ডিজিটাল অর্থনীতি, ‘টেকনো-ফিউডালিজম’ কী?

Author
গাও সিয়াং

মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব দেখায় যে তথ্য উৎপাদনের উপাদানের উপর দখল, অ্যালগরিদমিক ক্ষমতার সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল শ্রমের আড়ালে চলতে থাকা শোষণ আসলে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে উদ্বৃত্ত মূল্য দখলেরই আধুনিক রূপ। টেকনো–ফিউডালিজমের ধারণা কেবল ডিজিটাল ভাড়া ও সামন্ত অর্থনীতির মিল’কেই সামনে টেনে আনে। কিন্তু পুঁজির প্রযুক্তিগত পুনর্গঠনের অন্তর্নিহিত যুক্তিকে এই ধারণায় উপেক্ষা করা হয়। ফলে এটি কেবল উপরে উপরে বা বলা চলে ভাসা ভাসা ঘটনাকে বিচার করে, ফলে পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত বিরোধকে উপলব্ধি করতে ব্যর্থই হয়।

Digital Economy, Techno-Feudalism: The Analysis

লেখক পরিচিতি- গাও সিয়াং (জন্ম ১৯৮৫), একজন অধ্যাপিকা। লিয়াওনিং প্রদেশের শেনিয়াং থেকে, দর্শনের পি.এইচ.ডি, আইনের পি.এইচ.ডি, বর্তমানে হারবিন ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির শেনজেন ক্যাম্পাসের মার্কসবাদ স্কুলের সহযোগী অধ্যাপিকা, স্নাতকোত্তর ডিগ্রী কোর্সের তত্ত্বাবধায়ক। তার গবেষণার অভিমুখ ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বুদ্ধিমান সমাজকে অধ্যয়ন’।

মূল রিসার্চ পেপারটি SSRN[i] ওয়েবসাইটে ১৭ই মে ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত

মূলকথা

পুঁজিবাদী অর্থনীতির ডিজিটাল রূপান্তরের সাথে সাথেই কিছু সমকালীন গবেষক ডিজিটাল অর্থনীতিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে “টেকনো-ফিউডালিজম” বিবৃতিকে সামনে এনেছেন। এই বিবৃতি জোরের সঙ্গে ঘোষণা করে যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কোম্পানি, যারা ডিজিটাল অর্থনীতির উদীয়মান বাজারে বহু ক্ষেত্রেই সামন্তপ্রভু, জমিদারদের ন্যায় আচরণ করে।

উদাহরণ হিসাবে বলা যায়,

ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের তথ্য (ডেটা) লুঠ = জমিদারের জমি দখল।

ডিজিটাল ভাড়া (রেন্ট) আদায় = জমির ভাড়া বাবদ আদায়।

তথ্য (ডেটা) ব্যবহারকারী ও সংশ্লিষ্ট শ্রমিককে ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণে রাখা = কৃষক/দাস’দের নিয়ন্ত্রণ।

তবে এমন বিবৃতিতে অনেকগুলি তত্ত্বগত ত্রুটি রয়ে গেছে। মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব (থিওরি অফ সারপ্লাস ভ্যাল্যু) দেখায় যে উপরোক্ত ঘটনাগুলি আসলে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে কাজে লাগিয়ে উদ্বৃত্ত মূল্য দখলেরই আধুনিক পুঁজিবাদী রূপ। ‘টেকনো-ফিউডালিজম’ শিরোনামটি কার্যত পুঁজির প্রযুক্তিগত পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে শোষণের কাঠামো পুনর্গঠনের অভ্যন্তরীণ যুক্তি উপেক্ষা করে এবং একটা অগভীর বিশ্লেষণ এবং তার ফলশ্রুতি হিসাবে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছয়।

