বাম বিকল্পের অন্বেষণে বাংলা বাঁচাও যাত্রা

Author
আভাস রায় চৌধুরী

খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, মানুষের এই পাঁচটি মৌলিক অধিকার বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সব মানুষের জন্য সুনিশ্চিত হয় না। তার জন্য সমাজ বদলের সংগ্রাম জারি আছে। খেটেখাওয়া মানুষের প্রতি রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থেকেই বামফ্রন্ট সরকার সীমাবদ্ধ ক্ষমতা নিয়ে জীবন-জীবিকার লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল।

Bangla Bachao Yatra in search of left alternatives

প্রথম পর্বের লিঙ্ক

দ্বিতীয় পর্ব

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের মার্জার এবং জেলার শাখা গুলিকে গুটিয়ে দেওয়ার ফলে ঋণদানের ক্ষেত্রটা দখল করেছে চিট ফান্ড ও মাইক্রোফিনান্স কোম্পানিগুলি। মূলত মহিলাদের নিয়ে গঠিত স্বনির্ভর গোষ্ঠী গুলির সঙ্গে সমবায় আন্দোলনকে যুক্ত করে গ্রামীণ মহিলাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পেরেছিল বামফ্রন্ট সরকার। সরকার পরিবর্তনের পরে পঞ্চায়েত পৌরসভা দখল করার মতোই স্বনির্ভর গোষ্ঠী গুলিকেও দখল করেছে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস। এখন এই স্বনির্ভর গোষ্ঠী গুলি মহিলাদের স্বনির্ভরতা কিংবা ক্ষমতায়নে ভূমিকা পালনের পরিবর্তে হয় পঙ্গু হয়ে গেছে অথবা দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সারদা, রোজভ্যালি, অ্যালকেমিস্ট সহ বিভিন্ন চিটফান্ডের লুট ও দুর্নীতি মানুষ জানেন। এই লুট ও দুর্নীতিতে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি-র বোঝাপড়া সাধারণ মানুষের বুঝতে পারছেন। কিন্তু মাইক্রো ফিনান্সের ঋণের জাল এবং অনাদায়ী অর্থ আদায় করার জন্য ঋণগ্রহীতা মহিলাদের উপর যে নিগ্রহ অত্যাচারের ঘটনাগুলি ঘটছে তা মাঝে মধ্যে মিডিয়া এলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে আড়ালে থেকে যাচ্ছে। বাংলাকে বাঁচাতে হলে মাইক্রো ফিনান্সের ঋণের জাল ও অত্যাচার থেকে বাংলার নারী সমাজকে রক্ষা করতে হবে।



খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, মানুষের এই পাঁচটি মৌলিক অধিকার বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সব মানুষের জন্য সুনিশ্চিত হয় না। তার জন্য সমাজ বদলের সংগ্রাম জারি আছে। খেটেখাওয়া মানুষের প্রতি রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থেকেই বামফ্রন্ট সরকার সীমাবদ্ধ ক্ষমতা নিয়ে জীবন-জীবিকার লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল। শিক্ষার সার্বজনীকরণ এবং গণতন্ত্রীকরণ শিক্ষা ক্ষেত্রে বামফ্রন্টের অন্যতম সাফল্যে। সরকার পরিবর্তনের পরে বাংলার শিক্ষাক্ষেত্র ক্রমশ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী রাজ্যের সাড়ে আট হাজারের উপর স্কুল বন্ধ হয়ে যেতে বসেছে। সরকারি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ গুলিতেও আসন পূরণ হচ্ছে না। আসলে শিক্ষা ও কাজের সম্পর্ক বিযুক্তি ঘটলে এই পরিণতি ঘটে। রাজ্যের শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যজুড়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, পলিটেকনিক ও আইটিআই-র ব্যাপক বিস্তার ঘটেছিল। কিন্তু আজ এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি বেশিরভাগই ধুঁকছে। এখনও পর্যন্ত চালু স্কুল গুলিতে শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ ও পরিকাঠামো ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সহ প্রায় প্রতিটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক অধ্যাপক পদ শূন্য। ২০১০-১১ সালে প্রথম শ্রেণী থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা ছিলেন ৪১৪৪৭৪ জন। এখন এই সংখ্যা ৩৭২৪৪৩ জন। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ মেডিকেল কলেজ গুলিতেও একই চিত্র। ২০২২ সালে রাজ্যের শিক্ষা মন্ত্রী নিজেই বলেছিলেন সেই সময় রাজ্যে স্কুল শিক্ষকের শূন্য পদ ছিল ৩৯৪১৫০। ২০০৮ সালে পশ্চিমবাংলায় শিক্ষক ছাত্রের অনুপাত ছিল ১:৩৫, এখন ১: ৭৫। উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে একই চিত্র। এরই সঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ দুর্নীতি এখন সর্বজনবিদিত। দুর্নীতি, ভঙ্গুর পরিকাঠামো ইত্যাদি কারণে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে প্রত্যক্ষভাবে গরিব, নিম্নবিত্ত, খেটেখাওয়া মানুষের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ধ্বংসের দিকে যায়। শিক্ষাক্ষেত্রে এই অবস্থা শুধুমাত্র ব্যর্থতা নয়, এটি অত্যন্ত পরিকল্পিত উদ্যোগ।সরকারের ব্যর্থতা বা প্রত্যাহার সুযোগ গ্রহণ করে বৈজ্ঞানিক গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার পরিবেশকে ধ্বংস করে সাম্প্রদায়িক ও বিদ্বেষ মূলক প্রজন্ম গড়ে তুলতে আরএসএস সহ সাম্প্রদায়িক সংগঠন গুলি অতিমাত্রায় তৎপর। মোদি সরকারের নয়া শিক্ষানীতি এই নেতিবাচক পরিবেশকে আরও বিপদজনক করে তুলবে। রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার মুখে কেন্দ্রীয় নয়া শিক্ষানীতির বিরোধিতা করলেও কাজে কেন্দ্রীয় নয়া শিক্ষা নীতিকেই কার্যকর করছে। বাংলাকে বাঁচাতে হলে বাংলার সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে হবে। শিক্ষা বাঁচলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাঁচবে, যুক্তিবাদ বাঁচবে, বাংলার উদার ,গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ-সংস্কৃতি বাঁচবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারি ব্যয় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সিলেবাসের মধ্যে সাম্প্রদায়িক চিন্তার অনুপ্রবেশ প্রতিহত করে বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ ও মুক্তচিন্তার উপাদান রক্ষা করতে হবে। নিয়োগ দুর্নীতি বন্ধ করে স্বচ্ছ নিয়োগ নীতির মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলিতে শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মীর শূন্য পদ পূরণ করতে হবে।

সারা দেশের মতোই পশ্চিমবঙ্গেও স্বাস্থ্য পরিসেবা এখন ক্রমশ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও কর্পোরেট গুলি স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে তাদের মুনাফা অর্জনের জন্য বেপরোয়া লুটের রাজ কায়েম করেছে। বামফ্রন্ট সরকারের সময় গ্রামীণ স্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলি গড়ে উঠেছিল। জেলা হাসপাতালের উন্নয়ন ঘটেছিল। সীমাবদ্ধতা দুর্বলতা ও ত্রুটি নিয়েই সরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ও পরিসেবা মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, গরীব খেটেখাওয়া সাধারণ মানুষকে অক্লান্ত পরিষেবা দিয়েছে। চলতি চোদ্দ বছরে চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধি না করে, সরকারি হাসপাতাল ও গ্রামীণ স্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলির পরিকাঠামো উন্নয়ন ও নিয়মিত চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে, শুধুমাত্র বেসরকারি বীমা কোম্পানি গুলির সহযোগিতায় হেল্থ কার্ডে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে পারে কিন্তু মানুষের স্বাস্থ্য পরিসেবায় দীর্ঘস্থায়ী কোনো পদক্ষেপ হতে পারে না। ভঙ্গুর পরিকাঠামোতে চিকিৎসক ও চিকিৎসা কর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেন। তবুও সরকারি হাসপাতাল গুলিতে চিকিৎসক ও চিকিৎসা কর্মীদের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে। কলকাতার আরজি কর হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসক ছাত্রীর উপর প্রাতিষ্ঠানিক অত্যাচার ও খুনের ঘটনা স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের দুর্নীতি ও অরাজকতা উন্মোচিত করছে। বাংলার মানুষকে বাঁচাতে হলে বাংলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বেসরকারি কর্পোরেটের লুটের হাত থেকে সরিয়ে এনে জনমুখী করে তুলতে হবে।

