ভারতের ক্রীড়ানীতি: একটি ধারাবাহিক ইতিহাস (পঞ্চম পর্ব)

Author
সুমিত গঙ্গোপাধ্যায়

হকি বিশ্বকাপে ভারতের ঐতিহাসিক জয় ছিল স্বাধীনতার পর ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রীড়া সাফল্যগুলির অন্যতম। এই সাফল্য হঠাৎ করে আসেনি; এটি ছিল দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, সেনা ও রেলওয়ে-কেন্দ্রিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা এবং দলগত খেলায় অভিজ্ঞতার ফল। তবুও লক্ষণীয় যে, এই সাফল্যও ছিল এক অর্থে ‘শেষ বড় সাফল্য’-এর সূচনা।

India's Sports Policy: A Continuous History ( part v)

১৯৭০-এর দশক ভারতের ক্রীড়া ইতিহাসে এক জটিল, দ্বন্দ্বপূর্ণ ও রূপান্তরময় সময়কাল। এই দশককে কেবল সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার সরল দ্বিবিভাজনে বোঝা যায় না; বরং এটি ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট, রাষ্ট্রীয় কেন্দ্রিকতার বিস্তার, সমাজের মধ্যবিত্তীকরণ এবং ক্রীড়াকে জাতীয় মর্যাদা ও কূটনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। স্বাধীনতার পরবর্তী দুই দশকে যে ক্রীড়া-পরিকাঠামো ও নীতির ভিত রচিত হয়েছিল, ১৯৭০-এর দশকে তার বাস্তব ফলাফল স্পষ্ট হতে শুরু করে—কিছু ক্ষেত্রে সাফল্যের আকারে, আবার বহু ক্ষেত্রেই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও নীতিগত ব্যর্থতার রূপে।
এই দশকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বোঝা ছাড়া ক্রীড়াক্ষেত্রের অবস্থান অনুধাবন করা সম্ভব নয়। ইন্দিরা গান্ধী-র নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থা ১৯৭০-এর দশকে ক্রমশ আরও কেন্দ্রীভূত ও প্রশাসনিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, পরবর্তী সময়ে জাতীয়তাবাদী আবেগের উত্থান এবং শেষপর্যন্ত ১৯৭৫–৭৭ সালের জরুরি অবস্থা—এই সবই ক্রীড়াকে রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি নির্মাণের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরে। রাষ্ট্র বুঝতে পারে যে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সাফল্য কেবল খেলাধুলার বিষয় নয়, বরং তা জাতীয় গৌরব, কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও অভ্যন্তরীণ ঐক্যের প্রতীক।

তবে এই উপলব্ধি বাস্তবায়নের পথে ছিল একাধিক অন্তরায়। ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তখন সংকটাপন্ন। ‘হিন্দু রেট অব গ্রোথ’, মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্যসংকট, বেকারত্ব—এই সবের প্রভাব পড়ে ক্রীড়াক্ষেত্রেও। ক্রীড়া তখনও বিলাস বা অতিরিক্ত কার্যকলাপ হিসেবে দেখা হত, বিশেষত নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত সমাজে। পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থা খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে গ্রহণে নিরুৎসাহিত করত। ফলে প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও বহু সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদ ঝরে পড়ত খুব অল্প বয়সেই।
এই সময়ে ভারতীয় ক্রীড়াক্ষেত্রের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসে হকিতে। ১৯৭৫ সালে কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত হকি বিশ্বকাপে ভারতের ঐতিহাসিক জয় ছিল স্বাধীনতার পর ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রীড়া সাফল্যগুলির অন্যতম। এই সাফল্য হঠাৎ করে আসেনি; এটি ছিল দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, সেনা ও রেলওয়ে-কেন্দ্রিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা এবং দলগত খেলায় অভিজ্ঞতার ফল। তবুও লক্ষণীয় যে, এই সাফল্যও ছিল এক অর্থে ‘শেষ বড় সাফল্য’-এর সূচনা। কৃত্রিম টার্ফের প্রসার, ইউরোপীয় ও অস্ট্রেলীয় শারীরিক হকির উত্থান এবং ভারতের ধীরগতির প্রশাসনিক অভিযোজন ক্ষমতা ভবিষ্যতে হকির অবনমনকে অনিবার্য করে তোলে।

ক্রিকেটের ক্ষেত্রে ১৯৭০-এর দশক ছিল রূপান্তরের দশক। একদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতের অবস্থান ছিল সীমিত ও অনিয়মিত, অন্যদিকে এই দশকেই ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন আত্মবিশ্বাসের জন্ম হয়। ১৯৭১ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডে ভারতের টেস্ট সিরিজ জয় ক্রিকেটকে প্রথমবারের মতো জাতীয় গর্বের প্রতীকে পরিণত করে। যদিও এই সাফল্যের নায়করা প্রধানত ১৯৬০-এর দশকের প্রজন্মের খেলোয়াড়, তবুও ১৯৭০-এর দশকেই ক্রিকেট ধীরে ধীরে মধ্যবিত্তের ঘরের খেলায় পরিণত হয়। সরকারি সম্প্রচার সংস্থা দূরদর্শনের বিস্তার ক্রিকেটকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়, যা ভবিষ্যতের ক্রিকেট-আধিপত্যের ভিত্তি গড়ে তোলে।
অন্যদিকে অ্যাথলেটিক্স, সাঁতার, জিমন্যাস্টিকস বা কুস্তির মতো ব্যক্তিগত খেলাগুলিতে ভারতের সাফল্য ছিল অত্যন্ত সীমিত। এর অন্যতম কারণ ছিল বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণের অভাব, আধুনিক কোচিংয়ের সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অনুপস্থিতি। যদিও কিছু ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী ও রেলওয়ে নির্ভর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিভা তুলে আনত, তবুও জাতীয় স্তরে সমন্বিত ক্রীড়ানীতি গড়ে ওঠেনি। ক্রীড়া তখনও ছিল মূলত রাজ্যভিত্তিক ফেডারেশন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হাতে, যেখানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও প্রশাসনিক অদক্ষতা ছিল প্রবল।
১৯৭০-এর দশকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এশিয়ান গেমসকে ঘিরে ভারতের ক্রীড়া নীতি। ১৯৭০ (ব্যাংকক) ও ১৯৭৪ (তেহরান) এশিয়ান গেমসে ভারতের পারফরম্যান্স ছিল মাঝারি। পদক তালিকায় ভারত কখনও শীর্ষে উঠতে পারেনি, বরং চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশের সঙ্গে ব্যবধান ক্রমশ বাড়তে থাকে। এই ব্যর্থতা নীতিনির্ধারকদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে কেবল ঐতিহ্য বা জনসংখ্যা দিয়ে ক্রীড়া-সাফল্য অর্জন করা যায় না; প্রয়োজন কাঠামোগত বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

নারী ক্রীড়ার ক্ষেত্রেও ১৯৭০-এর দশক ছিল দ্বন্দ্বপূর্ণ। একদিকে রাষ্ট্রীয় ভাষ্যে নারী ক্রীড়ার গুরুত্ব স্বীকার করা হচ্ছিল, অন্যদিকে সামাজিক বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। গ্রামীণ ও শহরতলির সমাজে নারী ক্রীড়াবিদদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ছিল সীমিত। পর্যাপ্ত সুযোগ, নিরাপত্তা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বহু প্রতিভা অঙ্কুরেই নষ্ট হয়ে যেত। কিছু ব্যতিক্রমী সাফল্য থাকলেও তা সামগ্রিক চিত্র বদলাতে পারেনি।
এই সময়ে ক্রীড়া প্রশাসনে রাজনীতির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্রীড়া ফেডারেশনগুলির নেতৃত্বে রাজনীতিবিদ ও আমলাদের আধিপত্য বাড়তে থাকে। খেলোয়াড়দের প্রতিনিধি হিসেবে সিদ্ধান্তগ্রহণের সুযোগ ছিল প্রায় নেই। ফলে নীতি নির্ধারণে মাঠের বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটত না। জরুরি অবস্থার সময় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হয়, যার প্রভাব ক্রীড়া সংগঠনগুলির স্বায়ত্তশাসনেও পড়ে।
তবে এই দশককে সম্পূর্ণ ব্যর্থতার দশক বলা ভুল হবে। ১৯৭০-এর দশকেই ক্রীড়া একটি সামাজিক দৃশ্যমানতা অর্জন করে, যা পরবর্তী দশকগুলিতে বিস্ফোরণের আকার নেয়। ক্রীড়া সাংবাদিকতার বিকাশ, জাতীয় স্তরে প্রতিযোগিতার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কিছু প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ভবিষ্যতের পথ প্রস্তুত করে। যদিও এই উদ্যোগগুলি ছিল অপর্যাপ্ত ও অসম, তবুও এগুলি ক্রীড়াকে প্রান্তিকতা থেকে মূলধারার আলোচনায় নিয়ে আসে।
সব মিলিয়ে ১৯৭০-এর দশকের ভারতীয় ক্রীড়া জগৎ ছিল সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার যুগপৎ সহাবস্থানের এক অধ্যায়। রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদ ক্রীড়াকে গুরুত্ব দিলেও তা প্রায়শই ছিল প্রতীকী; বাস্তব কাঠামোগত সংস্কার ও বিনিয়োগ ছিল সীমিত। সমাজ ক্রীড়াকে ভালোবাসতে শুরু করলেও তাকে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। এই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই ভারতীয় ক্রীড়া ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকের দিকে অগ্রসর হয়, যেখানে বাণিজ্যিকীকরণ ও বিশ্বায়নের ঢেউ পুরনো কাঠামোকে ভেঙে নতুন বাস্তবতা নির্মাণ করে।
এই অর্থে ১৯৭০-এর দশককে ভারতীয় ক্রীড়া ইতিহাসে একটি ‘সংক্রমণকাল’ বলা যায়—যেখানে অতীতের ঐতিহ্য ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনার মাঝে দাঁড়িয়ে ছিল এক রাষ্ট্র ও সমাজ, যারা এখনও ঠিক করে উঠতে পারেনি ক্রীড়া তার কাছে আবেগ, নাকি নীতি, নাকি কেবলমাত্র উপলক্ষ।
 

এই সংক্রমণকালের গভীরতর তাৎপর্য বোঝার জন্য ১৯৭০-এর দশকের ক্রীড়া ও শিক্ষাব্যবস্থার আন্তঃসম্পর্কের দিকটিও বিশেষভাবে বিবেচনা করা জরুরি। এই সময়ে ভারতের বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে ক্রীড়া কার্যক্রম মূলত আনুষ্ঠানিক ও পরীক্ষানির্ভর কাঠামোর বাইরে রয়ে যায়। শারীরশিক্ষা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও তা ছিল প্রান্তিক, অবহেলিত ও প্রায়শই প্রতীকী। ক্রীড়াকে ‘সহশিক্ষামূলক কার্যকলাপ’ হিসেবে দেখা হত, জীবিকা বা সামাজিক উন্নয়নের একটি বাস্তব পথ হিসেবে নয়। ফলে ক্রীড়া ও শিক্ষার মধ্যে যে জৈব সম্পর্ক গড়ে ওঠা প্রয়োজন ছিল, তা তৈরি হয়নি। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে প্রতিভা চিহ্নিতকরণ ও বিকাশের প্রক্রিয়ায়।

এই দশকে ক্রীড়া ও শ্রেণি-বাস্তবতার সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্রিকেটের মতো খেলাগুলি দ্রুত শহুরে মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠলেও গ্রামীণ ও শ্রমজীবী শ্রেণির জন্য ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ সীমিতই থেকে যায়। হকি, কুস্তি বা অ্যাথলেটিক্সের মতো খেলায় নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত অংশগ্রহণ থাকলেও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তারা টিকে থাকার লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ে। ক্রীড়া তখনও সমান সুযোগের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারেনি; বরং সামাজিক বৈষম্য অনেক ক্ষেত্রে ক্রীড়াক্ষেত্রেই পুনরুৎপাদিত হয়।

১৯৭০-এর দশকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া রাজনীতির পরিবর্তনও ভারতের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ক্রীড়া বিশ্ব রাজনীতির এক নরম কিন্তু কার্যকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ক্রীড়া ব্যবস্থার সঙ্গে ভারতের তুলনা প্রায়ই করা হত, কিন্তু ভারত সেই মডেল সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। একদিকে গণতান্ত্রিক কাঠামো, অন্যদিকে সীমিত অর্থনৈতিক সক্ষমতা—এই দ্বৈত সীমাবদ্ধতার মধ্যে ভারতের ক্রীড়ানীতি দোদুল্যমান রয়ে যায়। রাষ্ট্র চেয়েছিল সাফল্য, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ কাঠামো গড়ে তুলতে প্রস্তুত ছিল না।

এই সময়ে ক্রীড়া অবকাঠামোর ভৌগোলিক বৈষম্যও প্রকট হয়ে ওঠে। দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতা, চেন্নাইয়ের মতো মহানগরীতে কিছু স্টেডিয়াম ও প্রশিক্ষণ সুবিধা থাকলেও দেশের অধিকাংশ অংশ ছিল কার্যত অবকাঠামোবিহীন। জাতীয় শিবির বা ক্যাম্পের ধারণা থাকলেও তা ছিল স্বল্পমেয়াদি ও অসংলগ্ন। ফলে ক্রীড়া উন্নয়নের যে ধারাবাহিকতা প্রয়োজন, তা সৃষ্টি হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ঠিক আগে তড়িঘড়ি প্রস্তুতি নেওয়া হত, যা কাঠামোগত দুর্বলতাকে আড়াল করতে পারত না।

১৯৭০-এর দশকের ক্রীড়া সংস্কৃতিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা ছিল ধীরে ধীরে পরিবর্তনশীল। প্রিন্ট মিডিয়া তখনও প্রধান মাধ্যম, যেখানে ক্রিকেট ও হকির আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। অন্যান্য খেলাগুলি খুব কমই নিয়মিত স্থান পেত। দূরদর্শনের বিস্তার শুরু হলেও তা এখনও সীমিত সম্প্রচারের পর্যায়ে। তবুও এই দশকেই ক্রীড়া ধীরে ধীরে জনআলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে শুরু করে। বড় ম্যাচ, আন্তর্জাতিক সফর বা বিশেষ সাফল্য সংবাদপত্রের শিরোনামে আসত, যা ক্রীড়াকে সামাজিক কল্পনায় স্থায়ী জায়গা করে দিতে সাহায্য করে।

এই দশকের অভিজ্ঞতা থেকেই রাষ্ট্র ও সমাজ ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শুরু করে যে ক্রীড়া কেবল আবেগের বিষয় নয়, এটি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও পেশাদারিত্বের দাবি রাখে। যদিও এই উপলব্ধি ১৯৭০-এর দশকে পূর্ণাঙ্গ নীতিতে রূপ নেয়নি, তবুও এটি ১৯৮০-এর দশকের কিছু উদ্যোগের ভিত্তি প্রস্তুত করে। পরবর্তী সময়ে স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের জন্ম, জাতীয় শিবিরের ধারণা ও বিদেশি কোচ আনার প্রক্রিয়া—সবকিছুর বীজ এই দশকের অভিজ্ঞতার মধ্যেই নিহিত ছিল।

নারী ক্রীড়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের একটি দ্বৈত উত্তরাধিকার দেখা যায়। সামাজিক বাধা সত্ত্বেও ১৯৭০-এর দশকে কিছু নারী ক্রীড়াবিদ জাতীয় স্তরে দৃশ্যমান হন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার কাজ করে। যদিও সংখ্যা কম ছিল এবং কাঠামোগত সহায়তা প্রায় অনুপস্থিত, তবুও এই উপস্থিতি প্রমাণ করে যে সামাজিক প্রতিরোধ সত্ত্বেও ক্রীড়া একটি পরিবর্তনের সম্ভাব্য ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, ১৯৭০-এর দশক ভারতীয় ক্রীড়ার ইতিহাসে একটি প্রস্তুতির পর্ব—যেখানে প্রশ্ন ছিল বেশি, উত্তর কম; সম্ভাবনা ছিল বিস্তর, কিন্তু বাস্তবায়ন ছিল দুর্বল। এই দশক রাষ্ট্রকে আয়না দেখিয়েছিল, সমাজকে দ্বিধার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল এবং ক্রীড়াকে আবেগ ও নীতির মাঝামাঝি এক অনিশ্চিত অবস্থানে রেখে গিয়েছিল। পরবর্তী দশকগুলির উত্থান-পতন, সাফল্য-ব্যর্থতা বুঝতে গেলে এই সংক্রমণকালের অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করা যায় না। কারণ এখানেই প্রথম স্পষ্ট হয় যে ভারতীয় ক্রীড়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কেবল প্রতিভার ওপর নয়, বরং সেই প্রতিভাকে ধারণ করার রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ইচ্ছাশক্তির ওপর।


আগামীকাল ষষ্ঠ পর্ব থাকবেঃ
গণমাধ্যম ও ক্রীড়া
'এলিট ক্রীড়া’ বনাম ‘গণক্রীড়া’র দ্বন্দ্ব
ক্রিকেটের উত্থান ও হকি ফুটবলের পতন

অলিম্পিক ও ভারত

প্রকাশ: ৩১-জানুয়ারি-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 31-Jan-26 12:05 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/indias-sports-policy-a-continuous-history-part-v - exists in postID 32097
Categories: Fact & Figures
Tags: , indian woman sports, woman cricket, indian sports
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড