয়োগ করা হলো। এরাজ্যেও সেই প্রকল্পের চাকা গড়াতে শুরু করলো বামফ্রন্ট সরকারের আমলে।
মিড - ডে - মিল ও তৃণমূলের দুর্নীতি
স্কুলে স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যার চেয়ে বেশি দেখানো হচ্ছে মিড ডে মিলের সংখ্যা।
রাজ্যে ৮ হাজার ৩০টি স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। প্রতি বছর পাল্লা দিয়ে কমছে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা। অথচ সরকারি পরিসংখ্যান বলছে সম্পূর্ণ বিপরীত কথা। তবে এই পরিসংখ্যানের মধ্যে যে আসলের তুলনায় জলের ভাগই বেশি সেকথা সহজেই বোঝা যায় ২০২৪’র তুলনায় ২০২৫ সালে রাজ্যের বিভিন্ন জেলার স্কুলগুলির প্রাথমিক স্তরে মিড ডে মিল গ্রাহকের সংখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে।
উল্লেখ্য আগে প্রধানমন্ত্রী পোষণ শক্তি নির্মাণ কর্তৃক বরাদ্দ যে টাকা মিড ডে মিলের বাজার করা থেকে রান্নাবান্নার কাজে ব্যবহৃত হতো সেই টাকার দায়িত্ব থাকত সেলফ হেলফ গ্রুপের হাতে। কিন্তু সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়েছে যে, এখন থেকে রাজ্যের প্রত্যেকটি স্কুলের মিড ডে মিল সংক্রান্ত যাবতীয় নথি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী পোষণ শক্তি নির্মাণের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হবে এবং সেই নথি দেখভালের দায়িত্বে থাকবেন দু’জন করে ভারপ্রাপ্ত বা তত্ত্বাবধায়ক। তারাই মিড ডে মিলের আর্থিক লেনদেন এবং বাজার খরচের দায়িত্বপ্রাপ্ত হবেন। আর এখানেই কাজ করছে শাসক দলের প্রভাব। দেখা গিয়েছে ভুয়ো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সেই টাকা লুঠ করছে তৃণমূলের নেতারা।
এখানে বলে রাখা উচিত মিড ডে মিলের জন্য যেই টাকা স্কুল গুলোয় পাঠানো হয় তাতে কোন ভাবেই সম্ভব হয় না খরচ চালানো। বর্তমানে বাজারে একটা ডিমের দাম ৭ টাকা। মে মাসের আগে প্রাথমিক স্তরে প্রতি পড়ুয়ার মাথাপিছু মিড ডে মিলের জন্য বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ ছিল ৬ টাকা ২৯ পয়সা, যা গত মাসে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৬ টাকা ৭৮ পয়সা।
সাধারণত মিড-ডে মিলে সপ্তাহে দু'দিন ডিম পাওয়ার কথা পড়ুয়াদের। জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় সেটাও দিতে পারছে না স্কুলগুলি। পঞ্চায়েত ভোটের আগে গ্রামের মানুষদের মন পেতে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে মিড ডে মিলের খাদ্য তালিকা প্রকাশ করা হয়। যদিও সেই নির্দেশিকা ভোট মিটে যাওয়ার পর তুলে নেওয়া হয়। সেখানে ফল, মাংস দেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল। ২০২৩ এর জানুয়ারি থেকে সপ্তাহে প্রতি পড়ুয়া পিছু ২০ টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ করে পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার জোর প্রচারও চালিয়েছিল তৃণমূল। কিন্তু এখন রাজ্য সরকার তাদেরই তৈরি সেই 'স্পেশাল নিউট্রিশন ফান্ডে’ বা বিশেষ পুষ্টি তহবিলে টাকা দেওয়া বন্ধ করেছে। ফলে অর্থের অভাবে পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এ রাজ্যের ছাত্রছাত্রীরা।
মুরগির মাংস, ডিম তো দূর, পুষ্টিকর অন্য খাবারও জোগানো যাচ্ছে না। বাজার অগ্নিমূল্য হওয়ায় ফলে মিড-ডে মিল খাতে সরকারি বরাদ্দ না বাড়ায় ছাত্রছাত্রীদের মধ্যাহ্নভোজনে সুষম আহারের জোগান দিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা।
ভারত সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক ও জাতীয় প্রকল্পের পুষ্টি সহায়তার সংজ্ঞায় অনুযায়ী প্রাথমিক শ্রেণির শিশুর জন্য দৈনিক অন্তত ১২ গ্রাম ও ৪৫০ ক্যালরি আর উচ্চ প্রাথমিক শ্রেণির জন্য দৈনিক ২০ গ্রাম ও ৭০০ ক্যালরি ধার্য করতে হবে। এখনকার বাজারমূল্যে আনাজপাতি, মশলা, জ্বালানি (রান্নার গ্যাস অথবা কাঠকয়লা) সব জিনিস কিনে ছাত্রপিছু মাত্র ৬ টাকা ৭৮ পয়সায় যথাযথ পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার দেওয়া সম্ভব কিভাবে সেই প্রশ্ন শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত সব অংশের।
অন্যদিকে বেশিরভাগ স্কুলের শিক্ষকদের ক্ষোভ, মিড-ডে মিল প্রকল্পের বরাদ্দ অপর্যাপ্ত টাকাও নিয়মিত আসে না। ফলে সবজি ও মশলাপাতির দোকানে দীর্ঘকাল ধার-বাকি রাখতে হয়। অনেক দোকানি ধার রাখতে গররাজি হন।
শিক্ষকদের একাংশের কথায়, ২০০৪ সালে এ রাজ্যে মিড-ডে মিল প্রকল্প শুরু হয়। তারপর প্রাথমিক স্তরে ছাত্রছাত্রীদের স্কুলছুটের সংখ্যা কমেছে। প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন করতে মিড-ডে মিলের বিকল্প নেই। কিন্তু বর্তমানে এরাজ্যের যা হাল তাতে সরকার একপ্রকার হাত তুলে নিয়েছে এই প্রকল্প থেকে।
বঞ্চিত মিড ডে মিলের কর্মীরা
কেন্দ্র ও রাজ্যের বঞ্চনা ক্রমাগতই বেড়ে চলেছে মিড ডে মিল কর্মীদের প্রতি। যারা রন্ধন কাজের সাথে যুক্ত তারা ১২ মাসের বদলে বেতন পান ১০ মাসের। একজন মিড ডে মিল কর্মী যেই বেতন পায় সেখানে কেন্দ্র ও রাজ্যের দেয় মজুরি মিলিয়ে সাকুল্যে মাত্র ১৫০০ টাকা পান এ রাজ্যের মিড ডে মিল কর্মীরা, এর মধ্যে কেন্দ্র দেয় ৬০০ টাকা। কেরালায় এই ভাতা দৈনিক ৬০০ টাকা অর্থাৎ ১৮ হাজার টাকা মাসে, সেখানে উৎসব ভাতা সহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধাও আছে বেশ কিছু। পুদুচেরিতে এই ভাতা ১২ হাজার টাকা। হিমাচল এবং কর্ণাটকে ৪ হাজার করে। সুতরাং এটা পরিস্কার যে এ রাজ্যে কী ভীষণভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন মিড ডে মিল কর্মীরা। মুখ্যমন্ত্রী সবাইকে উৎসবে অংশ নিতে কিন্তু এরাজ্যের মিড ডে মিল কর্মীদের নেই কোন উৎসব ভাতা।
আগামীকাল সপ্তম বা অন্তিম পর্ব
প্রথম পর্ব লিঙ্ক
দ্বিতীয় পর্ব লিঙ্ক
তৃতীয় পর্ব লিঙ্ক
চতুর্থ পর্ব লিঙ্ক
পঞ্চম পর্ব লিঙ্ক
প্রকাশ: ২৪-অক্টোবর-২০২৫
শেষ এডিট:: 27-Oct-25 14:16 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/the-flaws-of-modern-education_6
Categories: Fact & Figures
Tags: #chortmc, kerala ldf govt, tmc, westbengal, , mid day meal, mid day meal scheme
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (150)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (133)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (78)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)
সাম্প্রতিক পোস্ট / Latest Posts
সমবায় প্রসঙ্গে
- ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন
“ এসো নির্মূল করি , স্বৈরাচারের ক্ষমতাকে ”
- সৌম্যদীপ রাহা
বাংলার বিকল্প পরিবেশ ভাবনা ও উন্নয়নের অভিমুখ
- সৌরভ চক্রবর্ত্তী
পশ্চিমবাংলার ক্রীড়ানীতি ও বিপল্প প্রস্তাব
- সুমিত গঙ্গোপাধ্যায়
তথ্য প্রযুক্তি এ আই আমাদের রাজ্যে সম্ভাবনা
- নন্দিনী মুখার্জি
প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি
- ওয়েবডেস্ক
.jpg)