বিগত বিধানসভা নির্বাচনে পেশাদার সংস্থার নির্বাচনী বিজ্ঞাপনে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর নারী পরিচিতি কে মানুষের কাছে জনপ্রিয় ভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের প্রায় প্রথম দিনগুলি থেকেই পশ্চিমবাংলার প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রীর সরকারের সময় নারী নির্যাতন ও নারী পাচারে পশ্চিমবাংলা ক্রমশ সামনের দিকে চলে এসেছে। সরকারি হিসাবে ২০২০ সালে পশ্চিমবাংলায় ৩৬৪৩৯ নারীর উপর সংগঠিত অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। ২০২১ সালে এই সংখ্যা ৩৫৮৮৪ এবং ২০২২ এ ৩৪৭৩৮। নারী নির্যাতনের এই পরিসংখ্যানে পশ্চিমবঙ্গকে অবশ্য পিছনে ফেলে হৈ হৈ করে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে উত্তরপ্রদেশ রাজস্থান মহারাষ্ট্র হরিয়ানার মতো বিজেপি শাসিত রাজ্য গুলি। সারাদেশে ২০২০ সালে ৩৭১,৫০৩ একটি এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে ২০২২ সালে এক লাফে তা বেড়ে দাঁড়ায় চার লক্ষ ৪০৫২৫৬। সারাদেশে এই ঘটনায় অপরাধীদের বিচার করে সাজা দানের হার ১২ থেকে ২৯ শতাংশ। সেখানে পশ্চিমবাংলায় অপরাধীদের সাজার হার মাত্র ২.৬ শতাংশ। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরেই শারদ উৎসবের সময়ে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ভবানীপুর থানা থেকে অপরাধী ছাড়িয়ে নেওয়ার ঘটনা আমাদের সকলের মনে পড়ে যাবে। রাজ্যের অপরাধীদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গ এখন দুস্কৃতিদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র । এই সময়ের মধ্যে রাজ্যে প্রতি বছর ১০০০-র বেশি কম বয়সী মেয়ে নিখোঁজ হচ্ছে। তার মধ্যে মাত্র ২৭ থেকে ২৯ টি ঘটনায় কেস ফাইল হয়। ২০২১-২৩ সময়কালে কেবলমাত্র সুন্দরবন এলাকা থেকে হারিয়ে গেছে ৪০ হাজারের বেশি কিশোরী ও যুবতী। ভাষ্যের পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু সারা দেশে, বিশেষত বিজেপি শাসিত রাজ্য গুলিতে নারীদের উপর সংগঠিত আক্রমণ, নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনাগুলির দূষিত অক্ষের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গও পৌঁছে গেছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদীরা রাজনৈতিক-সামাজিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ধর্ষণ ও নারী নিগ্রহের ঘটনা গুলিকে ব্যবহার করছে। পশ্চিমবঙ্গেও এই ঘটনাগুলি লুম্পেন রাজনীতির অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাকে বাঁচাতে হলে অর্ধেক আকাশ নারীদের সম মর্যাদায় এবং সম অধিকারের ভিত্তিতে পথ চলার পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে হবে।

চলতি চোদ্দ বছরে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে বিদ্বেষ-বিভাজনের পরিমণ্ডল কে গড়ে তুলেছে। এতে সবচাইতে বেশি লাভ হয়েছে আরএসএস-র রাজনীতি।  তৃণমূল কংগ্রেসের সময় এই পরিমন্ডলে আরএসএস/বিজেপি-র যে বৃদ্ধি ঘটেছে পশ্চিমবাংলার সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতিতে তা কোনদিন ঘটেনি। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ভিত্তিতে দেশভাগের পরে হাজার হাজার ছিন্নমূল উদ্বাস্তু মানুষ ওপার বাংলা থেকে এ বাংলায় এসেছিলেন। সেদিনও তৎপর ছিল আরএসএস। কিন্তু শক্তিশালী বাম গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিবেশে তারা খুব একটা কিছু করে উঠতে পারেনি। তিন দশকের বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে আরএসএস সহ সব ধরনের সম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যারিকেড গড়ে তুলেছিল বামপন্থীরা। মুখ্যমন্ত্রীত্বের প্রথম দিকে সংখ্যালঘু মানুষদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করে শ্রীমতি নিজেকে সংখ্যালঘু মানুষদের একজন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন। তাতে পশ্চিমবাংলার জনসংখ্যার প্রায় ২৯ শতাংশ মুসলমান সম্প্রদায় ভুক্ত মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার কোনো উন্নয়ন এই সময়কালে ঘটেনি। সর্বশেষ ওবিসি ইস্যুতে এই সরকারের দ্বিচারিতা সব ধরনের সংখ্যালঘু মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। অথচ শ্রীমতির ওই আচরণ আরএসএস ও বিজেপিকে বাড়তে সাহায্য করেছে। বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় সংখ্যালঘু অংশের মধ্যে মৌলবাদী শক্তির তৎপরতা বেড়েছে। বাংলাকে বাঁচাতে হলে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ-বিভাজনের পরিমণ্ডলকে পরিবর্তন করতে হবে। বাংলায় ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের ঐতিহ্য এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ঐতিহ্য কে ভাঙ্গা আরএসএস-র দীর্ঘদিনের লক্ষ্য। তৃণমূল কংগ্রেসকে ব্যবহার করে ওরা সেই কাজে অনেকটাই  এগিয়ে গেছে। আরএসএস/বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের যৌথ উদ্যোগে বাংলায় বিদ্বেষ বিভাজনের রাজনৈতিক পরিমন্ডল তৈরি হয়েছে। বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আরএসএস/বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে খেটে খাওয়া ও সাধারণ মানুষের যথাসম্ভব সর্ববৃহৎ ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।

বাংলা বাঁচাও যাত্রা ঊনবিংশ শতকের বাংলার 'জাগরন'র ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার কে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই ঐতিহ্য রক্ষার সংগ্রাম শক্তিশালী করতে চায়। তবে সতর্ক থাকতে হবে খেটেখাওয়া মানুষের ঐক্য বিরোধী বেঙ্গলি শভিনিজমের প্রবক্তারা যেন ঘোলা জলে মাছ ধরতে না পারে। কারণ ভারতবর্ষের মতো বাংলার সমাজ-সংস্কৃতির প্রাণ ভোমরা বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য। রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণে 'বাংলা বাঁচাও যাত্রা' বাংলার মানুষের কাছে এই বার্তায় পৌঁছে দিতে চায়।

উত্তর থেকে দক্ষিণের পথে পাহাড়, তরাই, ডুয়ার্সের চা বাগানের শ্রমিকদের কাজ ও মজুরির দাবি তুলে ধরতে চায় বাংলা বাঁচাও যাত্রা। এবার শারদ উৎসবের সময় দার্জিলিং পাহাড়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে। নদী, পাহাড়, বনভূমি সহ রাজ্যের প্রকৃতি ও পরিবেশ লুটের ফলে ভয়ঙ্কর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদী ভাঙ্গন এখন রাজ্যের অন্যতম একটি সমস্যা। বিশেষত মালদহ মুর্শিদাবাদ জেলায়। ভাঙন কবলিত এলাকার মানুষদের পাশে লড়াইয়ে আছে এবং থাকবে সিপিআই(এম) ও বামপন্থীরা। রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষত মুর্শিদাবাদ জেলায় মূলত নারী শ্রমিকেরা বিপুল সংখ্যায় বিড়ি শিল্পে কাজ করেন। বড় বিড়ি মালিকদের নির্মম শোষণের শিকার এই শ্রমিকেরা। বড় বড় বিড়ি মালিকরা এখন রাজ্যের শাসকদলের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সরকার চালানো অংশ নিচ্ছে। ফলে শোষিত শ্রমিকদের পাশে সরকার নেই বললেই চলে। বাংলা বাঁচাও যাত্রা বিড়ি শ্রমিকদের জীবন সংগ্রামের সেই অব্যক্ত যন্ত্রণার কথা গুলিকে তুলে ধরতে চায়, দাবি আদায়ের সংগ্রামে পথ চলতে চায়।

