Site icon CPI(M)

The Standing Man: Manmathanath Sarkar

Kakababu

মুজফ্‌ফর আহমদ

অন্য রাজনীতিক পার্টিদের কথা বলার অধিকার আমার নেই – আমরা কমিউনিস্টরা কিন্তু কলকাতা পুলিস কোর্টে একটা হিমালয় পাহাড়ের আড়াল পেয়ে গিয়েছিলেম। যত প্রচণ্ড বেগেই ঝড় আসুক না কেন, তার ঝাপটা আমাদের গায়ে লাগার আগে এই পাহাড়ে প্রতিহত হয়ে বরাবর কমজোর হয়ে গেছে। গত ২৯শে জুলাই তারিখে কলকাতা পুলিস কোর্টের আমাদের এই হিমালয় পাহাড় হঠাৎ ধসে পড়েছে। কমরেড মন্মনাথ সরকার আর আমাদের ভিতর নেই। মাত্র ৬৮ বছর বয়সে একটি মহান জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল।

কমরেড মন্মথনাথ সরকারের সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক দিনের। তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯২৭ সালের কোনো সময়ে হয়েছিল, কিংবা ১৯২৮ সালের শুরুতে তা ভালো করে মনে নেই, তবে একথা মনে আছে যে তাঁর প্রথম বারের বিনা বিচারের বন্দীদশা হতে মুক্তি পেয়ে আসার পরেই তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল। তরুণ যুবক মন্মথনাথ এম. এ. আর ল’ পাস করে সবে আদালতে নাম লিখিয়েছেন, এমন সময়ে আরম্ভ হ’ল দক্ষিণেশ্বরের বোমার মামলা। তিনি সেই মোকদ্দমার তদবীর করলেন। সেটাই তাঁর ওকালতি জীবনের প্রথম মামলা ছিল কিনা তা জানিনে। কিন্তু কথায় আছে “বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা।” মন্মথনাথ সরকার বেঙ্গল ক্রিমিনল ল’ এমেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট অনুসারে বিনা বিচারে বন্দী হলেন। বাঙলাদেশের সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী আন্দোলনকে দমন করার জন্যে এই আইনটি পাস হয়েছিল। মন্মথনাথ এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না এমন কথা বলা যায় না, তবে কাজে তো তিনি করেছিলেন শুধু দক্ষিণেশ্বরের মামলার তদবীর।

১৯২৭-২৮ সালে কিছু সংখ্যক সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী তাঁদের নিজেদের পথ না ছেড়েও আমাদের সঙ্গে, অর্থাৎ কমিউনিস্টদের সঙ্গে অল্প অল্প মেলামেশা করতেন। তাঁদের মনে কিঞ্চিৎ দোদুল্যমানতা এসেছিল একথা বলা যায়। ঠিক এইভাবেই মন্মথনাথ সরকারও আমাদের সঙ্গে মিশেছিলেন। ফাল্গুন দাসের গলিতে তাঁর বাসায় আমি তখন গিয়েছি। তাঁর বাবার সঙ্গেও আমার দেখা হয়েছে। ১৯২৯ সালের মার্চ মাসে মীরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমায় গিরেফতার হয়ে মীরাটে চলে যাওয়ার পরে আবদুল হালীম আমায় খবর দিয়েছিলেন যে মন্মথনাথ সরকার আমাদের মামলা-মোকদ্দমাগুলির তদবীর করছেন। গণ-আন্দোলনের কর্মীদের, বিশেষ করে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের কর্মীদের উপরে পুলিসের জুলুমের কোনো অস্ত থাকে না। ব্রিটিশ আমলে এ জুলুম তো হতোই, ‘স্বাধীনতার’র আমলে তার মাত্রা আরও বেড়েছে। আমাদের কর্মীদের ধরা পড়ে কোনো না কোনো সময়ে কলকাতার পুলিস কোর্টে যেতেই হয়। কলকাতার বাইরেও তাঁরা ধরা পড়ে বাইরের কোর্টগুলিতে যান। কোনো কোনো সময়ে একটি মোকদ্দমা দু’বছর ধরে চলে। তার পরে পুলিস একদিন মোকদ্দমা তুলে নেয়।

ঊনিশ’শ ত্রিশের দশকে সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরা যখন বিনা-বিচারে বন্দী হলেন তখন তাঁরা বিভিন্ন জেলে ও বন্দী-নিবাসে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী সাহিত্যের পড়াশুনার ভিতর দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির দিকে ঝুঁকে পড়তে থাকেন। মন্মথনাথ সরকারও এই সময়ে ধরা পড়ে রাজপুতনার দেউলী বন্দী-নিবাসে গিয়েছিলেন। তিনি তো আগে হতেই কমিউনিস্ট পার্টির দিকে ঝুঁকেছিলেন। দেউলীতে গিয়ে পার্টির প্রতি তাঁর আকর্ষণ আরও বেড়ে যায়। তবুও তাঁর মনে অল্প দিনের জন্যে একটা কিন্তুর সৃষ্টি হয়েছিল। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী ভাইরা হাতের বাইরে চলে যাচ্ছেন দেখতে পেয়ে সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী দাদারা (নেতারা) এত বেশি বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন যে তাতে মন্মথনাথ সরকারের মনেও সাময়িক দুর্বলতা সঞ্চার হয়েছিল। তবে অল্প দিনের ভিতরেই তিনি তাঁর সেই দুর্বলতা মনে হতে ঝেড়ে ফেলে দিতে পেরেছিলেন।

১৯৩৭ সালে যে বেশি সংখ্যায় ডেটেনিউরা মুক্তি পেতে আরম্ভ করেছিলেন তার অনেক আগে কমরেড মন্মথনাথ মুক্তি পেয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গেই কলকাতার পুলিস কোর্টে তিনি রাজনীতিক কর্মীদের মামলার তদবীর শুরু করেছিলেন এবং বিশেষভাবে শুরু করেছিলেন কমিউনিস্ট কর্মীদের মামলার তদবীর।

১৯২৯ সালে আমি মীরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমার সংস্রবে ধরা পড়েছিলেম তারপরে মুক্তি পেয়ে এসেছিলেম ১৯৩৬ সালের জুন মাসের শেষ সপ্তাহে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি তখনও বে-আইনী প্রতিষ্ঠান। আমি মার্কামারা লোক হয়ে গিয়েছিলেম। আমার ছাড়া পাওয়ার ফলে সুবিধা হলো এই যে অন্য রাজনীতিক মতের যাঁরা জেলে ও বন্দী-নিবাসে কমিউনিস্ট হয়েছিলেন তাঁরা আমার নিকটে এসে আমাদের পার্টিতে (ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে) যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করতে লাগলেন। অন্য মুক্ত বন্দীদের সঙ্গে কমরেড মন্মথনাথ সরকারও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেওয়ার বিশেষ বাসনা আমাকে জানিয়ে গিয়েছিলেন। তখনও অবশ্য তিনি কলকাতা পুলিস কোর্টে পার্টি সভ্যদের ও মজদুরের মামলাগুলির পরিচালনা করছিলেন। এবার আনুষ্ঠানিকভাবে পার্টি সভ্য হলেন তিনি।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে গবর্নমেন্ট তাকে নদীয়া জিলার মাজদিয়ার নিকটবর্তী একটি গ্রামে তাঁর নিজের বাড়িতে আটক করে রেখেছিলেন। কিছুদিন পরে তাঁকে অবশ্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

কলকাতা পুলিস কোর্টের একজন এডভোকেট হিসাবে কমরেড মন্মথনাথ সরকার কমিউনিস্ট পার্টির ও মজুর আন্দোলনের যে-সেবা করেছেন তার কোনো তুলনা হয় না। তিনি সর্বদা বাতের ব্যায়রামে ভুগতেন। তার জন্যে কমিউনিস্টদের ও মজুরদের মোকদ্দমার তদবীর হয়নি একথা কেউ বলতে পারবেন না। এ ব্যাপারে তাঁর নিজের স্বাস্থ্য থাকল, না ভেঙে পড়ল সেদিকে তিনি কখনও নজর দেননি। মজুরদের ও কমিউনিস্টদের মোকদ্দমা থাকলে কোর্টে তাকে যেতেই হবে – এই ছিলেন মন্মথনাথ সরকার। কলকাতা পুলিস কোর্টের কোনো মোকদ্দমা হলে আমরা ভাবতে অভ্যস্ত হয়েছিলেন যে ‘ও তো মন্মথনাথ সরকারের কাজ, তিনি যা ভালো বুঝবেন, করবেন। কোনো বিশেষ কিছু করণীয় থাকলে তিনি আমাদের নিকটে খবর পাঠাতেন। তা না হলে তাঁর কাজ তিনিই করে যেতেন। অনেক সময়ে কোনো কোনো কমরেডের গিরেফতারের খবর তিনিই প্রথম আমাদের জানাতেন। একজন কমরেডকে পুলিস হয়তো রাস্তা থেকেই গিরেফতার করে নিয়ে গেল। না পেলেন খবর তাঁর কর্মস্থলের সাথীরা, না জানালেন কিছু তাঁর বাড়ির লোকেরা, কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টার ভিতরে তাঁকে তো কোর্টে হাজির করতেই হবে। সেখানে মন্মথনাথ সরকার রয়েছেন।

কমিউনিস্ট পার্টি মন্মথনাথ সরকারকে কোনো পুরস্কার দিতে পারেনি। তিনি পার্টির কর্মশীল সভ্য ছিলেন। পুরস্কার তিনি নিতেই বা যাবেন কেন? তবুও ১৯৫২ সালের প্রথম নির্বাচনের সময়ে তাঁকে কমিউনিস্ট পার্টির তরফ হতে ডক্টর বিধানচন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো সাব্যস্ত হয়েছিল। তিনি আর ডক্টর রায় একই পাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। তখন ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতা কমরেড সত্যপ্রিয় ব্যানার্জিকে উত্তরপাড়ার আসন দেওয়া হয়েছিল। সেখানে আমাদের পার্টির সভ্যরা তাঁর পক্ষে কাজও করেছিলেন। তিনি যদি সেখানে টিকে থাকতেন তবে নিঃসন্দেহে জিতেও যেতেন। তাঁর উত্তরপাড়া ছেড়ে যাওয়ার পরে কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড মনোরঞ্জন হাজরা ওই আসনটি সহজেই জিতে নিয়েছিলেন। কিন্তু ফরওয়ার্ড ব্লক আমাদের সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট গঠন করার সুযোগ নিয়ে দাবি করে বসলেন ডক্টর বিধানচন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে তাঁদেরই লড়তে দিতে হবে এবং কমরেড সত্যপ্রিয় ব্যানার্জি তাঁদের প্রার্থী। আমাদের তরফ থেকেও বৌবাজারের আসনে কমরেড মন্মথনাথ সরকারের পক্ষে কাজ আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল, ভোটারের তালিকাও কেনা হয়েছিল। তবুও তথাকথিত যুক্তফ্রন্টের দাবি মেটানোর জন্যে আমাদের নিবৃত্ত হতে হল। কমরেড সত্যপ্রিয় ব্যানার্জি বৌবাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে হেরে গেলেন। কমরেড মন্মথনাথ সরকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে গেলেও কমরেড মহম্মদ ইসমাইলের মতো অতি অল্প ভোটে হারতেন।

এই এলাকায় তাঁর ব্যাপক পরিচিত ছিল। তা ছাড়া, পুলিস কোর্টের উকিলেরা তাঁর হয়ে খাটতে ও নির্বাচনের খরচ জোগাতে প্রতিশ্রুত ছিলেন। আমরা দেখেছি সারা জীবন তাঁর রাজনীতিক ত্যাগ স্বীকারের জন্যে কলকাতা পুলিস কোর্টে তিনি সকলের শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। রাজনীতিতে যাঁরা তাঁর সঙ্গে একমত নন তাঁরাও তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন।

মন্মথনাথ সরকার অবিবাহিত ছিলেন। আত্মীয়ের মৃত্যুতে, সহকর্মীর মৃত্যুতে মানুষ ভাবপ্রবণ হয়ে ওঠে। এই ভাবপ্রবণতার মূল্য আমার নিকটে বড় বেশি। কিন্তু দুর্ভাগ্যই বলতে হবে, আমার মন যে আজ কত বেদনা-জর্জর হয়ে আছে তা ভাষায় রূপ দেওয়ার ক্ষমতা আমি কোনো দিন আয়ত্ত করতে পারলাম না। এই ব্যাপারে বোবাই রয়ে গেলাম চিরদিন।

* ১৯৬৬ সালে নন্দন পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যায় এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়। সেই লেখার শিরোনাম ছিল ‘আমাদের মন্মথনাথ’। মন্মথনাথ সরকার ছিলেন পার্টির সেইরকম কর্মী যাদের ছাড়া পার্টির কাজ চলে না অথচ নিজস্ব স্বকীয়তার কারণেই তারা কিছুটা আড়ালেই রয়ে যান। এহেন কমরেড মন্মথনাথের স্মৃতিকথা লিখতেই কলম ধরেছিলেন মুজফ্‌ফর আহমদ, আজ কাকাবাবুর ১৩৫-তম জন্মদিবসে তাঁর সেই লেখাই রাজ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হল। মূল রচনার বানান অপরিবর্তিত রাখা হল, ওয়েবসাইটে ব্যবহৃত শিরোনামটি ওয়েবসাইট টিমের পক্ষে নির্ধারিত। ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রকাশিত মুজফ্‌ফর আহমদ নির্বাচিত প্রবন্ধ সংকলন থেকে লেখাটি সংগৃহীত।   

Spread the word