মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি

Author
ওয়েবডেস্ক

পশ্চিমবঙ্গে ৬০ লক্ষ ভোটারের সুপরিকল্পিত ভোটাধিকার হরণ এবং সাংবিধানিক আদেশের অবমাননার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ

Letter to The Chief Election Commissioner
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
মুজফ্ফর আহমদ ভবন
৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০ ০১৬
তারিখ: মার্চ ০৯, ২০২৬

প্রতি,
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার,
ভারতের নির্বাচন কমিশন,
নির্বাচন সদন,
অশোক রোড, নয়াদিল্লি ১১০০০১
বিষয়: পশ্চিমবঙ্গে ৬০ লক্ষ ভোটারের সুপরিকল্পিত ভোটাধিকার হরণ এবং সাংবিধানিক আদেশের অবমাননার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ।

মহাশয়,
আমরা পশ্চিমবঙ্গের এক ভয়াবহ সাংবিধানিক সংকটের দিকে আপনার জরুরি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' (SIR) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন ২০২৬-এর নামে নজিরবিহীনভাবে ৬০ লক্ষ ভোটারকে 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন' (বিচারাধীন) নামক একটি আইনি ও প্রশাসনিক শূন্যতার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই বৈধ নাগরিকদের এইভাবে 'সন্দেহভাজন' হিসেবে তালিকাভুক্ত করা কেবল একটি পদ্ধতিগত ত্রুটি নয়; এটি ভারতীয় গণতন্ত্রের পবিত্রতার ওপর সরাসরি আঘাত। 
আমাদের বক্তব্যগুলি নিচে দেওয়া হলো:
১. আইনগত ‘ধূসর অঞ্চল’ তৈরি করা
বর্তমান আইন অনুযায়ী একজন নাগরিক হয় ‘ভোটার’ অথবা ‘অভোটার’। ৬০ লক্ষ মানুষের জন্য 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন' (বিচারাধীন) নামে যে অবস্থান তৈরি করা হয়েছে তার  জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে কোনো ভিত্তি নেই। উদ্বেগজনক বিষয় হল, এই বিপুল সংখ্যক মানুষের মধ্যে অধিকাংশই আর্থিক ও সামাজিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। নির্বাচনের ঠিক আগে তাদের কণ্ঠরোধ করার এই প্রক্রিয়া গণতন্ত্রবিরোধী। ভোটার তালিকায় ‘Under Adjudication’ নামে কোনো শ্রেণি থাকা উচিত নয়।
২. পরিকল্পিতভাবে নাম বাদ দেওয়া ও তথাকথিত ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ বা 'যৌক্তিক অসঙ্গতি'
ধর্মীয় সংখ্যালঘু ভোটারদের পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়ার ঘটনায় আমরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছি। ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ নামে যে অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, তার আড়ালে সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট। বহু সরকারি কর্মচারী এবং দীর্ঘদিনের যাচাইকৃত ভোটারদের উত্তরাধিকারীদের নামও এই তালিকায় চলে এসেছে, যা এক ধরনের ডিজিটাল জালিয়াতির ইঙ্গিত দেয়। যখন বুথ লেভেল অফিসার থেকে পর্যবেক্ষক পর্যন্ত প্রশাসনিক যন্ত্র নিরপেক্ষতা ত্যাগ করে রাজনৈতিক কর্মীর মতো আচরণ করে, তখন আমাদের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৩. আপিলের অধিকারে বাধা এবং ফর্ম-৬ এর বিভ্রান্তি
জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ২৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী, প্রতিটি নাগরিকের আপিল করার সংবিধিবদ্ধ অধিকার রয়েছে।তবে 'স্পিকিং অর্ডার' বা সুনির্দিষ্ট কারণসহ প্রত্যাখ্যানপত্র না দিয়ে প্রশাসন বিচারগত প্রতিকারের পথ বন্ধ করে দিচ্ছে। তদুপরি, প্রশাসন কৌতূহলজনকভাবে 'বাতিল' হওয়া ভোটারদের নতুন করে ফর্ম-৬ পূরণ করার পরামর্শ দিচ্ছে, যা আইনত ভিত্তিহীন  কারণ তাদের পূর্ববর্তী অবস্থার নিষ্পত্তি হয়নি। অনলাইন সুবিধা হঠাৎ বন্ধ করে দিয়ে দরিদ্র নাগরিকদের অফলাইনে আবেদন জমা দেওয়ার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে বাধ্য করা এক প্রকার রাষ্ট্রীয় হয়রানি।
৪. প্রাতিষ্ঠানিক সততার ব্যর্থতা
এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার পেছনে যে প্রযুক্তিগত ‘ত্রুটি’ দেখানো হচ্ছে, তার জন্য একটি উচ্চস্তরের স্বাধীন তদন্ত শুরু করা আবশ্যক। মাত্র দুইজন নিম্নস্তরের কর্মচারীর বিরুদ্ধে এফআইআর করা অত্যন্ত অপ্রতুল পদক্ষেপ।মাননীয় সুপ্রিম কোর্ট ভোটার তালিকা যাচাইয়ের জন্য বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নিয়োগ করতে বাধ্য হয়েছেন—এই তথ্যটিই ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI) এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রশাসন উভয়ের নিরপেক্ষতার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
আমাদের দাবি
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পবিত্রতা রক্ষার জন্য আমরা নিম্নলিখিত দাবিগুলি জানাচ্ছি—
* সার্বজনীন অন্তর্ভুক্তি ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা: কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে যেন চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের আগে প্রতিটি প্রকৃত ও যোগ্য ভোটারের নাম পুনরুদ্ধার ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সমস্ত ম্যাপ করা ভোটার এবং যাচাইকৃত ফর্ম-৬ আবেদনকারীদের অবিলম্বে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
 * 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন' তকমা বিলোপ: নির্বাচন কমিশনকে সরকারিভাবে জনসাধারণের কাছে ঘোষণা করতে হবে যে 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন' তকমাকে কোনো সরকারি সুবিধা, সহায়তা বা পরিষেবা অস্বীকার বা বিলম্বিত করার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
* নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা
যে সব ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে তাদের প্রত্যেককে লিখিতভাবে সুনির্দিষ্ট কারণ জানাতে হবে এবং আপিল করার জন্য স্পষ্ট ও সহজলভ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক ভোটার SIR প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরেও কোনো নোটিশ ছাড়াই তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন—এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
*ভোটদানের জন্য অবিলম্বে নাম অন্তর্ভুক্তি
আমরা দাবি করছি যে এই ৬০ লক্ষ নাগরিকের নাম পুনর্বহাল না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন ঘোষণা করা যাবে না। প্রশাসনিক শূন্যতা বা বাহ্যিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এড়াতে 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন' অবস্থায় থাকা সমস্ত ভোটারকে আপাতত ভোট দেওয়ার জন্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে চূড়ান্ত যাচাই নির্বাচন শেষে করা যেতে পারে, কিন্তু  কিন্তু ভোট দেওয়ার অধিকার স্থগিত রাখা যাবে না।
*চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর কঠোর নজরদারি
সব ধরনের স্বেচ্ছাচারী অবস্থান দূর করে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশনকে কঠোর নজরদারি বজায় রাখতে হবে যাতে আর কোনো প্রযুক্তিগত বা প্রশাসনিক কারচুপি না হয়।
শেষে আমরা জোর দিয়ে বলছি, নির্বাচন কমিশনকে তার সাংবিধানিক মর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যে রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক স্বার্থে কোনো প্রকৃত ভোটারের অধিকার বলি না হয়।

শ্রদ্ধা সহ,
মহম্মদ সেলিম
রাজ্য সম্পাদক
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী), পশ্চিমবঙ্গ

প্রকাশ: ০৯-মার্চ-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 09-Mar-26 15:59 | by 4
Permalink: https://cpimwestbengal.org/letter-to-the-chief-election-commissioner
Categories: Press Release
Tags: eci, sir, sir west bengal
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড