আধুনিক ভারতে চরম দক্ষিণপন্থা বনাম পরিবর্তনকামী বামপন্থার লড়াই
সায়রা শাহ হালিম
বামপন্থীদের দাবি, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন এবং মূলধারার গণমাধ্যম দলীয় স্বার্থের দ্বারা “দখল” হয়ে গেছে। বামপন্থীদের কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো এই প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার, যাতে তারা ক্ষমতাসীন দলের পরিবর্তে জনগণের স্বার্থে কাজ করে তা নিশ্চিত করা।

ভারত আজ এক চূড়ান্ত অস্তিত্বগত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আজকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আর সাধারণ নীতিগত মতপার্থক্যের দ্বারা সংজ্ঞায়িত নয়, বরং জাতিসত্তা সম্পর্কিত দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত ও আপসহীন দৃষ্টিভঙ্গিজাত এক গভীর সংঘাত দ্বারা চিহ্নিত। একদিকে রয়েছে বিজেপি–আরএসএস’র জোট, যারা একটি কেন্দ্রীভূত, সাংস্কৃতিকভাবে সমপ্রকৃতির ‘হিন্দু রাষ্ট্র’র ধারণা চাপিয়ে দিতে চাইছে। অন্যদিকে রয়েছে সিপিআই(এম)’র নেতৃত্বে বামপন্থীদের ঐক্যবদ্ধ শক্তি, যারা ধর্মনিরপেক্ষতা, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং আমূল অর্থনৈতিক ন্যায়ের ভিত্তিতে একটি জনগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে সোচ্চার।
এটি “নিউ ইন্ডিয়া”-র নামে সংখ্যাগরিষ্ঠতার আধিপত্য বনাম “সংবিধান-নির্ভর ভারতে”র বহুত্ববাদী মুক্তির লড়াই। বামপন্থীদের কাছে বর্তমান সময়টা শুধুই একটি রাজনৈতিক সংকট নয়— এটি এক গভীর সভ্যতাগত সংকট। এখানে প্রশ্নের মুখে ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার সময় গড়ে ওঠা জাতীয় ঐকমত্য এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের অস্তিত্বই বিপন্ন।
দক্ষিণপন্থী প্রকল্প: হিন্দুত্ব ও নয়াউদারবাদী আধিপত্য
বিজেপি–আরএসএস প্রকল্পের মূল কেন্দ্রে রয়েছে হিন্দুত্ব—একটি মতাদর্শ, যার লক্ষ্য ভারতীয় নাগরিকত্বের সংজ্ঞাই নতুন করে নির্ধারণ করা। সংবিধাননির্ভর নাগরিকত্বের বদলে ধর্মীয় পরিচয়কে অন্তর্ভুক্তির ভিত্তি করে এই প্রকল্প বিদ্যমান সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসকে নতুন করে সাজাতে চায়।
“এক দেশ” আখ্যান
বামপন্থীরা ‘এক দেশে এক নির্বাচন’ এবং ‘এক দেশ, এক কর’-এর মতো সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলিকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে দেখেন না। তাঁদের দৃষ্টিতে, এগুলি অতিকেন্দ্রীকরণের হাতিয়ার—যার উদ্দেশ্য ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রাণস্বরূপ আঞ্চলিক বৈচিত্র্য ও ভাষাগত পরিচতিকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করা। ভারতের যে সাংবিধানিক ধারণা, তাকে সমতল করে একটি একরৈখিক, একক সত্তায় পরিণত করার মধ্য দিয়েই দক্ষিণপন্থী প্রকল্প যুক্তরাষ্ট্রীয় বাধাগুলিকে ভেঙে ফেলতে চায়, যে বাধাগুলি তাদের সম্পূর্ণ মতাদর্শগত আধিপত্যের পথে অন্তরায়।
সাম্প্রদায়িক–করপোরেট আঁতাত
এ প্রসঙ্গে সিপিআই(এম)-এর প্রধান সমালোচনা হলো, তাদের লব্জে, ‘সাম্প্রদায়িক– করপোরেট আঁতাত’র উত্থান। বামপন্থীরা যুক্তি দেন যে, হিন্দুত্ব এখানে এক ধরনের সাংস্কৃতিক ধোঁয়াশা হিসেবে কাজ করছে, যার আড়ালে কার্যকর করা হচ্ছে আগ্রাসী নয়াউদারবাদী নীতি। যখন ধর্মীয় মেরুকরণ জনচেতনাকে দখল করে রাখে, তখন রাষ্ট্র নির্বিঘ্নে জাতীয় সম্পদগুলো—বন্দর, বিমানবন্দর এবং শক্তি ক্ষেত্র—কয়েকটি পছন্দের করপোরেট গোষ্ঠীর হাতে তুলে দিচ্ছে। এই কাঠামোতে, আধিপত্যবাদ হলো সেই রাজনৈতিক চালিকাশক্তি যার জোরে একটি অভিজাত অর্থনৈতিক অ্যাজেন্ডা গণতান্ত্রিক নজরদারি এড়িয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে।
বামপন্থীদের পাল্টা আধিপত্য: পরিবর্তনকামী গণতন্ত্র
“এক জাতি” মডেলের বিরুদ্ধে বামপন্থীদের প্রস্তাব “জনগণতন্ত্র”। এটি নেহাতই বিদ্যমান গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে চায় না বরং গণতন্ত্রকে আরও অগ্রসর করে নিয়ে যেতে চায়।
সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতা: বামপন্থীদের কাছে ধর্মনিরপেক্ষতা শুধু রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথকীকরণ নয়; এটি নিপীড়িতদের জন্য একটি সুরক্ষা-কবচ। এটিই একমাত্র কাঠামো যা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং সংবিধানের প্রস্তাবনায় নিহিত সমাজতান্ত্রিক স্তম্ভগুলির অখণ্ডতা নিশ্চিত করতে পারে।
শ্রেণি সংগ্রামের দৃষ্টিভঙ্গি: বিরোধী রাজনীতিতে বামপন্থীদের অনন্য অবদান হলো, এই সংঘাতকে শ্রেণি সংগ্রামের কাঠামোর মাধ্যমে উপস্থাপিত করায় জোর দেওয়া। তাদের যুক্তি হলো, ধর্মীয় মেরুকরণ একটি “মিথ্যা চেতনা”, যা কৃত্রিমভাবে নির্মাণ করা হয়েছে রেকর্ড বেকারত্ব, স্থবির মজুরি এবং আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধির মতো বাস্তব অর্থনৈতিক সংকট থেকে শ্রমজীবী মানুষদের নজর ঘোরাতে।
প্রধান সংঘাতের কেন্দ্র ও প্রাতিষ্ঠানিক অখণ্ডতা
বর্তমানে এই লড়াই চলছে ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির পরিসর জুড়ে। সিপিআই(এম) নিজেকে রাষ্ট্রের “মুক্তি”-র মতাদর্শগত ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
রাষ্ট্রকে পুনরুদ্ধার
বামপন্থীদের দাবি, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন এবং মূলধারার গণমাধ্যম দলীয় স্বার্থের দ্বারা “দখল” হয়ে গেছে। বামপন্থীদের কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো এই প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার, যাতে তারা ক্ষমতাসীন দলের পরিবর্তে জনগণের স্বার্থে কাজ করে তা নিশ্চিত করা।
সামাজিক ন্যায়ের ফ্রন্ট: জাতভিত্তিক জনগণনা
বাম রণকৌশলে সাম্প্রতিক এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো জাতভিত্তিক জনগণনার জোরালো সমর্থন। দলিত, আদিবাসী ও ওবিসি সম্প্রদায়ের ব্যবস্থাগত অর্থনৈতিক বঞ্চনার সঙ্গে শ্রেণি সংগ্রামকে যুক্ত করে বামপন্থীরা “সমজাতীয় হিন্দু” আখ্যানকে ভেঙে দিতে চায়। তাদের মতে, একটি জনগণনা প্রকৃত অর্থনৈতিক ন্যায়ের প্রথম পদক্ষেপ—যা “সবকা সাথ”-এর ভাষ্য ও উচ্চবর্ণ করপোরেট আধিপত্যের বাস্তবতার মধ্যেকার ব্যবধান উন্মোচিত করবে।
মতাদর্শগত অগ্রদূত: বাম বনাম “নরম” মধ্যপন্থা
অনিশ্চিত ভোটার বা হতাশ উদারপন্থীদের কাছে বামপন্থীরা এমন এক মতাদর্শগত স্পষ্টতা উপস্থাপন করে, যা মধ্যপন্থী দলগুলির মধ্যে প্রায়ই অনুপস্থিত।
ভোটে জিততে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ও বিভিন্ন আঞ্চলিক দলগুলির সংখ্যাগুরু অংশের মনোভাবকে তুষ্ট করার চেষ্টাকে প্রায়শই “নরম হিন্দুত্ব” চর্চার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। কিন্তু বামপন্থীদের অবস্থান হলো, সাম্প্রদায়িকতাকে অনুকরণ করে আপনি তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবেন না। “সাম্প্রদায়িক-করপোরেট” শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে বামপন্থীরা ধর্মনিরপেক্ষতাকে সরাসরি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের—রান্নাঘর থেকে টেবিল পর্যন্ত—অর্থনৈতিক ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই ধারাবাহিকতা বৃহত্তর মধ্যপন্থী জোটগুলিতে প্রায়ই দেখতে পাওয়া আদর্শগত আপোশ ও অবস্থান বদলের প্রবণতাকে রোধ করে।
