নভেম্বর বিপ্লব - তার আগে ও পরে

সূর্যকান্ত মিশ্র
লেনিন বিপ্লবী পার্টি গড়ে তুলতে মতাদর্শ, রাজনীতি, সংগ্রাম ও সংগঠন এই চার বিষয়ীগত দিকের ওপরে যে গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন এখনও তা সারা বিশ্বে সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য দিশা দেখায়। বিপ্লবের জন্য শুধু বিপ্লবী পরিস্থিতি যথেষ্ট নয়, বিপ্লবী পার্টি সংগঠনও জরুরি।

উনবিংশ শতাব্দীতে প্রথম সফল সর্বহারা বিপ্লবে স্বল্পমেয়াদি প্যারি কমিউনের পতনের পর বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ১৯১৭ সালের ৭-১৭ নভেম্বর দুনিয়া কাঁপানো দশদিনে রাশিয়ায় লেনিনের নেতৃত্বে নভেম্বর বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছিল এবং বিশ্বে প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের পতনের পর লেনিনের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল বিশ্বের কমিউনিস্ট পার্টিগুলিকে নিয়ে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক (কমিন্টার্ন)। তিনিই চিহ্নিত করেছিলেন সাম্রাজ্যবাদকে পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর হিসাবে, উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণকে তার জন্মের সময়কাল হিসাবে। সাম্রাজ্যবাদের যুগের প্রধান দ্বন্দ্ব ও স্তরগুলিকে চিহ্নিত করে, মার্কসবাদের শিক্ষা অনুসরণ করে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতির নির্দিষ্ট বিশ্লেষণ করে, বিপ্লবের স্তরগুলিকে মার্কসবাদের প্রয়োগে লেনিন সারা বিশ্বে সফলভাবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন যে একটি দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও নির্মাণ সম্ভব। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সফল রূপায়ণের জন্য সারা দুনিয়ার সব দেশে কোনও একটি রণনীতি ও রণকৌশল প্রযোজ্য হতে পারে না, বরং পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করেই তা নির্ধারণ করতে হয়, এই শিক্ষাও সারা বিশ্বের জন্য নভেম্বর বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
মার্কস এঙ্গেলসের মতো লেনিনও অনুমান করেছিলেন পুঁজিবাদের বিকাশের দিক থেকে অপেক্ষাকৃত অনুন্নত রুশ দেশে গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর অতিক্রম করার পাশাপাশি শিল্পোন্নত জার্মানিতে বিপ্লব সফল হবে। কিন্তু তা হয়নি। রোজা লুক্সেমবার্গ ও লিবখনেখটকে নৃশংসভাবে হত্যা করে সেখানে প্রতিবিপ্লব সফল হয়েছিল।
১৯২৪ সালে লেনিনের অকাল মৃত্যুর পর স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিকল্পিত অর্থনীতির অসাধারণ সাফল্য ঘটেছিল। লেনিনের সময় ফ্যসিবাদের জন্ম হয়নি। সেই সময় লেনিনের নেতৃত্বে বিপ্লবোত্তর সাম্রাজ্যবাদী প্রতিবিপ্লবগুলিকে পরাস্ত করতে যুদ্ধকালীন অর্থনীতি এবং তারপর নয়া অর্থনীতি গ্রহণ করতে হয়, যা এখন প্রকারান্তরে মহাচীন অনুসরণ করছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে কমিন্টার্নের সপ্তম কংগ্রেসে গৃহীত দিমিত্রভ প্রস্তাব অনুযায়ী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলা হয়। অসীম ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে ফ্যাসিস্ত জার্মানির আক্রমণের প্রতিরোধ করে বার্লিনে লাল ফৌজ লাল পতাকা উড়িয়েছিল। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতেও সমাজতন্ত্র জয়ী হয়েছিল। পাশাপাশি চীন, ভিয়েতনাম, কিউবা, গণতান্ত্রিক কোরিয়া ও লাওসে বিপ্লবের সাফল্য ও সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম সফল হয়েছে। স্তালিনের মৃত্যুর পরই ক্রুশ্চেভের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টিতে সংশোধনবাদী বিচ্যুতির শুরু। সেই ধারায় নভেম্বর বিপ্লবের প্রায় ৭৩ বছর পরে মিখাইল গর্বাচভের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙে ফেলা হয়। কিন্তু নভেম্বর বিপ্লবের তাৎপর্য ও অবদানকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নেই মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথম শ্রমজীবী মানুষ শ্রেণি শোষণ মুক্ত সমাজ গড়া হয়েছিল, সেইসঙ্গে সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে দ্রুত শিল্পায়ন এবং অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানের সার্বিক অগ্রগতি ঘটেছিল। দারিদ্র, নিরক্ষরতা ও বেকারির অবসান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসনের ক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তার বিপুল বিস্তার ঘটেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের অগ্রগতি পুঁজিবাদী দেশগুলির ওপরেও প্রভাব ফেলেছিল এবং সেখানকার শাসকশ্রেণিগুলি বাধ্য হয়েছিল যুদ্ধোত্তর ‘পুঁজিবাদের স্বর্ণযুগে’ জনকল্যাণকর রাষ্ট্র বা নিজেদের নাগরিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করতে। সংশোধনবাদ তখন তার মধ্যে বিশ্ব পুঁজিবাদের ‘তৃতীয় সঙ্কট’-এর ছায়া অনুসন্ধানে ব্যস্ততার জন্য উৎপাদন ক্ষেত্রে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিপ্লবের প্রয়োগে পিছিয়ে পড়েছিল।
উনবিংশ শতাব্দীতে মার্কস এঙ্গেলসের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট লিগ গড়ে তোলা এবং ১৮৪৮ সালে কমিউনিস্ট ইশ্তেহার প্রকাশ করার পাশাপাশি বিভিন্ন পুঁজিবাদী দেশে শ্রমিক-কৃষক অভ্যুত্থান সংগঠিত করা হয়েছিল। এগুলির অবদমন এবং কমিউনিস্ট লিগের অবসানের পর থেকে আজ পর্যন্ত কাল্পনিক সাম্যবাদ থেকে বৈজ্ঞানিক সাম্যবাদের উত্তরণের দলিল হিসাবে 'কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো'র আহ্বান-'দুনিয়ার মজদুর এক হও' - কমিউনিস্ট মতাদর্শের ভিত্তিই হলো শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিকতাবাদ। মূলত শ্রমিক সংগঠনগুলির অংশগ্রহণে মার্কসের সভাপতিত্বে ১৮৬৪ সালে প্রথম আন্তর্জাতিকের (International Working Men’s Association) প্রতিষ্ঠা হলেও প্যারি কমিউনের (১৮৭১) পতনের পর মার্কসের কথায় “তার এই ঐতিহাসিক প্রথম ঐতিহাসিক কাঠামোর মধ্যে সেই প্রচেষ্টা আর কোনোভাবেই বাস্তবোচিত ছিল না”(গোথা কর্মসূচির সমালোচনা)।
মার্কসকে সমাধি দেওয়া হয়েছিল তাঁর নিজের আর্মচেয়ারে বসে থাকা অবস্থায় জীবনাবসানের তিন দিন পরে, তাঁর স্ত্রী জেনি মার্কসের সমাধির পাশে, ১৮৮৩ মার্চ ১৭, ইউরোপ থেকে আমেরিকার বিপ্লবী নেতৃবৃন্দ এসে পৌঁছানোর পর। সমাধির পাশে সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন এঙ্গেলস, যাঁর নাম মার্কসের সঙ্গে এখনো উচ্চারিত হয়। এর পর মার্কসের ছেড়ে যাওয়া কাজ নিজের প্রায় সবকাজ ছেড়ে তিনিই সম্পন্ন করেছেন। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকেরও অবসান ঘটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর্বে। লেনিন এই যুদ্ধকে গৃহযুদ্ধে পরিণত করার ডাক দিয়েছিলেন, এক দেশের শ্রমজীবী মানুষ আরেক দেশের শ্রমজীবী মানুষের বিরুদ্ধে রাইফেল না তুলে রাইফেলের নল নিজ নিজ দেশের শাসকদের দিকে ঘুরিয়ে দিক, এই ছিল লেনিনের আহ্বান। লেনিনের অবদান হলো, উনবিংশ শতাব্দীর ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে ‘পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর সাম্রাজ্যবাদ’-এর বিশ্লেষণ ও সেই যুগের রণকৌশল নির্ধারণ। তিনি সাম্রাজ্যবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি ব্যাখ্যা করেছিলেন এবং দেখিয়েছিলেন কেন