তৃণমূল-বিজেপি আঁতাত স্পষ্ট - 'নির্দল' প্রার্থী দীনেশ বাজাজ

Author
ওয়েবডেস্ক

TMC-BJP Nexus - Ex TMC MLA 'Independent' Candidate

প্রকাশ: ১৪-মার্চ-২০২০

বিজেপি’র সঙ্গে বোঝাপড়া করেই শেষ পর্যন্ত রাজ্যসভার পঞ্চম আসনেও প্রার্থী দাঁড় করালো তৃণমূল। শুক্রবার মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিনের শেষ মিনিটে সময় শেষের মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগে মনোনয়ন জমা দিতে রিটার্নিং অফিসার তথা বিধানসভার সচিবের ঘরে দৌড়তে দৌড়তে প্রবেশ করেন তৃণমূলেরই প্রাক্তন বিধায়ক দীনেশ বাজাজ। মনোনয়ন জমা দিয়ে বেরিয়ে তিনি বললেন, ‘হঠাৎ করে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিলাম। আগে বিধায়ক ছিলাম, এখন আরও উঁচুতে উঠতে ইচ্ছে হলো। তাই দিদিকে বললাম রাজ্যসভায় প্রার্থী হতে চাই। উনিও বললেন, তাই নির্দল হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম।’

‘হঠাৎ’ করে নিজের উঁচুতে ওঠার ‘ইচ্ছে’পূরণের জন্য ‘নির্দল’ প্রার্থী হওয়ার যে কাহিনি তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, বাস্তব ঘটনাবলি তার উলটো দেখাচ্ছে। তৃণমূল এবং বিজেপি নিজেদের পরস্পর বিরোধিতাকে জনসমক্ষে অব্যাহত রেখে কীভাবে গোপনে হাত মিলিয়ে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের যৌথ প্রার্থীকে আটকাতে মাঠে নেমেছে তা স্পষ্ট হয়ে গেছে।

তৃণমূলের দুই প্রার্থী আগেই মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন, বৃহস্পতিবার মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের যৌথ প্রার্থী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যও। শুক্রবার শেষ দিনে তৃণমূলের আরও দুই প্রার্থী মৌসম বেনজির নূর এবং অর্পিতা ঘোষ তাঁদের মনোনয়ন জমা দিয়ে দেন। সব মিলিয়ে পাঁচ শূন্য আসনের জন্য পাঁচ প্রার্থীর মনোনয়ন জমা হয়ে যাওয়ার পরে নাটকের শুরু। ষষ্ঠ প্রার্থী হিসাবে দীনেশ বাজাজ মনোনয়ন জমা দিতেই নির্বাচন অবধারিত হয়ে উঠতে চলেছে। 

শুরুতে এদিন দুপুরে দীনেশ বাজাজ বিধানসভায় এসে পার্থ চ্যাটার্জির ঘরে ঢোকেন। তৃণমূল নেতা ও পরিষদীয় মন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি আগের দিনই বলে দিয়েছিলেন, ‘পঞ্চম আসনে প্রার্থী দেব কিনা সময় হলে দেখতে পাবেন। নির্দল কেউ প্রার্থী হলে আমরা সমর্থন করতে পারি।’ অন্যদিকে এদিনই দুপুরে বিজেপি’র রাজ্য অফিস থেকে বিজেপি নেতা সায়ন্তন বসুও জানিয়ে দেন, ‘আমরা প্রার্থী দিচ্ছি না। নির্দল কেউ প্রার্থী হলে আমরা সমর্থন করার জন্য হাইকমান্ডের অনুমতি চাইব। তারা যা বলবে তাই হবে।’ তৃণমূল এবং বিজেপি’র গোপন আলোচনার ভিত্তিতে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে তা বোঝাই যাচ্ছিলো। এরপরেই দীনেশ বাজাজ বিধানসভায় পার্থ চ্যাটার্জির ঘর থেকে বেরিয়ে বলেন, ‘আমি প্রার্থী হচ্ছি। একটু পরেই মনোনয়ন জমা দেবো।’ একথা বলে তিনি বিধানসভা থেকে বেরিয়ে যান মনোনয়নের কাগজপত্র ও হলফনামা প্রস্তুত করতে।

এদিকে ঘড়ির কাঁটা তখন দুপুর তিনটে ছুঁতে চলেছে। নির্বাচন কমিশনের কঠোর নির্দেশ অনুসারে তিনটেয় মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় শেষ। সময় শেষের পাঁচ মিনিট আগে থেকে প্রতি মিনিটে মিনিটে বিধানসভার সচিব তথা রিটার্নিং অফিসারের ঘর থেকে চিৎকার করে ঘোষণা করা হচ্ছে, ‘যদি কেউ মনোনয়ন জমা দেওয়ার জন্য এসে থাকেন তাহলে এখনই চলে আসুন, সময় এখনই শেষ হবে।’ ঘড়ির কাঁটা যখন ২টো বেজে ৫৯ মিনিট তখনও দীনেশ বাজাজের দেখা নেই। রিটার্নিং অফিসারের ঘরের সামনে তখন সাংবাদিকদের ভিড়। আর বোধহয় মনোনয়ন জমা পড়ল না, এই ভেবে সবাই যখন প্রায় নিশ্চিত, তখনই দেখা গেল বিধানসভায় ঢুকে গাড়ি থেকে নেমে ছুটতে ছুটতে রিটার্নিং অফিসারের ঘরে ঢুকছেন দীনেশ বাজাজ। সময় শেষের কয়েক সেকেন্ড আগে তিনি ঢুকতে পেরেছেন। প্রায় দু’ঘণ্টা বসে থেকে মনোনয়ন খুঁটিয়ে দেখে জমা দিয়ে বেরিয়ে এসে তিনি বললেন, আরও উঁচুতে ওঠার ইচ্ছে হলো তাই নির্দল প্রার্থী হলাম।

নামেই নির্দল। দীনেশ বাজাজের মনোনয়নে প্রস্তাবক হিসাবে নাম রয়েছে মন্ত্রী সহ দশজন তৃণমূল বিধায়কের। তিনি বলেছেন, ‘তৃণমূল আমাকে সমর্থন করবে বলেছে। বাকি দলের কাছেও সমর্থন চাইব।’ কিন্তু বামফ্রন্ট কংগ্রেসের তো নিজেদের প্রার্থী রয়েছে, তারা আপনাকে সমর্থন দেবে না। তাহলে বিজেপি’র কাছেও কি সমর্থন চাইবেন? সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে দীনেশ বাজাজ বললেন, দল হিসাবে নয়, বিজেপি’র বিধায়কদের কাছে নিশ্চয়ই সমর্থন চাইব।

বিজেপি আর তৃণমূল নাকি এভাবেই পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করবে! 

কিন্তু শুধু তৃণমূল এবং বিজেপি’র বিধায়কদের ভোট পেলেও দীনেশ বাজাজের পক্ষে জেতা সম্ভব নয়। বিধানসভায় বিধায়ক সংখ্যার বিচারে বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেসের ভোটেই বিকাশ ভট্টাচার্যের জয় নিশ্চিত। তাহলে? কীভাবে জিততে চাইছেন দীনেশ বাজাজ? তৃণমূল এবং বিজেপি মুখে কুলুপ এঁটেছে। আর দীনেশ বাজাজ বলেছেন, আমার স্ট্র্যাটেজি আগে বলব কেন? 

স্ট্যাটেজি যাই হোক না কেন আসল কথা হলো কংগ্রেস অথবা বামফ্রন্টের বিধায়ক ভাঙাতে হবে তৃণমূলকে। মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক, গোয়া, মনিপুর সব জায়গায় বিজেপি যা করছে এবং এরাজ্যে তৃণমূল যেভাবে দল ভাঙিয়ে পৌরসভা দখল করেছে, সেভাবেই রাজ্যসভায় জিততে চাইছে। বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের থেকে ইতিমধ্যেই তৃণমূলের কিনে নেওয়া বিধায়কদের সদস্যপদ খারিজ করেননি অধ্যক্ষ। কিন্তু তাদের সংখ্যাতেও দীনেশ বাজাজ জিততে পারবেন না। আরও বিধায়ক ভাঙাতে হবে। তৃণমূল সেই খেলাতেই নামছে বিজেপি’র সহযোগিতায়। 

বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের ঐক্যবদ্ধভাবে ‘তৃণমূল-বিজেপি বিরোধী’ লড়াইতে যাওয়ায় এবং বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের মতো লড়াকু আইনজীবীকে যৌথ প্রার্থী করার সিদ্ধান্তে তৃণমূল এবং বিজেপি কতটা সমস্যায় পড়েছে তা তাদের আচরণেই স্পষ্ট। যেভাবেই হোক বিকাশ ভট্টাচার্যকে ঠেকাতে তৃণমূল মরিয়া হয়ে কংগ্রেসের একাংশের কাছে বার্তা পাঠায় যে বামফ্রন্টের কাউকে নয়, কংগ্রেস মীরাকুমারের মতো কাউকে অথবা কংগ্রেস নিজেদের কাউকে প্রার্থী করুক। তাহলে তৃণমূল পঞ্চম আসনে আর প্রার্থী দেবে না। কিন্তু কংগ্রেসের তরফে তাতে সাড়া না পাওয়ায় তৃণমূল এবং বিজেপি উভয়ের কাছেই গ্রহণযোগ্য দীনেশ বাজাজকে নির্দল প্রার্থী হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছে। 

বামফ্রন্ট পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের যথেষ্ট বিধায়ক রয়েছে বিকাশ ভট্টাচার্যকে জেতানোর জন্য। কাজেই আমাদের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। অন্যদিকে তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়ক যাকে বিজেপি প্রার্থী করবে বলে ঠিক করেছিল তার নাম তৃণমূল এখন প্রস্তাব করে নির্দল প্রার্থী করেছে যাতে বিজেপি’র সমর্থনও পাওয়া যায়। দল ভাঙিয়ে দীনেশ বাজাজকে জেতানোর চেষ্টা করলেও ওরা সফল হবে না, বরং তৃণমূলের গোষ্ঠী কোন্দলে ওদেরই চারজন প্রার্থীর কারো জয় বিঘ্নিত হয় কিনা সেটা দেখুক। বিরোধী দলনেতা আবদুল মান্নানও বলেছেন, আমাদের একান্ন বাহান্ন জন বিধায়ক রয়েছে, তাতেই বিকাশ ভট্টাচার্য জিতবেন। আমাদের চাপ কীসের? 

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 14-Mar-20 13:59 | by 4
Permalink: https://cpimwestbengal.org/tmc-bjp-nexus-ex-tmc-mla-independent-candidate
Categories: Current Affairs
Tags: rs election, tmc bjp nexus
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড