নভেম্বর বিপ্লব, লেনিন: শেখালেন তিনি শেখালেন (দ্বিতীয় পর্ব)

Author
কনীনিকা ঘোষ

পার্টি হল শ্রমিক শ্রেণীর সুসংহত বাহিনী ইহার নিজস্ব শৃঙ্খলা রয়েছে এবং সকল সভ্যকেই  সে শৃঙ্খলা মানতে হবে। পার্টি সম্মিলিত ইচ্ছার মুর্ত প্রতীক। যদি পার্টির সকল সভ্য একই বাহিনীতে সুসংহত থাকে যদি একই ইচ্ছা একই কর্ম পন্থা এবং শৃঙ্খলায় তারা পরস্পর সংলগ্ন হয়ে থাকে কেবল তাহলেই পার্টি শ্রমিক শ্রেণীর প্রকৃত সংগ্রামের নেতৃত্ব করতে এবং একটিমাত্র লক্ষ্যের প্রতি সংগ্রামকে পরিচালনা করতে পারে।

November Revolution, Lenin: He taught he taught (part 2)

দ্বিতীয় পর্ব


১৮৯৫ সালের ডিসেম্বর মাসে জার সরকার লেনিন কে গ্রেফতার করলেও জেল থেকেই লেনিন সংঘের কর্ম সূচির খসড়া করেন অদৃশ্য কালি হিসাবে দুধ ব্যবহার করে এবং একটি ডাক্তারি বইয়ের লাইনগুলোর ফাঁকে ফাঁকে লিখে তিনি তা প্রচার করেন। এই সংঘ রুশ দেশের অন্যান্য প্রদেশের শ্রমিকদের মধ্যেও প্রবল উৎসাহ সঞ্চার করে। লেনিন এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের গ্রেপ্তারের পর সংঘের নেতৃত্বে অদল বদল হয় নতুন যারা, তারা এসে নিজেদের নবীন বলে প্রচার করে।এই নবীনরা ঘোষণা করেন শ্রমিকদের কেবল মালিকদের বিরুদ্ধে মজুরি নিয়ে অর্থনৈতিক সংগ্রামের ডাক দেওয়া উচিত রাজনৈতিক সংগ্রাম হলো উদারনৈতিক বুর্জোয়াদের ব্যাপার। তাদের হাতেই সেই সংগ্রামের নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়া প্রয়োজন। এদের নাম দেওয়া হয় অর্থনীতিবাদী ইকোনমিস্ট। এদের বিরুদ্ধে এবং নারদনিকদের বিরুদ্ধে যারা শুধুমাত্র কৃষিজীবীদেরই ভাবতো বিপ্লবের প্রধান নেতা তাদের বিরুদ্ধে লেনিন শ্রমিকদের সংগঠিত করেন।

এই সময় লেনিন 'জনগণের বন্ধুরা কি ধরনের  এবং তাহারা কিভাবে বিশাল ডেমোক্রেটদের বিরুদ্ধে লড়িতেছে " এই বইতে জারতন্ত্র জমিদার ও বুর্জোয়াদের কর্তৃত্ব বরবাদ করবার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে শ্রমিক কৃষকের বিপ্লবী ঐক্যের কথা প্রচার করেন। এই সময়েই বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী রা মার্কসবাদী পোশাকে সাজেন।এই  আইনি মার্কসবাদীদের বিরুদ্ধেও লেনিন কে লড়াই করতে হয।  একই সাথে তিনি আইনি মার্কসবাদীদের উদারনৈতিক বুর্জোয়া মনোভাবের মুখোশ খুলে দেন। লেনিন  তথাকথিত অর্থনীতিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। লেনিন অর্থনীতিবাদীদের মতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ পত্র লেখেন, রুশ দেশের এই অর্থনীতিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও  বার্নস্টাইন সহ বিভিন্ন নেতৃত্ব পরিচালিত  সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে। এই কাজে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করে লেনিনের বেআইনি সংবাদপত্র ইসক্রা। ১৯০০ সালের ডিসেম্বর মাসে বিদেশে ইসক্রার  প্রথম সংখ্যা বের হয়, যার সামনের পাতায় লেখা ছিল 'স্ফুলিঙ্গ হইতে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হইবে'। যা সত্যিই  পরবর্তীকালে বাস্তবায়িত হয়েছিল।

