হো চি মিন — এক বিপ্লবী ঋষির উপাখ্যান

শমীক লাহিড়ী
কলকাতা শহরের রাজপথে যখন ১৯৪৬ সালে ছাত্র-যুবরা স্লোগান তুলল— ‘আমার নাম, তোমার নাম, ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম’, তখন সেই ধ্বনি পৌঁছে গিয়েছিল ভিয়েতনামের জঙ্গলে লুকানো বিপ্লবীদের কানে। হো চি মিন কলকাতাকে দেখতেন বিপ্লবের এক তীর্থ হিসেবে। তিনি মনে করতেন, ভারত ও ভিয়েতনাম কেবল দুটি দেশ নয়, তারা একই শোষণের ইতিহাসের সহোদর।

অন্ধকার রাতের নির্জনতায় প্রশান্ত মহাসাগরের নোনা হাওয়ায় যে নাম ভেসে বেড়াত, সে কি কেবল এক সাধারণ খালাসির ছদ্মনাম, নাকি এক আগ্নেয়গিরির সুপ্ত গর্জন? কখনো তিনি 'নগুয়েন দ্য প্যাট্রিয়ট', কখনো বা প্যারিসের ধূসর গলিতে হারিয়ে যাওয়া এক নামহীন বিদ্রোহী — যিনি কুয়াশার মতো নিঃশব্দে বিচরণ করেছেন ইউরোপ থেকে মস্কো, দক্ষিণ চীন থেকে উত্তর ভিয়েতনামের গভীর অরণ্যে। শত নামের আবরণে ঢাকা এক রহস্যময় সত্তা, যাঁর রবারের চটির চিহ্ন কোনো পরাশক্তিই মুছে ফেলতে পারেনি। লোকে তাঁকে ডাকত 'হো চি মিন' — যিনি আলোকবর্তিকা হাতে অন্ধকারের বুক চিরে পথ দেখান। কিন্তু সেই আলোর গভীরে কতশত ছদ্মনাম আর কত সহস্র ত্যাগের ইতিহাস যে রক্তলিপি হয়ে আছে, তা আজও ইতিহাসের এক রহস্যময় ধূসর অধ্যায়। সেই রহস্যের পর্দা সরিয়ে আজ আমরা প্রবেশ করব এক কালজয়ী বিপ্লবীর জীবন-মহাকাব্যে।
ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মানুষের আবির্ভাব ঘটে, যাঁরা কেবল সময়ের সন্তান নন, বরং সময়কে নিজ হাতে গড়ে তোলেন। হো চি মিন ছিলেন তেমনই এক সত্তা — যাঁর হাতে ছিল মার্ক্সীয় মতাদর্শের শাণিত তলোয়ার, আর হৃদয়ে ছিল রবীন্দ্রনাথের নিভৃত শান্তিবোধ। বিংশ শতাব্দীর এশিয়ায় তিনি ছিলেন এক অবিনাশী অগ্নিশিখা, যা সাম্রাজ্যবাদের অন্ধকার গ্রাস থেকে ভিয়েতনামকে ছিনিয়ে এনেছিল।
নির্জন পথ ও একটি আগ্নেয় সংকল্প
হো চি মিনের যাত্রা শুরু হয়েছিল এক নিঃশব্দ অভিযাত্রীর মতো। ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট ভিয়েতনামের এক কিশোর যখন জাহাজের খালাসি হয়ে বিশ্বভ্রমণে বের হলেন, তখন তাঁর চোখে ছিল পরাধীনতার জ্বালা। ইউরোপের ধূসর রাজপথ থেকে রাশিয়ার তুষারপাত — সবখানেই তিনি খুঁজে ফিরেছেন একজোড়া চোখ, যা তাঁকে স্বাধীনতার হদিশ দেবে।
তিনি যখন কারাবন্দি ছিলেন চীনের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে, তখন তাঁর হাতে বন্দুক ছিল না, ছিল কলম। ১৯৪২-৪৩ সালের সেই দুঃসহ দিনগুলোতে তিনি লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত 'প্রিজন ডায়েরি'। সেখানে তিনি লিখছেন,
"দেহের খাঁচায় আজ আমি বন্দি, কিন্তু আমার মন অজেয়,
বিপ্লবী হতে গেলে লোহার শিকলকেও হার মানাতে হয়।"
এই লাইন দু’টির মধ্যেই প্রতিফলিত হয় তাঁর চরিত্রের বজ্রকঠিন দৃঢ়তা। তিনি বুঝেছিলেন, রাজনৈতিক মুক্তি কেবল রাজপথের লড়াই নয়, তা হলো চেতনার উত্তরণ।
রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকার ও ভারতীয় আত্মিক বন্ধন
হো চি মিন যখন ভারতের কথা ভাবতেন, তখন তাঁর চোখে ভাসত এক সুপ্রাচীন সংস্কৃতির ছবি। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের বিশ্বজনীন ভাবনার অনুরাগী। রবীন্দ্রনাথ যেভাবে প্রাচ্যের আত্মিক শক্তিকে পাশ্চাত্যের যান্ত্রিকতার ওপরে স্থান দিয়েছিলেন, হো চি মিন তাঁর লড়াইয়ে সেই দর্শনের প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন।
কলকাতা শহরের রাজপথে যখন ১৯৪৬ সালে ছাত্র-যুবরা স্লোগান তুলল— ‘আমার নাম, তোমার নাম, ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম’, তখন সেই ধ্বনি পৌঁছে গিয়েছিল ভিয়েতনামের জঙ্গলে লুকানো বিপ্লবীদের কানে। হো চি মিন কলকাতাকে দেখতেন বিপ্লবের এক তীর্থ হিসেবে। তিনি মনে করতেন, ভারত ও ভিয়েতনাম কেবল দুটি দেশ নয়, তারা একই শোষণের ইতিহাসের সহোদর।
তিনি বলতেন, ভারত ও ভিয়েতনাম হলো, ‘একই বৃক্ষের দুটি শাখা’। তাঁর জীবনদর্শনে মহাত্মা গান্ধীর কৃচ্ছ্রসাধন আর রবীন্দ্রনাথের মানবিকতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। তাঁর সেই বিখ্যাত রবারের চটি আর খাকি পোশাক ছিল একাধারে ঐতিহ্যের প্রতীক এবং সাম্রাজ্যবাদের ঠাটবাটের ঔদ্ধত্যের জবাব।
ফরাসি দর্পচূর্ণ: দিয়েন বিয়েন ফু-র মহাকাব্য
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ভিয়েতনামের আকাশ ছিল ফরাসি বোমারু বিমানের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। হো চি মিন জানতেন, এই লড়াই অসম। একদিকে আধুনিক মারণাস্ত্র, অন্যদিকে রুগ্ন কৃষকের দল। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন তাঁর দেশের মাটির শক্তিতে। ১৯৪১ সালে গড়ে তুললেন 'ভিয়েত মিন'। 'ভিয়েত মিন' (Viet Minh) শব্দটি একটি সংক্ষিপ্ত রূপ। এর পূর্ণ রূপ হলো 'ভিয়েৎ নাম দক লাপ দং মিন' (Viet Nam Doc Lap Dong Minh)। বাংলায় এর আক্ষরিক অর্থ হলো, ‘ভিয়েতনামের স্বাধীনতার লিগ’ (League for the Independence of Vietnam)।
১৯৫৪ সালের দিয়েন বিয়েন ফু-র যুদ্ধ ছিল আধুনিক ইতিহাসের এক অনন্য বাঁক। ফরাসি সেনাপতিরা ভেবেছিলেন, জঙ্গল আর পাহাড়ের গোলকধাঁধায় কমিউনিস্টদের পিষে ফেলবেন। কিন্তু হো চি মিনের মন্ত্রে দীক্ষিত ভিয়েতনামি জনগণ সাইকেলে করে কামানের পার্টস বয়ে নিয়ে গেল পাহাড়ের চূড়ায়। ফরাসি দর্প চূর্ণ হলো। জেনেভা চুক্তির টেবিলে মাথা নত করল ঔপনিবেশিক শক্তি। হো চি মিন তাই নিজের কবিতায় লিখেছিলেন -
"শত্রু যখন পাহাড়ের মতো অটল,
জনগণ তখন বর্ষার প্লাবনের মতো দুর্মর।"
দিয়েন বিয়েন ফু-র যুদ্ধ ছিল বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসের অন্যতম এক রোমাঞ্চকর এবং যুগান্তকারী সামরিক সংঘাত। ১৯৫৪ সালের ১৩ মার্চ থেকে ৭ মে পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধটি ছিল প্রথম ইন্দোচীন যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়, যেখানে ফরাসি ঔপনিবেশিক বাহিনী এবং ভিয়েতনামের বিপ্লবী 'ভিয়েত মিন' বাহিনী মুখোমুখি হয়েছিল।
ফরাসিদের 'মরণফাঁদ' পরিকল্পনা
ফরাসিরা ভেবেছিল ভিয়েতনামি গেরিলারা সম্মুখ যুদ্ধে অভ্যস্ত নয়। তাই তারা উত্তর ভিয়েতনামের একটি প্রত্যন্ত উপত্যকা 'দিয়েন বিয়েন ফু'-তে একটি শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে। তাদের পরিকল্পনা ছিল সেখানে ভিয়েতনামি গেরিলাদের প্রলুব্ধ করে নিয়ে আসা এবং আধুনিক বিমানবাহিনী ও ভারী কামানের গোলা দিয়ে তাদের পিষে ফেলা। তারা মনে করেছিল দুর্গম পাহাড়ের কারণে ভিয়েত মিনরা সেখানে কোনো ভারী অস্ত্র নিতে পারবে না।
হো চি মিন ও জেনারেল গিয়াপের বিস্ময়কর কৌশল
ফরাসিদের এই হিসাবকে ভুল প্রমাণ করে দিলেন হো চি মিনের সুযোগ্য সেনাপতি জেনারেল ভো এনগুয়েন গিয়াপ। তিনি এক অসম্ভবকে সম্ভব করলেন।
পাহাড়ের মাথায় কামান: প্রায় ৫০ হাজার ভিয়েতনামি সাধারণ মানুষ ও যোদ্ধা মিলে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এবং গভীর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে টেনে টেনে ভারী কামানগুলোকয়ে প্রথমে পাহাড়ের চূড়ায় তুলে ফেললেন। এরপরে ফরাসি ঘাঁটিকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে ভিয়েত মিনরা মাইলের পর মাইল সুড়ঙ্গ খুঁড়ল, যাতে ফরাসি গোলন্দাজরা তাদের অবস্থান বুঝতে না পারে।
যুদ্ধের ভয়াবহতা
১৩ মার্চ সন্ধ্যায় ভিয়েতমিন বাহিনীর অতর্কিত গোলার আঘাতে যুদ্ধ শুরু হয়। ফরাসিরা হতভম্ব হয়ে দেখল পাহাড়ের চূড়া থেকে নিচের ঘাঁটির ওপর বৃষ্টির মতো গোলা পড়ছে। প্রথম আঘাতেই ভিয়েতনামের গেরিলা বাহিনী ফরাসিদের বিমানবন্দরটি ধ্বংস করে দেয়, ফলে বাইরে থেকে খাদ্য বা রসদ আসার পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফরাসি সৈন্যরা মাটির নিচে বাঙ্কারে আটকা পড়ে যায়। বর্ষার কাদা আর ওষুধের অভাবে ফরাসি ঘাঁটিতে নরক নেমে আসে। টানা ৫৬ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ৭ মে ১৯৫৪ তারিখে ফরাসি জেনারেল দ্য ক্যাস্ট্রিস তাঁর ১০ হাজারেরও বেশি সৈন্যসহ আত্মসমর্পণ করেন। ফরাসি সাম্রাজ্যবাদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয় এই যুদ্ধ।
কেন এই যুদ্ধ এতো গুরুত্বপূর্ণ?
ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম ঘটনা যেখানে একটি আধুনিক ইউরোপীয় সামরিক শক্তিকে এশিয়ার একটি গেরিলা বাহিনী সম্মুখ যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছিল। এই হারের ফলে ফরাসিরা ভিয়েতনাম ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয় এবং 'জেনেভা চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়। এই জয় সারা বিশ্বের পরাধীন জাতিগুলোর (বিশেষ করে আফ্রিকা ও এশিয়ায়) মনে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল যে, কেবল অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলেই সাম্রাজ্যবাদকে হারানো সম্ভব।
হো চি মিন এই জয় সম্পর্কে বলেছিলেন, এটি ছিল “ভিয়েতনামি জনগণের অটল সংকল্পের জয়"। এটি কেবল একটি সামরিক বিজয় ছিল না, এটি ছিল একটি জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার মহাকাব্য।
মার্কিন দানবের বিরুদ্ধে
ফরাসিরা বিদায় নিলেও শান্তি এল না। এবার এল বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক শক্তি — আমেরিকা। হো চি মিনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনি কীভাবে আমেরিকার পারমাণবিক শক্তি আর বি-৫২ বোমারু বিমানের মোকাবিলা করবেন? তিনি শান্ত স্বরে উত্তর দিয়েছিলেন সেই চিরকালীন রূপক দিয়ে - "যদি একটি বাঘ একটি হাতির সঙ্গে লড়াই করে এবং স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তবে হাতিটি তাকে তার দাঁত দিয়ে চূর্ণ করে দেবে। কিন্তু বাঘ যদি দিনের বেলা লুকিয়ে থাকে এবং রাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তবে হাতিটি একদিন ক্লান্ত হয়ে পড়বে এবং রক্তক্ষরণে মারা যাবে।"
এই 'বাঘ' ছিল ভিয়েতনামের গেরিলা বাহিনী। হো চি মিন ট্রেইল হয়ে উঠল সেই লড়াইয়ের স্নায়ুকেন্দ্র। হো চি মিন ট্রেইল ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় উত্তর ভিয়েতনাম থেকে দক্ষিণ ভিয়েতনামে সৈন্য, অস্ত্র এবং রসদ পাঠানোর এক বিশাল এবং জটিল গোপন যাতায়াত ব্যবস্থা। মার্কিন বাহিনীর আধুনিক প্রযুক্তির বিরুদ্ধে এটি ছিল ভিয়েতনামি বিপ্লবীদের টিকে থাকার প্রধান "জীবনরেখা"।
নামে ‘ট্রেইল’ বা পথ হলেও এটি আসলে কোনো একটি নির্দিষ্ট রাস্তা ছিল না। এটি ছিল হাজার হাজার ছোট-বড় রাস্তা, পায়ে হাঁটা পথ, সুড়ঙ্গ এবং জলপথের এক বিশাল মাকড়সার জালের মতো নেটওয়ার্ক। এই পথটি উত্তর ভিয়েতনাম থেকে শুরু হয়ে প্রতিবেশী দেশ লাওস এবং কম্বোডিয়ার গভীর জঙ্গল ও পাহাড়ের ভেতর দিয়ে দক্ষিণ ভিয়েতনামে পৌঁছেছিল। এর মোট দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৬,০০০ কিলোমিটার। মাইলের পর মাইল দুর্গম জঙ্গল আর ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের জালে মার্কিন সেনারা দিশেহারা হয়ে পড়ল। হো চি মিন জানতেন, বোমা দিয়ে শহর ধ্বংস করা যায়, কিন্তু স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা মুছে ফেলা যায় না।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যখন ভিয়েতনামের সবুজ অরণ্যে 'নেপাম' আর 'এজেন্ট অরেঞ্জ' ঢেলে বিষাক্ত করে দিচ্ছিল, তখন হো চি মিন তাঁর সৈনিকদের বলতেন -
"আমাদের ধানখেত পুড়তে পারে, আমাদের বন উজাড় হতে পারে,
কিন্তু আমাদের উত্তরসূরিদের রক্তে যে স্বাধীনতা বইছে, তা অক্ষয়।"
দক্ষিণ ভিয়েতনামের যুদ্ধ, যা বিশ্বজুড়ে ভিয়েতনামের যুদ্ধ (১৯৫৫–১৯৭৫) নামে পরিচিত, ছিল বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাতগুলোর একটি। এই লড়াইটি কেবল দুটি দেশের যুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল পুঁজিবাদের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
ভিয়েতনামের এই দীর্ঘ লড়াইয়ের পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ ছিল।
বিভক্ত ভিয়েতনাম: ১৯৫৪ সালে ফরাসিদের পরাজয়ের পর জেনেভা চুক্তির মাধ্যমে ভিয়েতনামকে সাময়িকভাবে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। উত্তর ভিয়েতনামে ছিল হো চি মিনের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট সরকার, আর দক্ষিণ ভিয়েতনামে ছিল মার্কিন সমর্থিত পুতুল সরকার। চুক্তি অনুযায়ী নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ একীভূত হওয়ার কথা থাকলেও আমেরিকা ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের শাসকরা নির্বাচনের বিরোধিতা করে।
ডমিনো থিওরি: তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ধারণা ছিল যে, ভিয়েতনাম যদি কমিউনিস্টদের দখলে চলে যায়, তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোও যেমন — লাওস, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশগুলিও একের পর এক সমাজতান্ত্রিক দেশে পরণত হবে। এই ভয় থেকেই আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
ভিয়েতকং-এর উত্থান
দক্ষিণ ভিয়েতনামের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সেদেশের ভেতরেই বিদ্রোহ শুরু হয়। এই বিদ্রোহীরা 'ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট' বা 'ভিয়েতকং' নামে পরিচিত ছিল। উত্তর ভিয়েতনাম এদের সাহায্য করতে শুরু করলে আমেরিকা পুরোদমে আক্রমণ শুরু করে।
ভিয়েতনাম কীভাবে এই অসম যুদ্ধে জিতেছিল, তা সজও সমগ্র বিশ্বের কাছে বিস্ময়কর। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি হওয়া সত্ত্বেও আমেরিকা ভিয়েতনামের কাছে পরাজিত হয়েছিল। ভিয়েতনামের জয়ের পেছনে কাজ করেছিল অভাবনীয় কিছু কৌশল।
ক) গেরিলা রণকৌশল (Guerrilla Warfare) - মার্কিন বাহিনীর কাছে ছিল অত্যাধুনিক ট্যাংক, হেলিকপ্টার এবং ন্যাপাম বোমার মতো মারণাস্ত্র। কিন্তু ভিয়েতনামের গেরিলারা সম্মুখ যুদ্ধে না গিয়ে 'মারো এবং লুকিয়ে পড়ো' (Hit and Run) নীতি গ্রহণ করে। তারা ঘন জঙ্গলের সুবিধা নিয়ে অতর্কিতে আক্রমণ করত এবং মার্কিন সেনারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাটির নিচে বা জঙ্গলে মিলিয়ে যেত।
খ) সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক (Cu Chi Tunnels) - ভিয়েতনামের গেরিলারা মাটির নিচে শত শত মাইল জুড়ে সুড়ঙ্গের জাল বুনেছিল। এই সুড়ঙ্গগুলোতে হাসপাতাল, শোবার ঘর, রান্নাঘর এমনকি অস্ত্রাগারও ছিল। মার্কিন বোমাবর্ষণের সময় তারা সুড়ঙ্গের ভেতর নিরাপদে থাকত। মার্কিন সেনারা এই সুড়ঙ্গগুলো খুঁজে পেলেও সেখানে ঢোকা তাদের জন্য ছিল প্রাণঘাতী ফাঁদ।
গ) হো চি মিন ট্রেইল - এই দুর্গম পথটি ছিল যুদ্ধের জীবনরেখা। আমেরিকা কয়েক মিলিয়ন টন বোমা ফেলেও এই পথ বন্ধ করতে পারেনি। যুদ্ধের প্রতিটি পর্যায়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ অব্যাহত ছিল।
ঘ) জনসমর্থন ও মনোবল - ভিয়েতনামের সাধারণ মানুষ এই যুদ্ধকে স্বাধীনতার লড়াই হিসেবে দেখেছিল। কৃষকরা দিনে লাঙল চালাত আর রাতে গেরিলাদের সাহায্য করত। অন্যদিকে, মার্কিন সেনারা এক অচেনা পরিবেশে কার বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। হো চি মিনের একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল - "তোমরা আমাদের দশজনকে মারলে আমরা তোমাদের একজনকে মারব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তোমরাই ক্লান্ত হয়ে ফিরে যাবে।"
ঙ) আমেরিকার অভ্যন্তরীণ যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন - টেলিভিশনের মাধ্যমে যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে আমেরিকার সাধারণ মানুষ এবং ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। নিজের দেশেই চরম জনমতের চাপে পড়ে মার্কিন সরকার ভিয়েতনাম থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
যুদ্ধের সমাপ্তি ও বিজয় (১৯৭৫)
১৯৭৩ সালে প্যারিস শান্তি চুক্তির পর মার্কিন বাহিনী বিদায় নেয়। ১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল উত্তর ভিয়েতনামের ট্যাংকগুলো দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজধানী সায়গনের রাষ্ট্রপতির প্রাসাদের গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। দক্ষিণ ভিয়েতনামের পতন ঘটে এবং ভিয়েতনাম একটি স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
এই বিজয় ছিল কেবল সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই নয়, বরং একটি জাতির অদম্য দেশপ্রেম এবং ধৈর্যের জয়।
আঙ্কেল হো: এক বিপ্লবী ঋষির মহাপ্রয়াণ
১৯৬৯ সাল। যুদ্ধ তখনো তুঙ্গে। কিন্তু ভিয়েতনামের আকাশ থেকে খসে পড়ল তার ধ্রুবতারা। হো চি মিন চিরবিদায় নিলেন। তিনি তাঁর উইল-এ লিখে গিয়েছিলেন, তাঁর মৃতদেহের ওপর যেন কোনো জাঁকজমকপূর্ণ স্মৃতিসৌধ না বানানো হয়। তিনি চেয়েছিলেন কৃষিপ্রধান ভিয়েতনামের তিনটি পাহাড়ের চূড়ায় তাঁর ছাই ছড়িয়ে দেওয়া হোক, যাতে তিনি সবসময় কৃষকদের কাছাকাছি থাকতে পারেন।
যদিও তিনি চূড়ান্ত বিজয় দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু তাঁর আদর্শই ১৯৭৫ সালে সায়গন শহরের (বর্তমানে হো চি মিন সিটি) পতনের দিন প্রতিটি বিপ্লবীর বুকে স্পন্দিত হচ্ছিল।
এক অবিনাশী চেতনা
হো চি মিন কেবল ভিয়েতনামের 'পিতা' নন, তিনি ছিলেন সারা বিশ্বের শোষিত মানুষের এক নীরব কণ্ঠস্বর। তাঁর লড়াই আমাদের শেখায় যে, সাম্রাজ্যবাদ যত শক্তিশালীই হোক না কেন, জনগণের সংহতির কাছে তা খড়কুটোর মতো উড়ে যায়।
নোয়াম চমস্কি থেকে ই.এম.এস নাম্বুদ্রিরিপাদ — সবাই তাঁর মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন এমন এক নেতাকে, যিনি মার্ক্সবাদকে কেবল পুঁথিগত বিদ্যা হিসেবে দেখেননি, বরং তাকে ভিয়েতনামের মাটির গন্ধে আর রবীন্দ্রনাথের কাব্যিক সুষমায় সাজিয়েছিলেন।
আজকের পৃথিবীতে, যেখানে আজও সাম্রাজ্যবাদ নতুন নতুন রূপে হানা দেয়, সেখানে হো চি মিনের সেই শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ মুখচ্ছবি আমাদের মনে করিয়ে দেয় তাঁরই লেখায় -
"ঝড় যত প্রবলই হোক, মাটির গভীরে শিকড় যার প্রোথিত,
তাকে উপড়ানো কোনো পরাশক্তির সাধ্য নয়।"
তিনি ছিলেন সেই নক্ষত্র, যে অন্ধকার রাতেও স্বাধীনতার দিশা দেখায়। হো চি মিন — নামটি কেবল একটি শব্দ নয়, এটি একটি রণধ্বনি, একটি কবিতা এবং একটি চিরকালীন বিপ্লবের নাম।
প্রকাশ: ১৯-মে-২০২৬
শেষ এডিট:: 16-May-26 17:21 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/ho-chi-minh-—-the-tale-of-a-revolutionary-sage
Categories: Fact & Figures
Tags: hochiminh, vietnam
বিভাগ / Categories
- Booklets - পুস্তিকা (4)
- Campaigns & Struggle - প্রচার ও আন্দোলন (157)
- Corporation Election - পৌরসভা নির্বাচন (6)
- Current Affairs - সাম্প্রতিক ঘটনাবলী (142)
- External Links - প্রাসঙ্গিক লিংক (4)
- Fact & Figures - তথ্য ও পরিসংখ্যান (79)
- Highlight - হাইলাইট (97)
- International - আন্তর্জাতিক (3)
- Party Documents - পার্টি পুস্তিকা (3)
- People-State - জনগণ-রাজ্য (6)
- Press Release - প্রেস বিজ্ঞপ্তি (155)
- Programme - কার্যক্রম (1)
- Truth Beneath - তথ্য (18)
- Uncategorized - অশ্রেণীভুক্ত (339)
সাম্প্রতিক পোস্ট / Latest Posts
কম খাও, দেশ বাঁচাও
- শমীক লাহিড়ী
পলিট ব্যুরোর বিবৃতি
- ওয়েবডেস্ক
আমরা তিমির বিলাসী নই, তিমির বিনাশী হতে চাই
- শমীক লাহিড়ী
রবীন্দ্রনাথ, ফ্যাসিবাদ ও লাল পার্টি
- ময়ূখ বিশ্বাস





.jpg)