চ্যালেঞ্জ এবং আধুনিক পথে এগিয়ে চলা
সমালোচকেরা প্রায়শই বামপন্থীদের সংকুচিত নির্বাচনী সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। তবে বামপন্থীদের যুক্তি হলো, তাদের সংসদীয় আসন সংখ্যার তুলনায় মতাদর্শগত প্রভাব তার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। এই ব্যবধান দূর করতে আন্দোলন বিবর্তিত হচ্ছে।
নয়াউদারবাদের ছায়ায় বেড়ে ওঠা ডিজিটাল-সচেতন প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে একটি সুসংগঠিত প্রচেষ্টা চলছে। “গণশিক্ষার” মাধ্যমে বামপন্থীরা জটিল মার্কসবাদ-লেনিনবাদী তত্ত্বকে আধুনিক “অধিকার ও মর্যাদা”র আধুনিক ভাষায় অনুবাদ করার চেষ্টা করছে—বিশেষত যুবদের বেকারত্বের এবং গিগ অর্থনীতির সংকট ও অনিশ্চিত শ্রমপরিস্থিতির প্রশ্নকে সামনে রেখে।
উপসংহার: অসমাপ্ত বিপ্লব
বিজেপি-আরএসএস এবং বাম নেতৃত্বাধীন ফ্রন্টের মধ্যে সংঘর্ষটি মূলত ভারত চেতনা নিয়ে চূড়ান্ত লড়াই।
বিজেপি-আরএসএস চায় একটি “অসমাপ্ত পুনরুদ্ধার”—অর্থাৎ সাংস্কৃতিক বিশুদ্ধতা ও কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্বের এক পৌরাণিক অতীতে প্রত্যাবর্তন। অন্যদিকে বামপন্থীরা চায় একটি “অসমাপ্ত বিপ্লব”— যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির অঙ্গীকার করা হয়েছিল কিন্তু পুঁজিবাদী স্বার্থের কারণে থমকে গিয়েছিল স্বাধীনতার সময়, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন।
এই লড়াইয়ের ফলাফল নির্ধারণ করবে ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী স্বৈরতন্ত্র নেমে আসবে, নাকি প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রে বিবর্তিত হবে। এই উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিসরে বামপন্থীরাই নিজেদের চরম দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে সবচেয়ে ধারাবাহিক প্রতিবন্ধক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে—এই বিশ্বাস নিয়ে যে, আরও উন্নত, ন্যায়সঙ্গত ও সমতাভিত্তিক ভারত শুধু সম্ভবই নয়, অনিবার্য।
দেশহিতৈষী পত্রিকার প্রকাশিত হবার পরে পুনঃ প্রকাশিত
প্রকাশ: ১৯-ফেব্রুয়ারি-২০২৬
শেষ এডিট:: 19-Feb-26 18:35 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/the-struggle-between-the-extreme-right-and-the-radical-left-in-modern-india
Categories: Fact & Figures
Tags: democraticright, leftalternative
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (150)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (133)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (78)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)
সাম্প্রতিক পোস্ট / Latest Posts
সমবায় প্রসঙ্গে
- ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন
“ এসো নির্মূল করি , স্বৈরাচারের ক্ষমতাকে ”
- সৌম্যদীপ রাহা
বাংলার বিকল্প পরিবেশ ভাবনা ও উন্নয়নের অভিমুখ
- সৌরভ চক্রবর্ত্তী
পশ্চিমবাংলার ক্রীড়ানীতি ও বিপল্প প্রস্তাব
- সুমিত গঙ্গোপাধ্যায়
তথ্য প্রযুক্তি এ আই আমাদের রাজ্যে সম্ভাবনা
- নন্দিনী মুখার্জি
প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি
- ওয়েবডেস্ক
.jpg)