১৮৯৪ থেকে ৯৮ সালে ভিন্ন ভিন্ন মার্কসবাদী সংস্থাগুলিকে একটা সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টিতে গঠিত করার চেষ্টা করা হলেও তা ব্যর্থ হয় কিন্তু ১৮৯৮ সালের ঠিক পরবর্তী সময়ে পার্টির মধ্যে মতাদর্শ ও সংগঠনমূলক বিভ্রান্তি বাড়িতে থাকে। এই সময় লেনিন উপলব্ধি করেন যে এমন একটি পার্টি প্রয়োজন যা সুসংহত ও কেন্দ্রীভূত হবে এবং যা বিপ্লবী আন্দোলনকে পরিচালিত করার ক্ষমতা রাখবে। আর এই সময়েই অর্থনীতিবাদীদের এবং আইনি মার্কসবাদীদের আক্রমণ ক্রমাগত চলছিল ফলে লেনিনের কাছে এদের পরাজিত করা প্রয়োজন ছিল। 'কোথায় আরম্ভ করিতে হইবে' নামে বিখ্যাত প্রবন্ধে লেনিন পার্টি গঠন সম্বন্ধে একটা সুস্পষ্ট ছক আগে এঁকে দেন, পরবর্তীকালে তার এই পরিকল্পনাকেই 'কি করিতে হইবে ''হোয়াট ইজ টু বি ডান ' গ্রন্থে  বর্ধিত আকারে প্রকাশ করেন যা ছিল পার্টি গঠনের এক অনন্য পরিকল্পনা। লেনিন বলেন আমাদের মতে রুশদেশের উপযোগী রাজনৈতিক সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করাই হইবে আমাদের কাজের আরম্ভ, আমাদের আকাঙ্ক্ষিত সংগঠন সৃষ্টির প্রথম ধাপ।লেনিনের ভাষায় সংবাদপত্র কেবল যৌথ প্রচারক আন্দোলন কারী নয়, সংবাদপত্র যৌথ সংগঠন ও সংগঠক ও বটে। যে পার্টি তৈরী করতে চান  তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তিনি বলেন এই পার্টিকে হতে হবে শ্রমিক শ্রেণীর অগ্রণী বাহিনী, সর্বহারা শ্রেণী সংগ্রামের সমন্বয়ে সাধনে ও পরিচালনায় ব্রতী। এই পার্টিকে হতে হবে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনের পথপ্রদর্শক। পুঁজিতন্ত্রের উচ্ছেদ ও সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করাই হলো পার্টির চরম লক্ষ্য। এইভাবে লেনিন প্রতি পদক্ষেপে কিভাবে পার্টি গড়ে তুলতে হবে সে কথা বলেছিলেন এবং হাতে-কলমে পার্টিকে গড়ে তুলেছিলেন।  তার এই বই পরবর্তীতে বলশেভিক পার্টির মতাদর্শের ভিত্তি যেমন হয় তেমনই যে কোন কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

এই সময় দ্বিতীয় পার্টি কংগ্রেস আহ্বান করা হয় l কংগ্রেসে নানামতে র প্রতিনিধিরা আসে। ইসক্রার জয়কে সুনিশ্চিত করতে লেনিন কে বিশেষ পরিশ্রম এখানে করতে হয়, সুবিধাবাদীরা পার্টি কর্মসূচিতে কৃষকদের দাবি অন্তর্ভুক্ত করতে চায়নি, জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সম্পর্কে ও অনেকে  আপত্তি জানায়। কিন্ত লেনিন লড়াই করে তা প্রতিষ্ঠা করেন।

লেনিন বলেছিলেন পার্টি এমন একটি সুসংহত বাহিনী যার সভ্যরা কেবল পার্টিতে নাম লিখে প্রবেশ করতে পারবে তা না, পার্টির কোন সংগঠন মারফত তাদের  পার্টিতে ঢুকতে হবে। সুতরাং পার্টি শৃঙ্খলাকেও  মেনে নিতে হবে। অন্যদিকে মারতভ বলেছিলেন সংগঠনের দিক থেকে  পার্টি হবে আলগা ধরনের। দেখা গেল যে,যে কেউ নাম লিখিয়ে  পার্টির সভ্য হতে পারবে,তাদের  পার্টির কোন সংগঠনে না থাকার দরুন পার্টি শৃঙ্খলা মেনে  নেবার কোন বাধ্যবাধকতা থাকবে না। লেনিন যুক্তিতে যুক্তিতে  এই মারতভের বিরুদ্ধে লড়াই করেই, কংগ্রেসে জয়লাভ করেন। এই সময় থেকেই কংগ্রেস নির্বাচন উপলক্ষে যে লেনিন পন্থীরা অধিকাংশ ভোট পায় তাহাদের বলশেভিক (সংখ্যাগরিষ্ঠ) বলা হয়। এখানেই দেখা যায় সংগঠনের প্রশ্নগুলো নিয়ে যে গুরুতর মতভেদ আছে সেই মতভেদ পার্টিকে বলশেভিক ও মেনশেভিক এই দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। বলশেভিকরা হল বিপ্লবী সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক সংগঠনিক নীতির পরিপোষক ও মেনশেভিকরা হলো সাংগঠনিক অব্যবস্থা ও সুবিধাবাদের পক্ষে নিমজ্জিত।