সাম্রাজ্যবাদী শিবিরে অন্তর্দ্বন্দ্ব থেকে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী এবং তার দুর্বলতম গ্রন্থি রুশ দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সফল রূপায়ণ সম্ভব। নভেম্বর বিপ্লবের পর তৃতীয় আন্তর্জাতিক গড়ে উঠেছিল যা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইতে কর্তব্য নির্ধারণে অবদান রেখেছিল। রুশ দেশে নভেম্বর বিপ্লবের এই প্রেক্ষাপট সাম্রাজ্যবাদের যুগে বিপ্লবের দিশা দেখিয়েছিল, কিন্তু চীন ভিয়েতনাম কিউবা কোরিয়া কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে বিপ্লবকে নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়েই বিচার করতে হবে। সারা দুনিয়ায় যে একই পরিস্থিতি ও বৈশিষ্ট্য বিরাজ করছে না তা স্বীকার করে স্তালিনের সময়কালেই তৃতীয় আন্তর্জাতিকের অবসান ঘটানো হয়। কিন্তু বিশ্বজুড়ে কমিউনিস্টদের আন্তর্জাতিকতাবোধ ও সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা কখনোই অস্বীকার করা হয়নি।
মতাদর্শগত দিক থেকে মার্কসবাদের অনুসরণে শুধু সাম্রাজ্যবাদের ব্যাখ্যাই নয়, লেনিন বিপ্লবী পার্টি গড়ে তুলতে মতাদর্শ, রাজনীতি, সংগ্রাম ও সংগঠন এই চার বিষয়ীগত দিকের ওপরে যে গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন এখনও তা সারা বিশ্বে সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য দিশা দেখায়। বিপ্লবের জন্য শুধু বিপ্লবী পরিস্থিতি যথেষ্ট নয়, বিপ্লবী পার্টি সংগঠনও জরুরি। বিপ্লবী পরিস্থিতি হলো এমন পরিস্থিতি যখন শাসক শ্রেণি আর পুরানো কায়দায় শাসন করতে পারছে না এবং শাসিতরাও আর পুরানো কায়দায় শাসিত হতে চাইছে না। এমন পরিস্থিতিতে সমাজে নানা অস্থিরতার প্রকাশ ঘটতে পারে, কিন্তু সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে না, যদি একটি বিপ্লবী পার্টির অস্তিত্ব ও সক্রিয়তা না থাকে।
শুরু থেকেই সিপিআই(এম) আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের সংশোধনবাদ ও সঙ্কীর্ণতাবাদী বিচ্যুতির বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রামে মার্কসবাদ লেনিনবাদের মৌলিক নীতিগুলির ভিত্তিতে স্বাধীন বিবেচনা ও নিজস্ব অভিজ্ঞতার দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। গর্বাচভের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়নে গ্লাসনস্ত পেরেস্ত্রৈকার সময়কালেও আমাদের পার্টি আপত্তির কথা জানিয়েছিল। বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের অংশীদার হিসাবে এর আগে ১৯৬৮ সালে মতাদর্শগত প্রশ্নে বর্ধমান প্লেনামেও সিপিআই(এম) ক্রুশ্চেভের নেতৃত্বে সিপিএসইউ’র সংশোধনবাদের বিরোধিতা করেছিল। ঐ সময়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির বামপন্থী হঠকারী বিচ্যুতির বিরুদ্ধেও পার্টি অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু কোনও সময়েই আমাদের পার্টি সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের পক্ষ অবলম্বন করেনি। বিংশ শতাব্দীর অবসান এবং পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির বিপর্যয়ের পর বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্য সাম্রাজ্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে দ্বন্দ্বে সাম্রাজ্যবাদের দিকে হেলে গেছে। ১৯৯২ সালে সিপিআই(এম)’র মাদ্রাজ কংগ্রেসের মতাদর্শগত দলিলে সেই পরিস্থিতির মূল্যায়ন করা হয়েছে। ২০১২ সালে পার্টির কোঝিকোড় কংগ্রেসে এই মতাদর্শগত দলিল সময়োপোযোগী করা হয়েছে যা সর্বশেষ দলিল। আমাদের পার্টির মতাদর্শে সমাজতন্ত্রকেই লক্ষ্য হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা নিয়ে আমাদের সেই লক্ষ্যে পথচলা থাকবে, কিন্তু জগণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন না করে একবিংশ শতাব্দীতে ভারতের প্রেক্ষাপটে সমাজতন্ত্রের রূপ আমরা কখনোই নির্দিষ্ট করে বলতে পারি না। নির্দিষ্ট পরিস্থিতির নির্দিষ্ট বিশ্লেষণ করে পথচলার শিক্ষা থেকে আমরা বিচ্যুত হবো না।
নভেম্বর বিপ্লবের ফসল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের সঙ্গে সঙ্গেই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন যা লগ্নিপুঁজির বিশ্বায়ন তা পুরোপুরি মাথা তুলেছে। আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির বিশ্বব্যাপী অবাধ চলাচলের মানে এই নয় যে সাম্রাজ্যবাদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে গেছে। কেবল এটুকুই বলা যেতে পারে যে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব স্তিমিত হয়ে আছে, এই স্তিমিত দশা এখনও বিরাজ করলেও তা যে কোনও সময়ে ফের মাথা চাড়া দিতে পারে। বিশ্বায়নের হাত ধরেই গড়ে উঠেছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO), গ্যাট (General Agreement on Tariffs and Trade) এবং গ্যাটস (General Agreement on Trade in Services) ইত্যাদি কাঠামোগুলি যা সূচনা করেছে নয়া উদারবাদের। এই ব্যবস্থা বিশ্ব ব্যবস্থায় বৈষম্যের কোনও অবসান ঘটাচ্ছে না, বরং নয়া উপনিবেশবাদ এবং নয়া ফ্যাসিবাদকে ডেকে নিয়ে আসছে, এগুলিই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের রাজনৈতিক ফসল। সোভিয়েতহীন একমেরু বিশ্বে পুঁজিবাদ তার মৌলিক চরিত্র বদলায়নি, উৎপাদন ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত শ্রম থেকে মুনাফা সৃষ্টি এখনও বহাল, কিন্তু প্রাধান্য বিস্তার করে চলেছে ক্রনি ক্যাপিটাল বা লুটেরা পুঁজির দাপট। এটা নবরূপে হলেও সম্পূর্ণ নতুন নয়, উনবিংশ শতাব্দীতেই মার্কস দেখিয়েছিলেন কীভাবে সাম্রাজ্যবাদ উপনিবেশগুলিতে লুটের মাধ্যমে পুঁজির আদিম সঞ্চয় ঘটিয়েছে। সেই কারণেই বর্তমান নয়া উদারবাদকে নয়া উপনিবেশবাদ বলা হচ্ছে যা ক্রনি ক্যাপিটাল বা লুটেরা পুঁজির শাসন কায়েম করছে।
এই প্রশ্ন দেখা দিতেই পারে যে বিশ্বের গতি কি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবে? না, ইতিহাসের গতি কখনোই থেমে থাকেনি। শ্রেণিহীন আদিম সমাজ থেকে দাসপ্রথা, তার থেকে সামন্ততন্ত্র, তার থেকে পুঁজিবাদ এবং তার বিকাশে সাম্রাজ্যবাদের উত্থান ঘটেছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বব্যাপী আধিপত্যও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ভেঙে গিয়েছে এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সেই আধিপত্য কায়েম করেছে। নিয়ত পরিবর্তনের এই ধারায় বর্তমানের সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যও একই জায়গায় স্তিমিত হয়ে থাকতে পারে না। এরই ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধের ঘোষণায়। নয়া উদারবাদের মূল কথাই ছিল পুঁজির বিশ্বব্যাপী অবাধ চলাচল, সেখানে শুল্ক প্রাচীরের ঘোষণা একটা যুদ্ধ ঘোষণাই বটে। কেন এমন পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে ট্রাম্পকে? কারণ নয়া উদারবাদ সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে। আমেরিকায় শাটডাউন করে লক্ষ লক্ষ কর্মীর বেতন বন্ধ, স্থায়ী কাজ বন্ধ, ছাঁটাই ইত্যাদির আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে মার্কিন সরকার দিশাহারা, আমেরিকায় মানুষের ক্ষোভ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানি ট্রাম্পের বিপরীত সুরে কথা বলে জয় ছিনিয়ে এনেছেন। অর্থাৎ উদারবাদের সঙ্কটের মধ্যে উগ্র দক্ষিণপন্থা ও নয়া ফ্যাসিবাদের বিপদ মাথা তুলছে, অন্যদিকে গণবিক্ষোভে নতুন পরিস্থিতির রূপালি সম্ভাবনাও দেখা দিচ্ছে। বিশ্বজুড়েই এই লড়াইয়ের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির মধ্যে স্তিমিত দ্বন্দ্বও তীব্র হচ্ছে, কখন তা প্রকাশিত হয়ে যাবে তা হলফ করে বলা সম্ভব নয়।
দুঃখের কথা আমাদের দেশের মোদী সরকার দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। এরফলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হচ্ছে। শুল্ক যুদ্ধের নামে আমেরিকা ভারতীয় পণ্যের ওপরে যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সেটা কোনোভাবেই এমনকি উদারনীতির ঘোষিত অবস্থানের সঙ্গেও মেলে না। নয়া উদারবাদের সঙ্কট এশিয়া আফ্রিকা লাতিন আমেরিকার দেশগুলির ঘাড়ে স্থানান্তরিত করে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি সুরাহা খুঁজছে, এটাই নয়া উপনিবেশবাদ। চীন নিজস্ব শক্তিতে এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, কিন্তু ভারতের মতো বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের আত্মসমর্পণ লজ্জাজনক। এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য কোনও একটি পথ বাতলে দেওয়া যায় না, বরং তা একেকটি দেশের সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির ওপরে নির্ভর করে। নভেম্বর বিপ্লবের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, ভারতে আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির ওপরে দাঁড়িয়েই বিষয়ীগত দিকগুলিতে জোর দিতে হবে, এটাই বর্তমান সময়ের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এর জন্য মেহনতি মানুষ থেকে মধ্যবিত্ত সব অংশের মানুষের ব্যাপকতম ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। বিজেপি আরএসএস’র হাত ধরে নেমে আসা নয়া ফ্যাসিবাদের আক্রমণে মোকাবিলায় বিহারের জেডি (ইউ) কিংবা পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূলের মতো যে শক্তিগুলি দর কষাকষি করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, তারা সফল হতে পারবে না। তারা নয়া ফ্যাসিবাদের আপাত বিরোধিতা দেখাতে পারে, কিন্তু কখন ভোল পালটে কোন দিকে চলে যাবে তার কোনও নিশ্চয়তাই নেই। তাই সারা দেশে আরএসএস-বিজেপি বিরোধী শক্তিগুলির ঐক্যবদ্ধ লড়াই গড়ে তোলার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের বুকে বিজেপি-তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াইতে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করাটাও জরুরি। দিন বদলের পালা কেউ চিরকাল রুখতে পারবে না, নিউইয়র্কে জোহরান মামদানির জয় সেই সম্ভাবনাকেই আবার দেখিয়ে দিয়েছে।
প্রবন্ধটি একই সাথে গণশাক্তি পত্রিকায় প্রকাশিত
প্রকাশ: ০৭-নভেম্বর-২০২৫
শেষ এডিট:: 07-Nov-25 06:44 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/the-november-revolution---before-and-after
Categories: Campaigns & Struggle
Tags: lenin, marxism-leninism, octoberrevolution, surjakanta mishra
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (155)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (141)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (78)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)
সাম্প্রতিক পোস্ট / Latest Posts
আমরা তিমির বিলাসী নই, তিমির বিনাশী হতে চাই
- শমীক লাহিড়ী
রবীন্দ্রনাথ, ফ্যাসিবাদ ও লাল পার্টি
- ময়ূখ বিশ্বাস
ভারতে বৃটিশ শাসনের ভবিষ্যৎ ফলাফল
- কার্ল মার্কস
বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রসঙ্গে: পলিট ব্যুরো বিবৃতি
- পলিট ব্যুরো
মহম্মদ সেলিমের বিবৃতি
- মহম্মদ সেলিম

.jpg)



