Site icon CPI(M)

The Last of Mahatma: A Retrospect (Part II)

Gandhi's Last Day 2

সৌভিক ঘোষ

হত্যার প্রথম পরিকল্পনা

১৯৪৮ সালের ২০শে জানুয়ারি। সবে সকাল হয়েছে, দিল্লী শহরের চারপাশ বড় উজ্জ্বল, বড় স্বচ্ছ। সকালে প্রকাশিত সবকটা খবরের কাগজে প্রথম পাতা জুড়ে মহাত্মা গান্ধীর স্বাস্থ্যের হাল হকিকত। তিনি তখন অনশন ভঙ্গ করেছেন কিছুদিন হল। অবশ্য যারা খুঁটিয়ে কাগজ পড়ে তারা বুঝল সেই সময় দেশের রাজনীতি সম্পর্কে গান্ধী যে অবস্থান নিয়েছেন তার কোনো কিছুই আর খবর নয়।

সপ্তাহের অন্যান্য কাজের দিনের মতো সেদিনও দিল্লির কোনৌট প্লেস এবং চাঁদনী চকে ক্রমশ ভিড় বাড়ছে।জহরলাল নেহেরুর সরকারি আবাস বিড়লা হাউজের খুব কাছে, গান্ধী রয়েছেন সেখানেই। দিল্লিতে শান্তি না ফেরা অবধি অনশন ভঙ্গ করবেন না বলে হুশিয়ারি দিয়েছিলেন মহাত্মা, দিল্লি শহর তাই বোধহয় কিছুটা শান্ত।

সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ বিড়লা হাউজের বড় গেটের সামনে একটি ট্যাক্সি এসে দাঁড়ালো। গাড়ির ভিতরে ছিলেন চারজন – গেটে দ্বাররক্ষক সেই গাড়ি আটকে দেন, তাদের উপস্থিতির কারণ জিজ্ঞাসা করলে একজন জানান তারা বিড়লা হাউজে সচিবের সাথে দেখা করতে এসেছেন। দ্বাররক্ষক সচিবের কাছে সাক্ষাতের অনুমতি আনতে ভিতরে গেলে চারজনে নিজেদের পরিকল্পনা বদলে ফেলেন, গাড়ি ঘুরে বিড়লা হাউজের পিছনের গেটে এসে দাঁড়ায়। ট্যাক্সি থেকে নেমে চারজন ভিতরে প্রবেশ করেন। এই এলাকাটি মূলত বিড়লা হাউজের কর্মচারীদের থাকার জন্য বরাদ্দ ছিল, সারি সারি ঘর এবং এক পাশে একটি লম্বা পথ। তারই শেষপ্রান্তে মহাত্মা গান্ধীর প্রার্থনা কক্ষ। একটি ছোট মঞ্চ এবং তার সামনে জনাবিশেক লোকের বসার মত জায়গা। এখানেই গান্ধী প্রতিদিন এসে বসেন, মানুষের সাথে কথা বলেন, তাদের ভরসা দেন। অনশন বন্ধ করলেও তার শরীর আর আগের মত নেই, যদিও প্রতিদিন তিনি একটু একটু করে আগের মত শক্তি ফিরে পেতে চেষ্টা করছেন। তবুও দুজনের কাঁধে ভর না দিয়ে চলাফেরা করার মত ক্ষমতা তার নেই। দিনের একটা সময় নিজের ঘরের জানলা দিয়ে তিনি দেখেন সারাদিন ধরে কতই না মানুষ তাকে দেখতে আসছে, তার সাথে কথা বলতে আসছে – এদের সকলের কাছে তিনি মহাত্মাই হয়ে উঠেছেন। সেইদিন সকালে জানলা দিয়ে তিনি ঐ চারজনকে দেখতে পেয়েছিলেন কিনা জানা নেই, তবে দেখতে পেলেও মহাত্মা হৃদয় ঘাতক চিনতে ব্যর্থ হতই একথা নিশ্চিত। মানুষের মুখের দিকে চেয়ে তাদের দুঃখ-যন্ত্রণার কথা তিনি যতটা সহজে উপলব্ধি করতেন, সাধারণের ছদ্মবেশে প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে উপস্থিত ষড়যন্ত্রী চিনে নেবার মত সন্ধিগ্ধ মন তার কোনদিনই ছিল না। তিনি সকলকে বিশ্বাস করতে পারতেন। মহাত্মা চরিত্রের সবচেয়ে উন্নত গুন এবং চরম দুর্বলতা একই।

আততায়ী

নাথুরাম গডসে – তার আসল নাম ছিল নারায়ন। একের পর এক কয়েকটি পুত্র সন্তানের মৃত্যু হলে সদ্যজাত পুত্রকে ঈশ্বরের  রোষ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে মেয়ে সাজিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে তার মা বাবা ছোট বয়সে তার নাকে নথ পরিয়ে দেন, সেই থেকে নাম হয় নাথুরাম। কম বয়সেই স্কুলের পড়াশোনা ছেড়ে দেন, ছোটোখাটো কাজ করতে শুরু করেন। পারিবারিক সংস্কার এবং কম বয়স থেকে কাজে যুক্ত হবার ফলে যাদের সাথে পরিচয় হয় সেই অনুসঙ্গেই মনের মধ্যে হিন্দু জাগরণ সম্পর্কে দৃঢ় ধারনা বসে যায়। একইসাথে মুসলমান বিদ্বেষ হয়ে ওঠে প্রবল। একটা সময় মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে খুবই উচ্চ ধারনা পশন করতেন – হিন্দু মহাসভা এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ গড়ে উঠলে তাতে যোগ দেন। নিজের উদ্যোগেই ইংরাজি শেখেন এবং একটি খবরের কাগজ বের করতে শুরু করেন। এই কাগজ প্রকাশ করার সময়েই পরিচয় হয় নারায়ন আপ্তের সাথে। নাথুরামের ভাই গোপাল গডসেও এই পরিকল্পনার অংশ ছিলেন, বিবাহিত বলে নাথুরাম তাকে এবং নারায়ন আপ্তেকে মহান কাজের ‘দায়িত্ব’ থেকে মুক্তি দেবার সিদ্ধান্ত নেন। বিনায়ক দামোদর সাভারকরকে নিজের গুরু মনে করতেন, ওনার হাত ধরেই বলা চলে নাথুরামের রাজনৈতিক সৈনিক হিসাবে জীবন শুরু হয়। ফাঁসি হবার পরে গোপাল গডসে নিজের অগ্রজের বলে যাওয়া কথা অনুসারে একটি বই লেখেন – তাতে অবশ্য উল্লেখ ছিল নাথুরাম এবং তার সঙ্গীসাথিরা যখন গান্ধী হত্যার সমস্ত পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে সাভারকরের আশীর্বাদ নিতে হিন্দু মহাসভার দপ্তরে গিয়েছিলেন তিনি সরাসরি কিছুই বলেন নি। ততদিনে নাকি সাভারকরকেও নাথুরাম আপোষপন্থি নেতা বলে চিহ্নিত করে ফেলেছিলেন। শুধু ‘বিজয়ী হও’ বলে সাভারকর সেদিন তাদেরকে বিদায় দিয়েছিলেন।

প্রবল আত্মপ্রত্যয় নিয়েই নাথুরাম গডসে মহাত্মা গান্ধীকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবার পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রথম প্রচেষ্টা ব্যার্থ হলে সিদ্ধান্ত বদল করেন, তার আগে অবধি তিনি দলগত পরিকল্পনায় গান্ধী হত্যার ছক কষেছিলেন। ২০শে জানুয়ারির সেই বোমা বিস্ফোরণের পরেও যখন গান্ধীকে হত্যার চেস্টা বিফল হল নাথুরাম নিজে একাই সেই কাজকে শেষ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তার দলে তিনিই ছিলেন নেতা – বাকিরা নির্দ্বিধায় তার কথামতো কাজ করতেন, তাকে অনুসরন করতেন। এই দলটির প্রথম থেকেই সিদ্ধান্ত ছিল মহাত্মার মুসলমান প্রীতি ভারতের দুর্দশার কারন – এই অপরাধেই গান্ধীকে কিছুতেই বেঁচে থাকতে দেওয়া চলে না। প্রথম থেকে এই লক্ষ্য নিয়েই তারা কাজ করেছেন। কোন কোন লেখক নাথুরামের হাতে এই হত্যাকান্ডকে সাময়িক উত্তেজনার ফল বলে দেখাতে চেয়েছেন – আদৌ এমনটা ছিল না। গান্ধী হত্যা একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল – নাথুরাম সেই রাজনীতিরি একজন নেতৃত্ব হিসাবে সেই কাজ সমাপন করেন।

বোমা বিস্ফোরণ

ছোট গেট দিয়ে ঢোকার পরে তারা এগিয়ে গেলেন প্রার্থনা কক্ষের দিকে। ইতস্তত কয়েকজন ঘোরাফেরা করছিলেন, কেউই খেয়াল করলেন না চারজন সকলের চোখের সামনে মহাত্মা গান্ধীকে খুন করবার পরিকল্পনা করছে।

প্রার্থনা সভার পিছনের দেওয়ালে ইঁটের গাথুনিতে কিছু ফাঁক রাখা, হাওয়া চলাচলের উদ্দেশ্যে। নারায়ণ আপ্তে এবং তার সাথীরা সেই ফাঁক দিয়েই গান্ধীর পিঠ লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। পরিকল্পনা হলো একদিকে বোমা নিক্ষেপ করে উপস্থিত জনতাকে সন্ত্রস্থ করে দেওয়া হবে এবং একই সাথে গুলি করে গান্ধীকে মেরে ফেলা হবে। বোমা ছুঁড়বে মদনলাল পাওয়া। কাজ শেষে সবাই হতচকিত জনতার ভিড়ে মিশে যাবেন এবং সুযোগ বুঝে বিভিন্ন দিক দিয়ে বিড়লা হাউজ ছেড়ে বেরিয়ে যাবেন।

এই সময় হিন্দু মহাসভার দপ্তরে গোপাল গডসে আপ্তে এবং তার সঙ্গীদের জন্য অপেক্ষায় রয়েছেন। দপ্তরের পিছন দিকে কিছুটা জায়গা রয়েছে, গাছগাছালি ভরা। সেখানেই তারা দুটি রিভলবার পরীক্ষা করেছিলেন। একটি রিভলবার জোগাড় করেছিলেন গোপাল গডসে, এটি সার্ভিস রিভলভার ছিল। পরিচিত এক বন্ধুর থেকে আরেকটি আগ্নেয়াস্ত্র জোগাড় করেন দিগম্বর বাদগে। দুটি রিভলবারেই কিছু যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল। গোপাল গডসে যে রিভলবার আনেন তার গুলি ভরার চেম্বারে সমস্যা দেখা দেয়, আরেকটিতে লক্ষ্যভেদ করার অনেক আগেই গুলির উপযুক্ত গতিবেগ হারিয়ে যাচ্ছিল। এই দুটি আগ্নেয়াস্ত্র উপযুক্ত অবস্থায় ব্যবহারযোগ্য করে তোলার দায়িত্ব পড়ে গোপাল গডসের উপরে। ঐদিন সকাল এগারোটা নাগাদ রিভলভার দুটির পরীক্ষা করার সময় স্থানীয় রক্ষী মেহর সিং তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন, যদিও হাতেনাতে ধরা পড়ার আগেই আগ্নেয়াস্ত্র দুটি লুকিয়ে রাখা হয়। সেই রক্ষীর প্রশ্নের উত্তরে পর্যটক বলে তারা নিজেদের পরিচয় দেন। শেষ অবধি গোপাল গডসে রিভলবার দুটি মেরামত করতে পারেন নি। এর ঠিক ৬ ঘণ্টা পরেই গান্ধীর উপরে আক্রমণ হয়।

সকাল গড়িয়ে বিকাল হলে কোনৌট প্লেসের মেরিন হোটেলের ঘরে এরা সবাই জড়ো হন। অ্যাটাচড বাথরুম সমেত একটি ছোট ঘর নাথুরাম গডসে এবং নারায়ন আপ্তে ভাড়া নিয়েছিলেন। হোটেলের রেজিস্টারে তাদের নাম লেখা ছিল এস দেশপান্ডে এবং এম দেশপান্ডে। এই ঘরে বসেই মহাত্মা গান্ধী হত্যাকাণ্ডের শেষ মুহূর্তের পরিকল্পনা সংগঠিত হয়েছিল। এই সময় পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন নারায়ন আপ্তে, মাথার যন্ত্রণায় কাতর নাথুরাম গডসে হোটেলের বিছানায় শুয়ে ছিলেন। পরিকল্পনা যখন শেষের দিকে তখন একবার নাথুরাম গডসে বিছানা থেকে উঠে বসেন এবং বলেন ” এই আমাদের শেষ সুযোগ… কিছুতেই ব্যর্থ হওয়া যাবে না, প্রত্যেকেই খেয়াল রাখুক – কোন ভুল যেন না হয় “।

এদের সবার মধ্যে পরিকল্পনার প্রথম দিকে গান্ধীর উদ্দেশ্যে কে গুলি চালাবেন সেই নিয়ে নানান চিন্তা ভাবনা ছিল, আগ্নেয়াস্ত্র সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞতা ছিল দিগম্বর বাগদের। নতুন নাম, পরিচয় ব্যবহার করা এবং দ্রুত পোশাক পাল্টে ফেলার পরিকল্পনা ছিল নারায়ন আপ্তের। একটি হাফ স্লিভ শার্ট এবং খাকি হাফপ্যান্ট ছিল নাথুরাম গডসের পোশাক। আপ্তে নিজের জন্য একটি ট্রাউজার এবং গাঢ় নীল রঙের কোট বেছে নেন। বিষ্ণু কারকারে ধুতি, নেহেরু শার্ট এবং গান্ধী টুপি পরেন এবং কপালে তিলক কেটে নিজেকে ব্রাহ্মণের বেশভূষায় সাজিয়ে তোলেন। কারকারের উপরে দায়িত্ব ছিল বিড়লা হাউজের ভিতরে কর্মচারীদের কোন একজনের ঘরে নিজেদের জায়গা বন্দোবস্ত করা। সেই কাজে ছোটা রাম নামে বিড়লা হাউজের এক কর্মচারীকে তিনি রাজি করান। ততক্ষণে আরো একবার হত্যার পরিকল্পনায় বদল হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে মহাত্মা গান্ধীকে সামনে থেকে গুলি করার। বোমা ছুড়ে উপস্থিত সবাইকে হতচকিত করে দিয়ে গান্ধীর সামনে এসে দাঁড়াতে হবে এবং গুলি চালাতে হবে – নাথুরাম গডসে ঘোষণা করেন, কঠিন হলেও মৃত্যু সম্পর্কে একশো শতাংশ নিশ্চিত হওয়া যায় এমন অন্য কোনো উপায় নেই।

বিকাল ৫টা বেজে দশ মিনিটে দিগম্বর বাদগে এবং শংকর কিষ্টাইয়া যখন বিড়লা হাউজে হাজির হলেন, ততক্ষণে প্রার্থনা শুরু হয়ে গেছে। মদনলাল পাওয়া বোমা ছুঁড়ে ছিলেন ঠিকই কিন্তু উপস্থিত সবার মধ্যে যেমন কোলাহল এবং হতচকিত অবস্থার কল্পনা তারা করেছিলেন তার কিছুই হল না! বোমা বিস্ফোরণের পরেও প্রার্থনা চলতে থাকলো, দুচারজন শুধু আওয়াজ শুনে দেখতে এলেন এবং পুলিশ খুবই দ্রুততার সাথে এলাকাটি ঘেরাও করে ফেলে। নাথুরাম গডসে, গোপাল গডসে, বিষ্ণু কারকারে এবং নারায়ণ আপ্তে কোনরকমে ট্যাক্সি চেপে পালিয়ে যান। পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন শুধু মদনলাল পাওয়া।

এই ঘটনার দিন দশেক আগে ড: জৈন এর সামনে মদনলাল এমন কিছু কথা বলেছিলেন যাতে আন্দাজ করা যায় দেশভাগ এবং দাঙ্গায় পরিবার হারানোর ভয়ানক যন্ত্রণা তাকে এক ভীষন রাগী মানুষে বদলে দিয়েছে। সেই ভয়ানক রাগ পুঞ্জীভূত হয়েছে মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে। এরই সাথে তিনি ডাক্তার যে জানিয়েছিলেন তার নতুন সঙ্গীদের কথা, তাদের সম্ভাব্য বিরাট পরিকল্পনার কিছু টুকরো হদিস। পরেরদিন খবরের কাগজে ড: জৈন এই বোমা বিস্ফোরণের খবর এবং পাওয়ার গ্রেফতারির খবর দেখে ডাক্তার সারাদিন সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে টেলিফোন করে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করেন। জয়প্রকাশ নারায়ণের সাথে একটুর জন্য দেখা হল না তার, বল্লভ ভাই প্যাটেল বম্বেতে থাকলেও তার সাথে কথা বলা গেল না। সেদিন যদি ডাক্তার জৈন সঠিক জায়গায় নিজের যতটুকু জানা এবং বোঝা সেকথা পৌঁছাতে পারতেন তাহলে হয়ত প্রথমবার আততায়ীদের ব্যর্থতার পরে দ্বিতীয় আক্রমণের আগেই তাদের সবাইকে গ্রেফতার করা যেত। নাথুরাম গডসের ছোঁড়া গুলিতে হয়ত গান্ধীকে মরতে হতো না। কিছুটা আশ্চর্যের হলেও একথা সত্যি ডাক্তার জৈন কিছুতেই খবর পাঠাতে পারলেন না। কোনক্রমে মোরারজি দেশাই অবধি তিনি পৌঁছাতে পেরেছিলেন বলে তিনিপরবর্তীকালে দাবি করেন। কিন্তু ডাক্তার জৈন এর বলা সম্ভাব্য বিপদের কথা মোরারজি দেশাই আদৌ বিশ্বাসযোগ্য মনে করেননি।

২০ শে জানুয়ারির সেই ব্যর্থ প্রচেষ্টার দিনই রাতের ট্রেন ধরে দিগম্বর বাড়গে এবং শংকর কিষ্টাইয়া পুনায় চলে যান। নাথুরাম গডসে এবং নারায়ণ আপ্তে চলে গেলেন বোম্বেতে। গোপাল গডসে এবং বিষ্ণু কারকারে দিল্লির ফ্রন্টিয়ার হোটেলের ঘরে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। সেদিনের ব্যর্থ প্রচেষ্টা এদের কাউকেই হতাশ করেনি, বরং গান্ধী হত্যার উদ্দেশ্যে তারা আরো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন।

২৬ শে জানুয়ারি বোম্বের থানে এলাকার রেলওয়ে ফ্রেইট করিডোরে তিনজন – নাথুরাম গডসে, নারায়ণ আপ্তে এবং বিষ্ণু কারকারে রাতের আঁধারে একে অন্যের সাথে আলোচনায় বসেন। গডসে জানান এভাবে নয় দশজনকে সাথে নিয়ে হত্যার পরিকল্পনার সঠিক নয়, কোন একজনকেই এই কাজে সফল হতে হবে। তিনি নিজেই জানান – একাই সেই কাজকে পরিণতি দিতে তিনি প্রস্তুত। আরো বলেন গান্ধী হত্যার পরিকল্পনা থেকে নিজের ভাই গোপাল গডসেকে অব্যাহতি দিতে চান। পরেরদিন ভোরবেলায় নাথুরাম এবং আপ্তের বোম্বে থেকে দিল্লিতে ফেরার বিমানের টিকিট বুক করাই ছিল। সিদ্ধান্ত হয় বিষ্ণু কারকারে ট্রেনে করে দিল্লি পৌঁছবেন এবং ২৯ শে জানুয়ারি দুপুরবেলায় বিড়লা মন্দিরে তারা একে অন্যের সাথে দেখা করবেন। বিড়লা মন্দির সেই সময় বহজনের জন্য দর্শনীয় স্থান ছিল তাই ভিড়ের সুযোগ নিতে অসুবিধা ছিল না।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৭ শে জানুয়ারি গডসে এবং আপ্তে দুপুর ১২ টা বেজে চল্লিশ মিনিটে দিল্লিতে পৌঁছান।  প্লেনে চাপার আগে বিমানবন্দরে গডসে নিজেকে পরিচয় দেন এন বিনায়ক রাও বলে, আপ্তে নিজের পরিচয় দেন ডি নারায়ন হিসাবে। মনে রাখা উচিত এই দুজনের পুরো নাম ছিল নাথুরাম বিনায়করাও গডসে, এবং নারায়ণ দত্তাত্রেয় আপ্তে। কিন্তু কোথাও কারোর মনেই সন্দেহ হল না। দিল্লিতে নেমে থেকে দিল্লি – মাদ্রাজ এক্সপ্রেসে চেপে তারা গোয়ালীয়রে ডাক্তার দত্তাত্রেয় পারচুরের বাড়িতে উঠলেন। এই পারচুরে হিন্দু মহাসভার এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যাক্তি ছিলেন। তিনি সম্ভবত আন্দাজ করেছিলেন এই দুজনের উপস্থিতির কারণ। তার কাছে একটি উন্নতমানের রিভলভার ছিল, সেটির কথা উঠলে তিনি গডসে এবং আপ্তেকে বলেন ‘আমি এতটাও বোকা নই’। ডাক্তার পারচুরের এক কর্মচারী, জগদীশ প্রসাদ গোয়েলের কাছে নাথুরাম গডসে একটি উন্নত রিভলবারের খোঁজ পান এবং নগদ পাঁচশো টাকা ও নিজেদের হেফাজতে থাকা পুরানো দুটি রিভলবারের বিনিময়ে সেটি হস্তগত করেন। গান্ধী হত্যাকে করতে শেষ বাধা ছিল একটি উপযুক্ত অস্ত্রের বন্দোবস্ত করা, এবার গডসে এবং আপ্তের জন্য সেই বাধাটুকুও আর রইলো না। দুজনে একসাথে রাতের ট্রেনে চেপে বসলেন।

তথ্যসুত্রঃ

১) দ্য অ্যাসাসিনেশন অফ মহাত্মা গান্ধী, ট্রায়াল অ্যান্ড ভার্ডিক্ট ১৯৪৮-৪৯

দ্য হিন্দু, হিস্টোরি সিরিজ

২) দ্য লাইফ অ্যান্ড ডেথ অফ মহাত্মা গান্ধী, রুপা পাবলিকেশন্স ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিঃ

রবার্ট পেইন

৩) গান্ধীজ প্যাশন, দ্য লাইফ অ্যান্ড লিগ্যাসি অফ মহাত্মা গান্ধী

স্ট্যানলি উলপার্ট

Spread the word