দ্বিতীয় কংগ্রেসের পর পার্টির মধ্যে বিরোধ আরো তীব্র হয়ে ওঠে। নানান ঘাত প্রতিঘাতে ইসক্রার ৫২ সংখ্যা থেকে আরম্ভ করে ইসক্রা মেনশেভিকদের নিজেদের মুখপাত্রে পরিণত হয় এবং এর মধ্যে দিয়ে  এরা সুবিধাবাদী মতবাদ প্রচার করে। এরা চূড়ান্তভাবে পার্টির ক্ষতি করতে চায়। প্লেখানভ  এই  সময় মেনশেভিকদের সমর্থন করেন। তার বিরুদ্ধে লেনিন আবার কলম ধরেন লেখেন 'এক পা আগে দুপা পিছে' যাতে তিনি সংগঠনের প্রধান প্রধান নীতির ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন মার্কসবাদী পার্টি শ্রমিক শ্রেণীর একটি অংশ, একটি বাহিনীর স্বরূপ কিন্তু যে কোন বাহিনী শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি নয়, অন্যান্য বাহিনী থেকে পার্টির প্রধান তফাত হল পার্টি একটি সাধারন বাহিনী নয় পার্টি হল অগ্রগামী বাহিনী, চেতনায় উদ্বুদ্ধ বাহিনী, শ্রমিক শ্রেণীর মার্কসবাদী বাহিনী।

পার্টি শুধু অগ্রণী বাহিনী নয়, পার্টি হল শ্রমিক শ্রেণীর সুসংহত বাহিনী ইহার নিজস্ব শৃঙ্খলা রয়েছে এবং সকল সভ্যকেই  সে শৃঙ্খলা মানতে হবে। পার্টি সম্মিলিত ইচ্ছার মুর্ত প্রতীক। যদি পার্টির সকল সভ্য একই বাহিনীতে সুসংহত থাকে যদি একই ইচ্ছা একই কর্ম পন্থা এবং শৃঙ্খলায় তারা পরস্পর সংলগ্ন হয়ে থাকে কেবল তাহলেই পার্টি শ্রমিক শ্রেণীর প্রকৃত সংগ্রামের নেতৃত্ব করতে এবং একটিমাত্র লক্ষ্যের প্রতি সংগ্রামকে পরিচালনা করতে পারে। এইভাবে লেনিন  পার্টি সংগঠনের নিয়ম নীতিকে রূপায়িত করেন।

তিনি আরো বলেন লক্ষ লক্ষ সাধারণ শ্রমিকের সহিত শ্রমিক শ্রেণীর অগ্রণী অংশের যে সম্পর্ক তার ই মূর্ত রূপ হল পার্টি। অগ্রণী হিসেবে পার্টি যতই চমৎকার হোক না কেন পার্টির বাইরে জনসাধারণের সঙ্গে তার সম্পর্ক না থাকলে এবং এই সম্পর্ক ক্রমাগত বহুগুণ বাড়াতে ও শক্তিশালী না করতে পারলে পার্টি বাঁচতে পারে না বা বাড়তে পারে না। পরিপূর্ণভাবে বাঁচতে ও বাড়তে হলে পার্টিকে জনগণের সহিত সম্পর্ক বহুগুণ বাড়াতে হয় নিজস্ব শ্রেণীর লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ও সাধারণের বিশ্বাস অর্জন করতে হয়।

তিনি বলেন ঠিক মতো কাজ করতে হলে এবং জনগণকে যথারীতি পরিচালিত করতে হলে পার্টিকে কেন্দ্রিকতার নীতির ভিত্তিতে দাঁড় করাতে হবে। যারা সংখ্যায় অল্প তারা অধিকাংশের মত মেনে নেবে এবং নিম্নতর সংগঠন গুলি উচ্চতর সংগঠন গুলিকে মানবে। এই শর্তগুলো পূরণ না হলে  পার্টি শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি হতে পারবে না। শ্রেণীকে পরিচালনা করার  যে কর্তব্য তা পালন করতে পারবে না। এভাবেই লেনিন মেনশেভিকদের বিরুদ্ধে পার্টি কে প্রতিষ্ঠা করেন।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলি প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে প্রভুত্ব কায়েম এবং চীন দেশকে ভাগ বাঁটোয়ারা করে নেবার জন্য যে তীক্ষ্ণ সংগ্রাম আরম্ভ করে সেই সংগ্রামে জারের রাশিয়াও যোগ দেয়।  অন্যদিকে জার তন্ত্রের সঙ্গে জাপানেরও বিরোধ বাধলো নানান ঘটনার মধ্য দিয়ে রুশ জাপান যুদ্ধ আরম্ভ হয় কিন্তু জনসাধারণ এ যুদ্ধ চায়নি।  রাশিয়া পশ্চাদপদ ব্যবস্থার জন্য তাদের দারুন ভুগতে হল। যুদ্ধ সম্বন্ধে বলশেভিক ও  মেনশেভিকদের মনোভাব ছিল বিভিন্ন প্রকারের। মেনশেভিক দের মধ্যে ট্রটস্কিও ছিলেন। তারা দেশ রক্ষার জন্য জার , জমিদার পুঁজিবাদের পিতৃভূমি রক্ষায় শামিল হচ্ছিল। অন্যদিকে লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা  বলেছিল এই দস্যু যুদ্ধে জার  সরকারের পরাজয়ই প্রয়োজন কারণ পরাজয়ের ফলে জার তন্ত্র দুর্বল হবে বিপ্লবের শক্তি বৃদ্ধি পাবে জার তন্ত্র যে কতদূর জীর্ণ হয়ে পড়েছে জার সৈনিকদের  বারবার পরাজয়ে সে বিষয়ে জনগণের চোখ খুলে গেল। বলশেভিকদের বাকু কমিটির নেতৃত্বে 1904 সালে বাকু শহরে শ্রমিকদের এক বিরাট ও সুসংবদ্ধ ধর্মঘট হয়, ধর্মঘটের শ্রমিকরা বিজয়ী হয়।  ১৯০৫ সালের ৩রা জানুয়ারি সেন্ট পিটার্সবর্গের সবচেয়ে বড় কারখানা পুটিলভে  ধর্মঘট শুরু হয়। চারজন শ্রমিকের কর্মচ্যুতি এই ধর্মঘটের কারণ। ধর্মঘট দাবানলের মতন ছড়িয়ে পড়ে। ।বলশেভিকদের নেতৃত্বে শ্রমিকদের বোঝানো সম্ভব হয় যে জারের কাছে আবেদন নিবেদন দ্বারা স্বাধীনতা অর্জন করা যায় না অস্ত্র বলে স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। বলশেভিকরা শ্রমিকদের এই বলে সাবধান করে দেয় যে তাহাদের উপর গুলি চলিতে পারে কিন্তু বিশ্বাসঘাতকদের কৌশল স্বরূপ জারের শীত প্রাসাদ অভিমুখে যে মিছিল যায় তা তারা রোধ করতে পারেনি কেননা শ্রমিকদের একটা বড় অংশ তখনও বিশ্বাস করত যে জার তাদের সাহায্য করবে। ১৯০৫ সালের ৯ই জানুয়ারি ভোরে শ্রমিকরা যার যে শীতপ্রাসাদে তখন অবস্থান করছিল সেদিকে অগ্রসর হল।তারা ছিল নিরস্ত্র কিন্তু জার দ্বিতীয় নিকোলাস তাদের শ্রমিকদের উপর গুলি চালানোর হুকুম দিল।  শ্রমিকদের রক্তে সেন্ট পিটার্স দুর্গের রাজপথ প্লাবিত হলো। একহাজার এর বেশি প্রান হারালো। ৯ জানুয়ারি রক্তাক্ত রবিবার নামে খ্যাত হলো, এর বিরুদ্ধে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল। শ্রমিক আন্দোলন অভূতপূর্ব উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হলো, রুশ দেশের বিপ্লব শুরু হল। ১৯০৫ সালের জুন মাসে কৃষ্ণ সাগরে নৌবাহিনীর পোটেমকিন  নামে একটি যুদ্ধ জাহাজে বিদ্রোহ বাঁধে বিদ্রোহের উপর বিরাট গুরুত্ব আরোপ করেন লেনিন,  তিনি মনে করিয়ে দেন  যে এই আন্দোলনে নেতৃত্ব গ্রহণ করা এবং শ্রমিক কৃষক এবং স্থানীয় সেনাদলের আন্দোলনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা বলশেভিকের পক্ষে প্রয়োজন। পোটেমকিনের বিরুদ্ধে জার কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ পাঠালেও সেই জাহাজের নাবিকেরা তাহাদের বিদ্রোহী সাথীদের উপর গুলি চালাতে অস্বীকার করে। কয়েক দিন ধরে যুদ্ধজাহাজ পোটেমকিনের মাস্তুলে বিপ্লবের রক্ত পতাকা উড়তে থাকে কিন্তু এতে অভিজ্ঞ নেতৃত্বের অভাব ছিল এবং তাতে শুধুমাত্র বলশেভিক পার্টির হাতে নেতৃত্বও ছিল না মেনশেভিক সোশ্যাল রেভেলিউশনারি, নৈরাজ্যবাদীরা ছিল। নানান সমন্বয়ের অভাবে বিদ্রোহের অবসান ঘটে পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে।

তবে এই বিপ্লবের ফলে স্থল বাহিনী, নৌ বাহিনীর শ্রমিক, সাধারণের সঙ্গে যে যোগ দিতে পারে এই ধারণা শ্রমিক কৃষকের কাছে এবং বিশেষ করে সৈন্য নাবিকদের কাছে আগের চেয়ে সহজবোধ্য এবং মনের মত হয়।   এই বিপ্লবে শ্রমিক শ্রেণী ও কৃষক সম্প্রদায় প্রচুর রাজনৈতিক শিক্ষা লাভ করে এবং এটা প্রতিষ্ঠিত হয় যে মেহনতকারী কৃষক সম্প্রদায় হলো সবচেয়ে বিরাট শক্তি যারা শ্রমিক শ্রেণীর সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করতে পারে। বলশেভিকদের সঙ্গে মেনশেভিকদের দুটি পৃথক নীতি নিয়ে লড়াই এই সময় চলছিল।বলশেভিকরা সম্পূর্ণ বিপ্লবের পূর্ণ বিজয়ের পথ চাইলো, অন্যদিকে মেনশেভিকদের পথ ছিল বিপ্লবের ধ্বংস স্থাপনের পথ তারা সর্বহারা নায়কত্বের পরিবর্তে লিবারেল বুর্জয়াদের নেতৃত্ব চাইল। এইভাবেই মেনশেভিক রা  আপোষের পথে চলে গেল এবং শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে, 'বুর্জোয়াদের  দালাল 'হিসেবে পরিগণিত হল ফলে পার্টিতে এবং সারাদেশে বলশেভিকরাই একমাত্র বিপ্লবী শক্তি হিসেবে পরিণত হল।  লেনিন 'গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোশ্যাল ডেমোক্রেসির দুই কৌশল 'নামে ইতিহাস প্রসিদ্ধ গ্রন্থে মেনশেভিক দের সমালোচনা ও বলশেভিক কর্মকৌশলের স্বপক্ষে চমৎকার বিশ্লেষণ  উপস্থিত করলেন। যখন তিনি  বুর্জোয়া বিপ্লবের যুগে মার্কসবাদী কর্মকৌশলের চুক্তি বিশ্লেষণ করেন তখন একই সময় তিনি  বুর্জোয়া বিপ্লব  সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে রূপান্তরিত হবার মাঝামাঝি সময় কর্মকৌশলের মূলনীতিগুলি  ঠিক করে দিয়েছিলেন।

বিপ্লব পরাজিত হলে, বলশেভিক রা  কর্মকৌশল বদলায় কিন্তু সংগ্রামের পথ ছাড়েনি। এই সময় মেনশেভিকরা বিপ্লবের পথ থেকে দূরে সরে সংস্কারপন্থী পার্টি গঠন করল নাম দিল 'স্তলিপিন লেবার পার্টি।' ট্রটস্কিও  এদের সমর্থন জানালেন। লেনিন তার 'মেটেরিয়ালিজম অ্যান্ড ইম্পেরিও ক্রিটিসিজম' গ্রন্থে  পার্টিকে এর বিরুদ্ধে তাত্ত্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করলেন। প্রাগ কনফারেন্সে  সর্বহারা পার্টি থেকে মেনশেভিক সুবিধাবাদীদের দূর করে দেওয়া গেল। তার জন্যই পার্টির পক্ষে পরবর্তীতে  বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। ১৯১২ সালে নতুন সংবাদপত্র প্রাভদা বলশেভিকরা লেনিনের নির্দেশে প্রকাশ করল।

এইভাবেই লড়াই আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে পথ অতিবাহহিত কর‍তে করতে  ১৯ শে জুলাই তারিখ (নতুন হিসেবে ১ লা আগস্ট) জার্মানি রুশ  দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। রুশ দেশ যুদ্ধে যোগ দিল।  লেনিন দেখিয়েছিলেন যুদ্ধ হলো পুঁজিতন্ত্রের এক অবশ্যম্ভাবী আনুষঙ্গিক ব্যাপার।।

জার শাসিত রাশিয়া যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না অন্যান্য পুঁজিবাদী দেশের তুলনায় রুশ শিল্প বহু পশ্চাতে পড়েছিল এবং রুশ দেশের কৃষি ব্যবস্থাও দীর্ঘকাল স্থায়ী কোন যুদ্ধের উপযোগী এক সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারেনি। যুদ্ধের সূচনা থেকে সোশ্যালিস্ট রেভোলিউশনারি, মেনশেভিক এই পাতি বুর্জোয়া দল গুলি পিতৃভূমি রক্ষার উদ্দেশ্যে জার  সরকারকে যুদ্ধ চালাতে সাহায্য করল, একমাত্র বলশেভিক পার্টি বিপ্লবী আন্তর্জাতিক মহান আদর্শের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখে  প্রথম থেকেই বলল যুদ্ধ লাগানো হয়েছে দেশ রক্ষার জন্য নয়, লাগানো হয়েছে পর রাজ্য গ্রাসের জন্য। সুতরাং এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের প্রাণপণ সংগ্রাম চালাতে হবে।দ্বিতীয়  আন্তর্জাতিকের বিভিন্ন পার্টি গুলি নিজ নিজ দেশের সাম্রাজ্যবাদী সরকারের পক্ষে যোগ দিল কিন্তু বলশেভিকরা  বলল সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে জার সরকারের সামরিক পরাজয় জনসাধারণের পক্ষে অপেক্ষাকৃত কম অমঙ্গল এর ব্যাপার কারণ এর ফলে জার তন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণের বিজয় এবং পুঁজিবাদী দাসত্ব ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের কবুল হইতে শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তি সংগ্রামের সাফল্য লাভ সহজ হইবে। লেনিন বললেন যে নিজ দেশের সাম্রাজ্যবাদী সরকারের পরাজয় ঘটাইবার যে নীতি তা কেবলমাত্র রুশ বিপ্লবীদের অনুসরণীয় নয় সমস্ত যুধ্যমান দেশের শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী পার্টি গুলির অবশ্যই অনুসরণীয়।

১৯১৭ সালের শুরু হলো ৯ জানুয়ারি তারিখের ধর্মঘটের মাধ্যমে। এই ধর্মঘটের সময় পেট্রোগ্রাড, মস্কো বাকু বিভিন্ন স্থানে মিছিল বের হয় অসংখ্য শ্রমিক এই ধর্মঘটে যোগ দেয়। কোন কোন মিছিলে  সৈনিকরা যোগদান করে। এই ধর্মঘট ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ১৯৯৭ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি তারিখে পেট্রোগ্রাডে পুটিলভ কারখানার ধর্মঘট শুরু হল।  ২৩ শে ফেব্রুয়ারি (৮ই মার্চ) আন্তর্জাতিক মহিলা দিবস ছিল,সেদিন  শ্রমিক মেয়েরা রাস্তায় বেরিয়ে অনাহার, যুদ্ধ ও জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করল শ্রমিকরা, নারী শ্রমিকদের বিক্ষোভ  প্রদর্শনকে সমর্থন করল। ধর্মঘট ক্রমে বাড়ছিল। শ্রমিক সাধারণ যে লাল ঝান্ডা উড়াচ্ছিল তাতে স্লোগান লেখা ছিল জার  নিপাত যাক,  যুদ্ধ নিপাত যাক, আমরা চাই রুটি।

চলবে...
প্রথম পর্বের লিঙ্ক
তৃতীয় পর্বের লিঙ্ক


প্রকাশ: ১১-নভেম্বর-২০২৫

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 11-Nov-25 08:59 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/november-revolution-lenin-he-taught-he-taught-part-2
Categories: Campaigns & Struggle
Tags: leninism, marxism-leninism, november revolution
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড