তাঁর শেষ নির্বাচনী বিবৃতির ৫ বছর পর..

Author
চন্দন দাস

রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য লিখেছিলেন,‘‘বামফ্রন্ট সরকারের সময় থেকেই যে অর্থনৈতিক ভাবনা আমরা রাজ্যের মানুষকে বলার চেষ্টা করেছি-তা হলো, কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ।

Five years after his last election statement
সেদিনও ২৯শে মার্চ ছিল। তবে তখন ছিল ২০২১। পাঁচ বছর আগে বিধানসভা নির্বাচন উপলক্ষ্যে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল সেদিন। কোনও বিধানসভা নির্বাচন উপলক্ষ্যে সেটিই তাঁর শেষ বিবৃতি।
এবার বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নেই। কিন্তু তাঁর সেই বিবৃতির বিষয় আজও এই ক্রমশঃ অচেনা হয়ে উঠতে থাকা বাংলায় প্রাসঙ্গিক।
১৯৯৮-এ তৃণমূল কংগ্রেসের আত্মপ্রকাশ। প্রথম থেকেই মমতা ব্যানার্জি বিজেপি’র দোসর। প্রথম থেকেই এই জোটের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য ছিলেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী তখন তিনি, তাই ২০০১, ২০০৬ এবং ২০১১-এর বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস অথবা বিজেপি’র প্রধান ‘টার্গেট’ ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তাই স্বাভাবিক। কিন্তু তারপরও বামফ্রন্টের প্রধান প্রচারক হিসাবে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর বক্তব্য এবং তার বিরোধিতা— রাজ্যের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান থেকেছে। ২০১৬ এবং ২০২১— এই দুটি বিধানসভা নির্বাচনের আগে বামফ্রন্ট সরকারে ছিল না। মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মমতা ব্যানার্জি। তবু বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বিশেষত তাঁর ভাবনা ছিল তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি’র আক্রমনের কেন্দ্র। ‘কৃষি আমাদের ভিত্তি/ শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ’—  এই স্লোগানে মিশে আছে মতাদর্শগত এবং রাজনৈতিক বোঝাপড়ায় গড়ে ওঠা এক বিকল্পের ভাবনা। তার বিরুদ্ধে তৃণমূল, বিজেপি-কে অপপ্রচার চালাতেই হবে। তা না করে ২০১১ পরবর্তী নির্বাচনও লড়তে পারেনি তৃণমূল, বিজেপি সহ অন্যান্য বামফ্রন্ট বিরোধীরা। 
এবারও তাই। 

বিস্মিত হলেন? ভাবছেন বাঙালি বামপন্থীদের আবেগে কিছুটা বাতাস খেলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে? ঠিক তা নয়। কেন নয়? তা বলার জন্য রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন উপলক্ষ্যে তাঁর শেষ বিবৃতটির উল্লেখ করবো। পুরো বিবৃতিটি উল্লেখ করবো না। জানি এই রীলস আর ভিডিও’র দুনিয়াতেও তাঁর শেষ বিবৃতিটি পুরো পড়ার লোকের অভাব হবে না। তবু একাংশই উল্লেখ করছি। কারন—ওই টুকুতেই স্পষ্ট হবে কেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবারও আছেন নির্বাচনের ময়দানে।

কী ছিল তাঁর বিবৃতিতে? 
রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য লিখেছিলেন,‘‘বামফ্রন্ট সরকারের সময় থেকেই যে অর্থনৈতিক ভাবনা আমরা রাজ্যের মানুষকে বলার চেষ্টা করেছি-তা হলো, কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ। আমরা সেই পথ ধরেই এগিয়েছি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বর্তমান সরকারের হাতে গত দশ বছরে সেই কৃষিতে আমরা পিছিয়ে পড়েছি। উল্লেখযোগ্য কোনও শিল্প আসেনি গত এক দশকে। নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরে এখন শ্মশানের নীরবতা। সেই সময়ের কুটিল চিত্রনাট্যের চক্রান্তকারীরা আজ দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ হারিয়েছে বাংলার যুবসমাজ। সরকারি ক্ষেত্রে কোনও বিনিয়োগ নেই। বাংলার মেধা ও কর্মদক্ষতা, যা আমাদের সম্পদ, তা আমাদের রাজ্য ছেড়ে ভিনরাজ্যে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। গত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গ সব দিক থেকেই পিছিয়ে পড়েছে। যুবদের কাজের স্বপ্ন চুরমার হয়ে গিয়েছে, শিক্ষাঙ্গন কলুষিত, স্বাস্থ্য পরিষেবা গরিব মানুষের নাগালের বাইরে—কার্যত ভেঙে পড়েছে।...নতুন প্রজন্মের হাজার হাজার যুবক-যুবতী ছোট-মাঝারি-বৃহৎ শিল্প ও কর্মসংস্থানের দাবি নিয়ে পথে নেমেছে। ওরাই পারবে এই বিপদকে রুখে দিতে। বর্তমান পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার তৈরি করে ওরা পারবে বাংলার হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে।’’
‘এক দশক’ আর নেই। রাজ্যে তৃণমূলের সরকার দেড় দশক পূরণ করেছে। এ’টুকু বাদ দিয়ে উপরে উল্লেখ করা বিবৃতিতে এমন কোনও বিষয় নেই যা আজকের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে মেলানো যাচ্ছে না। সিঙ্গুর কিংবা নন্দীগ্রামে যারা কাঁধে কাঁধ, হাতে হাত, মঞ্চে পাশাপাশি লড়াই করেছিল, সেই তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি আজ আপাতদৃষ্টিতে মুখোমুখি। আছে বামফ্রন্ট এবং আইএসএফ সহ তাদের সহযোগীরা। কিন্তু যা তাৎপর্যপূর্ণ, তা হলো— শিল্পে হাহাকার, কর্মসংস্থানের দুর্দশা, কাজের খোঁজে রাজ্যের যুবদের দলে দলে ভিন রাজ্যে যাওয়া, সরকারি হাসপাতালগুলি চিকিৎসক, স্বাস্থ্য কর্মীর অভাবে ধুঁকতে থাকা কিংবা শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্বিষহ অবস্থা— এগুলি বাংলার বাস্তবতা, মানুষের সঙ্কট। 
তাই সেগুলি নির্বাচনের ইস্যু।

কোনও সন্দেহ নেই যে, ভোটার তালিকার নিবিঢ় সংশোধন প্রক্রিয়া (এসআইআর) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে উপস্থিত হয়েছে। যাকে কেন্দ্র করে মমতা ব্যানার্জি তাঁর দলের প্রচারের প্রধান আক্রমনের কেন্দ্র করে তুলেছেন নির্বাচন কমিশনকে। ভোটার তালিকায় ‘বিবেচনাধীন’ মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি কিংবা বামফ্রন্ট এবং তাদের সহযোগীদের নিজস্ব এবং আলাদা ভাষ্য আছে। এসআইএর-এ ‘বিবেচনাধীন’দের তালিকায় সংখ্যালঘু মুসলমানদের নাম বেশি। তা নিয়ে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের প্রচারও এবারের নির্বাচনে একটি বিষয় হয়ে ওটার সুযোগ পেয়েছে। 
কিন্তু তারপরও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান প্রচারক মমতা ব্যানার্জিকে দাবি করতে হয়েছে,‘‘আমরা ২কোটি চাকরি দিয়েছি।’’প্রশ্ন হলো, এই দাবিকে মেনে নিলে রাজ্যে বুথ পিছু ২৪৮জনের চাকরি হয়েছে গত দেড় দশকে, তা মেনে নিতে হয়। কিন্তু বাস্তব তা বলছে না। আবার রাজ্যে প্রচারে এসে সিঙ্গুর কিংবা ব্রিগেডে বিজেপি’র প্রধান মুখ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও রাজ্যে কর্মসংস্থানের কথা বলেছেন। একই কথা বলেছেন অমিত শাহ্ও। মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে, ২০১৪-তে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বছরে ২কোটি চাকরি হবে। সেই হিসাবে গত প্রায় বারো বছরে রাজ্যের প্রতি বুথে কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগের ফলে গড়ে ২০৯জন করে চাকরি হওয়ার কথা। তাও কী দেখা যাচ্ছে? না, যাচ্ছে না। 
কর্মসংস্থানের একটি ক্ষেত্র শিল্প। রাজ্যে ১৫ বছর সরকার চালিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। কেন্দ্রে বিজেপি সরকার চালাচ্ছে প্রায় ১২ বছর। এই রাজ্য থেকে বিজেপি’র সাংসদ হয়েছেন ২০১৯-এ ১৮জন, ২০২৪-এ ১২জন। পশ্চিমবঙ্গে শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে দুই দলের নির্বাচিত বিধায়ক, সাংসদদের ভূমিকা এই নির্বাচনে আতসকাঁচের নিচে চলে আসা স্বাভাবিক। এই সময়কালে রাজ্য থেকে পাততাড়ি গুটিয়েছে ৬৬৮৮টি কোম্পানি। অন্তত ১৪৬টি বড় কারখানা এই সময়ে বন্ধ হয়েছে। শুধু পানাগড়ের শিল্পতালুকে বন্ধ হয়েছে ছোট, মাঝারি ২৫টি কারখানা। ২০২৩-২৫— এই সময়কালে রাজ্যে বন্ধ হয়েছে ২০২৪৯টি ছোট, মাঝারি কারখানা।

এই সবের একটি প্রভাব সুনির্দিষ্ট— রাজ্য থেকে যুবক যুবতীদের ভিন রাজ্যে চলে যাওয়া কাজের খোঁজে। মমতা ব্যানার্জির মতেই সেই পরিযায়ীদের সংখ্যা প্রায় ৫০লক্ষ। 
সেদিন যা সম্ভাব্য ছিল, আজ সেই সঙ্কট প্রবল বাস্তব। আর তা বুঝেই ‘কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ’—এর স্লোগানের ডানায় বামপন্থীদের পক্ষ থেকে লক্ষ্য, কর্মসূচি হাজির করেছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। 
এবার তিনি নেই। কিন্তু সেই স্লোগান কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা এখন আরও স্পষ্ট। জীবনযন্ত্রণা যখন প্রবলতর হয়েছে, সঙ্কট যখন দুয়ার ছাড়িয়ে প্রতিটি অন্দরের কোণায় আসন পেতে বসেছে, তখন এই বাংলায় অস্বীকার করার মতো লোক বিরল হয়ে পড়েছে—  শেষ বিবৃতিটায় আছে বাংলা বাঁচানোর সোনার অক্ষরে আঁকা রূপরেখা।




প্রকাশ: ২৯-মার্চ-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 29-Mar-26 09:55 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/five-years-after-his-last-election-statement-Buddhadeb-Bhattacharjee
Categories: Fact & Figures
Tags: 34 years left front, bengalneedsleft, bjp tmc nexus
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড