সমবায় প্রসঙ্গে

ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন
সমবায়কে রাজনৈতিকভবে এমনভাবে রাখা চাই, যাতে সমবায় শুধু যে সাধারণভাবে ও সর্বদাই নির্দিষ্ট কিছু সুবিধা পাবে তাই নয়, সে সুবিধা হওয়া চাই বৈষয়িক সুবিধা (ব্যাঙ্ক হারের মাত্রা ইত্যাদি)। সমবায়গুলিকে ঋণ দিতে হবে এমন পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ, যা অত্যাধিক না হলেও ব্যক্তিগত উদ্যোগের জন্য আমরা যে পরিমাণ ঋণ দিই তার চেয়ে বেশি, গুরু শিল্প ইত্যাদিকে যা মঞ্জুর করি এমন কি তার সমান।
.jpg)
আমাদের দেশে রাষ্ট্রক্ষমতা যেহেতু সত্যি করেই শ্রমিক শ্রেণীর হাতে, যেহেতু উৎপাদনের সমস্ত উপায়ই এই রাষ্ট্রক্ষমতার দখলে, সেইহেতু এখন জনসাধারণকে সমবায়বদ্ধ করার কাজটাই শুধু আসলে বাকি আছে, জনসাধারণের সর্বোচ্চ পরিমাণ সমবায়ীকরণের পরিস্থিতিতে আপনা থেকেই সেই সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য সিদ্ধ হবে, যা শ্রেণী-সংগ্রাম, রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য সংগ্রাম ইত্যাদির আবশ্যিকতায় ন্যায্যতই বিশ্বাসবানদের পক্ষ থেকে আগে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ ও অশ্রদ্ধা আকর্ষণ করত। কিন্তু রাশিয়ার সমবায়ীকরণের তাৎপর্য এখন আমাদের পক্ষে কত বিপুল, কত অশেষ হয়ে উঠছে তা সকল কমরেডই যে বোঝে এমন নয়। নয়া অর্থনৈতিক পলিসিতে আমরা ব্যবসায়ীরূপ কৃষককে, ব্যক্তিগত ব্যবসার নীতিকে একটা সুবিধা দিয়েছিলাম। সমবায়ের বিপুল তাৎপর্য আসছে ঠিক এই থেকেই (লোকে যা ভাবছে এটা তার উল্টো)। আসল কথা হল, নয়া অর্থনৈতিক পলিসির আমলে আমাদের যা দরকার তা হল যথেষ্ট মাত্রায় ব্যাপক আকারেও গভীরভাবে রাশিয়াবাসীদের সমবায়-সমিতিতে সংগঠিত করা, কেননা ব্যক্তিগত স্বার্থ, ব্যক্তিগত ব্যবসার স্বার্থ এবং তার ওপর রাষ্ট্রীয় পরিদর্শন ও নিয়ন্ত্রণকে কোন মাত্রায় মেলাতে হবে, কোন মাত্রায় তাকে সাধারণ স্বার্থের অধীনস্থ করে রাখতে হবে, যা পূর্বে বহু বহু সমাজতন্ত্রীর কাছে বিষম গেরো হয়ে উঠেছিল, তা এখন আমরা পেয়ে গেছি। বস্তুতপক্ষে, উৎপাদনের বৃহদায়তন উপায়গুলির ওপর রাষ্ট্রের ক্ষমতা, প্রলেতারিয়েতের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা, এই প্রলেতারিয়েতের সঙ্গে লক্ষ লক্ষ ক্ষুদে ও অতি ক্ষুদে চাষীর জোট, কৃষকদের ক্ষেত্রে এই সব প্রলেতারিয়েতের নেতৃত্বের নিশ্চিতি ইত্যাদি-সমবায় এবং কেবলমাত্র সমবায় থেকেই একটা পরিপূর্ণ সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠন করার পক্ষে এই জিনিসগুলিই কি যথেষ্ট নয়? অথচ এই সমবায়কে আমরা আগে অবজ্ঞা করে দেখেছি দোকানদারি বলে এবং নয়া অর্থনৈতিক পলিসির আমলে এখনো একদিক থেকে তাই দেখার অধিকার আমাদের আছে। এটা এখনো সমাজতান্ত্রিক সমাজের নির্মাণ নয়, কিন্তু সে নির্মাণের জন্য যা কিছু প্রয়োজন ও পর্যাপ্ত তা এই।
আমাদের ব্যবহারিক কর্মীদের অনেকেই এই পরিস্থিতিটা ছোটো করে দেখে। আমাদের সমবায়-সমিতিগুলিকে তারা অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে এবং প্রথমত, নীতির দিক থেকে (উৎপাদন-উপায়সমূহের উপর রাষ্ট্রের মালিকানা) এবং দ্বিতীয়ত, কৃষকদের পক্ষে সরলতম, সহজতম এবং আয়ত্তাধীন পদ্ধতিতে নয়া ব্যবস্থায় উৎক্রমণের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই সমবায়ের কী অশেষ গুরুত্ব তা তারা বুঝতে পারে না। এবং প্রধান কথাটা পুনরপি এইখানেই। সমাজতন্ত্র গঠনের জন্য নানাবিধ শ্রমিক সমিতি নিয়ে কল্পচারণ এক জিনিস, কিন্তু ব্যবহারিকভাবে এ সমাজতন্ত্র এমনভাবে গঠন করতে পারা যাতে নির্মাণকার্যে প্রতিটি ক্ষুদে চাষী অংশ নেয়-তা একেবারেই অন্য ব্যাপার। এই স্তরেই এখন আমরা পৌঁছিয়েছি। এবং কোনো সন্দেহই নেই যে, এই স্তরে উপনীত হয়ে আমরা তা অপরিসীম কম কাজে লাগাচ্ছি।
নয়া অর্থনৈতিক পলিসিতে গিয়ে আমরা যে বাড়াবাড়ি করেছি, সেটা এই দিক থেকে নয় যে স্বাধীন শিল্প ও বাণিজ্যের নীতিতে আমরা মাত্রাতিরিক্ত রকমের গুরুত্ব দিয়েছি। নয়া অর্থনৈতিক পলিসিতে গিয়ে আমরা বাড়াবাড়ি করেছি এই দিক থেকে যে, সমবায়ের কথা নিয়ে ভাবতে ভুলে গেছি, এই দিক থেকে যে বর্তমানে সমবায়ের গুরুত্ব আমরা ছোটো করে দেখছি, এই দিক থেকে যে পূর্বকথিত দুটি দিক থেকে সমবায়ের প্রভৃত গুরুত্ব আমরা ভুলতে বসেছি।
এবার এই 'সমবায়' নীতির ভিতিতে ব্যবহারিকভবে অবিলম্বেই কী করা যেতে পারে এবং করা উচিত, তা নিয়ে পাঠকদের সঙ্গে আলোচনা করতে চাই। কী উপায়ে এমনভাবে আমরা এক্ষুনি এই সমবায় নীতিকে বিকশিত করে তুলতে পারি ও কী উপায়ে তা করা উচিত, যাতে তার সমাজতান্ত্রিক অর্থ সকলের কাছে পরিস্কার হয়ে যায়?
সমবায়কে রাজনৈতিকভবে এমনভাবে রাখা চাই, যাতে সমবায় শুধু যে সাধারণভাবে ও সর্বদাই নির্দিষ্ট কিছু সুবিধা পাবে তাই নয়, সে সুবিধা হওয়া চাই বৈষয়িক সুবিধা (ব্যাঙ্ক হারের মাত্রা ইত্যাদি)। সমবায়গুলিকে ঋণ দিতে হবে এমন পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ, যা অত্যাধিক না হলেও ব্যক্তিগত উদ্যোগের জন্য আমরা যে পরিমাণ ঋণ দিই তার চেয়ে বেশি, গুরু শিল্প ইত্যাদিকে যা মঞ্জুর করি এমন কি তার সমান।
সমস্ত সামাজিক ব্যবস্থাই বিশেষ একটি শ্রেণী কর্তৃক আর্থিক সাহায্যদানেই কেবল গড়ে উঠতে পারে। স্বাধীন পুঁজিবাদের জন্মগ্রহণে যে কোটি কোটি বুবল মূল্য দিতে হয়েছিল, তার উল্লেখ করার দরকার নেই। এখন আমাদের এই কথাটা বুঝতে হবে এবং ব্যবহারিক কাজে প্রয়োগ করতে হবে যে, বর্তমানে যে সমাজ-ব্যবস্থাকে সচরাচর অপেক্ষা বেশি সমর্থন করা উচিত সেটি হল সমবায়-ব্যবস্থা। কিন্তু সমর্থন করতে হবে কথাটার সত্যকার অর্থে, অর্থাৎ এই সমর্থন বলতে যে কোনো রকমের সমবায়-বাণিজ্যের সমর্থন বুঝলে যথেষ্ট হবে না, সমর্থন বলতে আমরা বুঝব এমন সমবায়-বাণিজ্যের সমর্থন, যেখানে জনসাধারণের সত্যকার বৃহৎ ভাগটা সত্যই অংশ নিচ্ছে। সমবায়-বাণিজ্যে অংশগ্রহণকারী কৃষককে একটা বোনাস দেওয়া এটা অবশ্যই একটা সঠিক পন্থা, কিন্তু সে ক্ষেত্রে এই অংশগ্রহণটা যাচাই করা, কৃষকের সচেতনতা ও সদগুণ যাচাই করা, এই হল আসল কথা। যখন কোনো সমবায়ী গাঁয়ে গিয়ে একটা সমবায়-দোকান খোলে, তখন লোকে, সত্যি করে বললে, তাতে কোনোই অংশ নেয় না, কিন্তু সেইসঙ্গে নিজেদের স্বার্থে প্রণোদিত হলে লোকেরাই তাড়াতাড়ি করে তাতে যোগ দিতে চাইবে।
এ সমস্যার আর একটা দিক আছে। সুসভ্য (সর্বাগ্রে সাক্ষর) ইউরোপীদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমবায়-কর্মে নিঃশেষে সকলকেই শুধু নিষ্ক্রিয় নয়, সক্রিয় অংশগ্রহণে বাধ্য করতে আমাদের খুব বেশি কিছু করার দরকার নেই। সঠিকভাবে বলতে হলে, কেবল একটি জিনিসই আমাদের করার আছে : আমাদের জনসাধারণকে এতটা সুসভ্য করে তুলতে হবে, যাতে সমবায়ের কাজে সকলের অংশগ্রহণের পুরো সুবিধা তারা বুঝতে পারে এবং সে অংশগ্রহণ সংগঠিত করতে পারে। কেবল এইটেই। সমাজতন্ত্রে উত্তরণের জন্য অন্য কোনো পণ্ডিতির আর আমাদের এখন দরকার নেই। কিন্তু এই কেবলটুকু সম্পন্ন করতে হলে প্রয়োজন একটা গোটা বিপ্লবের, সমগ্র জনসাধারণের সাংস্কৃতিক বিকাশের একটা গোটা যুগ। তাই আমাদের নিয়ম হওয়া উচিত যথাসম্ভব কম পণ্ডিতিপনা এবং যথাসম্ভব কম চালিয়াতি। এদিক থেকে নয়া অথলনৈতিক পলিসি এই অর্থে একটা অগ্রগতি যে, তা অতি সাধারণ স্তরে কৃষকের উপযোগী এবং তার কাছ থেকে উচ্চ কিছু দাবি করে না। কিন্তু নয়া অর্থনৈতিক পলিসির মাধ্যমে সমবায়ে সমগ্র জনসাধারণের সার্বজনীন অংশগ্রহণ সম্ভব করে তুলতে হলে একটা গোটা ঐতিহাসিক যগের দরকার। উত্তম ক্ষেত্রে এ যুগ আমরা পেরতে পারি একটি কি দুটি দশকে। তাহলেও, এটি হবে একটি বিশেষ ঐতিহাসিক যুগ-এই ঐতিহাসিক যুগ ছাড়া, সার্বজনীন সাক্ষরতা ছাড়া, উপযুক্ত মাত্রার জ্ঞান ছাড়া, বই পড়ার অভ্যাসে জনসাধারণকে যথেষ্ট মাত্রায় শিক্ষিত করে তোলা ছাড়া এবং তার পেছনে একটা বৈষয়িক ভিত্তি ছাড়া, শস্যহানি দুর্ভিক্ষ ইত্যাদির বিরুদ্ধে কিছুটা রক্ষাকবচ ছাড়া-এছাড়া আমরা আমাদের লক্ষ্যার্জনে অক্ষম হবে। এখন প্রধান কথাই হল, যে বৈপ্লবিক উদ্যম, যে বিপ্লবী উদ্দীপনা আমরা দেখিয়েছি এবং দেখিয়েছি যথেষ্ট পরিমাণে ও পরিপূর্ণ সফলতা অর্জন করেছি-তার সঙ্গে মেলাতে পারা (প্রায় বলবার ইচ্ছে হচ্ছে) এক বুদ্ধিমান ও সাক্ষর ব্যবসায়ী হবার ক্ষমতা, ভালো সমবায়ী হবার পক্ষে যা সম্পূর্ণ যথেষ্ট। ব্যবসায়ী হবার ক্ষমতা বলতে আমি বোঝাতে চাইছি সংস্কৃতিবান ব্যবসায়ী হবার ক্ষমতা। সেই সব রুশী অথবা সাধারণভাবে চাষীর মাথায় যেন কথাটা ভালো ঢোকে, যারা ভাবে ব্যবসা যখন করছে তখন ব্যবসায়ী হবার ক্ষমতা রাখে। কথাটা মোটেই ঠিক নয়। ব্যবসা করছে বটে, কিন্তু সংস্কৃতিবান ব্যবসায়ী হওয়া এখনো অনেক বাকি। এখন সে ব্যবসা করছে এশীয় ধরনে, কিন্তু ব্যবসায়ী হতে হলে দরকার ইউরোপীয় ধরনে ব্যবসা করতে পারা। তার সঙ্গে এর তফাত একটা গোটা যুগের।
উপসংহারে একসারি অর্থনৈতিক, আর্থিক ও ব্যাঙ্কিং সুবিধা চাই সমবায়গুলির জন্য, এইটাই হওয়া উচিত জনসাধারণকে সংগঠনের নতুন নীতিতে আমাদের সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রের সমর্থন। কিন্তু এতে শুধু কর্তনের সাধারণ রূপরেখাই হাজির হচ্ছে মাত্র-কেননা তাতে ব্যবহারিক দিক থেকে কর্তব্যের সমগ্র বিষয় সুনির্দিষ্ট ও সবিস্তারে বর্ণিত হচ্ছে না, অর্থাৎ সমবায়ীকরণের জন্য যে বোনাস আমরা দেব তার রূপ (এবং তা দেবার সর্ত), যে রূপের বোনাস দিয়ে আমরা সমবায়গুলিকে যথেষ্ট সাহ্য করতে পারব, যে রূপের বোনাসের মাধ্যমে আমরা উঠব সুসভ্য সমবায়ীদের স্তরে সেই রূপটা আমাদের খুঁজে বার করতে পারা চাই। এবং উৎপাদন-উপায়সমূহের উপর সামাজিক মালিকানার আমলে, বুর্জোয়ার ওপর প্রলেতারিয়েতের শ্রেণীগত জয়লাভের আমলে সুসভ্য সমবায়ীদের যে ব্যবস্থা, তাই হল সমাজতন্ত্রের ব্যবস্থা।
প্রকাশ: ২২-এপ্রিল-২০২৬
শেষ এডিট:: 22-Apr-26 23:22 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/regarding-cooperatives
Categories: Fact & Figures
Tags: lenin, , cooperatives
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (150)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (133)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (78)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)
সাম্প্রতিক পোস্ট / Latest Posts
সমবায় প্রসঙ্গে
- ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন
“ এসো নির্মূল করি , স্বৈরাচারের ক্ষমতাকে ”
- সৌম্যদীপ রাহা
বাংলার বিকল্প পরিবেশ ভাবনা ও উন্নয়নের অভিমুখ
- সৌরভ চক্রবর্ত্তী
পশ্চিমবাংলার ক্রীড়ানীতি ও বিপল্প প্রস্তাব
- সুমিত গঙ্গোপাধ্যায়
তথ্য প্রযুক্তি এ আই আমাদের রাজ্যে সম্ভাবনা
- নন্দিনী মুখার্জি
প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি
- ওয়েবডেস্ক