ভূমিকা

একথা অনস্বীকার্য যে, ডিজিটাল অর্থনীতি বিশ্বজোড়া অর্থনৈতিক বৃদ্ধির একটি মূল চালিকা শক্তি হিসাবে উৎপাদন পদ্ধতি, সামাজিক যোগাযোগ ও দৈনন্দিন জীবনকে গভীরভাবে রূপান্তর করেছে। এর দুনিয়াজোড়া সম্প্রসারণ ডেটা-ভিত্তিক উৎপাদনের উপাদান, ডিজিটাল শ্রম, অসংগঠিত  ইনফর্মাল ফ্লেক্সিবল কর্মসংস্থান ও প্ল্যাটফর্ম পুঁজিবাদের মতো নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্ম দিয়েছে। এই পরিবর্তন ব্যাখ্যা করতে কিছু গবেষক টেকনো-অর্থনৈতিক ধারা (techno-economic paradigms) ব্যবহার করেছেন এবং ধারণা দিয়েছেন যে, “ডিজিটাল প্রযুক্তি দ্বারা ত্বরান্বিত সামাজিক-অর্থনৈতিক রূপান্তর আসলে পুঁজিবাদের নতুন পর্যায় নয়” বরং “টেকনো-ফিউডালিজমে ফিরে যাওয়া” ।

এই বিবৃতিতে বলা হয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলির তরফে তথ্য-সম্পদ দখল, ডিজিটাল ভাড়া আদায় এবং অ্যালগরিদমিক শ্রম নিয়ন্ত্রণ’র মতো বিশয়গুলির সুবাদে পুঁজিবাদ পুনরায় নিজেকে প্রায় সামন্ত (ফিঊডাল) সম্পর্কের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে পুঁজিপতি এবং শ্রমিক উভয়েই “নিও-ফিউডাল লর্ড” অর্থাৎ নয়া-সামন্তপ্রভু’দের অধীনে চলে যাচ্ছে।

এই বয়ান পশ্চিমা বামপন্থী সমালোচনায় জনপ্রিয় হলেও দুটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়:

ক) ডেটা প্লান্ডার, ডিজিটাল ভাড়া ভিত্তিক মুনাফা এবং অ্যালগরিদমিক নিয়ন্ত্রণ কি সত্যিই পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে এক সম্পূর্ণ নতুন রূপ?

খ) পুঁজিবাদী ডিজিটাল অর্থনীতি কি সত্যিই ফিউডাল প্রযুক্তি একচেটিয়া (মনোপলি) অবস্থায় পর্যবসিত হয়েছে?

এই সকল প্রশ্নগুলির সমাধানে মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্বের শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রয়োগই অপরিহার্য বলে এ প্রবন্ধ যুক্তি হাজির করে।

১. পুঁজিবাদী ডিজিটাল অর্থনীতিতে টেকনো-ফিউডালিজম’ বিবৃতি ও মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব

ডিজিটাল অর্থনীতিতে টেকনো-ফিউডালিজম বয়ান বলতে বোঝায় কিছু অ্যাকাডেমিক গবেষণা, যেখানে ডিজিটাল অর্থনীতির নির্দিষ্ট বৈশিষ্টসমূহকে ফিউডাল বা সামন্ত যুগের উৎপাদন সম্পর্কের সাথে তুলনা করা হয়। এখানে যুক্তি দেওয়া হয় যে ডিজিটাল যুগে বড় বড় প্ল্যাটফর্মগুলি (যেমন গুগল, ফেসবুক, টেনসেন্ট, আলিবাবা) ডেটা, অ্যালগরিদম এবং প্ল্যাটফর্মের উপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে সামন্ত প্রভুদের ন্যায় কর্তৃত্ব কায়েম করে। তথ্য (ডেটা) ব্যবহারকারী ও পরিষেবার খরিদ্দারদের উপর সামন্ত ধরণের শাসন চালায়। এই সমস্ত Western scholars অর্থাৎ পশ্চিমী গবেষকদের সমালোচনার কেন্দ্রীয় ধারণাটি হল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের একচেটিয়া ক্ষমতা এবং ‘ডিজিটাল রেন্ট বা ভাড়া’-নির্ভর পুঁজিবাদ।

.    টেকনো-ফিউডালিজম শিরোনামের উৎস

এ ধারণার উৎপত্তি ৯০’র দশকে, যখন তথ্য-প্রযুক্তি বিপ্লব সমাজকে ডিজিটাল যুগে নিয়ে এসেছিল। কারও কারও মতে, প্রযুক্তির দ্রুত বিবর্তন পুঁজিবাদের উন্নয়ন ঘটায়নি বরং তাকে সামন্তধর্মী (ফিউডাল) অর্থনৈতিক কাঠামোয় ফিরিয়ে দিয়েছে।

  • Loyd Blankenship (Cyberpunk বই, ১৯৯০): “মেগা-কর্পোরেশনের ক্ষমতা রাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে গেছে, তারা সামন্ত মালিকের ন্যায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করছে” ।
  • Tiziana Terranova (২০০০): “ডিজিটাল শ্রমিক অর্থাৎ ডিজিটাল সার্ফ (serf) যেখানে তথ্য ব্যবহারকারী এবং সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরা নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের উপর নির্ভরশীল” ।
  • Valerio De Stefano (২০১৬): “অ্যাপ-নির্ভর গিগ শ্রমিকরা সামন্ত যুগের ন্যায় অ্যালগরিদমিক নিয়ন্ত্রণে উৎপাদন ব্যবস্থাকে পুনরুৎপাদন করে চলে” ।
  • Christian Fuchs (২০২০): “ডিজিটাল পুঁজিপতিরা শ্রমিকদের অধিকারকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থায় যে সকল বৈষম্য রয়েছে তাকে কাজে লাগিয়ে সামন্ত ও প্রাক-পুঁজিবাদী যুগের উৎপাদন সম্পর্ক’কে বর্তমান পুঁজি চক্রের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে”।

২০১৮ সালের পর থেকে, ক্লাউড কম্পিউটিং, বিগ-ডাটা, এবং জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’র জোয়ারে প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠানগুলো সুপার-প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে - এরা বাজার-প্রভাব প্রচলিত অ্যান্টিট্রাস্ট আইনি কাঠামোরও বাইরে চলে গেছে।

  • Cédric Durand (Techno-feudalism, ২০২০, ২০২৪): “ডেটা ও অ্যালগরিদমের উপর এহেন নিয়ন্ত্রণ ডিজিটাল অর্থনীতিকে সামন্ত ধরণের ভাড়া নির্ভর আধিপত্যের দিকে ঠেলে দেয়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মালিকরা তথ্য ব্যবহারকারী ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের শ্রমিকদের উপর ‘ডিজিটাল রেন্ট বা ভাড়া’ চাপিয়ে দেয়” ।

এই থিসিসকে Jodi Dean, Evgeny Morozov, Yanis Varoufakis সহ আরও অনেকেই সমর্থন করেছেন।

২.২   টেকনো-ফিউডালিজম শিরোনামের তাত্ত্বিক ভিত্তি

এমন বয়ানের তিনটি কেন্দ্রীয় যুক্তি রয়েছে।

১. ব্যবহারকারীর তথ্য-সম্পদের প্রযুক্তিগত লুণ্ঠন: প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীর সামাজিক নেটওয়ার্ক, বায়োমেট্রিক ডেটা, আচরণগত তথ্য সংগ্রহ করে - বিনিময়ে তারা কিছু দেয় না। এইভাবে তারা ডেটা সমৃদ্ধ করে, যা অ্যালগরিদমে কাজে লাগে।

২. ডিজিটাল ভাড়া দিয়ে অতিমুনাফা আহরণ: ডেটা এবং অ্যালগরিদমের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মগুলো ‘ডিজিটাল রেন্ট বা ভাড়া’ পায়। এটি তাদের উৎপাদনের সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়াই মুনাফা অর্জনের রাস্তা।

চারধরনের ডিজিটাল রেন্ট অর্থাৎ ভাড়া নেওয়ার উপায় রয়েছে।

      • ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি রেন্ট: পেটেন্ট, কপিরাইট ইত্যাদি বাবদ আয়।
      • নেচারাল মনোপলি রেন্ট: প্ল্যাটফর্মের একচেটিয়া স্কেল আদায় বাবদ আয়।
      • ডিফারেনশিয়াল রেন্ট: সফটওয়্যার, জ্ঞান ইত্যাদির অসাম্যকে ভিত্তি করে আদায় করা আয়।
      • ডায়নামিক ইনোভেশন রেন্ট: ডেটা-কেন্দ্রিক দ্রুত ইনোভেশনের সুবাদে প্রাপ্ত আয়।

৩. অ্যালগরিদমিক শ্রম ও ব্যবহারকারীদের নিয়ন্ত্রণ: ব্যবহারকারী ও প্ল্যাটফর্ম শ্রমিক দু’জনকেই অ্যালগরিদমের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। পণ্য কেনাবেচায় প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীর চালচলন, অভ্যাস, ব্যক্তিগত তথ্য ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে, একইভাবে কর্মীদের কাজ বিশেষভাবে অনলাইনে ট্র্যাক/স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল্যায়ন করে—ফিউডাল-ধর্মী ‘অ্যাটাচমেন্ট’র সম্পর্ক তৈরি হয়।

২.৩   মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্বের আলোকে পুঁজিবাদী ডিজিটাল অর্থনীতি

কার্ল মার্কস বলেছেন: “উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদন কেবল পুঁজিবাদী উৎপাদন-বিধির নিয়ামক আইনমাত্র নয়; এটি তার পরম নির্বিশেষ (absolute) আইন” ।

তথ্য-প্রযুক্তি ও ডিজিটাল টেকনোলজি পুঁজির চক্রকে (১৯৯০-এ) শিল্পের সীমাবদ্ধতা এবং বিনিয়োগের সংকট থেকে উদ্ধার করে—শ্রম উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় শ্রম সময় কমায়, এবং উৎপাদন ও লেনদেন-ব্যবস্থা যুগান্তকারীভাবে বদলায়।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান

  • ‘ফ্রী পরিষেবা’-র বিনিময়ে পরিষেবা ব্যবহারকারীর রোজকার খুঁটিনাটি তথ্য (ডেইলি অ্যাক্টিভিটি ডেটা) সংগ্রহ করে তাতে অভিজ্ঞ প্রকৌশলী, ডেটা-সায়েন্টিস্টদের নির্দিষ্ট ‘শ্রম’ প্রয়োগ করে- এভাবে ডেটাকে পণ্য/কমোডিটিতে রূপান্তর করে, যা তৈরী করে উদ্বৃত্ত মূল্য।
  • সামাজিক সম্পদের কেন্দ্রিকরণ মারফৎ- শ্রম, স্বনিযুক্ত ব্যক্তি, ক্ষুদ্র-মাঝারি প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের পরিকাঠামো – সবকিছুকেই এক প্ল্যাটফর্মের কেন্দ্রের দিকে টেনে আনে।
  • অ্যালগরিদমিক সিস্টেমের মাধ্যমে শ্রমিকদের কাজকে নিয়ন্ত্রণ করে—এতে শোষণ-প্রক্রিয়াটি আধুনিকতর হয়ে ওঠে
  • সম্পূর্ণ বা চরম (absolute surplus value extraction) ও আপেক্ষিক (relative surplus value intensification) উদ্বৃত্ত মূল্যের আহরণ।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ফিউডাল-ধর্মী শোষণ, ডেটা-ভাড়া ও শ্রমের অ্যালগরিদমিক নিয়ন্ত্রণ - সবই মূলত পুঁজির পুনরুৎপাদন ও পুনঃসংস্থান। মার্ক্সের সেই সতর্কবাণী: “যে বিশেষ অর্থনৈতিক ফর্মে নিস্বার্থ উদ্বৃত্ত শ্রম সরাসরি উৎপাদক থেকে বেরিয়ে আসে - সেটিই নিয়ন্ত্রণ ও দাসত্বের সম্পর্ক নির্ধারণ করে” - ডিজিটাল রূপান্তর হলেও এই মূল নিয়ম অপরিবর্তিত থেকে যায়।

৩.     মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব অনুযায়ী টেকনো-ফিউডালিজম ধারণার ভ্রান্তি

৩.১     ডিজিটাল উৎপাদন উপাদানের ‘লুণ্ঠন’কে অন্যান্য সজীব শ্রমের শোষণের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা

টেকনো-ফিউডালিজম ধারণার অনেক গবেষকই বলেন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠানগুলি নিজেদের ব্যবহারকারী ও শ্রমিকদের ডেটা দখল করে মুনাফা করে আর সেটাই যেন শোষণ। কিন্তু মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব আমাদের দেখায় যে পুঁজিবাদী উৎপাদনের মূলে রয়েছে শ্রমের মাধ্যমে উদ্বৃত্ত মূল্য আহরণ। অর্থাৎ শোষণ মানে কেবলমাত্র সম্পদের উপর দখল কায়েম করা বোঝায় না।

ডেটাকে অসংখ্যবার কপি ও শেয়ার করা যায়; কাঁচা অর্থাৎ ‘Raw’ অবস্থায় তা অর্থনৈতিকভাবে কার্যকরী হয় না যতক্ষণ না মানবিক শ্রম তাকে প্রক্রিয়াজাত করে (যেমন ডেটা ইঞ্জিনিয়ারদের ক্লিনিং, এগ্রিগেশন, মডেল ট্রেনিং)। এভাবেই ডেটার উপযোগিতা তৈরি হয়, যা আসলে জীবিত শ্রম থেকেই আসে।

অতএব আসল শোষণ ঘটে সেই সকল প্রযুক্তিবিদের মেধা নির্ভর শ্রম থেকে উৎপন্ন উদ্বৃত্ত মূল্যকে দখলের মাধ্যমে, শুধুমাত্র ‘ডেটা চুরি’ বললেই সবটা বলা হয় না।

৩.২     প্ল্যাটফর্মের ধরণ ও উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎসকে গুলিয়ে ফেলা

অনেকে মনে করেন, সার্কুলেশন-ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্মগুলির ‘ডিজিটাল ভাড়া’ উৎপাদন-ক্ষেত্রের জীবিত শ্রম থেকে প্রাপ্ত উদ্বৃত্ত মূল্যের স্থান দখল করেছে। কিন্তু বাস্তবে, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম আলাদা সূত্রে উদ্বৃত্ত আয় করে : -

  • উৎপাদনধর্মী প্ল্যাটফর্ম (যেমন AWS): উৎপাদন দক্ষতা বাড়িয়ে উৎপাদকদের দ্বারা নির্মিত অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত মূল্য থেকে একটি অংশ নেয়।
  • সার্কুলেশনধর্মী প্ল্যাটফর্ম (যেমন উবার, এয়ারবিএনবি): লেনদেনকে দ্রুতগতি সম্পন্ন করে তোলে ও তার সুবাদে উৎপাদকদের উদ্বৃত্ত মূল্য থেকে একটি অংশ নেয়।
  • বিজ্ঞাপনভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম (যেমন ফেসবুক, ইউটিউব): ব্যবহারকারীর তথ্য (ডেটা) ও আচরণগত মনোভাব’কে বিক্রি করে বিজ্ঞাপনদাতাদের থেকে তার বিনিময় মূল্য পায়।
  • মিশ্র প্ল্যাটফর্ম (যেমন অ্যাপল ইকোসিস্টেম): উৎপাদন, সার্কুলেশন ও বিজ্ঞাপন - তিনটি ক্ষেত্র থেকেই অতিরিক্ত মুনাফা নিজেদের দখলে নিয়ে আসে।

৩.৩    আর্থিক পুঁজির নিয়ামক ভূমিকাকে উপেক্ষা করা

শুধু অ্যালগরিদম ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রমিক ও ব্যবহারকারীদের নিয়ন্ত্রণই সব না, এর পিছনে মূল চালক হল আর্থিক পুঁজি। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও শেয়ারবাজারে উচ্চ মূল্যের চাপ এ ধরণের প্ল্যাটফর্মকে আরও বেশি ব্যবহারকারী, বেশি ডেটা, ও বেশি বাজার’কে নিজেদের দখলে আনার দিকে ঠেলে দেয়। এর ফলে শ্রমশক্তির উপর পুঁজি বহুমাত্রিক শোষণ চালায়।  উপভোক্তা ঋণ, সাপ্লাই চেইন ফিন্যান্সের মতো পণ্য বাজারে নিয়ে আসে এবং উদ্বৃত্ত মূল্যের বিতরণের ক্ষেত্রে নিজেকে প্রধান নিয়ন্ত্রকে পরিণত করে।

.     সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ডিজিটাল অর্থনীতির চর্চা ও শিক্ষা

৪.১ তথ্য (ডেটা) ভিত্তিক সম্পত্তি অধিকারের উদ্ভাবন ও তার বাজারভিত্তিক বরাদ্দ

পুঁজিবাদী ডিজিটাল অর্থনীতিতে প্ল্যাটফর্মগুলোর ডেটা সম্পদ দখল ও একচেটিয়া লাভ ভাঙতে হলে ডেটা সম্পত্তি অধিকার কাঠামোতে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন জরুরি। চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতান্ত্রিক ডিজিটাল অর্থনীতি এমন এক পথের সন্ধান করেছে যেখানে ডেটা মালিক, উৎপাদক ও ব্যবহারকারীর অধিকার সুরক্ষিত থাকে, আবার ডেটার কার্যকর প্রবাহ ও ব্যবহারও সম্ভব হয়।

পৃথকীকরণের নীতি অনুযায়ী তথ্যের ক্ষেত্রে তিনটি অধিকার কার্যকর হয়।

১. তথের মালিকানা - পাবলিক ডেটা (যেমন ট্রাফিক ডেটা), কর্পোরেট ডেটা (যেমন আলিবাবার লেনদেন তথ্য), এবং ব্যক্তিগত ডেটা (যেমন উইচ্যাট প্রোফাইল)–এর মালিকানা নির্ধারণ।

২. প্রক্রিয়াকরণ ও ব্যবহারের অধিকার - যারা ডেটা প্রসেসিং-এ বিনিয়োগ করে, তারা সেখান থেকে আয় করার অধিকার রাখবে।

৩. তথ্য ভিত্তিক পণ্যকে পরিচালনা করার অধিকার - প্রক্রিয়াজাত ডেটা বা তথ্য’কে পণ্যের বাজারে লেনদেনের বৈধ অধিকার।

বেইজিং, শাংহাই, শেনজেন প্রভৃতি শহরে সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী তথ্য বিনিময় কেন্দ্র (ডেটা এক্সচেঞ্জ সেন্টার) স্থাপন করা হয়েছে। এই সমস্ত কেন্দ্রে তথ্য ভিত্তিক পণ্যের মালিকানার নিশ্চিতকরণ, মূল্যায়ন, বিভিন্ন মালিকানার মধ্যে মিল খুঁজে বের করা ও লেনদেনের মাধ্যমে তথ্যের নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে।

৪.২     ডিজিটাল অর্থনীতির শাসন কাঠামোয় উদ্ভাবন

পুঁজিবাদী ডিজিটাল অর্থনীতিতে ডিজিটাল ভাড়া মূলত একচেটিয়া নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল উৎপাদন-উপকরণের ফলে সৃষ্ট বাজার বিকৃতি।

শি জিনপিং বলেছেন: ‘প্ল্যাটফর্মগুলির মনোপলি ও পুঁজির অগোছালো সম্প্রসারণ রোধ করতে হবে। আইন অনুযায়ী প্রতিযোগিতা বিরোধী একচেটিয়া আচরণ সমূহের ক্ষেত্রে তদন্ত করতে হবে’।

চীনের সরকার ২০২১ সাল থেকেঃ

  • একচেটিয়া বিরোধী (অ্যান্টি-মোনোপলি) তদারকিকে জোরদার করেছে। যেমন আলিবাবা, টেনসেন্ট, মেইটুয়ান-এর বিরুদ্ধে তদন্ত ও জরিমানা করা হয়েছে।
  • “রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব + বাজার সমন্বয়” মডেলে ডিজিটাল পরিকাঠামোর উন্নয়ন করেছে।
  • সুপার-প্ল্যাটফর্মগুলিকে (৫০০ মিলিয়ন বা তার চাইতেও বেশি ইউজার রয়েছে যাদের) নিজেদের ইকোসিস্টেমকে উন্মুক্ত করতে বাধ্য করেছে যাতে পরিষেবাগুলির আন্তঃসংযোগ সম্ভব হয়।

“East Data, West Computing” প্রকল্পের অধীনে ৮টি জাতীয় কম্পিউটিং হাব ও ১০টি ডেটা সেন্টার ক্লাস্টার গড়ে তোলা হয়েছে। নিংশিয়া ঝংওয়ে ক্লাস্টারটি গ্রীন এনার্জি বা পরিবেশবান্ধব শক্তি ভিত্তিক ডেটা সেন্টারের মডেল দিচ্ছে এবং হুয়াওয়ে, ইনস্পুর প্রভৃতি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের কাজের প্রতি আকৃষ্ট করছে।

৪.৩     নতুন কর্মসংস্থানে শ্রমিকদের অধিকারের সুরক্ষা

ডিজিটাল শ্রমিকরা প্রায়ই “অ্যালগরিদমের খাঁচা”-য় আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এর বিরুদ্ধে নতুন কর্মসংস্থানে শ্রম অধিকার সুরক্ষার নীতি (MOHRSS No.56, 2021) প্রণীত হয়েছে।

মূল উদ্যোগ

  • বহু শহরে গিগ কর্মীদের জন্য পূর্ণ প্রিমিয়ামের পেশাগত দুর্ঘটনা বীমা চালু করেছে।
  • হাংঝৌ-তে কুরিয়ার ও গিগ কর্মীদের জন্য ডিজিটাল ক্ষেত্রে দক্ষতার সার্টিফিকেশন এবং তার সাথেই তাদের বাসস্থানের জন্য পয়েন্ট বোনাস, সরকারি প্রশিক্ষণ ভর্তুকি ও করছাড় ইত্যাদি দেওয়া হয়।
  • ত্রিপাক্ষিক আলোচনা (সরকার–ইউনিয়ন–প্ল্যাটফর্ম) ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে শ্রমের মান নির্ধারণ ও চুক্তির বাস্তবায়ন করা হয়। জিয়াংসুর নানতং শহরের ব্যবস্থাকে উদাহরণ হিসাবে নেওয়া যায়।

প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় স্তরের আয়-বণ্টনে শ্রমিকের স্বার্থকে কেন্দ্র করে ‘শ্রমই মূল্য সৃষ্টি করে’ নীতি মেনে চলে এবং সমাজে মূল্য সহ-সৃষ্টি ও বন্টন উৎসাহিত করে।

. শেষ কথা

ডিজিটাল অর্থনীতির জমানায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উপর বিভিন্ন সংস্থার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল ভাড়া, এবং শ্রম নিয়ন্ত্রণ- এসবই আসলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নিজেকে সামন্ত যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার নিদর্শন বলে টেকনো-ফিউডালিজম’র ধারণা’য় মনে করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এ হলো ডিজিটাল পরিসরে পুঁজির সঞ্চয়, পুঁজিবাদী যুক্তিরই একটি ধারাবাহিকতা মাত্র।

মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব দেখায় যে তথ্য উৎপাদনের উপাদানের উপর দখল, অ্যালগরিদমিক ক্ষমতার সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল শ্রমের আড়ালে চলতে থাকা শোষণ আসলে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে উদ্বৃত্ত মূল্য দখলেরই আধুনিক রূপ।

টেকনো–ফিউডালিজমের ধারণা কেবল ডিজিটাল ভাড়া ও সামন্ত অর্থনীতির মিল’কেই সামনে টেনে আনে। কিন্তু পুঁজির প্রযুক্তিগত পুনর্গঠনের অন্তর্নিহিত যুক্তিকে এই ধারণায় উপেক্ষা করা হয়। ফলে এটি কেবল উপরে উপরে বা বলা চলে ভাসা ভাসা ঘটনাকে বিচার করে, ফলে পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত বিরোধকে উপলব্ধি করতে ব্যর্থই হয়।

এর বিপরীতে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ডিজিটাল অর্থনীতির চর্চা পুঁজিবাদী ডিজিটাল অর্থনীতির সমস্যার উত্তর হিসাবে এক ঐতিহাসিক সমাধানকে সামনে এনেছে—

  • তথ্যের অধিকার ধারণার উদ্ভাবন ও তাকে বাজারভিত্তিক বণ্টনের মাধ্যমে তথ্যকে ব্যক্তিগত একচেটিয়া মালিকানার থেকে সরিয়ে সামাজিক মালিকানার আওতায় নিয়ে আসা।
  • একচেটিয়া বিরোধী (অ্যান্টি–মোনোপলি) তদারকি ব্যস্থাকে জোরদারের মাধ্যমে প্ল্যাটফর্ম ভিত্তিক পুঁজি প্রসারণের বিশৃঙ্খলাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।
  • নতুন কর্মসংস্থানে শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় উপযুক্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ডিজিটাল অর্থনীতির বিতরণ কাঠামোকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে শ্রমিক ও ব্যবহারকারীর মধ্যে যৌথভাবে মূল্য সৃষ্টি ও সম্পদের বণ্টনকে নিশ্চিত করা।

এমন প্রয়াস প্রমাণ করেছে যে চীনের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট সহ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ডিজিটাল অর্থনীতিতে পুঁজির সঞ্চয় চক্রকে ভেঙে জনসাধারণ কেন্দ্রিক উন্নয়ন অর্জন করা যেতে পারে।

ভবিষ্যত সম্পর্কে বলা যায় ডিজিটাল অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য তাত্ত্বিকভাবে তথ্য (ডেটা) উপাদানের মূল্য নির্ধারণকে আরও গভীর করা এবং বাস্তবে বৃহৎ মডেলের সমাজতান্ত্রিক প্রয়োগের অনুসন্ধান করা জরুরি। মানবমুক্তির অভিমুখে ডিজিটাল অর্থনীতিকে অগ্রসর করেই আমরা ‘টেকনো–ফিউডালিজম’র মতো পশ্চাদগকেমন ঠেকাতে পারব এবং মানবসভ্যতার এগিয়ে চলার জন্য নতুন ও বাস্তবোচিত পথ’কে উন্মোচিত করতে পারব।



বাংলা অনুবাদঃ সৌভিক ঘোষ ও অঞ্জন মুখোপাধ্যায়

ইংরেজি ও বাংলা শিরোনাম রাজ্য ওয়েবডেস্কের নিজস্ব

 

[i] SSRN, formerly known as Social Science Research Network, is an open access research platform used to share early-stage research, evolve ideas, measure results, and connect scholars around the world. From submission to distribution, the potential is there for your research to reach millions of SSRN viewers and subscribers around the world. 

 


প্রকাশ: ১৮-আগস্ট-২০২৫

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 18-Aug-25 01:43 | by 2
Permalink: https://cpimwestbengal.org/digital-economy-techno-feudalism-the-analysis-
Categories: International
Tags: bigcapital, capitalism, economy, karlmarx, surplusvalue, digitaleconomy, technofeudalism
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড