Site icon CPI(M)

বিষয় পঞ্চায়েত,লেখক বিরোধীরা,পত্রিকা সরকারের! -চন্দন দাস…

২১ অক্টোবর ২০২২, শুক্রবার

অষ্টম পর্ব

লেখিকার নাম শামিমা সেখ। তিনি তৃণমূলের নেত্রী। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের সভাধিপতি। তাঁর লেখা ছাপা হচ্ছে রাজ্য সরকারের পত্রিকায়।

কবে? ২০১৯-তে নয়। ২০০৯-এ। সরকার তখন বামফ্রন্টের। তৃণমূল মাওবাদী, বিজেপি-কে নিয়ে লাগাতার তখন হামলা চালাচ্ছে সিপিআই(এম)-র কর্মীদের উপর। তখনও বিরোধীদের গুরুত্ব দিচ্ছে বামফ্রন্ট সরকার।

শুধু দক্ষিণ ২৪ পরগনারই নয়, সেই সময়ে পূর্ব মেদিনীপুরের সভাধিপতি, সহ সভাধিপতির লেখাও প্রকাশিত হচ্ছে। তাঁরা তিনজনেই তৃণমূলের নেতা। রাজ্যের পঞ্চায়েত ব্যবস্থা নিয়ে তাঁদের উপলব্ধি কী? শামিমা সেখ সমালোচনার সুর বজায় রেখেও লিখতে বাধ্য হয়েছেন,‘‘আমাদের রাজ্যে ১৯৭৩ সালের পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত আইন অনুসারে জেলা পর্যায়ে জেলা পরিষদ, ব্লক পর্যায়ে পঞ্চায়েত সমিতি ও গ্রাম পর্যায়ে পঞ্চায়েত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া পরে গ্রামীণ বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী ও তরান্বিত করার লক্ষ্যে গ্রাম সংসদ স্তরে গ্রাম উন্নয়ন সমিতি গঠন ও তাকে বাজেট তৈরি ও রূপায়নের জন্য ক্ষমতা প্রদান, ব্লক সংসদ ও জেলা সংসদ গঠন ও তাদের সক্রিয় করে তোলার প্রয়াস, পঞ্চায়েত সমিতি ও জেলা পরিষদের সকল স্থায়ী সমিতিতে রাজনৈতিক দলগুলি থেকে নির্বাচিত সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা ইত্যাদি হয়েছে।’’

এই ‘গ্রামীণ বিকেন্দ্রীকরণ’ এবং অন্য রাজনৈতিক দলগুলির সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার কাজটি কার? বামফ্রন্টের।

সেই সময়ে ওই দুটি জেলায় মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যখনই গেছেন প্রশাসনিক বৈঠক করেছেন। দেড় কোটি টাকার সভা নয়। কাজের সভা — প্রকৃত আলাপ আলোচনার সভা। কিন্তু তৃণমূলের টিকিটে জয়ী সভাধিপতিসহ নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আমন্ত্রিত হলেও মুখ্যমন্ত্রীর ডাকা সভায় যাননি।

মমতা ব্যানার্জির নীতি — বয়কট। বিরোধীদের বয়কট। তখনও ছিল। বামফ্রন্ট সরকার চালিয়েছে, পঞ্চায়েত পরিচালনা করেছে সবাইকে যুক্ত করে। নীতির তফাৎ এখানেই।

বামফ্রন্টের সরকার থাকাকালীন বিরোধীরা অনেক পঞ্চায়েত চালিয়েছে। এমনকি জেলা পরিষদও। যেমন মুর্শিদাবাদ। মালদহ। পূর্ব মেদিনীপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। বামফ্রন্ট নির্বাচনের আগে বিরোধীদের প্রার্থী পদ আটকানোর চেষ্টা করেনি। নির্বাচনের পরে ভয় কিংবা লোভ দেখিয়ে পঞ্চায়েত, জেলা পরিষদ দখলের চেষ্টা করেনি। উল্‌টে বিরোধীদের সন্মান দিয়ে বৈঠকে ডেকেছে। আলাপ আলোচনা করতে চেয়েছে। চেয়েছে মতামত।

পঞ্চায়েতের তিনটি স্তরে বিরোধীদের মতামত দেওয়ার পথ প্রতিষ্ঠা করেছে বামফ্রন্টই। উদাহরণ?

জেলা পরিষদ, পঞ্চায়েত সমিতিতে স্থায়ী তৈরি করা হয়েছিল। ২০০৩-এ পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরেই গ্রাম পঞ্চায়েতেও পাঁচটি উপসমিতি তৈরি করা হয়েছিল। উপসমিতিগুলির কাজও স্থায়ী সমিতিগুলির মতই ছিল। অর্থাৎ তারা পঞ্চায়েতের তিনটি স্তরে কার্যনির্বাহীব দল হিসাবে কাজ করত।

প্রতিটি স্থায়ী সমিতিতে বিরোধীরা সদস্য থাকতেন।

জেলা পরিষদ স্তরে সর্ববৃহৎ বিরোধী দলের নেতাকে সভাপতি করে জেলা কাউন্সিল তৈরি করা হত। ১৯৯৪ থেকেই তা চালু হয়। সেই জেলা কাউন্সিল কী করত? জেলার সর্বস্তরে পঞ্চায়েতগুলির কাজকর্মে আর্থিক নিয়মাবলী মানা হয়েছে কিনা, কোনও অপ্রয়োজনীয় খরচ হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখার ক্ষমতা ছিল জেলা কাউন্সিলের।

কেমন হত? পঞ্চায়েত কিংবা পঞ্চায়েত সমিতি হয়তো বামফ্রন্টের। তাদের কাজকর্ম, আর্থিক অবস্থা, স্বচ্ছ্বতা খতিয়ে দেখতে যেত জেলা কাউন্সিল। সেই কাউণ্সিলের সভাপতি হতেন তৃণমূল কিংবা কংগ্রেসের নেতা!

আজকের পশ্চিমবঙ্গে কল্পনা করা যায়? যায় না। কারন তৃণমূলের ‘সংস্কৃতি’ ঠিক এর বিপরীত।

তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন স্বয়ং মমতা ব্যানার্জি। ২০১১-র মে-তে সরকার গঠন করে তৃণমূল কংগ্রেস।

পঞ্চায়েত সংক্রান্ত এই সরকারের প্রথম পদক্ষেপ ২৬শে মার্চ, ২০১২। প্রথম পদক্ষেপেই মমতা ব্যানার্জি বুঝিয়ে দিলেন তাঁর পথ কোনটি। সেদিন উত্তর ২৪ পরগণা জেলা পরিষদের যাবতীয় ক্ষমতা কেড়ে নেয় রাজ্য সরকার। যা তার আগের ৩৪ বছরে কখনো হয়নি। শুধু উত্তর ২৪ পরগণাই নয়, সেই অনাচারের শিকার হয়েছিল মুর্শিদাবাদ এবং নদীয়া জেলা পরিষদও।

মুখ্য সচিবের পক্ষ থেকে জারি করা সেদিনের নির্দেশের (১৯৫৯/পি এন/ও/১/৩বি-২/২০১২) অনুসারে, ‘কার্যকরীভাবে ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হওয়ায় ১৯৭৩-র ওয়েস্ট বেঙ্গল পঞ্চায়েত অ্যাক্টের ২১২ ধারা অনুসারে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারের টাকায় পরিচালিত যাবতীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব জেলা শাসক তথা উত্তর ২৪ পরগণা জেলা পরিষদের এক্সিকিউটিভ অফিসারকে অর্পণ করা হলো।’

অথচ সরকারের রিপোর্ট অন্য কথা বলছিল।

২০১২-১৩’-র বাজেট উপলক্ষ্যে রাজ্যের জেলা পরিষদগুলি কেমন কাজ করেছিল, তা স্পষ্ট করতে তালিকা বানিয়েছিল রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তর। এগারোটি প্রকল্পে কাজের বিচারের পর মমতা ব্যানার্জির সরকার নম্বর দিয়েছিল জেলা পরিষদগুলিকে। প্রথম স্থানে ছিল বর্ধমান জেলা পরিষদ। দ্বিতীয় স্থানে যৌথভাবে ছিল বীরভূম এবং উত্তর ২৪ পরগণা। জলপাইগুড়ি ছিল চতুর্থ স্থানে। হুগলী, নদীয়া, হাওড়া, বাঁকুড়া ছিল যথাক্রমে পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম স্থানে। এই সব কটি জেলা পরিষদই ছিল বামফ্রন্ট পরিচালিত।

নবম স্থান পেয়েছিল তৃণমূল পরিচালিত পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদ। তৃণমূল পরিচালিত দক্ষিণ ২৪ পরগনা ছিল ১৮ নম্বরে। নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া অপর জেলা পরিষদ মুর্শিদাবাদ ছিল ১৩ নম্বরে। উল্লেখ্য, ২০০৯-’১০ সালে জেলা পরিষদগুলির কাজের পর্যালোচনা হয়েছিল। সেই পর্যালোচনাতেও দক্ষিণ ২৪ পরগণা ১৮ তমই ছিল। অর্থাৎ গত দু’বছরে, কোনও সরকারের আমলেই দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলা পরিষদে কাজের হাল আদৌ ফেরেনি।

 অর্থাৎ কাজের বিচার করেননি মমতা ব্যানার্জি। দখল ছিল লক্ষ্য — একমাত্র লক্ষ্য। নির্বাচিত প্রতিনিধি, সংস্থাকে অগ্রাহ্য করা, মানুষের মতামতকে পদদলিত করা এবং বিরোধীদের কার্যত উৎখাত করার রাজনীতির স্পষ্ট প্রকাশ ঘটে সেদিনই।

২০১৩ থেকে পঞ্চায়েতের প্রতিটি পর্যায়ে বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছে তৃণমূল। ফলে বিরোধীদের কোনও ভূমিকাই রাখতে চাওয়া হয়নি মমতা-শাসনে। পঞ্চায়েতগুলি চোরের আখড়া হয়ে ওঠার এটিও অন্যতম কারন।


ক্রমশ

পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ব্যবস্থার অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক চন্দন দাসের এই প্রবন্ধটি মোট ১২ টি পর্ব প্রকাশিত হবে।

Spread the word