 

জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, লিঙ্গ, অঞ্চল নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের বিশেষত যুব সমাজের মৌলিক প্রত্যাশা একটি স্থায়ী কাজের সঠিক ঠিকানা। কর্মসংস্থান গড়ে তুলতে সরকারকে প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিতে হবে। নয়া উদারবাদী ব্যবস্থা উৎপাদনের ক্ষেত্রে সংকুচিত হওয়ায় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র ভয়ংকর আক্রমণের মধ্যে পড়েছে। রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য শিল্পায়নের যে প্রচেষ্টা নিয়েছিল তা ছিল আসলে নয়া উদারবাদের চালু নিয়মের বিরুদ্ধে খেটেখাওয়া মানুষের সংগ্রাম। সেই কারণে এত আক্রমণ, এত ষড়যন্ত্র, এত কুৎসা, এত বিরোধিতা। ওই সময় মানুষ অধিকার সচেতন হয়েছিল। তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি-র জামানায় সাধারণ মানুষকে ওরা সরকারের কৃপা প্রার্থীতে পরিণত করতে সচেষ্ট। বাংলাকে বাঁচাতে হলে কৃষিকে রক্ষা করে জমির যুক্তিসঙ্গত ব্যবহারের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পাশাপাশি ভারী বুনিয়াদি শিল্প স্থাপনের দিকে এগোতেই হবে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র প্রসারিত করতে হবে। কৃষিকে রক্ষা করা শিল্প গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সংগ্রাম আসলে শ্রেণি বিভক্ত সমাজে খেটেখাওয়া মানুষের শ্রেণি সংগ্রাম। বাংলা বাঁচাও যাত্রা অন্তরে শ্রেণি সংগ্রামের অনুরণনকে বহন করছে।

 

কয়েকটা বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে জীবন-জীবিকার দাবিতে খেটেখাওয়া মানুষের লড়াই চলছে। জীবনের অভিজ্ঞতায় মানুষ বুঝছেন আরএসএস/বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক ও সম্প্রদায়িক বিভাজন তাদের জীবন যন্ত্রণার কোনো সমাধান নয়। মানুষ উপলব্ধি করছেন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তাদের আশু দাবি আদায় করতে হবে। লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই বাংলাকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। চলমান লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যে অভিজ্ঞতা মানুষ অর্জন করেছেন তা থেকে উৎসারিত সমস্যা ও দাবি গুলি বাংলা বাঁচাও যাত্রায় আমরা মানুষের কাছে উপস্থিত করছি। যাত্রাপথে মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতা, মানুষের লড়াই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকেই আজকের পরিস্থিতি উপযোগী  জনগণের বাম বিকল্প ইশতেহারে গড়ে উঠবে। শীতের পরেই আসবে বসন্ত। পাতা ঝরে যাওয়া গাছের ডালে ডালে আবার দেখা মিলবে কিশলয়ের। ঋতু বৈচিত্র এই বদল, আসলে প্রকৃতিতে দ্বান্দ্বিকতার খেলা। প্রকৃতিতে এলেও সমাজে বসন্ত আপনা থেকে এসে যায় না। বসন্ত আনার সংগ্রাম করতে হয়। বাংলা বাঁচাও যাত্রা পশ্চিমবাংলার সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, সব মিলিয়ে মানুষের জীবন সংগ্রামে  নতুন বসন্তের ইঙ্গিত দেবেই।

 

প্রতিবেদনটি দুটি পর্বে প্রকাশিত

দেশহিতৈষী পত্রিকায় প্রকাশিত


প্রকাশ: ৩০-নভেম্বর-২০২৫

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 30-Nov-25 17:10 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/bangla-bachao-yatra-in-search-of-left-alternatives2
Categories: Campaigns & Struggle
Tags: #tmcjungleraj, 34 years left front, left alternative, bangla bachao yatra
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড